Friday, June 22, 2018

উত্তম দাশ : মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন

   "শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত।" মলয় রায়চৌধুরী       
                        
                              ডক্টর উত্তম দাশ, ডিন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রচণ্ড অবিশ্বাস, ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান, এই ত্রিবিধ নৈরাজ্যে ষাটের দশকের শুরুতে আত্মার একটা ছটফটানি মলয় রায়চৌধুরী যখন সবে টের পাচ্ছেন তখন তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র । জীবনের মুখোমুখো দাঁড়াবার বয়েস । নিজেকে চিনে নেবার, অস্তিত্বের স্বরূপ আবিষ্কারের সময় । ততদিনে চিনে নেবার অবকাশ হয়েছে স্বদেশকে, সমাজ তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো খুলে ধরেছে সামনে । স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে চোদ্দ বছর আগে । দেশবিভাগ, শেকড়হীন মানুষের বিলি ব্যবস্হা, দেশপ্রেম ততদিনে মুনাফা তুলছে । পরিবারের গঠন পালটাচ্ছে; শহর-গ্রাম ব্যবধান বাড়ছে, নীতিবোধ ভাঙছে, বিশ্বাসের তলানি এ-প্রজন্ম চোখে দেখার ফুরসৎ পায়নি । বাংলাকবিতায় রবীন্দ্রবিরোধিতা রাজণেতিক মুনাফার জন্য মাত্র প্রয়োজন, ত্রিশ-চল্লিশের কবিতা গতানুগতিক হচ্ছে নির্জীব কবিদের হাতে । পঞ্চাশ সবে জা্ছে । নিজস্ব ভূমি আবিষ্কার হয়নি । 

এমন একটি টালামাটাল সময়ে আমরেকান কবি গিনসবার্গ পাটনায় মলয়ের বাড়ি । দাদা সমীর রায়চৌধুরীর সুবাদেই এই যোগাযোগ । সমীর নিজে কবি, পঞ্চাশের কবিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ । বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে তখন মলয়ের পরিচয় নিবিড় নয় । এই সময়ে হঠাৎ ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের In The Sowre Hungry Time পঙক্তিটি তাঁকে ঘিরে থরল । এখান থেকে তুলে নিলেন  'হাংরি' শব্দটি । অসওয়াল্ড স্পেংলারের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বিষয়ক কনসেপ্টে খুঁজে পেলেন হাংরি শব্দের দার্শনিক ভিত্তি । এরই প্রেক্ষিতে গিন্সবার্গ আকর্ষণ করলেন বৈদ্যুতিক । শুধু কবিতা নয়, জীবনযাত্রাও । উত্তাল উদ্দাম শেকড়হীন নোঙেছেঁড়া । মলয়ের জীবন চর্চায় ঈশ্বর নেই ( গিনসবার্গের ছিল বুদ্ধে ), ব্যক্তিসত্ত্বার বাইরে অন্য কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু কবিতায় জীবনের বিশ্বস্ত অনুবাদ আছে, ছলনাহীন, স্পষ্ট । জীবন আর কবিতা দুটো সমান্তরাল বাহু নয় । একই বাহু । ফলত জীবন ও কবিতা সেখানে সমার্থক । আকৃষ্ট হতেই পারেন মলয় । এই সময়ের প্রতিক্রিয়া  দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জানালেন তিনি । শক্তিও তখন পাটনায় । শক্তি উৎসাহিত হলেন । উৎসাহ দিলেন । কিন্তু শক্তি কলকাতায় ফিরেই 'সম্প্রতি' পত্রিকায় লিখলেন 'ক্ষুৎ-কাতর আক্রমণ' । বাংলায় লেখা মলয়ের পরিকল্পনার প্রথম ভাষ্য ।  দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নেতৃত্বে অভিষিক্ত করে ১৯৬১ সালের নভেম্বরে প্রথমে ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলেন মলয় একটি ইস্তাহার । ১৯৬২ সালের এপ্রিলে বাংলায় বের করলেন একটি ইস্তাহার, 'হাংগরি জেনারেশন' । তিনকলমে ডবলক্রাউন ১/৮ প্ররষ্ঠায় ছাপা বুলেটিন । বার্জাস টাইপে ছাপা হলো -- স্রষ্টা : মলয় রায়চৌধুরী । নেতৃত্ব : শক্তি চট্টোপাধ্যায় । সম্পাদনা : দেবী রায় । এক পৃষ্ঠার বুলেটিন, বাঁধা পত্রিকার ডিমাই ১/৮ সাইজে পরিবর্তনের পথে নামের বানানের বিবর্তন হলো 'হাংরি জেনারেশন' ।ততদিনে অবশ্য দলবল বেড়েছে । কিন্তু হাংরি জেনারেশনের প্রথম বুলেটিনটি গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে যাঁরা হাংরি আন্দোলনের শরিক হয়েছিলেন, ধরে নিতে হবে এই বুলেটিনের বয়ানে তাঁদের সায় ছিল । অন্তত তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন একটা আন্দোলনকে, হাংরি জেনারেশন নামের আন্দোলনকে । 

মলয়ের লেখা প্রথম বুলেটিনের সঙ্গে মৌল কোনো বিরোধ তাঁদের আদর্শগত কারণে ছিল না, থাকলে একদল তরুণ নিশ্চয় এভাবে সংগঠিত হতে পারতেন না ল আমি ভুলিনি, একটা আন্দোলন যৌথ চিন্তার ফসল । পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনে এই যৌথ চিন্তার রূপ দেখব । কিন্তু প্রাথমিক স্তরে একজন তাত্বিকের আনুগত্য মেনে নেয়াই সঙ্গত । তাত্বিক মলয় প্রথম বুলেটিনে লিখেছেন :

"কবিতা এখন জীবনের বৈপরীত্যে আত্মস্হ । সে আর জীবনের সামঞ্জস্যকারক নয়, নিরলস যুক্তিগ্রন্হন নয় । এখন, এই সময়ে, অনিবার্য গভীরতার সন্ত্রস্তদৃক ক্ষুধায় মানবিক প্রয়োজন এমনভাবে আবির্ভূত যে, জীবনের কোনো অর্থ বের করার প্রয়োজন শেষ । এখন প্রয়োজন অনর্থ বের করা, প্রয়োজন মেরুবিপর্যয়, প্রয়োজন নৈরাত্মসিদ্ধি । প্রাগুক্ত ক্ষুধা কেবল পৃধিবীবিরোধিতার নয়, তা মানবিক, দৈহিক ও শারীরিক । এক্ষুধার একমাত্র লালনকর্তা কবিতা, কারণ কবিতা ব্যতীত আর কি আছে জীবনে ! মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে । কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয় ।

কবিতা থাকা সত্ত্বেও, অসহ্য মানবজীবনের সমস্ত প্রকার অসম্বদ্ধতা । অন্তরজগতের নিষ্কুন্ঠ বিদ্রোহে, অন্তরাত্মার নিদারুণ বিরক্তিতে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রচিত হয় কবিতা -- উঃ, তবু মানবজীবন কেন এমন নিষ্প্রভ, হয়তো, কবিতা এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে যাঁরা অভ্যস্ত, তাঁদের অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব এই সংকটের নিয়ন্ত্রক।

কবিতা বলে যাকে আমরা মনে করি, জীবনের থেকে মোহমুক্তির প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণের ফলাফল তা কেবল নয় । ফর্মের খাঁচায় বিশ্বপ্রকৃতির ফাঁদ পেতে  রাখাকে আর কবিতা বলা হয় না । এমন কি, প্রত্যাখ্যাত পৃথিবী থেকে পরিত্রাণের পথরূপেও কবিতার ব্যবহার এখন হাস্যকর। ইচ্ছে করে, সচেতনতায়, সম্পূর্ণরূপে আরণ্যকতার বর্বরতার মধ্যে মুক্ত কাব্যিক প্রজ্ঞার নিষ্ঠুরতার দাবির কাছে আত্মসমর্পণই কবিতা । সমস্তপ্রকার নিষিদ্ধতার মধ্যে তাই পাওয়া যাবে অন্তরজগতের গুপ্তধন । কেবল, কেবল কবিতা থাকবে আত্মায় ।

ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন । টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে । এখন কবিতা রচিত হয় অর্গাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে । যেহেতু ত্রশ্নু বলাৎকারের পরমুহূর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে 'সচেতনভাবে বিহ্বল' হলেই এখন কবিতা সৃষ্টি সম্ভব । শখ করে, ভেবে-ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু কবিতা রচনা তেমন করে কোনো দিনই সম্ভব নয় । অর্থব্যঞ্জনাঘন হোক অথবা  ধ্বনিপারম্পর্যে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি না থাকলে, কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতো অনুন্মেষিণী হয়ে যেতে পারে ।"

হাংরি জেনারেশনের বিরুদ্ধে প্রচলিত যে অভিযোগ যৌনতা এবং জান্তব ক্ষুধা বা জৈবতার, তার ইঙ্গিতমাত্র নেই মলয়ের বুলেটিনে । যদিও জীবনের সামগ্রিক ক্ষুধাকে তিনি বলেছেন -- 'মানসিক, দৈহিক এবং শারীরিক ।' তবু তাঁর বিশ্লেষণ যেখানে এসে থেমেছে সেখানে এ-ক্ষুধা আত্মিক । অন্তরাত্মা ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির সামর্থ্যে কবিতা আসলে বস্তুগত জীবন ও আত্মিক জীবনের মেল বন্ধন । কবিতা যেখানে জীবনের একমাত্র আশ্রয় সেখানে কবিতা ও জীবন একার্থক, অথচ জীবনের সংকট কবিতা ও জীবনকে ভিন্নভাবে দেখে । কবিতা বানিয়েদের মলয় দেখেছেন ক্ষমাহীন, কবিতা তাঁর কাছে অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, সুতরাং 'সচেতনভাবে বিহ্বল' হলেই কবিতা সৃষ্টি সম্ভব । অরগ্যাজমের মতো বলতে, যে জৈববৃত্তি বোঝায় তা কখনোই উদ্দীপনাহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত নয় । বৈজ্ঞানিক সত্যে উপমাটি ব্যর্থ । এখানে আমাদের মেনে নিতে হবে কবিতার স্বতঃস্ফূর্তি, মলয়ের ধারণা মতো । অনেকটা রোমান্টিক কবিদের স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অব পাওয়ারফুল ফিলিংস, অবশ্যই রোমান্টিকদের মতো আবেগে আত্মসমর্পণ নয়, কল্পজগৎ তেরি নয়, সচেতন বিহ্বল অবস্হাই মলয়ের ধারণায় কবিতা সৃষ্টির শর্ত, 'অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি' না থাকলে তাকে মলয় কবিতা বলতে রাজি নন । নিঃসন্দেহে অভিনব । বিশেষত বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তি । কিন্তু এই অভিনব মতবাদ থেকেই হাংরি আন্দোলনের শুরু ।

No comments:

Post a Comment

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...