Saturday, August 20, 2022

হাংরি আন্দোলনের কবি সমীরণ ঘোষ ( ১৯৫৩ - ২০১২ )

 হাংরি আন্দোলনের কবি সমীরণ ঘোষ (১৯৫৩ – ২০১২) 

মলয় রায়চৌধুরী

এক

উত্তরবঙ্গের কবি ও লেখক অলোক গোস্বামী,  রাজা সরকার,, অরুণেশ ঘোষ, অলোক গোস্বামী, প্রবীর শীল, রতন নন্দী, কিশোর সাহা, কুশল বাগচি, সুমন্ত ভট্টাচার্য, পল্লবকান্তি রাজগুরু, চন্দন দে, বিকাশ সরকার, মলয় মজুমদার, মনোজ রাউ্‌ত,  জীবতোশ দাস প্রমুখের মতো সমীরণ ঘোষও ছিলেন হাংরি আন্দোলনের অংশভাক। এনাদের কয়েকজনের মতো সমীরণ ঘোষ ছিলেন দেশভাগের উদ্বাস্তু । স্বাভাবিক যে শৈশব থেকে দারিদ্র্যের মোকাবিলা করতে হয়েছে । বাবা নীরদচন্দ্র ঘোষ , মা লাবণ্যপ্রভা ঘোষের ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে। 


সমীরণ ঘোষ পঞ্চম পুত্র ও নয় সন্তানদের মধ্যে অষ্টম গর্ভের সন্তান । অষ্টম গর্ভ নিয়ে বাঙালিদের মধ্যে একটি কিংবদন্তি বেশ জনপ্রিয় । কংসের বোন দেবকীর সঙ্গে বসুদেবের বিয়ে হয়। বিয়েতে উপস্থিত থাকা কালে কংস দৈববাণী শুনতে পান যে দেবকীর অষ্টম সন্তান তাকে বধ করবে। তাই তিনি দেবকী ও বাসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন। কারাগারে এঁদের পর পর ছয়টি সন্তান হয়, তাদের সকলকে কংস হত্যা করেন। সপ্তম সন্তান শ্রীবলরাম দেবকীর গর্ভ থেকে প্রতিস্থাপিত হন গোকুলবাসী বসুদেবের দ্বিতীয় স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে। সেখানেই ভাদ্রমাসের পূর্ণিমায় তাঁর জন্ম হয়। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে মধ্যরাতে কৃষ্ণ নামে অষ্টম পুত্রের জন্ম হয়। বংশ রক্ষার জন্য বসুদেব তক্ষুনি কৃষ্ণকে গোকুলে গোপরাজ নন্দের ঘরে গোপনে রেখে আসেন। সেই রাতেই নন্দের স্ত্রী যশোদার কন্যা যোগমায়ারূপে জন্মগ্রহণ করেন দেবী মহাশক্তি। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে মধ্যরাতে কৃষ্ণ নামে অষ্টম পুত্রের জন্ম হয়। বংশ রক্ষার জন্য বসুদেব তক্ষুনি কৃষ্ণকে গোকুলে গোপরাজ নন্দের ঘরে গোপনে রেখে আসেন।  বসুদেব কৃষ্ণকে যশোদার ঘরে রেখে সদ্যোজাত কন্যা যোগমায়াকে নিয়ে মথুরায় ফেরেন। কংস তখন যোগমায়াকে পাথরে ছুঁড়ে মেরে ফেলার হুকুম দেন, কিন্তু যোগমায়া নিক্ষিপ্ত অবস্থায় আকাশে উঠে গিয়ে বলেন, “তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।” 


কংসকে বলা যায় সেই সময়ের প্রতিষ্ঠান । আশ্চর্য নয় যে অষ্টম গর্ভের সন্তান সমীরণ ঘোষ কবিতার জগতে প্রতিষ্ঠানবিরোধী কবি হিসাবে পরিচিত হন । আমরা জানি, কংস দুষ্ট প্রকৃতির প্রজা পীড়নকারী ভোজবংশীয় রাজা ছিলেন। তিনি মথুরারাজ উগ্রসেনের স্ত্রী পদ্মাবতী আর রাক্ষস দ্রুমিলের অবৈধ সহবাসের ফলে জন্মগ্রহণ করেন। মহারাজ উগ্রসেনের অজ্ঞাতে তাঁর পরমাসুন্দরী স্ত্রী মহারাণী পদ্মাবতীর সাথে রাক্ষসরাজ দ্রুমিল উগ্রসেনের ছদ্মবেশে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। রাণী পদ্মাবতী তাকে নিজের স্বামী ভেবে আপত্তি করলেন না।  সুখে মত্ত হয়ে রাক্ষসরাজ দ্রুমিল আত্মপ্রকাশ করলে তাকে চিনেও রাণী পদ্মাবতী কিছু বললেন না। রাক্ষসের বীর্যে অন্তঃসত্ত্বা হলেন রাণী। গর্ভাবস্থার শেষে জন্ম দিলেন এক পুত্রসন্তানের। নাম দেন কংস। রাক্ষসের ঔরস্যে জন্ম বলেই তিনি রাক্ষসের স্বভাব পেয়েছিলেন। তিনি মগধের রাজা জরাসন্ধের দুই মেয়ে অস্তিপ্রাপ্তিকে বিয়ে করেন। তিনি জরাসন্ধের সহায়তায় বুড়ো বাপ রাজা উগ্রসেনকে বন্দি করে মথুরার রাজা হন। 


সমীরণ ঘোষের দেশের বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের বেতাটি গ্রাম, নেত্রকোনা , ময়মনসিংহ ; সেখান থেকে বাবা-মা ভাই-বোনদের সঙ্গে ১৯৬৯ সালে চলে আসেন শিলিগুড়ির ডাবগ্রামে।পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে  তিনি  কয়েক রাত পায়ে  হেঁটে ভারতে এসেছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক দেবব্রত বিশ্বাসও ময়মনসিংহ থেকে চলে এসেছিলেন ।


 কৈশোর থেকে প্রথম যৌবন কাটিয়েছিলেন শিলিগুড়ি শহরে। সাহিত্যে আগ্রহ ও কবিতা লেখার শুরু শিলিগুড়িতে।শিলিগুড়িতে চাঁদা তুলে লিটল ম্যাগাজিন আরম্ভ করেন এবং যৌথ সম্পাদনা করেন ধৃতরাষ্ট্র, ঋত্বিক, ঠিকানা, কনসানট্রেশন ক্যাম্প ইত্যাদি পত্রিকার । শিলিগুড়িবাসী অন্যান্য তরুণ কবিদের মতো তাঁর ওপরও প্রথম দিকে অরুণেশ ঘোষের প্রভাব ছিল । দেশভাগ, দারিদ্র্য ও নকশাল আন্দোলনের রাজনৈতিক টালমাটালে উত্তপ্ত সত্তর দশকে লেখালিখিতে প্রথার বিরুদ্ধে সাঁতার দেবার প্রয়াস করেন আর ১৯৬১ সালে শুরু হয়ে থিতিয়ে পড়া হাংরি সাহিত্য আন্দোলনকে উত্তরবঙ্গে আরেকবার জাগিয়ে তোলার কাজে সমমনস্ক বন্ধুদের সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ আরম্ভ করেন । চাকরি পাওয়া যাবে না অনুমান করে সমীরণের অভিভাবকরা তাঁকে  বাংলায় সাম্মানিক স্নাতক কোর্সে ভর্তি হতে দেননি । তাই বিকাল থেকে রাত অবধি শিলিগুড়ি নাইট কলেজে বাণিজ্য বিভাগে পড়ে স্নাতক হন । সাংসারিক দায়িত্বের কারণে তাঁকে চাকুরি খোঁজা আরম্ভ করতে হয় আর পেয়ে যান পোস্টঅফিসে চাকুরি । সে চাকুরি ছিল ডাকবিভাগের পিওনের । 


সমীরণ ঘোষের বাবা ছিলেন পোস্টমাস্টার । সম্ভবত বাবার সুপারিশে তিনি ২০ বছর বয়সে ডাক বিভাগে পিওনের চাকরিতে যোগ দেন কবি । শিলিগুড়ির অভিজাত হাকিম পাড়ার একাধিক গলিতে সাইকেলে চেপে চিঠি বিলি করতেন। শীত, গ্রীষ্ম হোক বা বর্ষা, চিঠি বিলি করার কায়িক পরিশ্রমের কারণে সমীরণ  কয়েকবার শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন আর নতুন চাকুরির খোঁজ করতে থাকেন । সাহিত্যের আড্ডায় মশগুল সমীরণ ঘোষ একদিন  খেয়াল করেন যে তাঁর সাইকেলে ঝোলানো  চিঠির ব্যাগ রাস্তায় টেনে নামিয়ে একটা গরু সেগুলো চেবাচ্ছে।  ডাকবিভাগ অমন দায়িত্বহীনতা সহ্য করেনি। 


পিওনের চাকরিটা ছাড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন এবং সুযোগ পেয়ে যান  ডাক বিভাগের পোস্টাল অ্যাসিস্টেন্ট বা ক্লার্কের  পরীক্ষা দেবার। সফল তিনি হন কিন্তু অবহেলার শাস্তি হিসাবে পোস্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিযুক্ত হবার সময়ে তাঁকে ট্রান্সফার করে দেয়া হয়  শিলিগুড়ি থেকে ৮০ কিমি দূরে জঙ্গল পাহাড় ঘেরা নাগরাকাটাতে।  মহানন্দার পাড় থেকে তিস্তা পেরিয়ে বহুদূরে । কলকাতা তো নয়ই, শিলিগুড়িতেও আর ফেরা হয়নি কবির।এক দিক থেকে ভালো হয়েছিল যে অরুণেশ ঘোষের প্রভাব বলয়ের বাইরে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তবে নাগরকোটায় সমমনস্ক সাহিত্যিক বন্ধু তিনি পাননি । নাগরকোটায় থাকতে ১৯৮১ সালে বিয়ে করেন শিক্ষিকা দুলালী মহালনবীশকে । দুলালী  প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হয়েছিলেন। চালসা পেরিয়ে কিলকোট পাহাড়ে ছোট স্কুল তাঁর। আজীবন সেখানেই চাকরি করেছেন সমীরণের স্ত্রী। ১৯৮৫ সালে তাঁর ছেলে সব্যসাচীর জন্ম হয়। ২০১১ সালে  সব্যসাচীর বিয়ে হয় রাজশ্রী দত্তের সঙ্গে। সেই বছরই মারা যান সমীরণ ।


১৯৮৬ সালে নাগরকোটা থেকে ট্রান্সফার হয়ে থিতু হন  ডুয়ার্সের মালবাজার শহরে, জলপাইগুড়ি জেলায়। চিরকাল মালবাজারে থাকতে হয়েছে আর এখানে বসেই লিখেছেন প্রতিভূমিকা, রক্তবীজ, রহস্যবৃষ্টি, মুষলগর্ভ, এক অন্ধ আরেক চক্ষুষ্মাণ, দারিদ্র বিক্রি আছে, হোঁচটনামা নামের বইগুলোর কবিতা । তাঁর মৃত্যুর পর, কবিতীর্থ প্রকাশনীর কর্ণধার উ্রৎপল ভট্টাচার্যের সৌজন্যে, ‘হোঁচটনামা’ কাব্যগ্রন্হ প্রকাশনার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকায়,তাঁর কবিতা এরকম, ‘হোঁচট সর্বদাই খাওয়া যায়, এবং সর্বত্র। তবে হোঁচট খাওয়াটা অভ্যাস করতে হয়, ভাবতে হয়, হোঁচট একটি খাবার জিনিস । মালবাজারের প্রয়াত কবি সমীরণ ঘোষের এমন অনেক অপ্রকাশিত কবিতা ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কবিপত্নী দুলালী দেবী সেই পাণ্ডুলিপি আগলে রেখেছিলেন। কলকাতা বইমেলায় সেই কবির কবিতার বই ‘হোঁচটনামা’ প্রকাশিত হয়েছে কবিতীর্থের উৎপল ভট্টাচার্যের সৌজন্যে। শিলিগুড়িতে জন্ম হলেও পরে চাকরির সুবাদে মালবাজারে থিতু হয়েছিলেন তিনি। আমৃত্যু সেখানেই ছিলেন। সত্তর দশকে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।”


আমার মনে হয় মালবাজারের একাকীত্ব কাটাতে এবং মুর্শিদাবাদের সমীরণ ঘোষ নামে আরেজন কবি থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমীরণ হঠাৎই নিজের নামে যোগ করেন ‘সৈয়দ’। বহু কবিতা লিখেছেন সৈয়দ সমীরণ ঘোষ নামে । তবে ওনার যে বইগুলো আমি পড়েছি সেগুলোতে নামের সঙ্গে সৈয়দ যুক্ত করেননি । শিলিগুড়িতে থাকার সময়ে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্হ ‘প্রতিভূমিকা’ বেরোয় ১৯৮২ সালে। পরের কাব্যগ্রন্হগুলো মালবাজারে বসবাস করার সময়ে । ১৯৮৮ সালে ‘রক্তবীজ’, ১৯৯৬ সালে ‘রহস্যবৃষ্টি’, ২০০২ সালে ‘মুষল গর্ভ’, ২০০৬ সালে ‘এক অন্ধ আরেক চক্ষুষ্মান’, ২০০৯ সালে ‘দারিদ্র বিক্রি আছে’ । ‘হোঁচটনামা’ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর, ২০১‌৬ সালে । স্ত্রী দুলালীর সংরক্ষিত সমীরণের কাগজপত্র থেকে ‘হোচটনামা’ কাব্যগ্রন্হের প্রেস কপি তৈরি করে দিয়েছিলেন হাংরি আন্দোলনের আরেক কবি কিশোর সাহা ।সমীরণ ঘোষ গল্প লিখতেন কিনা জানি না, চোখে পড়েনি, তবে বাংলাদেশের একটি বিজ্ঞাপনে দেখলুম  সৌম্য সরকার ও মোস্তাফিজ কারিগরের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ নির্বাচিত হাংরি গল্প’  সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, অরুণেশ ঘোষ, অবনী ধর, ফালগুনী রায়, কনক ঘোষ, সুভাষ কুণ্ডু, আপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপকজ্যোতি বড়ুয়া, বিজন রায় এবং সমীরণ ঘোষ প্রমুখের গল্প।



দুই


তাঁদের সেই সময়ের সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে রাজা সরকার লিখেছেন,” তখন ১৯৭৭ ,৭৮। এই সময়ে আমি আর সমীরণ ঘোষ একটা ঠিকঠাক  লিটল ম্যাগাজিনের  সন্ধানে আমরা দুজন খুব উদগ্রীব হয়ে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় মিলিত হই স্থানীয় কোর্ট মোড় সংলগ্ন গ্রন্থাগারগুলোতে। তার একটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং অন্যটি তরাই হরসুন্দর । এই সময়েই একদিন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের রিডিং টেবিলে একটি শীর্ণ পত্রিকার সন্ধান পাই। নাম ‘ধৃতরাষ্ট্র’। সম্পাদক মনোজ রাউত। ততদিনে অবশ্য ‘পাহাড়তলী’ আর ‘আসমুদ্র হিমাচল’ নামে আরো দুটি পত্রিকার নাম আমরা শুনেছি বা দেখে ফেলেছি। অচিরেই ‘ধৃতরাষ্ট্র’ সম্পাদক মনোজ রাউত সম্পর্কে খোঁজ খবর করে একদিন তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় পর্ব সাঙ্গ হয়ে গেল। যেন আমরা পরস্পরকে খুঁজছিলাম। সেই পর্ব ছিল সেদিন বেশ দীর্ঘ এবং শেষ হয়েছিল একটি গোপন পানশালায়।”


শিলিগুড়ি শহর তখনও লিটল ম্যাগাজিনের জন্য শুনশান । ছোট কাগজ বলতে ঐ দু’চারটে যা বের হয় তা অনেকটা নির্বাক যুগের কথা মনে করিয়ে দেয় । হয়তো তাতে কখনো দু’চারটে ভাল লেখার হদিশও আছে, কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের আধার সেখানে তৈরি হয়নি । লেখালেখির বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক গাম্ভীর্য তখনো লিটল ম্যাগাজিনের জন্মের অন্তরায় । ঠিক এই রকম এক আবহে নতুন করে শিলিগুড়িতে একটি লিটল ম্যাগাজিনের শুরু। নাম “ধৃতরাষ্ট্র”। পাত্র মিত্ররা মনোজ রাউত,সমীরণ  ঘোষ,পল্লব কান্তি রাজগুরু, চন্দন দে ও রাজা সরকার। লেখা ও  জীবন খুব কাছাকাছি নিয়ে আসার প্রচেষ্টার সেই শুরু । শুরু লেখার ভাষা ও স্বভাব চরিত্রের  পরিবর্তনেরও । আর তার জন্য ক্রমশঃ যে সামাজিক ঘাত প্রতিঘাতের মুখোমুখি হতে হচ্ছিলো তা বলা বাহুল্য । কিন্তু  দমে যাওয়ার বদলে  ক’বছরের মধ্যেই  ব্যাপারটি আরো সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ওঠে । এরকম একটি পরিবেশে একসময় শিলিগুড়ির অন্তত ৬/৭টি লিটল  ম্যাগাজিন মিলে  একযোগে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করা শুরু হয়ে গেল । যার নাম ছিল  “কনসেনস্ট্রেশন ক্যাম্প” । সময়টা ১৯৮৩। এটিকে শিলিগুড়ির লিটল ম্যাগাজিনের দ্বিতীয় পর্ব বলা চলে। । আমাদের সবারই কমবেশি অভিজ্ঞতা বলছিল ব্যাক্তিগত ভাবে এক দুইজন মিলে একটি কাগজ করার চেয়ে সংঘবদ্ধভাবে একটি লিটল ম্যাগাজিন কে একটা আন্দোলনমুখী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া অনেক জরুরী। যাতে  আমাদের ভাষা ভাবনার আধার হতে পারে পত্রিকাটি। সক্রিয় লেখকসুচি হলো এরকম– অলোক গোস্বামী, প্রবীর শীল,রতন নন্দী, কিশোর সাহা,কুশল বাগচি,সুমন্ত ভট্টাচার্য,মলয় মজুমদার, মনোজ রাউ্‌ সমীরণ  ঘোষ, রাজা সরকার সহ আরও  অনেকে । শিলিগুড়ি শহরের বইপাড়াটাকেই সকাল বিকেল আমাদের পত্রিকার চলমান অফিস হিসেবে ধরা হতো। যেখানে আলাপ আলোচনা লেখালেখির নিয়ে তুমুল তর্ক বিতর্ক চলতো। চলতো পত্রিকা প্রকাশের যাবতীয় পরিশ্রমের কাজ। আশেপাশের মানুষজন এইসব কান্ড দেখে প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও পরে একসময় মেনে নিয়েছিল। এই  পর্বে আমার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে ষাট দশকের হাংরি জেনারেশনের লেখকদের । তখন এমন নয় যে হাংরি লেখকরা খুব সক্রিয়। তাদের সক্রিয়তা বা আন্দোলন অনেক আগেই ১৯৬৪/৬৫তেই স্তিমিত হয়ে গেছে। কিন্তু যেহেতু এটি একটি সাহিত্য আন্দোলন তার রেশ বা রচনার মৃত্যু ঘটেনি। শিলিগুড়িতে আমাদের মত  নতুন পাঠকের কাছে তা নিঃসন্দেহে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু এটা খুবই  আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত হলেও এই আন্দোলন সম্পর্কে শিলিগুড়ির লেখা জগৎ তখনও অন্ধকারে। খোঁজ খবর বইপত্র কিছুই পাওয়া যায়না।  তার উপর তখনো অতীতের নানা চাপের ফসল হাংরি লেখকদের উপর  দায় হিসেবে রয়ে গেছে । পত্রিকা বের হয় না। নিজেরাও তারা তখন অনেকটা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। তবে এদিক ওদিক থেকে ছিটকে কিছু বই হাতে আসলেও আন্দোলন সম্পর্কে জানার কোন উপায় নেই। আমরা তাদের লেখা পড়ার প্রথম সুযোগ পাই তখনকার ত্রিপুরাবাসী হাংরি কবি প্রদীপ চৌধুরি সঙ্গে যোগাযোগ করার পর। তিনি সেখান থেকে তখন কিছুটা নিয়মিত ‘ফুঃ’নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন।তার  সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে  সন্ধান পাই কবি অরুণেশ ঘোষ এর। তিনি কুচবিহারে থাকেন। হাংরি আন্দোলনের শরিক না হলেও উত্তরবঙ্গের তিনিই একমাত্র এই আন্দোলনের খোঁজখবর রাখতেন এবং তাদের শেষদিকের পত্র পত্রিকায় লিখতেন। তবে তখন তিনি খুব নীরব এবং নিঃসঙ্গ। ইতিমধ্যে তার সম্পর্কে অনেক সত্য মিথ্যা খবর রটানো ছিল। তার মধ্যে একটা ছিল যে উনি কারোর সঙ্গে দেখা করেন না। কিন্তু লেখালেখি নিয়ে আমাদের ভাষা ও ভাবনার সন্ধান তখন এতই তীব্র যে খুব দ্রুত আমি একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কিছু প্রশ্ন নিয়ে তার প্রত্যন্ত গ্রাম হাওয়ারগাড়িতে এক দুপুরে গিয়ে হাজির হই। সব রটনা মিথ্যা মনে হয়। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে  আমার কথা হয়। একসময় আমার লিখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর উনি ডাকযোগে আমাকে পাঠিয়েও দেন। যা আমার সম্পাদিত কাগজ ‘কুরুক্ষেত্রে’র এর শেষ সংখ্যায় ছাপা হয়। তারপর  থেকে অনেকদিনই আমাদের সঙ্গে তার সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। এবং  পরবর্তী কালে প্রকাশিত ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ এ তার প্রভাবও ছিল। দ্বিতীয় পর্বের লিটল ম্যাগাজিন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ তখনকার সময়ে প্রকাশিত কাগজগুলোর মধ্যে ক্রমশঃ উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।আশি এবং নব্বই এই দুই দশক জুড়ে এই কাগজটি লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র সম্পর্কে অনেক কথাই বলে। লিটল ম্যাগাজিন বাজারি বড় কাগজের ছিট কাগজ হিসেবে থাকবে, না কি  একটি পৃথক লেখা ভাবনার উপর নির্ভর করে শুধু সাহিত্য-শখ পুরণের খেলার সামগ্রী না হয়ে সময়ের দাবী অনুযায়ী একটি ভিন্ন; যাকে তখনকার মত বলা –প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখার আধার হয়ে উঠবে। আজ আর অস্বীকারের উপায় নেই যে ষাট দশকের হাংরি লেখকরা ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’এর মাধ্যমেই উত্তরের এই সব অঞ্চলে পরিচিতি পান। কেউ কেউ এটাকে হাংরি রিভাইভাল বলে ভাবতে ভালবাসতেন বা মলয় রায়চৌধুরি যেমন এগুলোকে হাংরি ছিট মহল বলে উল্লেখ  করতেন। কিন্তু আমরা জানতাম দুই দশক পরে নতুন করে হাংরি আন্দোলন হয় না। সময় এবং পরিসরের মাত্রা তখন ভিন্নতর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা টের পেলাম একটা হাংরিয়ালিজম দানা বাঁধছে কিছু হাংরি লেখকের মনে। দুই দশক পরে তখন আন্দোলনের একটা তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। হাংরি মেনিফেস্টোর অসম্পুর্ণতা দূর করার চেষ্টা। ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’সেই কাজে কিছুটা ব্যবহৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’এ সুভাষ ঘোষের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর আমরা নানা ভাবে আক্রান্ত বোধ করতে থাকি। সেই সাক্ষাৎকারে হাংরি কনসেপ্ট নিয়ে সুভাষের কথায় অনেকে অস্বস্থি বোধ করেন। অনেকেই আন্দোলন নিয়ে সুভাষের কথার বিরোধিতা করতে গিয়ে আমাদেরও তার সঙ্গে জড়িয়ে নেয়। সঙ্ঘ ভাঙা  মানুষেরা বোধ করি কোন সঙ্ঘ আর পছন্দ করে না। কিন্তু ততদিনে পাশাপাশি আমরা জেনে যাচ্ছি যে হাংরিদের অভ্যন্তরীণ মত পার্থক্য, মামলা কেন্দ্রিক কিছু ব্যক্তিগত বিভেদের সালতামামি। এসব অগ্রাহ্য না করতে পারলেও আমরা আমাদের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছিলাম। ততদিনে কিছুটা বিস্মৃত হয়ে যাওয়া ফাল্গুনি রায় ও অবনী ধর এর লেখা আমরা আমাদের কাগজে পুনঃ প্রকাশ করতে শুরু করি। হাংরি লেখকদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইও ঐসময় কনসেনস্ট্রেশন ক্যাম্পের লেখকদের নিজ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় । যেমন মনোজ রাউত প্রকাশ  করেন শৈলেশ্বর ঘোষের ‘প্রতিবাদের সাহিত্য’এবং অরুণেশ ঘোষের ‘অপরাধ আত্মার নিষিদ্ধ যাত্রা’। অরুণেশের এই বইটি যথেষ্ট বিতর্কিত হয় । বিতর্কিত হতে পারে কিন্তু বইটিকে অগ্রাহ্য করার ডাক দেয়া হয়েছিল কলকাতার ‘কাগজের বাঘ’এর পক্ষ থেকে। কিছুটা পরের দিকে খুব উল্লেখযোগ্য দুটি কাজ করেন অলোক গোস্বামী। একটি সুভাষ ঘোষের ‘গোপালের নয়নতারা’ও ফাল্গুনী রায়ের একটি রচনা সংকলন প্রকাশ । সাধারণ পাঠকের কাছে ফাল্গুনী রায় তখনও অনেকটা অজ্ঞাত। তার উপর তিনি ছিলেন হাংরি আন্দোলনের বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং কিছুটা ব্রাত্য ।  স্বাভাবিক ভাবেই  বইটি কোন পাঠক সহায়তা পায়নি কলকাতাতেও। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফাল্গুনী নিয়ে অনেক উচ্ছাস তৈরি হয় । তার রচনা সংকলিতও হয়। কিন্তু অলোক  গোস্বামীর এই  সংকলনটির উল্লেখ কোথাও দেখা যায় না। কলোনীর স্বভাব আমাদের  যাবে কোথায়! প্রসঙ্গত একটি উল্লেখ ফাল্গুনী রায় বিষয়ে করা যেতে পারে যে ফাল্গুনীর মৃত্যুর পর তার জন্য একমাত্র শোকসভাটি হয় কুচবিহার শহরের একটি ছোট্ট ঘরে । উপস্থিত ছিলেন আহবায়ক হিসেবে অরুণেশ ঘোষ, জীবতোষ দাস,ও অন্য দুএক জন এর সঙ্গে  শিলিগুড়ি থেকে যাই আমি। স্মৃতিচারণে অরুণেশ সেদিন  ফাল্গুনী সম্পর্কে আমাদের কিছুটা অবহিত করেন। ঘটনাটি‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’প্রকাশের আগেকার ঘটনা। দুটি দশক জুড়ে আমাদের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’এর কর্মকান্ড। আমরা না চাইলেও নিজেদের মুদ্রাদোষে আমরা পরস্পর কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি একটা সময়। সেই বিচ্ছিন্নতার মূলে প্রধানত ছিল  প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন, বিতর্ক। পাশাপাশি ছিল আমাদের পরিচিত হাংরি লেখকদের পারষ্পরিক বিদ্বেষপ্রসূত কার্যকলাপ।  আর এই ঘটনাক্রমে  ৬/৭ টি লিটল ম্যাগাজিনএর সঙ্ঘ ভাঙতে শুরু করলো। অলোক ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ থেকে সরে গিয়ে বের করলো ‘ক্রমশ’ ও আরো পরে ‘গল্পবিশ্ব’।   তারপরও বিচ্ছিন্ন ভাবে‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’এর আরো কয়েকটি সংখ্যা  আমার আর সুমন্ত ভট্টাচার্য্যের ব্যবস্থাপনায় বের হয়ে বন্ধ হয়ে যায়।” 


‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার শারদ ১৪২২ সংখ্যায় স্মৃতিচারণ করাকালে অলোক গোস্বামী লিখেছেন : “দিব্যি চলছিল প্রতিষ্ঠার সাম্পানে সওয়ারি হওয়ার লড়াই । দিবে আর নিবের পাকচক্রে মেতে থেকে বেশ স্ফূর্তিতেই ছিল সবাই । শহরে আয়োজিত বিভিন্ন অনিয়মিত মাসিক সাহিত্যচক্রে আমন্ত্রণ মিলছিল এবং কলার উঠিয়ে হাজিরও হচ্ছিল সবাই । মাঝপথেই হঠাৎ রাস্তাটা বাঁক নিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে গেল । সবার নয় । আমাদের কয়েকজনের । নিজেরাই ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম । ঘোরার ভাবনাটা বদলাতে সাহায্য করেছিল কিছু সাহচর্য ও লেখাপত্র । জেনেছিলাম সাহিত্য নিছকই বিনোদনের মাধ্যম নয় । নয় ভাতঘুমের সহায়ক বটিকা । পাঠক রুচি নামক ইওটোপিয়াকে সামনে রেখে শিল্প-সংস্কৃতির যে বেসাতি চালু আছে তার মূল উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা নয়, জনচেতনাকে দাবিয়ে রাখাও । সাহিত্য এবং জীবনকে একই মুঠোয় ধরতে হয় । এবং সত্য কোনো একমাত্রিক বিষয় নয় । প্রকৃত সত্যকে গোপন করতেই কলাকৈবল্যবাদ কিংবা প্রগতিশীলতার তত্ত্বের জন্ম । লিটল ম্যাগাজিনের মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানের লেখন সাপ্লাই করা নয়, কিংবা নয় হাত পাকাবার আসর । লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে আরেকটি শব্দ ওপ্রোত জড়িত— ‘আন্দোলন’ । যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য, পাঠককে সচেতন করে তার প্রত্যাশা বাড়ানো । তেজস্ক্রিয় ভাষা মারফত প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা । প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণা জীবনের তলা থেকে উঠে আসে না । সুতরাং গা গতরের ভাষা ব্যবহার করে ভাষাকে এলিটিজম থেকে মুক্ত করতে হবে । অর্থাৎ কিনা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে হবে । আমরা কয়েকজন আস্হা রাখলাম নতুন শ্লোগানের সঙ্গে— ‘প্রতিবাদের সাহিত্য’ ।”


ওই একই প্রবন্ধে অলোক গোস্বামী লিখেছেন, “যা পড়লাম তা মাথা বিগড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট । ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা । পরিচিত হলাম সুভাষ, শৈলেশ্বর, ফালগুনী, প্রদীপ, বাসুদেব অরুণেশদের লেখাপত্রের সঙ্গে । হাতের কাছে পেয়ে গেলাম রোল মডেল । ব্যাস শুরু হয়ে গেল মফঃশ্বল শহরে আমাদের জেহাদি জীবন । আমরা কয়েকজন নিজেদের পত্রিকার ঝাঁপ নামিয়ে প্রকাশ করলাম যৌথ-সম্পাদিত কাগজ — ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’ । ইতিপূর্বে সম্পাদক এবং বিজ্ঞাপনবিহীন পত্রিকা বাংলা ভাষায় কখনও প্রকাশিত হয়েছিল কিনা জানা নেই । জানা নেই এমন কোনো পত্রিকা যার ব্যাক কভার পেজে বিনা আমন্ত্রণে লেখা না-পাঠানোর সনির্বন্ধ অনুরোধ থাকত । ফ্রন্ট কভারে বোল্ড টাইপে লেখা থাকত– পাঠক তোমাকে খাবো। ক্ষুধার্তদের সঙ্গে যখন আমাদের যোগাযোগ হয়, ততদিনে জেল-জরিমানা পর্ব মিটে গিয়ে ক্ষুধার্ত আন্দোলনের ওপর থেকে প্রচারের আলো সরে গিয়েছে দূরে । নতুন প্রজন্মের কাউকে আকর্ষণ করতে পারছিল না ক্ষুধার্ত আন্দোলন । সুতরাং বলা যেতেই পারে, আটের দশকে ক্ষুধার্ত চেতনার পুনরুথ্থান ঘটেছিল শিলিগুড়িতে । এবং তা ঘটিয়েছিল ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’ । তারপর সমগ্র উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল হাংরি চেতনা । ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’-এর পাশাপাশি অন্যান্য শহর থেকেও প্রকাশিত হয়েছিল অজস্র পত্রিকা, যেমন ‘জিরাফ’, ‘রোবট’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘কুরুক্ষেত্র’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘দ্রোহ’, ‘বিকল্প’ ইত্যাদি ।”


তিন

উত্তরবঙ্গে হাংরি জেনারেশনের প্রসার ও বিলুপ্তি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, হাংরি পত্রিকা ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ এর সম্পাদক অলোক গোস্বামী তাঁর বই ‘মেমরি লোকাল’-এ এই কথাগুলো লিখেছিলেন : 

“নব্বুই দশকে সদ্য প্রকাশিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বগলে নিয়ে এক ঠা ঠা দুপুরে আমি হাজির হয়েছিলাম শৈলেশ্বরের বাড়ির গেটে। একা। ইচ্ছে ছিল শৈলেশ্বর ঘোষের সঙ্গে মুখোমুখি বসে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবো। যেহেতু স্মরণে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তাই আস্থা ছিল শৈলেশ্বরের প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব,যুক্তিবোধ তথা ভদ্রতাবোধের ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শৈলেশ্বর আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন এবং যৌথ আলোচনাই পারবে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন উদ্যমে একসাথে পথ চলা শুরু করতে। কিন্তু দুভার্গ্যবশতঃ তেমন কিছু ঘটলো না। বেল বাজাতেই গেটের ওপারে শৈলেশ্বর ঘোষ। আমাকে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন।

–কী চাই!

মিনমিন করে বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলবো।

–কে আপনি?

এক এবং দুই নম্বর প্রশ্নের ভুল অবস্থান দেখে হাসি পাওয়া সত্বেও চেপে গিয়ে নাম বললাম।

–কি কথা?

–গেটটা না খুললে কথা বলি কিভাবে!

–কোনো কথার প্রয়োজন নেই। চলে যান।

–এভাবে কথা বলছেন কেন?

–যা বলছি ঠিক বলছি। যান। নাহলে কিন্তু প্রতিবেশীদের ডাকতে বাধ্য হবো।

এরপর স্বাভাবিক কারণেই খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমার চেহারাটা যেরকম তাতে শৈলেশ্বর যদি একবার ডাকাত, ডাকাত বলে চেঁচিয়ে ওঠেন তাহলে হয়ত জান নিয়ে ফেরার সুযোগ পাবো না। তবে ‘ছেলেধরা’ বলে চেল্লালে ভয় পেতাম না। সমকামিতার দোষ না থাকায় নির্ঘাত রুখে দাঁড়াতাম।

ভয় পাচ্ছি অথচ চলেও যেতে পারছি না। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে আরও খানিকটা জানা বোঝা জরুরি।

–ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। তবে পত্রিকার নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে সেটা রাখুন।

এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন শৈলেশ্বর।

–কোন পত্রিকা?

–কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।

–নেব না। যান।

এরপর আর দাঁড়াইনি। দাঁড়ানোর প্রয়োজনও ছিল না। ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি ব্যক্তি শৈলেশ্বর ঘোষকে চিনতে ভুল হয়নি আমাদের। আর এই সমঝদারি এতটাই তৃপ্তি দিয়েছিল যে অপমানবোধ স্পর্শ করারই সুযোগ পায়নি।

শৈলেশ্বরের হাত ঝাপটানিতে ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ থেকে সরে গেলেন অনেকে। অরুণেশ ঘোষ তো সরে গিয়েছিলেনই, সঙ্গে নিয়ে গেলেন তাঁর কিছু কাছের মানুষজনকেও, যাদের কাউকে কাউকে আমরাও কাছের মানুষ ভাবতাম। তাতে অবশ্য আমাদের কিছু এসে গেল না। বরং ‘কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্প’-এর কভারে লিখে দিলাম, “সত্যের ঘাত অসহ্য হলে বুর্জোয়া ভাইরাসেরা গড়িয়ে যায় নিজস্ব ভাগাড়ের দিকে।” লিখে দিলাম, “ জানি পাঠক, তুমি পাজামা কিংবা পেন্ডুলাম নও।”

কিন্তু আমাদের কিছু না এসে গেলেও একজনের গিয়েছিল, সুভাষ ঘোষের। চটে গিয়েছিল সুভাষ-শৈলেশ্বর রসায়ন। যদিও নিজস্ব অবস্থান এবং অসহায়তার কথা বন্ধু ‘শৈলেশ’কে আপ্রাণ বোঝাতে চেয়েছিলেন সুভাষ, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতা এতটাই চরমে উঠেছিল যে খোদ কোলকাতাতেই শৈলেশ্বরের ইশারায় সুভাষকে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিতও হোতে হয়েছিল। বাল্যবন্ধুর সেই লাঞ্ছনার সংবাদ উত্তরবঙ্গের অনুচরদের কাছে পৌঁছে দিতে দ্বিধা দেখাননি শৈলেশ্বর ঘোষ।”

চার


সমীরণ ঘোষের কবিতা নিয়ে কোনো সিরিয়াস আলোচনা এ পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি, একমাত্র নন্দিনী ধরের আলোচনা ছাড়া ।  নন্দিনী ধর  খুঁজে পেতে আক্রমণ করার জন্যই লিখেছেন । কী লিখেছেন তিনি ? পড়া যাক :

সমীরণ ঘোষের ‘‘কর্তব্যহীন কুকুরের সঙ্গে’’ কবিতাটির বিশ্লেষণ


কর্তব্যহীন কুকুরের সঙ্গে আমার তিনবার দৃষ্টি বিনিময় হল

রাস্তার প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় পরস্পর বিরোধী

বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছি হয়তো ফিরে যাওয়াও

বলা যায় কোনো অতর্কিত আক্রমণের আশংকা নেই

সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত গতিবিধি ও বর্ণমালা ব্যবহারে

‘ভালবাসা’’মৃত্যু’ এইসব শব্দ নিয়ে প্রতিনিয়ত

বেলাভূমিতে খেলাধুলো হয় এই মাত্র

অপরাধপ্রবণ একটা শূন্য হাত পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছি

অন্যটি দিয়ে পৃথিবীর চিবুক আদর করে

নাড়িয়ে দিয়ে বলছি, ‘বালা, নাচো তো দেখি’’—


নন্দিনী ধর লিখেছেন কবিতাটিতে আছে তিনটি মূল ছবি। প্রথমটির কেন্দ্রে একটি কুকুর, যার সাথে তিনবার দৃষ্টি বিনিময় হয় কবিতার কথকের। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট। এবং সেই প্রেক্ষাপটে পকেটে হাত দিয়ে কথক। বাকি যা যা কবিতাটিতে বলা হয়েছে, তা পাঠকের কাছে মূর্ত হয় কথকের বিবৃতির মধ্যে দিয়ে। সে বিবৃতিতে বিশেষণের ছড়াছড়ি। তাই, আমরা জানি, কথকের হাতদুটি ‘‘অপরাধপ্রবণ’’। পকেট ‘‘শূন্য’’। আর, এই বিশেষ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে আমরা পাঠক হিসেবে অবগত হই কবিতায় দৃশ্যমানতার রাজনীতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে। জানতে পারি, আমাদের আবেগগত বৈষয়িকতা (emotional subjectivity) ব্যতীত আসলে সব চিত্রকল্পই অর্থহীন। তাই, কবিতাটিতে আছে একধরনের প্রগলভতার নন্দনতত্ত্ব। যে প্রগলভতায় ভর করে— প্রতিটি চিত্রকল্পকে বিশেষণে বিশেষণে মুড়ে— কবি তার পাঠককে বলে দিতে চান কেমন করে পড়তে হবে, ব্যাখা করতে হবে এইসব চিত্রকল্প। এই প্রগলভার দর্শন, পাঠককে চীৎকার করে শ্রতলিপি দিতে থাকার দর্শন আসলে আবার হাংরি কবিতার সাধারণীকৃত দর্শনও বটে। বলা যেতে পারে, সমীরণের এ কবিতায় চিত্রকল্পের তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। কুকুর, শূন্য পকেট, ল্যাম্পপোস্ট— এসবই বিশ্বসাহিত্যে নাগরিক অবসাদ বোঝাতে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে কবিতায়, গল্পে। সেই ঊনিশ শতক থেকে। শুধু কবিতাতেই বা কেন, সিনেমায়, স্থিরচিত্রে, গল্প, উপন্যাসে। তাই, একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এ কবিতা একধরনের গতানুগতিকতায় পরিপূর্ণ। ইংরেজীতে যাকে আমরা বলি ক্লীশে। কাজেই, কোথাও এই ক্লীশে-জর্জরিত কবিতা আমাকে বড়ো বোর করে, ক্লান্ত করে। আর, এই বোর হওয়ার যে বোধ, তার কোনো বাংলা হয় না।


আরও বোর হই যখন পড়ি এই লাইনটি— ‘‘‘ভালোবাসা’, ‘মৃত্যু’ এইসব শব্দ নিয়ে প্রতিনিয়ত / বেলাভূমিতে খেলাধুলো হয় এই মাত্র’’। আমি বুঝছি কি বলতে চাইছেন কবি। তার সাথে আমার কোনো রাজনৈতিক মতবিরোধ নেই এই বিষয়ে। কিন্তু, সত্যি কথা বলতে কী, একধরনের প্যাঁচপেঁচে নীতিবোধ ছাড়া আর কিছু আমি এই লাইনদুটিতে দেখতে অক্ষম। না, কোনো বিশ্লেষণ নয়, কোনো জটিল চিত্রকল্প নয়— একধরনের মধ্যবিত্ত নৈতিকতা আর হাহাকারের চাপে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকে এই কবিতাপংক্তি-দুটি। একটু ঘেঁটে দেখলে যা দেখা যায় তা হল, এইজাতীয় মধ্যবিত্ত নৈতিকতার ঘোষণায় সশব্দ হাংরি কবিতার ঐতিহাসিক ভাণ্ডার। না, আমি ঠিক একথা বলতে চাইছি না যে হাংরি আন্দোলন দাঁড়িয়ে আছে কোনো একবগ্গা একশিরালতার উপরে। কিন্তু, তৎসত্বেও দেখা যায় মধ্যবিত্ত বাঙালী নৈতিকতাকে ভেঙে চুরমার করার ক্ষেত্রে হাংরি কবিতার মূল অস্ত্র কোনো জটিল সমাজতাত্ত্বিক চোখ নয়, বরং একধরনের অতীব সহজ নীতিবাক্যের সমাহার। ইংরেজীতে  যাকে বললেও বলা যেতে পারে ‘কমনসেন্সিক্যাল নলেজ’। সন্দেহ নেই, এই নীতিমালা আমাদের সামনে হাজির হয় এক ক্রোধের মুখোশ, বিদ্রোহের মুখোশ পরে। যৌবনের ক্রোধ, যৌবনের বিদ্রোহ। কিন্তু, সে মুখোশ টান মেরে খুলে ফেললে যা থাকে তা হল, নীতিজর্জরিত, নীতিজীর্ণ জ্ঞানমালা। এবং, এই নীতিমালাই যেহেতু মূল ভরসা, তাই যে মূল মধ্যবিত্ত নীতিবোধকে এই ক্রোধ বা বিদ্রোহ সমস্যায়িত করতে চাইছে, তার থেকে এই মূলগত বিদ্রোহী চেতনার তফাত খুব বেশি হয়ে ওঠে না।


বলা যেতে পারে, সমীরণের কবিতা একধরনের আত্মসচেতনতার কবিতাও। তাই, কবিতাটি পাঠকের সামনে হাজির করে তার নিজস্ব বিদ্রোহের একধরনের তত্ত্বায়নও। তাই, যখন সমীরণ লেখেন, ‘‘রাস্তার প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় পরস্পর বিরোধী / বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছি হয়তো ফিরে যাওয়াও/বলা যায় কোনো অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা নেই’’’, তখন তাঁর কবিতার শরীরে ছায়া পড়ে কবিতার সমকালের। সমীরণের জন্ম ১৯৫২ সালে। যদিও এই কবিতার সালতারিখ জানা যায় না, বুঝে নিতে অসবিধে হয় না কবিতাটির রচনাকাল, নকশালবাড়ি-পরবর্তী বাংলা। বিশেষত ‘‘অতর্কিত আক্রমণ’’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার তুলে নিয়ে আসে আমাদের সামনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অনুষঙ্গ। কিংবা, নকশালবাড়ি-পরবর্তী, ১৯৭৭-পরবর্তী মৃত্যুর মতো শান্তিময় রাজনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার যে পরিবেশ। আর, তার সাথে সাথে কবিতাটির শরীরে মাথা তুলে দাঁড়ায় হতাশ, বিক্ষুব্ধ— অথচ স্থিতিস্থাপকতাবাদী— কথক। যার কাছে এগিয়ে ও পিছিয়ে যাওয়া আসলে সমার্থক। সমীরণের কবিতা তাই হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক স্থবিরতার কবিতা।একথা মনে হওয়ার সাথে সাথে ভাবার চেষ্টা করি, অন্য কোনো ব্যাখ্যা কি হতে পারে এ কবিতার?


মানে, এও তো হতে পারে পারে, সমীরণের কবিতার ভাষা আসলে একধরনের তির্যকতার অভিব্যক্তি, শ্লেষের অভিব্যক্তি। যেমন ধরুন, কবিতার শেষ তিনটি পংক্তি: ‘‘অপরাধ প্রবণ একটা হাত শূন্য পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছি/অন্যটি দিয়ে পৃথিবীর শূন্য চিবুক আদর করে/নাড়িয়ে দিয়ে বলছি, ‘বালা, নাচো তো দেখি’’— ’’। অস্বীকার করা যায় না, এই লাইনগুলিতে খোদাই হয়ে আছে বাস্তবতার ওপর আঘাত। কিন্তু, সেই আঘাতের চাপে কবিতাটির শরীরে ঘটে না তো কোনো বিস্ফোরণ। শেষপর্যন্ত তাই কথক থেকে যান সেই দর্শকের স্তরে। এক জন শ্লেষ-ঘর্মাক্ত, সচেতন দর্শক। তবু দর্শক তো। নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক। সক্রিয় কর্মী নন। কজেই, সমীরণের কবিতাটি রয়ে যায় ব্যর্থতার তথ্যগাথা হয়ে।


সেই ব্যর্থতার পদাঙ্ক অনুসরণ করলে দেখা যাবে যে, কবিতাটিতে বিবিক্তা বিষয়টি নিজেই একটি রাজনৈতিক একক। বিবিক্তা এখানে কোনো সূচনাবিন্দু নয়, নয় কোনো সমাপ্তিরেখার মধ্যপথ। সে নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন। যে যে দর্শন তার ভাষাগত অবয়ব বারবার খুঁজে পায় হাংরি কবিতার যতিচিহ্নহীনতায়, পংক্তিবিভাজনে। হাংরি কবিতার অন্যতম মূল দর্শন ও ভিত্তিগত রাজনীতি তাই হয়ে ওঠে বিবিক্তা-উদযাপন।


হ্যাঁ, যে পৃথিবীতে হাংরি কবিতার জন্ম হয়েছিল, সে পৃথিবী সত্যিই তো এক স্বপ্নভঙ্গের পৃথিবী। স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গ। বামপন্থার স্বপ্নভঙ্গ, বিপ্লবের স্বপ্নভঙ্গ। এ পৃথিবী আমার চেনা, আমার বন্ধুদের চেনা। এবং, মার্জনা করবেন, পাঠক, এ তালিকাটির জন্য কোনো হাংরিদের বাংলা সাহিত্যের প্রয়োজন হয়নি। মানে, যে রবীন্দ্রনাথকে খিস্তি করে ভূত ভাগিয়েছে হাংরি কাকুরা (এবং নকুরাও), সে রবীন্দ্রনাথ একাই যথেষ্ট। তো, এই তমসাতালিকা পড়তে পড়তে তাই প্রশ্ন করতে বাধ্য হই— সে তো বুঝলাম। কিন্তু, তারপর?


মানে, ছয়ের দশক মানে তো শুধু স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস নয়। স্বপ্ন গড়ারও ইতিহাস। ভিয়েতনাম। খোদ আমেরিকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন। ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি। বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী আন্দোলন। সেজার শাভেজ। আমেরিকা-মেক্সিকোর বর্ডার জুড়ে কৃষক আন্দোলন। লাতিন আমেরিকা। আফ্রিকার দেশগুলিতে জাতীয় মুক্তির দাবিতে লড়াই। নারীবাদী আন্দোলন। বিকল্প যৌনতার অধিকারের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা। পুরনো বামপন্থা ভেঙে নতুন বামপন্থার উদ্ভব।তো আমরা যারা হাংরি বা নকশালবাড়ি এ দুটোর কোনোটাই স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিনি, তারা ঠিক কি করব এ পর্যবেক্ষণ নিয়ে? প্রথমত, যে অসাধারণ ব্যতিক্রমবাদের দর্শনের মধ্য দিয়ে হাংরিরা নিজেদের দেখে থাকার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা করে থাকেন, এমনকী এখনও পর্যন্ত, সে প্রচেষ্টা থেকে আমরা নিজেদের একটু দূরে সরিয়ে নেব। হাংরি আন্দোলনকে আমরা দেখার চেষ্টা করব তার সমসময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, তার নিজস্ব দর্শনের বুনোট ছেনে ছেনে।


বাংলা মূলস্রোতের কবিতার প্রচ্ছন্ন গতিমুখ যদি নির্ধারিত হয়ে থাকে ভদ্রলোক শ্রেণীর আভ্যন্তরীণ চেতনার সাংস্কৃতিক তথ্যায়ন, তবে হাংরি-কবিতার প্রকল্প হয়ে উঠল ঠিক এর বিপরীত: একধরনের ‘‘ছোটলোক’’ সংস্কৃতির রূপায়ণ। ‘‘ছোটলোক’’ শব্দটি একটি বাঙ্ময়তা নিয়ে হাজির হল হাংরি-দর্শনে। উদাহরণ? ভেবে দেখুন, মলয় রায়চৌধুরীর আত্মকথায় ‘‘ছোটলোক’’ শব্দটি ঠিক কতোবার ব্যবহৃত হয়েছে। তাই একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে আপাতভাবে পরিশীলন-বিমুখী হাংরি-দর্শনের ভিত্তিতেই আছে সেই একই শ্রেণীবোধ, শ্রেণী-দর্শন, শ্রেণীচেতনা। আছে প্রত্যক্ষভাবেই।


কিন্তু, ‘‘ছোটলোক’’ হাংরি-দর্শনে যে অর্থনৈতিক শ্রেণীর অর্থে হাজির হল, তা নয়। ‘‘ছোটলোক’’ শব্দটি অর্থনৈতিক একটি এককের থেকেও অনেক বেশি সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের দ্যোতনায় হাজির হল হাংরি বিশ্ববীক্ষায়। ‘‘ভদ্রলোক’’ পরিচিতিকে ছুঁড়ে ফেলতে সচেষ্ট হাংরি কবি-লেখক-শিল্পী আঁকড়ে ধরতে চাইলেন ছোটলোকের সংস্কৃতিকে। ছোটোলোকামো এক্ষেত্রে হয়ে উঠল একধরনের মুখোশ, একধরনের সীমা অতিক্রম করা, একধরনের লক্ষ্মণের গণ্ডী পেরোনো।


কিন্তু, মজার কথাটা হল গিয়ে এই, তথাকথিত ছোটলোকদের অন্তর্গত, খুব, খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ, যাঁরা লেখাপড়ার সুযোগ পেলেন, সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পারলেন, তাঁরা অধিকার পেতে চাইলেন ‘‘ভদ্রলৌকিক’’ বলে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে। ভদ্রলোক সংস্কৃতির অন্দরে। প্রমাণ চান? পড়ে দেখুন ভারতীয় দলিত সাহিত্যের জটিল সংগ্রহশালা। এই দ্বন্দ্বের মাঝে দাঁড়িয়ে, হাংরি কবিশিল্পীদের ‘‘ছোটলোক’’ হয়ে ওঠার নির্নিমেষ চেষ্টা প্রমাণ রাখতে রাখতে গেল তাঁদের আপাদমস্তক ভদ্রলৌকিকতার। এমনকী মধ্যবিত্ততারও। ওই অনেকটা কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই—এর মতো আর কী। আর, যেকোনো মুখোশ বা পারফমেন্সে এইটাই তো মজা। যখন ইচ্ছে মুখোশ খুলে ফেলা যায়, যখন ইচ্ছে রঙচঙ মুখে ফেলে ফিরে যাওয়া যায় নিজ নিজ শ্রেণীর বেষ্টনীতে।

তবে কিনা, এসবের জন্যই প্রয়োজন ছিল আদর্শ ছোটলোকের একটি প্রতিমূর্তি তৈরি করা। কারণ, যদি একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন দাঁড়ায় মধ্যবিত্ত/নিম্ন-মধ্যবিত্ত যুবকদের ছোটোলোকের মুখোশ পড়ার মধ্য দিয়ে, তা হলে তো সেই রূপায়ণের স্বার্থেই ‘‘ছোটোলোক’’ বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তাই না? 


ঝেড়ে কাসার সময় এসেছে এবার। মানে, হাংরি আন্দোলনের অন্যতম মূল মতাদর্শগত ভিত্তি যদি হয় বিবিক্তা, হাংরি কবিতা ও লেখালেখির সাথে আমার প্রধান সম্পর্কও তবে বিবিক্তার। মানে, কোনো কোনো সময়ে হাংরি কবিতা পড়তে গিয়ে এই আন্দোলনজাত কবিদের পাতাজোড়া লাইনের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে। মুগ্ধ করে নিয়ম ভাঙা যতি চিহ্নের ব্যবহারও। মুগ্ধ করে কবিতার পংক্তির যে ভাঙা লাইনের পৃষ্ঠাগত স্থাপত্য, সে সব বিধি ভেঙে টানা গদ্যে লেখা। সেসব গদ্য আবার ঠিক পদ্যও নয়। গদ্য ও পদ্যের মাঝামাঝি। মুগ্ধ হই বহু সময়ে পড়তে গিয়ে। এবং প্রায় তৎক্ষণাৎ, ছিটকে বেরিয়ে আসি। বন্ধ করি পড়া। কেন? কারণ, এ প্রশ্ন বারবার করতে বাধ্য হই, করি— এই যে বিবিক্তাঘন হাংরি কাব্যবিশ্ব, এখানে ঠিক কীরকমটি স্থান দেওয়া হয়েছে আমাকে, আমার মতো একটি মানুষকে। মানে, একটি মেয়েকে। তো, শুরু করি একটি অতীব সাধারণীকৃত পর্যবেক্ষণ দিয়ে। হাংরি কবিতায় মেয়েরা হাজির হয় মূলত যৌনবস্তু হিসেবে। সেখানে যৌনচেতনা ও শরীরচেতনা ছাড়া মেয়েদের অন্য কোনো চেতনা নেই। এবং, সেই যে যৌনায়িত নারী শরীর হাংরি কবিতার পরিধিতে তা টিকে থাকে একটি উপলক্ষ্য হয়ে। অলিখিত পাতার মতো— শূন্য, সাদা। যে সাদা পাতায় লেখা হবে রাগী হাংরি কবির যৌনকামনা। হাংরি লিরিকের যে ‘‘আমি’’ সেখানে তাই প্রবেশাধিকার নেই আমার মতো কারুর। মাথা থেকে পা অবধি একটি রাজনৈতিক মেয়ের। নিজের যৌন-স্বাধীনতা যে বুঝে নিতে পারে। যার আছে স্বাধীন যৌন কল্পনা। নিজের। কিন্তু, সেই স্বাধীন যৌনচেতনা থাকার প্রাথমিক শর্তই তো হল আমি কারুর যৌনবস্তু নই। এবং, সেই যৌন চেতনাই কেবল অধিকার করে থাকে না আমার মানুষ ও নারী হিসেবে বেঁচে থাকার গোটা চেতনাকে। বরং, সেখানে আছে রাজনীতি, আছে শিল্পবোধ, সাহিত্যবোধ, মনস্বিতা। এবং, হাংরি কবিতার পাতায় নিজেকে খুঁজতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করি, হাংরি কবিতা ঠিক আমার মতো পাঠকের কথা ভেবে লেখা হয়নি। অর্থাৎ, হাংরি লেখালেখির প্রতীকী বিশ্ব গঠিত হয় এক ধরনের প্রগাঢ় কল্পনার খামতির মধ্য দিয়ে। যেখানে, বারবার প্রতিফলিত হয় এই সত্য যে, মেয়েদের বাস্তবিক জীবন ও অন্তর্জীবনের রূপায়ণে হাংরি লেখক-কবিরা এক্কেবারে অক্ষম। এবং, এই কল্পনার খামতি প্রতিফলিত হয় হাংরি ইতিহাসের কবি-পরিচিতির মধ্যে। বহু ঘাঁটাঘাঁটি করে আমি পেয়েছি একটি নারী নাম— আলো মিত্র। হাংরি দলিল-দস্তাবেজে তিনি ত্রিদিব মিত্রের স্ত্রী বলে চিহ্নিত। এই বিপুল পিতৃতান্ত্রিক নির্ভরতার সূচক ছাড়া, তাঁর অন্য‌ কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় না অন্য‌ কোনো লেখা। কোনো পাঠক যদি অন্য‌ কোনো ইতিহাসের হদিশ দিতে পারেন আমায়, দিতে পারেন অন্য‌ কোনো তথ্য‌, বাধিত হব। বদলে নেব নিজের ভাবনাচিন্তার গতিপথও। পরবর্তী সময়ে সুনীতা ঘোষ নামে এক কবির কবিতা পাওয়া যায় দু-একটি সংকলনে। কিন্তু, তাঁর সম্পর্কে আর কিছু জানতে পারা যায় না। তাঁর কবিতাতেও এমন কোনো লিঙ্গচেতনা পাওয়া যায় না, যা ভেঙে দেবে বা সমস্যায়িত করবে হাংরিধর্মীয়দের যৌনচেতনার আধিপত্যকারী বয়ানকে। অবশ্য, হাংরি চেতনার নিজস্ব তত্ত্বায়নের ধারার মধ্য দিয়ে দেখলে, তাদের লিঙ্গদর্শন নিয়ে খুব বেশি দ্বন্দ্বের কোনো জায়গা থাকে না। যেমন ধরুন, হাংরি তত্ত্বায়নে আমরা পাই একধরনের আত্মকথার প্রবর্তন। কাজেই, ইস্তেহারের পর ইস্তেহারে লেখা হয় ‘‘আপাদমস্তক কেবল নিজেকেই ব্যবহার করা’’, ‘‘নিজেকে দেখাই জগৎ কে দেখা, দেখাই জ্ঞান’’, ‘‘অভিজ্ঞতা ছাড়া সত্যকে ধরবার কোনো উপায় নেই— শুদ্ধ বুদ্ধি জীবন সত্যকে ধরতে পারে না’’ জাতীয় বাক্য। মানে, একধরনের সচেতন আত্মধর্মিতার নন্দনতত্ত্ব করা হয় হাংরি কবিতায়। সত্যি বলতে কী এধরনের সচেতন আত্মকথাকেন্দ্রিকতা হয়তো বাংলাসাহিত্যে সেইভাবে ছিল না। কিন্তু, অন্যন্য হাংরি তত্ত্বায়নের মতোই এই আত্মকথাকেন্দ্রিকতা নিয়েও কোনো বিশদ বা গভীর আলাপ-আলোচনা হল না হাংরি লেখালেখিতে। কাজেই, আমরা এইসব ইস্তেহার থেকে পেলাম না ‘‘আমি’’ বা ‘‘নিজ’’ এককগুলির কোনো সংজ্ঞায়ন। ‘‘আমি’’টি কে? তার শ্রেণী কী? লিঙ্গ কী? জাতপাত কী? সমকামী না বিসমকামী এ ‘‘আমি’’? এবং যেহেতু ‘‘আমি’’-র কোনো সংজ্ঞায়ন পেলাম না, বিবিধধারার ‘‘আমি’’-র মধ্যেকার বহুমুখী দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই যে গঠিত হয় আমাদের সামাজিক ইতিহাসসমূহ, তারও কোনো বিশ্লেষণ বা একটি সাধারণ স্বীকারোক্তিও এল না কোনো হাংরি রচনায়। অতএব এই সংজ্ঞায়নের অভাবে যে ‘‘আমি’’ আমরা বারবার পেলাম, তা হল এক মধ্যবিত্ত ‘‘আমি’’। আরো বিশেষ করে বলতে গেলে, ‘মধ্যবিত্ত পুরুষ আমি’। আর, যেহেতু সগর্বে, সশব্দে ইস্তেহারে ইস্তেহারে ঘোষণা করা হল, নিজেকে-দেখাই-জগৎকে-দেখা জাতীয় মন্তব্য, তাই মধ্যবিত্ত পৌরুষের দৃষ্টিভঙ্গী ছাড়া আর কিছুই এল না হাংরি লেখালেখির পরিধিতে। এছাড়া, এই আত্মকথাকেন্দ্রিকতার পাশাপাশি এল আর একটি উচ্চারণ— ‘‘জীবনকে ত্যাগ করে নয়, জীবনের কাদামাটি অশ্লীলতার মধ্যে ডুব দিয়ে আবার বেরিয়ে আসা।’’ যার অর্থ সহজ বাংলায় বললে দাঁড়ায়, আমি কতো খারাপ তা পরত খুলে খুলে দেখাতে হবে। অর্থাৎ, একধরনের এক্সপোজার বা উন্মুক্তির নন্দনতত্ত্ব ও রাজনীতি। এই ছক অনুয়াসী যা দাঁড়ায়, তা  হল, মধ্যবিত্ত পুরুষ অসৎ। পিতৃতান্ত্রিক যৌন আগ্রাসনের ইচ্ছা পৌরুষের আদিগন্ত বাস্তব। কাজেই, সে সামাজিক ও অর্ন্তবাস্তবকে বারবার নিয়ে এসো নিজের কবিতায়। কিন্তু, মুশকিলটা হল গিয়ে এইখানে যে, মধ্যবিত্ত পিতৃতান্ত্রিতাকে চেনার জন্যে আমার তো কোনো হাংরি কবিতার দরকার নেই! সে তো জন্মইস্তক পরিবারের মধ্যে, পরিবারের বাইরে, ক্লাসরুমে, কফিহাউসের আড্ডায় দেখে চলেছি তো দেখেই চলেছি। জানি, এই কথাটি বলার সাথে সাথে রে রে করে উঠবে আমার বহু বহু পুরুষ বন্ধুরা। বলবে, যে মেয়েরা ভাবনাচিন্তা করে— অর্থাৎ, আমাদের, মানে আঁতেল ছেলেদের মতোই— তাদের ওইটুকু একটু হজম করে নিতে হবে। সে ‘ওইটুকু’ হতে পারে হাংরি কবিতা, বাউলগান, কামু, কাফকা, মার্ক্স বা রামকৃষ্ণের পিতৃতান্ত্রিকা। কারণ, ওই পিতৃতন্ত্র ব্যাপারটা একটু হজম করে নিলেই যে মিলে যাবে আরও বৃহত্তর মুক্তির দিশা। কিন্তু, তৎসত্ত্বেও বলব, এসবের মধ্যেও অবাক হবার কিছু নেই। এই রাজনৈতিক শৈল্পিক সীমাবদ্ধতার বীজ লুকিয়ে আছে হাংরি দর্শনের ভিত্তির পরতে পরতে। বিশেষত তার আত্মজৈবনিকতার দর্শনের মধ্যে। যে জোর দিয়ে আত্মজীবনীকে দেখা হল হাংরি দর্শনে, সেই জোরের মধ্য দিয়েই বন্ধ হল একাধিক দরজা। একথা আমিও মনে করি যে, আত্মজীবনী বাদ দিয়ে কোনো লেখাজোখা হয় না। কিন্তু আবার শুধু আত্মজীবনী দিয়েও কোনো সাহিত্য, কবিতা বা রাজনীতি হয় না। এবং একটু চারপাশটা তাকিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে,সাহিত্যের একটি অন্যতম প্রচলিত ধারাই হল আত্মজীবনী। আমরা অনেকেই আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা গোগ্রাসে গিলি। তাই, শুধুই আত্মজৈবনিকতার পুনরাবৃত্তির মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানবিরেধিতা নেই। কার আত্মজীবনী, কীভাবে আত্মজীবনী, কেমনভাবে আত্মজীবনী, এসব প্রশ্নের মধ্যে থাকলেও থাকতে পারে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার বীজ। কিন্তু, এই জাতীয় জটিল প্রশ্নের উত্থাপন হাংরি জেনারেশনের স্বভাববিরুদ্ধ। তাই, আমরা হাংরি দর্শনে আত্মজৈবনিকতার নামে যা পেলাম তা হল একধরনের আত্মজীবনীর উপধর্মময়তা। আসলে, হাংরি আত্মজীবনী তো বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষের আত্মতার গল্প। অর্থাৎ, বাংলার আধুনিকতার বিকাশের আধিপত্যকারী শ্রেণীচেতনার গল্প, আধিপত্যকারী লিঙ্গচেতনার গল্প। এবং, সেই গল্প আমাদের পারিপার্শ্বিকের গলা কামড়ে ধরে আছে। তাই, যা দাঁড়ায় এখানে, তা হল— হাংরি আন্দোলনের মূল ভিত্তিই নির্মিত হয়েছে মধ্যবিত্ত পুরুষের শ্রেণীগত, লিঙ্গগত সুবিধাভোগিতা আড়াল করার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে। হাহাকার, বিবিক্তার ভাষার আড়ালে নিজের মধ্যবিত্ত মুখ লুকিয়েছে হাংরি লেখককুল— তাদের কবিতার ‘‘আমি’’-রা। এই বিশেষ রকমের অসততার আত্মজৈবনিকতার খতিয়ান লেখার সাহস হাংরিদের কোনোদিনও ছিল না। এখনও নেই। তাই, হাংরি আত্মজৈবনিকতার মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে এই মুখ লুকোনোর উদযাপন। কাজেই, আক্রমণ কখনো করা হয়নি হাংরি আত্মজীবনীতে মধ্যবিত্ত বাঙালী পুরুষের পৌরুষজাত শ্রেণী ও লিঙ্গজাত বিবিক্তামুখরিত পশ্চাৎপদতাকে। কিন্তু, ওই যে আগেই বলেছি না, মধ্যবিত্ত পৌরুষের পশ্চাৎপদতা জানার জন্য কোনো হাংরি বা অন্য কোনো ধরনের কবিতা পড়ার কোনো দরকার নেই আমাদের। আমাদের কবিতার কাছে আমাদের দাবি অনেক বেশি। কবিতার কাছে আমরা চাই সেই পশ্চাৎপদতা ভাঙার দলিল, সেই ভাঙনের জটিলতার খতিয়ান। সেখানে আত্মজীবনীর একটা ভূমিকা অবশ্যই আছে। কিন্তু শুধু আত্মজৈবনিকতা দিয়ে সে কাজ সম্ভব নয়। আত্মজৈবনিকতা থেকে বেরনোর প্রচেষ্টার ওপরেও অনেকাংশেই নির্ভর করবে এই ভাঙন লেখার কাজ। একথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের পৃথিবী পুড়ছে, আমরা পুড়ছি। আমরা যে খারাপ আছি, একথা জানার জন্য কোনো কবিতা পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তেমনি, কেমনভাবে আমি ও আমরা খারাপ আছি, এই কথা জানার জন্য কোনো কবিতা, বা অন্য কোনো শিল্পের কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কাজেই, এই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে হাংরি কবিতা আমাদের কোনো ধরনের নতুন উপলব্ধির সামনে টেনেহিঁচড়ে এনে দাঁড় করায় না। পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলা যদি হয়ে থাকে হাংরি লেখালেখির অন্যতম মূল লক্ষ্য, তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি, হাংরি কবিতার ফলাফল আমার ওপর হয় ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ, বড়ই স্বস্তিদায়ক বোধ হয় হাংরি বয়ানের বিবিক্তাস্ফালন। আমি জানি, অনেক পাঠকের কাছে আমার এ মূল্যায়ন জীভে বালির মতো ঠেকবে। বাপু হে, তোমাকে কী ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখকরা এমন কোনো কথা দিয়েছিল নাকি, যে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, নয়া-উদারনীতি বা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, দক্ষিণপন্থার উদ্ভব— এই সমস্ত বিবিধ সংকটে তারা তোমাকে ভাষা দেবে? না, সত্যিই বলেননি হাংরি কবিরা এমন সব কথা। কিন্তু, আমি তো মার্ক্সের সমালোচনাও করি না তাঁর দাগিয়ে দেওয়া জমির ওপর দাঁড়িয়ে। বা, মোদী-চিহ্নিত বা আর.এস.এস.-বর্ণিত তাত্ত্বিক এককগুলির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা করি না হিন্দু মৌলবাদের সমালোচনা। কারণ, আমরা তো বিশ্বাস করি, বহিরাগত ভাবনাচিন্তার ধাক্কাতেই যে কোনো দর্শনের সম্প্রসারণ ঘটে। অথবা তা হয়ে যায় অপ্রাসঙ্গিক। হাংরি দর্শনের মধ্যে সেইরকম সম্প্রসারণের কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু, যদি বা সেই সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থেকে থাকে, তা হলে তা নির্মিত হবে হাংরি দর্শনের আঁক কাটাকাটির পরিধির বাইরে গিয়েই। ঠিক সেই কারণেই লিঙ্গ বিষয়টি আমার কাছে হাংরি সমালোচনার ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এবং, এ কথাও আমি জোরের সাথে বলব, হাংরি দর্শনে, শ্রেণী ও লিঙ্গ টিকে আছে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে। লিঙ্গ বাদ দিয়ে হাংরি দর্শনের শ্রেণীচেতনার কোনো আলোচনায় সম্ভব নয়। যদিও, আবারও জানি যে, এ প্রশ্নও উঠবে যে, লিঙ্গই কি মূল বা একমাত্র কথা? মানে, শুধুই লিঙ্গচেতনার পশ্চাৎপদতা, পিতৃতন্ত্রের মাপকাঠিতেই কি নাকচ করে দেবে তুমি হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস? উত্তরটা হল, হ্যাঁ। যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা আমাকে দেখে শুধুই কতোগুলো ফুটোর সমাহার বা যোনি হিসেবে, তাকে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বলে মনে করি না। 

হাংরিদের কবিতায় পোঁদ মুছে উঠে দাঁড়াচ্ছে আমাদের কবিতা। আমার। আমাদের। আমাদের। আমাদের। কবিতা।

পাঁচ

ওপরে চার নম্বরে পুরোটাই নন্দিনী ধরের বক্তব্য । তিনি হাংরি আন্দোলনকারী সবাইকে একটা খোঁয়াড়ে পুরে দেখাতে চেয়েছেন । বলাবাহুল্য যে সমীরণ ঘোষের ওই একটা কবিতাই উনি পড়েছেন। উনি জানতেন না যে সমীরণ ঘোষ জীবন আরম্ভ করেছিলেন পোস্ট অফিসের পিওন হিসাবে ।  হাংরি আন্দোলন-এর কবি সমীরণ ঘোষের কাব্যগ্রন্হ ‘রক্তবীজ’  সম্পর্কে রাজা সরকার লিখেছেন :

“ব্যক্তিগতভাবে আমার একটা হিসেব আছে যে, জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর বছর কুড়ি  পর আবার ফিরে এসেছিলেন  কলকাতায়। যেমন ফাল্গুনী রায় ফিরে এসেছিলেন মৃত্যুর পনের বছর পর শিলিগুড়ির কলেজ পাড়ায়। এমন আরও  অনেকেই হয়তো  ফিরে ফিরে এসেছিলেন। আমি, আমার জানা সকল প্রয়াত কবির তালিকা এখন দিচ্ছিনা। দিচ্ছি শুধু একজনের; তিনি সমীরণ ঘোষ। মৃত্যুর আট বছর দুইশ একুশ দিন পর তিনি ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছেন ডুয়ার্সের বানারহাট সংলগ্ন কলাবাড়ি নামক স্থানে। সেখানে দিবাকর ভট্টাচার্য্য নামে এক প্রবীণ সাহিত্যকর্মীর সংগে তার দেখা হয়েছে। তিনি ফোনে আমাকে জানিয়েছেন।

দিবাকর ভট্টাচার্য্য তার জীবৎকালের এক পর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে এক প্রান্তিকতম বিন্দুতে এসে এই সময় দাঁড়িয়ে  আছেন।  তার হাতে একটি কাব্যগ্রন্থ, যার নাম রক্তবীজ, প্রণেতা সমীরণ ঘোষ। সেই কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে করতে হঠাৎ থেমে গিয়ে দিবাকর  আমাকে ফোন করলেন।  ফোন করে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। কান্না সংবরণ করতে করতে বলতে লাগলেন---রাজা, সমীরণের এই বইটার মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলাম আমিরে--- কতকাল আগের কথা---ঠিকমত ওর পাণ্ডুলিপি পড়েছিলাম কি না আজ আর মনে নেই, পড়ে থাকলেও ভুলে গেছি---কিন্তু আজ সেই লেখা পড়ছি, পড়ে দেখছি---কী সব কবিতা লিখেছিলো সমীরণ---এত বছর পার হয়ে গেল---এই সব কবিতার,এইরকম একটি বইয়ের খোঁজ  হয়নি কেন এতকাল---এ কি আমাদের ব্যর্থতা নয় ! এ তো বাংলা কবিতার পাঠক হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা! বইটি আমি এখন বুকে জড়িয়ে ধরে আছি।

এমন এক ফোনালাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি শুনতে  পারছি সমীরণ তার হাস্‌কি গলায় হাসছে আর দিবাকরকে বলছে---নে হয়েছে, এখন ছাড় ছাড়---।

এই পর্যন্ত শুনে আমি মনে মনে এই সকল বিস্মরণের পথরেখা দেখতে দেখতে ভাবলাম একটা বয়সের পর কান্নাকে বোধ হয় আর আটকানো যায় না। দিবাকর আর একটু কাঁদুক।

সমীরণের 'রক্তবীজ' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিলো ১৯৮৫ সনে। দিবাকর ভট্টচার্য্য'র যুক্তপ্রয়াস প্রিন্টার্স,আলিপুরদুয়ার থেকে। স্বভাবতই ধরা যায় কবিতাগুলো হয়তো লেখা হয়েছিলো সেই আশির দশকের প্রথম ভাগে। ঠিক সেই সময়ের পথরেখা ধরে এগুতে থাকলে চোখে পড়বে শিলিগুড়ির এক যুবককে। যে দুপুরের খর রোদ বা ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকল পরিতাপ ও স্নেহের ভাণ্ড উপুড় করে পরিক্রমা করে চলেছেন তার পেশাজীবনের পথ। তারজন্য  সেদিন  জীবনের এমন কোনো  আয়োজন ছিলো না যা দিয়ে তাঁর সেদিনের  ক্লান্তি  ও শ্রম জড়ানো পদবিক্ষেপগুলো দুদণ্ড সুস্থিরতা পায়। তাঁর কবিতা-ভাষার জন্মের জন্য এমনই এক জীবন সে প্রাপ্ত হয়েছিলো।

'রক্তবীজ' সমীরণের অন্যতম একটি কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থিত অগ্রস্থিত সকল কবিতা নিয়ে তাঁর একটি কবিতাসমগ্র এখন  সময়ের আকাঙ্ক্ষা। সমীরণ তনয় সব্যসাচীর সংগে কথাপ্রসঙ্গে জানা গেল সমীরণের গদ্যরচনাগুলোকে একত্রিত করে একটি গদ্যগ্রন্থও প্রকাশ করা যায়। আমি আশা করব অকাল প্রয়াত সমীরণ আবার তাঁর কবিতার সঙ্গে বার বার ফিরে ফিরে আসুক।”

সমীরণ ঘোষ সম্পর্কে অলোক গোস্বামী লিখেছেন : “সমীরণ ঘোষ। কবি বন্ধু। উত্তরবঙ্গের সাহিত্যপ্রেমী মানুষরা জানে ওর নাম। মাঝে সৈয়দ সমীরণ ঘোষ নামে লিখত, পরে আবার পূর্ব নামে ফিরে এসেছিল।চকচকে টাক, লাল টকটকে চেহারা আর ফ্রেঞ্চ কাট দাড়িতে লেনিনের আভাস ছিল। কে জানে হয়ত সমীরণও জানতো এই সাযুজ্যের কথা। হয়ত সে কারণেই সব সময় চিন্তামগ্ন থাকতো সমীরণ। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তায় থাকত হয়ত। নাহলে বেআইনী মদের ঠেকে আচমকা পুলিশী হানা হলে সবাই পালিয়ে যেতে পারলেও একমাত্র সমীরণই প্রতিবার ধরা পড়ত কেন! তো সমীরণের কবিতার একটা লাইন ছিল, আহা, আপনাদের দুধ আর আমাদের মদ….। লাইনটাকে প্রকৃত মর্যাদা দিয়েছিল আমাদের আরেক বন্ধু মনোজ। প্রতিবার শেষ ফোঁটাটা ঢেলে ফেলার পর বোতলটাতে জল ঢেলে ঝাঁকিয়ে নিতো। সেই বোতল ধোয়া জল গ্লাসে ঢেলে গম্ভীর মুখে বলতো, রক্ত হয়। আমার থেকে অনেকটাই বড় ছিল সমীরণ। এমন কী মনোজের চে’ও। তবু আমরা সমীরণকে নাম ধরে ডেকে তুই তোকারি করতাম। আজ ভাবতে অবাক লাগে ওরকম গম্ভীর স্বভাবের একজন মানুষ, পান থেকে চুন খসলেই যে চটে উঠতো, সে অত আপন হয়েছিল কিভাবে! আমার সঙ্গে অনেক পরে পরিচয়। মনোজ অনেক আগে থেকে বন্ধু ছিল ওর। সেই তখন, যখন সমীরণ ছিল ডাকপিওন, সাইকেল নিয়ে বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতো। সাইকেলের সামনের রডে বসে থাকতো মনোজ। একবার সাইকেল দূরে রেখে দুই বন্ধুতে এমন আড্ডায় ব্যস্ত ছিল, গরু যে চিঠি চিবিয়ে খাচ্ছে সেটা খেয়ালই করেনি। এনিয়ে পরবর্তীতে বিভাগীয় ঝামেলা সামলাতে হয়েছিল সমীরণকে। এ ঘটনার সময় সমীরণকে চিনতাম না আমি। পরে শুনেছি। এবং সেটাও মনোজের কাছ থেকে। সমীরণ ফালতু গল্প করতোই না যে!  বহুদিন হলো চলে গিয়েছে সমীরণ। মারা যাবার কিছুদিন আগে ফোন করে ক্ষোভ জানিয়েছিল, কোলকাতা তোকেও গিলে ফেললো?  সমীরণ, আজ রাতে তোকে মনে পড়ছে। মনে পড়ছে অনেক সন্ধ্যার স্মৃতি। মনে পড়ছে শিলিগুড়ি স্টেশন চত্বরে বাবলুদার কুপির আলোয় ঝকমকিয়ে ওঠা তোর আত্মগর্বী মুখটা।”


‘হোঁচটনামা’ কাব্যগ্রন্হের ভূমিকায় কিশোর সাহা লিখেছেন, “এ যেন উত্তরের এক কালো ঘোড়ার কাহিনি। যে গতিতে দুরন্ত। অথচ বরাবরই রেসের মাঠ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে । নানা ট্রফির হাতছানি । সে সব উপেক্ষা করে একাই আনমনে ঘুরে বেড়িয়েছে । সঙ্গীসাথিদের কারও কারও ইঁদুরের মতো ছোটাছুটি দেখেও অভিমুখ বদলায়নি কখনও । পাহাড়-নদী-ঝরণা সবুজ চা-বাগানে ঘুরতে ঘুরতে একদিন কোথায় যেন মিলিয়ে যায় সেই কালো ঘোড়াটি। তাঁর স্মৃতি বুকে নিয়ে বয়ে চলে জুরন্তি, চেল, ঘিস, মূর্তির মতো নদীগুলি ।  সমীরণ ঘোষ এরকমই । পরে যিনি নামের আগে সৈয়দও ব্যবহার করতেন । বাংলা সাহিত্যের ঠিক ক’জন সৈয়দ সমীরণ ঘোষের নাম জানেন ? ক্ষুধার্ত প্রজন্মের উথালপাতাল বৃত্তের বাইরে তাঁর কবিতা-লেখালিখি জীবনযাপনের ব্যাপ্তিই বা কতটা ? কবিতার দুনিয়ায় তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু শিলিগুড়ির পোস্ট অফিস মোড়ের বৃদ্ধ ফল বিক্রেতা, রাতের টাউন স্টেশনের থুরথুরে ভিখিরির মতো অনেকেই এসব বিতর্কে যাবেন না । তাঁদের কাছে সমীরণ মানে চিরচেনা এক দরদি । শীতের রাতে সাইকেল থামিয়ে আধঘুমন্ত ভিখিরির গায়ে নিজের জ্যাকেট পরিয়ে দেওয়ার কাজটা যে করতে পারে । তাকে ভোলা যায় । পোস্টআপিসের মাস মাইনের টাকা পেয়ে ফল বিক্রেতার ছেলের বই কেনার টাকা দেওয়ার ঘটনাও ভোলা সহজ নয় । একজন কবির কী এসব করার কথা ? আর পাঁচজন কী ভাবেন সেসবের তোয়াক্কা করতেন না সমীরণ । কম কথা বলতেন । কিন্তু সোজা সাপটা । তাই ক্ষুধার্ত প্রজন্মের অর্থাৎ হাংরি জেনারেশনের উত্তরের অন্যতম কবি হিসাবে একটা পরিচিতি পেলেও কখনও আত্মম্ভরিতায় আকাশে ওড়েননি । এমনকী শহুরে দলাদলি থেকেও আমৃত্যু দূরে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি । কফি হাউসের থেকেও বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন মালবাজারের ক্যালট্যাক্স মোড়ের চায়ের দোকানে । কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন স্টলে কিছুক্ষণ থেকেই যেন হাঁপিয়ে উঠতেন । বরং চালসার পাহাড়ি পথে মংরু ওরাঁওয়ের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা বলার সময়ে ছিলেন অসম্ভব সাবলীল । আনমনে হাঁটতে হাটতে নেওড়া নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রাখালের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেওয়া । আবার কখনওবা ভরা বর্ষায় বাস ধরে শিলিগুড়িতে নেমে তাউন স্টেশান, হকার্স কর্নারে ছাতা নিয়ে সেই সব পুরানো দিনের স্বাদ নিতে ঘোরাঘুরির স্মৃতিও কম নেই স্মৃতিতে । উত্তরের বন-পাহাড়-নদী-ঝরনা-জঙ্গল এবং মংরু ওরাঁও, সগন মুণ্ডা, সোমবারু তিরকের সহজ-সরল জীবনেই খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের অক্সিজেন । হবতো সেকারণেই সযত্নে আড়ালে রেখেছেন নিজস্ব অক্সিজেনের উৎসকে । হয়তো সেজন্যই জুরন্তি, মর্তি, মাল, নেওড়া নদীর কথা তাঁর কবিতায় সেভাবে আসেনি । তা নিয়ে নানা  কথাবার্তার সময়ে শুধু হেসেছেন । আচমকা ‘কবির এক জীবনের সব কিছু কি আর কবিতায় ধরা পড়ে’ বলে রওনা দিয়েছেন । সমীরণ এমনই ছিলেন। হঠাৎ সামনে হাজির হওয়া । দীর্ঘ সময় চুপ করে বসে জীবনের পাত্রে শুধু চুমুক দিয়ে যাওয়া। টুকরো-টুকরো মন্তব্য । পকেট থেকে কবিতা বার করলেও তা পাঠ করতে রাজি না হওয়া । পরনিন্দা-পরচর্চার মাত্রা বাড়লে দূরে সরে গিয়ে সিগারেটে টান দেওয়া। জমজমাট কবিতার আড্ডার আসরে আচমকা পানপাত্র ঠকাস করে সরিয়ে রেখে নিঃশব্দে চলে যাওয়া ।


ছয়


সমীরণ ঘোষ ‘বিকল্প’ পত্রিকার একটি নিবন্ধে বলেছেন যে কবিতা হলো ‘বেঁচে থাকার নেশা’ । 

নিবন্ধর কিছুটা এখানে তুলে ধরছি। “এ কথাও নতুন নয় যে, কবিতা লেখার ব্যাপারটি স্বমেহন বা আত্মরতির সমতুল কিংবা রকমফের । কিন্তু কেন এই কর্মটি কখনও কোনও মানুষের কাছে অনোন্যপায় হয়ে দাঁড়ায়, এমনকী জীবনভর চলে এই বিবিক্তি ও বিবিক্ষা । বিষয়টি কি মনোবিদের খোরাকি ও চর্চার অন্তর্গত হবার যোগ্য ? তাহলে কবিতা এক ধরনের অস্বাভাবিক অসুস্হ মানসিকতার নির্যাস । যদি সমাজে এই প্রশ্নের প্রতি হ্যাঁ-বাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে থাকে, সে তো সাংঘাতিক কথা ।  সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাবার মতো অবস্হা। পরিস্হিতি অবশ্য সেরকম হয়নি কোথাও । বাংলাভাষাভাষী মানুষের মাথার ওপর থেকে ছাউনি বরং সরিয়ে নিতে পারেন, ব আ পায়ের তলার মাটি, রবীন্দ্রনাথ নজরুল সুকান্তকে সরাতে পারবেন । তাঁদের কবিতা রচনাকে কেউ খারাপ স্বপ্নের মধ্যেও আত্মরতি বলে ভাবে না । 


নিজের কথাই কবিতায় বলা হয় । সারাজীবন নিজেকে আসঁকতে আঁকতে ভাবতে ভাবতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে যাওয়া, — মূলত একটাই কবিতা, দীর্ঘ সর্পিল একটা পথরেখা। সে বলা ফুরোয় না। গদ্যে সরাসরি নিজের কথা, নিজের কবিতা লেখার কথা বলা, একজন নিবিষ্ট কবির কাছে বিড়ম্বনা বলে মনে করি ।


যা হোক, কোনও একটি নির্দিষ্ট কার্যকারণ নিজের মধ্যে খুঁজে পাইনি, যাকে দায়ী করা যায়, কেন কবিতা। আত্মহননের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে প্রতিনিয়ত নিক্ষেপ করা, অবরুদ্ধ করে রাখা, –একেও বেঁচে থাকারই এক প্রকার নেশা বলা যায় । জীবনকে ভালোবাসা আর ঘৃণা করা মিলেমিশে কোথাও একটা খোঁড়ানো লেংচে চলার এলোমেলো ছাঁচ তৈরি হয়েছে । ঘৃণা না করে ভালোবাসার নাগাল পাওয়া যায় না। ভালোবাসার আর্তি না থাকলে  নদীর কছে যাওয়া যায় না । নারীর কাছে আঁজলা ভরে রক্ত  নিয়ে দাঁড়ানো যায় না ।


নিজের ভিতরে একটা দুটো পাঁচটা অনেকগুলো মানুষ, সেখানে হ্যাঙ্গাম হুজ্জোতে লেগেই থাকে পরস্পরে । সেই মহা ডামাডোলের মধ্যে একটা হেস্তনেস্ত করতে করতে কবিতা। বহির্জগতের তাচ্ছিল্য অপমানে চোয়ালের দাঁত ঘষটাতে ঘষটাতেওই কবিতা । খুব শান্ত নিস্তরঙ্গ সময়ে কবিতা লিখেছি বলে মনে পড়ে না । নেশা করলে বিভিন্ন আবর্জনার স্তুপ থেকে মুখ তোলে পবিত্র পাপী । কবিতার মতো কিছু আকাড়া বাক্যবন্ধ আসে।  সেসবও কখনও কবিতা হিসেবে দাঁড়ায়, কখনও নয় । এখানে বলা প্রয়োজন, এই দাঁড়ানো মানে হয়ে ওঠাটা নিজের কাছে, নিজের জন্যই । কে কীভাবে নিলো, আদৌ কেউ পড়ল কিনা, বা সম্পাদকের টেবিল-তলার ঝুড়িতে স্হান পেল — এ নিয়ে ভাবিনি কোনওদিন । কবি একটি মনোরঞ্জনকারী চরিত্র নয় । ‘কবি’ অভিধাটিতে একটি বিদ্রোহী সত্তা নিহিত থাকে । যে সবকিছু স্বাভাবিক ও সাধারণভাবে মেনে নেয় না। সে সন্দেহ করে ।শেখানো পড়ানো বুলি দিয়ে তার চলে না । সর্বদা একটা দহন বা প্রজ্বলন সে অনুভব করে । সে অনুভব করে নিজের ভিতরে ।  লাল গোলাপটাকে সে কালো গোলাপ বলে সন্দেহ করতেই পারে। অসুন্দরকে সুন্দর করেও দেখতে জানে । 


এরপর খানিকটা ব্যক্তিগত কথাবার্তা, ব্যবহৃত গেঞ্জি জাঙিয়ার কথা, প্রেম ও অপ্রেমের কথা, অতীত বর্তমানের খোসা ছাড়ানো দিনগুলির কথা বলতে ইচ্ছে করেই ।  কবিতায় যা লিখি , সাধারণভাবে তাতে আমিই আমার পুরোহিতও ভাতার । প্রেম অপ্রেম, আশা হতাশার উপলব্ধি বিভিন্ন অলিগলি ধরে লেখার চেষ্টা। সেখানেই থাকুক আমার আমি । জীবনের সবচেয়ে বড়ো তৃষ্ণার নাম ভালোবাসা । সহস্র টুকরো হয়ে আতসবাজির মতো ঝরে পড়ছে শরীরের আর্তি , অস্থানে ভুল নিশানায় বিজন রেতঃপাতের যন্ত্রণার মধ্যেও কোনও স্হির চোখে চোখ রাখে কখনও


একটা কোনও নির্দিষ্ট বিষয় ধরে কবিতা হয় না । ব্যক্তি সমাজ সংসার প্রেম প্রকৃতি সবই মিশে থাকে কবিতায় । সবচেয়ে একান্ত ও একাগ্র হয়ে থাকে নিজেরই জীবন, বিষাদমাখা দিনাতিপাত ও একাকীত্ব । তুচ্ছ ও তাচ্ছিল্যময় দীনহীন জীবনের অগ্রপশ্চাৎ । অশিক্ষা ও অজ্ঞানতাও আমাকে কবিতার পথে টেনে এনেছে । ঘৃণার পাহাড়, কখনও মনে হয়, আর বইবার সাধ্য নেই । ভালোবাসারও তীক্ষ্ণ তত্ববারি আমাকে প্রতিনিয়ত নগ্ন করে বিক্ষত করে । সেসব নিয়ে যা লিখি তা নিজ জীবনের সংকীর্ণতাকে ছাপিয়ে যদি ভিন্নমাত্রা ও বহুকৌণিক বিচ্ছুরণ সৃষ্টি করতে পারে, তবেই খানিকটা সার্থকতায় উত্তীর্ণ হতে পারে কবিতা । প্রকৃত প্রস্তাবে এ সম্পূর্ণ পাঠ প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার । কবির কাছে এসব মুখ্য প্রশ্ন নয় । আমি বিশ্বাস করি একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কী হলে কী হবে, এ সবের তোয়াক্কা করে না । 


ব্যক্তি একদিন কোনও স্যাঁতসেতে ঘরের এক পাট বিবর্ণ জানালা খোলা রেখে স্তব্ধ হয়ে যাবে।


সাত


শিলিগুড়ির অন্যান্য হাংরি কবি আর সমীরণ ঘোষের মধ্যে যে তফাতটা নজরে পড়ে তা হলো মালবাজারে যাবার পর ওনার সংবেদন ও জীবনবোধে পরিবর্তন । মালবাজার ছিল সাহিত্যসমাজ থেকে বহু দূরে, যাকে বলা যেতে পারে প্রকৃতির কোলে, যা শহুরে কবিদের ভাগ্যে জোটে না, অথচ হাংরি আন্দোলনের দ্রোহবীজ চিরকাল পুষেছেন নিজের মগজে । ইউরোপ-আমেরিকার বহু কবি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন প্রকৃতির অংশ হয়ে জীবনযাপনের জন্য । কিশোর সাহা যেমন লিখেছেন, সমীরণ ঘোষের চারিপাশের বন-পাহাড়-নদী ঝরনা-জঙ্গল আর আদিবাসি সমাজ তাঁকে ঘিরে ফেলেছিল এবং মৃত্যু পর্যন্ত সমীরণ সেই ঘেরাটোপকে ভালোবেসেছিলেন । নন্দিনী ধর যে বিবিক্তির জন্য হাংরি আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করেছেন, বিশেষ করে সমীরণ ঘোষকে, তা স্বীকার করে নিয়েছেন সমীরণ । 


সমীরণ যদিও পরবর্তীতে মালবাজারের পোস্টমাস্টার হয়েছিল, চাকরির শুরুতে ছিল ডাকপিওন । কবিবন্ধু মনোজ রাউতকে সাইকেলে বসিয়ে কবিতা আলোচনা করতে করতে ডাক বিলি করতো সমীরণ ঘোষ। একবার সাইকেল রেখে দুই বন্ধুতে চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে এতটাই মশগুল হয়ে পড়েছিল যে গরুতে ব্যাগ থেকে বীমা কোম্পানির একটা চেক খেয়ে ফেলে। এনিয়ে প্রচুর শোরগোল উঠেছিল। চাকরি বেঁচে গেলেও সমীরণকে বদলি করা হয় নাগরাকাটায়। তারপর মালবাজারে। শিলিগুড়িতে ফেরা হয়নি। চেষ্টা আর দৌড়ঝাঁপ করলে হয়তো ফিরতে পারতেন, কিন্তু ফিরতে চাননি । মালবাজারকে ভালোবেসে ফেলেছিল সমীরণ । আর মালবাজারের প্রাকৃতিক নির্জনতায় ভালোবেসে ফেলেছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতকে, রবীন্দ্রনাথকে । বন্ধুহীন নির্জন  থাকাটা শ্রেয় মনে হয়েছিল । 


২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘দারিদ্র বিক্রি আছে’ কাব্যগ্রন্হে ‘অনুরণন’ কবিতায় সমীরণ লিখেছেন :

এই যে ঘাম মুছে ফেললাম

বোতল উঁচিয়ে গলায় ঢেলে নিলাম জল

একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের মুখড়াটুকু গুন গুন

সিগারেটে অগ্নিসংযোগ—

হঠাৎ একবার ঘুমন্ত মুখে ঝুঁকে পড়া,

কবিতা লিখতে গিয়ে মনে হল,

কোমল কন্ঠনালিতে বসে যাচ্ছে আমার নখ

গোঁফে লঢগে থাকা রক্ত জিভ ঘুরিয়ে

পরিষ্কার করে নেবার, কথাও মনে পড়ল—


ওই কাব্যগ্রন্হেই, ‘হে দায়বদ্ধ’ কবিতায় লিখেছেন

কফিনের ভিতর থেকে করমর্দনের জন্য হাত

বাড়িয়ে দিল শতাব্দীর শেষ অভিযাত্রী ।

আকাশ ছোঁয়া সমকাল থেকে তাকে ঝাঁপ দিতে

অনেকেই দেখেছে । সবগুলো বাকসো তছনছ হয়ে গিয়েছিল

এমন হাসি কাশি কান্নার রোল—

যা হোক, শেষের দুচারটি কাঠি পোঁতা নিশ্চয়ই বাকি

রয়ে গিয়েছিল অসাবধানে, তাই সৌহার্দ্যপূর্ণ হাত

বেরিয়ে এসেছে রৌদ্রে ।

কে নেবে এই উৎসারিত দায়ভার, পিছনে হাত কার ?

হে দায়বদ্ধ, কফিনটা আপনার না আমার ?


 'একা থাকা' দুধরণের। প্রথমটা একাকীত্ব এবং আরেকটি হল নির্জনতা। দ্বিতীয়টা মনের একটি সুখী অবস্থা প্রকাশ করে যখন আগেরটি হতাশার যন্ত্রণার দিকে নিয়ে যায় ।  প্রতিটি মানুষেরই  তাদের পূর্বের কর্মকাণ্ড আর চিন্তাধারার ফলাফল অনুযায়ী এই ধরণের অভিজ্ঞতা হয় । বলাবাহুল্য কবিরাও এর ব্যতিক্রম  নন। ন সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, কবিরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমে উভয় ধরনের অভিজ্ঞতাই প্রকাশ করেছেন। সমীরণও করেছেন । বিভিন্ন ভাষায়  নির্জনতা নিয়ে প্রচুর কবিতা পাওয়া যায়। বেশিরভাগ রোমান্টিক কবি এটির প্রশংসা করেছিলেন, কারণ এটি তাদের প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং অনুগ্রহ উপভোগ করতে দেয়। যেমন 'ড্যাফোডিলস' কবিতায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ । সমীরণ সেই ধরণের রোমান্টিসিজমে আক্রান্ত হননি, মূলত হাংরি আন্দোলনের বনেদের কারণে । 


আমেরিকান সাহিত্যে 'কনফেশনাল পোয়েট্রি' নামে একটি সম্পূর্ণ ধারা রয়েছে যার উৎপত্তি জনবিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্বের অনুভূতি থেকে । সেই ধরণের কবিতায় আমরা জীবনানন্দ দাশ কিংবা সমীরণ ঘোষকে পাবো না । স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা ব্যক্তিগত বা "আমি" এর কবিতা, যা বিনয় মজুমদারের ‘গায়ত্রীকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি’  বা আমার ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো । লেখার এই শৈলী ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে উদ্ভূত হয়েছিল । শৈলেশ্বর ঘোষ এই শৈলীর মাধ্যমে মৃত্যু, ট্রমা, বিষণ্নতা এবং সম্পর্কের অনুভূতির মধ্যে যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উৎপত্তি  তা এই ধরনের কবিতায়  আত্মজীবনীমূলক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করেছেন। ইংরজি ভাষায় স্বীকারোক্তিমূলক সুপরিচিত কবিতাগুলির মধ্যে একটি হল সিলভিয়া প্লাথের "ড্যাডি"। তাঁর বাবাকে সম্বোধন করা, কবিতাটিতে হলোকাস্টের উল্লেখ রয়েছে তবে একটি গানের ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা শৈশবের নার্সারি ছড়ার প্রতিধ্বনি করে ।


তাঁর ‘কনফেশনস’-এ সেন্ট অগাস্টিন লিখেছেন, "মানুষ পাহাড়ের ওপরে, সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ে, নদীর দীর্ঘ গতিপথে, তারার বৃত্তাকার গতির বিস্ময় দেখার জন্য ভ্রমণ করে এবং তারা বিস্মিত না হয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সেন্ট অগাস্টিনের পর্যবেক্ষণ, বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে সত্য হলেও , শিল্পী ও কবিদের ক্ষেত্রে খাটে না । শিল্পী এবং কবিরা তাঁদের কাজে এতটাই নিমগ্ন হওয়ার জন্য দোষী হয়ে ওঠেন যে অনেক সময়ে তারা নিজেদের স্বাস্থ্য আর পরিবারকেও অবহেলা করতে পারে । অমন কবিরা নিজেদের সম্পর্কে অতৃপ্ত বিস্ময় প্রকাশ করেন, যা সমীরণ ওপরের রচনাটিতে করেছেন এবং ক্রমাগত নিজেদের অন্বেষণ করে চলেন কারণ তাঁরা নিজেরাই নিজেদের পরীক্ষাগার ।  তাঁরা, যেমন ফালগুনী রায় বা শম্ভু রক্ষিত, সাধারণত বুঝতে পারেন না যে ব্যাপারটা কীভাবে ঘটেছে যে তাঁরা অন্যদের চেয়ে বেশি প্রতিভাধর ! তাঁরা কবিতা লেখার শুরু থেকেই সৃজনশীল আশীর্বাদের অবস্থায় নিজেদের খুঁজে পান ।  তাঁরা মুগ্ধকর পরিবেশে নিজেদের মধ্যে সৃজন-ক্ষমতা আবিষ্কার করেন যা তাঁদের শিল্পকে সম্ভব করে তোলে। এই মুগ্ধতার দরুন অনেকে লেখালিখি সীমিত করে ফ্যালেন, যেমন সমীরণ ঘোষ আর ফালগুনী রায় করেছেন । জীবদ্দশায় সমীরণের কেবল ছয়টি কাব্যগ্রন্হ প্রকাশিত হয়েছিল । মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে, ২০১৬ সালে, হোঁচটনামা ।


অনেকে, কবি বা  শিল্পীদের মতন লোকদের মতো আত্মমগ্নতাকে  নেতিবাচক আর অপ্রীতিকর বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন।  প্রকৃতপক্ষে, শিল্পীদের মধ্যে কবি, ভাস্কর, স্হপতি, ছবি আঁকিয়ে, লেখক, অভিনেতদের চরিত্রে আত্মমগ্নতার অত্যধিক আবেগপ্রবণতা লক্ষ্য করেন আর  তাদের সাথে মিশতে অসুবিধা বোধ করেন। কিন্তু সৃজনকর্মে  নিযুক্ত ব্যক্তিদের  আত্মমগ্ন  হওয়া তাদের সৃজনশীল স্বভাবের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান।

একজন শিল্পী বা কবি নিজের সৃজনকর্মের মূর্ত প্রতীক। কবিকে তাঁর কাজ থেকে আলাদা করা যাবে না।  কবিতাই কবির জীবনের মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র  । নিজের সৃজনকর্মের প্রতি  বিশ্বাস একজন কবির মননে চিরকাল থাকে ।  এমনকি তা কবির  ঘুমের মধ্যে প্রক্রিয়ারত থাকে । লুকিয়ে রাখতে চাইলেও লুকানো যায় না। 


হোঁচটনামা কাব্যগ্রন্হের নামকবিতাটি :

হোঁচট সর্বদাই খাওয়া যায়, এবং সর্বত্র । তবে হোঁচট

খাওয়াটা অভ্যাস করতে হয়, ভাবতে হয়, হোঁচট একটি

খাবার জিনিস ।

প্রথম প্রথম কিন্তু স্রেফ জুতোর তলায় অজস্র হোঁচট

আমি পিষে মেরেছি । কোনওটাকে নিয়ে মজা করে

খানিকক্ষণ ফুটবলও খেলে নিয়েছি । আজ একটু দুঃখ

হয়, যা একমাত্র রুমাল জানে । রুমেলি জানে না,

বিড়ালও না । বাসা ছিল নাতো, শরীরে মলাট হয়ে

লেপটে ছিল ভালো ।

আমার ডানার বয়স আড়াই হাজার বছরের কম নয় ।

আজ অজস্র টীকা ভাষ্য কাঁটা ও কর্কটে তাকে, কিংবা

নিজেকেই, গরম তাওয়ায় উলটে দিই । শডাসন শোষণ

প্রেম ঘৃণা সব দুই ডানায় আগলে খাদের কিনারে

টালমাটাল দাঁড়িয়ে, গভীর গহনে হিমশীতল স্রোত, আর

বিপরীত ব্যালকনির স্তিমিত আলোয় সামান্য ঝুঁকে

থাকা অলোকসামান্য হোঁচট।

বাতাস থেকে সংগ্রহে এনে তাকে একটু লেহন, শুন্যতা

থেকে মূর্ত হওয়া দেখতে চোখ বন্ধ করি, সামনে উঁচু

নীচু প্রান্তরে ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘাসবীজ, এ আমি-র চূর্ণ

বিচূর্ণ অন্ধকার ।

[ মুম্বাই, রচনাকাল : আগস্ট ২০২২ ]


 

 

 

 

 

 

 

 


No comments:

Post a Comment

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...