Wednesday, July 28, 2021

হাংরি আন্দোলন-এর কবি সমীরণ ঘোষ সম্পর্কে রাজা সরকার লিখেছেন

 হাংরি আন্দোলন-এর কবি সমীরণ ঘোষ সম্পর্কে রাজা সরকার লিখেছেন :

  • রক্তবীজ
    ব্যক্তিগতভাবে আমার একটা হিসেব আছে যে, জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর বছর কুড়ি পর আবার ফিরে এসেছিলেন কলকাতায়। যেমন ফাল্গুনী রায় ফিরে এসেছিলেন মৃত্যুর পনের বছর পর শিলিগুড়ির কলেজ পাড়ায়। এমন আরও অনেকেই হয়তো ফিরে ফিরে এসেছিলেন। আমি, আমার জানা সকল প্রয়াত কবির তালিকা এখন দিচ্ছিনা। দিচ্ছি শুধু একজনের; তিনি সমীরণ ঘোষ। মৃত্যুর আট বছর দুইশ একুশ দিন পর তিনি ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছেন ডুয়ার্সের বানারহাট সংলগ্ন কলাবাড়ি নামক স্থানে। সেখানে দিবাকর ভট্টাচার্য্য নামে এক প্রবীণ সাহিত্যকর্মীর সংগে তার দেখা হয়েছে। তিনি ফোনে আমাকে জানিয়েছেন।
    দিবাকর ভট্টাচার্য্য তার জীবৎকালের এক পর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে এক প্রান্তিকতম বিন্দুতে এসে এই সময় দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে একটি কাব্যগ্রন্থ, যার নাম রক্তবীজ, প্রণেতা সমীরণ ঘোষ। সেই কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে করতে হঠাৎ থেমে গিয়ে দিবাকর আমাকে ফোন করলেন। ফোন করে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। কান্না সংবরণ করতে করতে বলতে লাগলেন---রাজা, সমীরণের এই বইটার মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলাম আমিরে--- কতকাল আগের কথা---ঠিকমত ওর পাণ্ডুলিপি পড়েছিলাম কি না আজ আর মনে নেই, পড়ে থাকলেও ভুলে গেছি---কিন্তু আজ সেই লেখা পড়ছি, পড়ে দেখছি---কী সব কবিতা লিখেছিলো সমীরণ---এত বছর পার হয়ে গেল---এই সব কবিতার,এইরকম একটি বইয়ের খোঁজ হয়নি কেন এতকাল---এ কি আমাদের ব্যর্থতা নয় ! এ তো বাংলা কবিতার পাঠক হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা! বইটি আমি এখন বুকে জড়িয়ে ধরে আছি।
    এমন এক ফোনালাপ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি শুনতে পারছি সমীরণ তার হাস্‌কি গলায় হাসছে আর দিবাকরকে বলছে---নে হয়েছে, এখন ছাড় ছাড়---।
    এই পর্যন্ত শুনে আমি মনে মনে এই সকল বিস্মরণের পথরেখা দেখতে দেখতে ভাবলাম একটা বয়সের পর কান্নাকে বোধ হয় আর আটকানো যায় না। দিবাকর আর একটু কাঁদুক।
    সমীরণের 'রক্তবীজ' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিলো ১৯৮৫ সনে। দিবাকর ভট্টচার্য্য'র যুক্তপ্রয়াস প্রিন্টার্স,আলিপুরদুয়ার থেকে। স্বভাবতই ধরা যায় কবিতাগুলো হয়তো লেখা হয়েছিলো সেই আশির দশকের প্রথম ভাগে। ঠিক সেই সময়ের পথরেখা ধরে এগুতে থাকলে চোখে পড়বে শিলিগুড়ির এক যুবককে। যে দুপুরের খর রোদ বা ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকল পরিতাপ ও স্নেহের ভাণ্ড উপুড় করে পরিক্রমা করে চলেছেন তার পেশাজীবনের পথ। তারজন্য সেদিন জীবনের এমন কোনো আয়োজন ছিলো না যা দিয়ে তাঁর সেদিনের ক্লান্তি ও শ্রম জড়ানো পদবিক্ষেপগুলো দুদণ্ড সুস্থিরতা পায়। তাঁর কবিতা-ভাষার জন্মের জন্য এমনই এক জীবন সে প্রাপ্ত হয়েছিলো।
    'রক্তবীজ' সমীরণের অন্যতম একটি কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থিত অগ্রস্থিত সকল কবিতা নিয়ে তাঁর একটি কবিতাসমগ্র এখন সময়ের আকাঙ্ক্ষা। সমীরণ তনয় সব্যসাচীর সংগে কথাপ্রসঙ্গে জানা গেল সমীরণের গদ্যরচনাগুলোকে একত্রিত করে একটি গদ্যগ্রন্থও প্রকাশ করা যায়। আমি আশা করব অকাল প্রয়াত সমীরণ আবার তাঁর কবিতার সঙ্গে বার বার ফিরে ফিরে আসুক।




Thursday, July 22, 2021

হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমিতাভ ঘোষাল

 


হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমিতাভ ঘোষাল 

( ‘গদ্য-পদ্য সংবাদ’ পত্রিকায় ১৯৮৬ অক্টোবরে প্রকাশিত )

সুমিতাভ : ষাটের দশকের হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ কতোটা ?


সুনীল : হাংরি আন্দোলনে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না । আমি তখন কৃত্তিবাস নামে একটা পত্রিকার সম্পাদনা করতুম । কৃত্তিবাসের থেকে কয়েকজন এই আন্দোলন শুরু করে । এদের মধ্যে প্রধান ভূমিকা প্রথমে নিয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী, সে ছিল আমার বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর ছোটো ভাই । সমীর রায়চৌধুরী কৃত্তিবাসের একজন লেখক এবং ওই গোষ্ঠীরই একজন । মলয়েরও কিছু কিছু লেখা কৃত্তিবাসে বেরিয়েছিল ।


সুমিতাভ : আচ্ছা শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো... ( কথায় বাধা দিয়ে )

সুনীল : হ্যাঁ, তারপরে মলয় প্রথমে শুরু করার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাতে যোগ দেয় এবং পরে উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও পরিচিতদের মধ্যে অনেকে আসেন  । এইভাবে হাংরি আন্দোলন শুরু হয় ।  কিন্তু এই আন্দোলনের কোনো ইস্তাহার বা কোনো ব্যাপারে আমার কোনো নাম ছিল না বা আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না । 


সুমিতাভ : হাংরি আন্দোলনকে কি আপনি একটা আদৌ সাহিত্য আন্দোলন বলে মনে করেন ?


সুনীল : হাংরি আন্দোলন তো সাহিত্যের আন্দোলন হিসেবেই শুরু হয়েছিল । কতোটা সাহিত্য তারা সৃষ্টি করতে পেরেছিল, সে বিষয়ে আমি কোনো মতামত দেব না । সেটা এখনকার যারা পাঠক তারাই বিচার করবে । তবে নতুন কোনো একটা সাহিত্য তারা সৃষ্টি করতে পেরেছিল এটা ঠিক । 


সুমিতাভ : তখনকার সাহিত্যে এই আন্দোলনের কোনো প্রতিচ্ছবি পড়েছিল কি?


সুনীল : দুটো ব্যাপার হয়েছিল । একটা হয়েছিল কী হাংরি আন্দোলনের যারা প্রধান তারা কিছু কিছু পত্র পত্রিকায় লিফলেট ইত্যাদি ছাপাতে শুরু করে । এই সাহিত্যকে বদলাতে হবে ; অন্যরকম সাহিত্য সৃষ্টি করে পুরোনো মূল্যবোধকে নষ্ট করে দিতে হবে  ইত্যাদি ।


সুমিতাভ : না, সাহিত্যে এর কোনো প্রতিচ্ছাপ পড়েছে কি ?

সুনীল : না । আমি বলব সাহিত্যে এর কোনো ছাপ পড়েছে বলে আমি মনে করি না । তবে এটা একটা গোষ্ঠী, অন্যরকম সাহিত্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল । তবে অ্যাবরাপ্টলি এই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায় । তবে এতোদিন বাদে আবার সেসব নিয়ে আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি । মাঝখানে দশ বছর হাংরিদের সম্পর্কে কথাবার্তা শুনিনি । ( এই দশ বছর মলয় রায়চৌধুরী কলকাতার সাহিত্য জগতের বাইরে ছিলেন, বুলেটিন প্রকাশ করার জন্য টাকা তিনিই দিতেন )।


সুমিতাভ : ট্রাডিশানাল বাংলা সাহিত্যকে কোনোভাবেই এরা একটুও বদলাতে পেরেছিল কি ?


সুনীল : সেটা তো আমি বলতে ওপারব না । হাংরিদের যারা প্রথান, যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, এরা হাংরি আন্দোলনের মাঝামাঝি অবস্হায় এর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান ।  যখন এই নিয়ে কোর্টে কেস হয়, তখন এরা বিবৃতি দেয় যে, আমাদের সঙ্গে হাংরির কোনো সম্পর্ক নেই । ওদের লেখা আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যের মূল ধারার সঙ্গেই যুক্ত । আলাদাভাবে হাংরি আন্দোলনের কোনো প্রভাব আছে বলে আমি মনে করি না ।


সুমিতাভ : ক্ষমতাবান বেশ কছু লেখক থাকা সত্ত্বেও, হাংরি আন্দোলনের জীবৎকাল খুব অল্প । এর কারণ কি ?


সুনীল :  ক্ষমতাবান লেখকরা প্রথমে তাড়াতাড়ি সরে গেলেন । দ্বিতীয় কথা, এরা সিরিয়াসলি সাহিত্য রচনা করার বদলে এমন কিছু কাজ করতে লাগলেন, যেগুলো অনেকেরই বিরক্তি উদ্রেক করলো । যেমন ধরো এরা কাউকে জুতোর মালা পাঠিয়ে দিল । কাউকে একটা মুখোশ পাঠিয়ে দিল । বা কাউকে টেলিফোন করে বলল, আপনার ছেলে মারা গেছে, বাড়ি চলে যান । এইভাবে কিছু কিছু অল্প বয়সের চ্যাংড়ামি  --- এটা অনেকেই করে, অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু এটাই যেন প্রধান হয়ে দাঁড়াল । লেখার মধ্যে তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করার করার জন্য অযথা এবং অকারণ অশ্লীলতা আনার চেষ্টা করল । আমি অবশ্য কোনো শব্দকেই অশ্লীল বলে মনে করি না । তথাকথিত অশ্লীলতা, তথাকথিত অশ্লীল শব্দ । বা আরেকটা ছিল, অন্যকে গালাগালি দেওয়া । এই সমস্ত দিকেই যেন তাদের মন বেশি গেল । অবশ্য অন্য লোকের অন্য মত থাকতে পারে ।


সুমিতাভ : হাংরি লেখাগুলোতে আত্মকামিতা জিনিসটার কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে করেন?


সুনীল : তা, আত্মকামীতা মানে ধরো, আমরা কৃত্তিবাসে যেটা বলতাম, যে নতুন আধুনিক সাহিত্য বলতে আমরা কী বুঝতাম ?তখন আমরা বলতাম যে কৃত্তিবাসের মূল সুর হচ্ছে কনফেশন । স্বীকারোক্তিমূলক লেখা । আমরা যেভাবে জীবন যাপন করছি সাহিত্যে সেটাকে ঠিক সেভাবেই স্বীকার করে নেওয়া দরকার । হাংরিরা হয়তো তার থেকেও আরো এক্সট্রিম-এ চলে গিয়েছিল । তারা, যাকে বলে আত্মকণ্ডূয়ন, সেটার দিকে চলে গিয়েছিল । তবে আমার মনে হয় হাংরি আন্দোলনের মূল সুর কৃত্তিবাস ধারারই একটা অঙ্গ ।


সুমিতাভ : নকশাল আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্ব, আর হাংরি আন্দোলন, মোটামুটি সমসাময়িক । এর কোনো বিশেষ তাৎপর্য আছে বলে আপনি মনে করেন ?


সুনীল : হাংরি আন্দোলনের মধ্যে রাজনীতি কিছু ছিল না । তবে ক্ষুধার ব্যাপারটা ছিল । তবে সেটা খাদ্য অভাবের যে ক্ষুধা, তা নয় বোধহয় । এটা বোধহয় অন্য কোনো ক্ষুধার কথা ওরা বলতে চেয়েছিল । নকশাল আন্দোলন অনেক ব্যাপক, অনেক মহৎ আত্মত্যাগ আছে । হাংরি আন্দোলন সেরকম কিছু একটা নয় ।


সুমিতাভ : হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার কম-বেশি পঁচিশ বছর পর, আবার একটা ক্ষুৎকাতর আবহাওয়া, বিশেষত ছোটো পত্র-পত্রিকাগুলোয় চোখে পড়ছে । এরকমটা কেন হচ্ছে বলতে পারেন ?


সুনীল : সেরকম কোনো আবহাওয়া আমার চোখে পড়ছে না । যা চোখে পড়ছে তা হলো হাংরিদের নিয়ে আবার লেখালিখি শুরু হয়েছে । কোনো কোনো পত্রিকায় এদের কেস টেস ছাপা হচ্ছে, হিস্ট্রিটাও ছাপা হয়েছে। মলয় রায়চৌধুরীকে বহুদিন নীরবতার পর আবার লেখালিখি করতে দেখছি ।


সুমিতাভ : সেটা এতদিন পরে হঠাৎ কি কারণে ?


সুনীল : আলাদা কোনো কারণ নেই । এটা নেহাতই কলকাতার ব্যাপার ।


সুমিতাভ : ধন্যবাদ । আমরা তাহলে উঠি…


সুনীল : তবে এটা বলছি, আমার সঙ্গে হাংরিদের সম্পর্ক এই যে আমি তাদের কোনো পত্র-পত্রিকায় লিখিনি । তাদের সঙ্গে আমার কোনো মানসিক মিলও ছিল না । আন্দোলনেও অংশ নিইনি । তবে যখন মামলা হয়, তখন আমার কাছে মলয় রায়চৌধুরী এসেছিল, যেন আমি তার হয়ে সাক্ষ্য দিই । আমি তার পক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছি । আদালতে দাঁড়িয়ে আমি বলেছিলুম, মলয় রায়চৌধুরীর কোনো কবিতায় আমি কোনো অশ্লীলতা খুঁজে পাইনি । আদালতে এটাই আমার সাক্ষ্য ছিল ।


সুমিতাভ : সেটা আপনি স্নেহের বশে করেছিলেন, না নিজের বিশ্বাসে ?


সুনীল : আমি পরে মলয়কে বাড়িতে বলেছিলাম, দেখ তোমার কোনো কবিতাকে যদিও আমি সার্থক কবিতা বলে মনে করি না, কিন্তু কেউ একটা কবিতার মধ্যে কিছু অশ্লীল শব্দ লিখেছে বলে তাকে আদালতে ডেকে নিয়ে গিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে, সেটাও আমি সমর্থনযোগ্য মনে করি না । সাহিত্যের জন্য শাস্তিদানের কোনো ঘটনা যদি ঘটে, তবে আমি সবসময় অভিযুক্তের পক্ষেই থাকব ।

( সুমিতাভ ঘোষাল সম্পাদিত 'গদ্য-পদ্য সংবাদ' পত্রিকার অক্টোবর ১৯৮৬ সংখ্যায় প্রকাশিত )

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...