Monday, October 25, 2021

মলয় রায়চৌধুরী - এক রাজদ্রোহী রাজপুত্রের কাহিনি : কলিম খান

প্রথম পর্ব : ষড়যন্ত্র : মারণ ( কোরাণ ও গীতা : পুনঃপাঠ ) মহম্মদ কহিলেন : হে আবুবক্কর ! মদিনা হইতে এই বিশাল সৈন্যবাহিনী লইয়া যে উদ্দেশ্যে হেথায় আসিয়াছি, তাহা বুঝি আর সফল হইল না । দেখো, সন্মুখসমরে আজ আমারই কোরেশ বংশের বংশজগণ । আর দেখো, উভয় সেনার মধ্যে আমারই পিতৃব্যগণ পিতামহগণ আচার্য্যগণ মাতুলগণ ভাতৃগণ পুত্রগণ পৌত্রগণ মিত্রগণ শ্বশুরগণ সুহৃদগণ অবস্হান করিতেছেন । আমি কাহাকে হত্যা করিব ? হে আবুবক্কর ! যুদ্ধেচ্ছু এই সকল স্বজনদিগকে সন্মুখে অবস্হিত দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন হইতেছে এবং মুখ শুষ্ক হইতেছে । ইহা সত্য যে, ৩৬০টি প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়া ইহারা যুগযুগান্ত ধরিয়া আরববাসীগণকে প্রতারিত করিতেছে, আর ওই প্রতীকগুলির সাহায্যে পুরাতন জীবনব্যবস্হায় তাহাদিগকে মোহগ্রস্হ করিয়া রাখিয়াছে, তাহাদের ধনসম্পদ ভোগ করিতেছে । ইহাও সত্য যে, আমি এই বংশেরই এক কনিষ্ঠতম ও অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার । তথাপি এক্ষণে ইহাদিগকে সমরাঙ্গনে সন্মুখস্হ দেখিয়া আমার হস্তপদ অবসন্ন হইয়া আসিতেছে । আবুবক্কর কহিলেন : অয় মুহম্মদ ! এই সঙ্কট সময়ে স্বর্গহানিকর অকীর্তিকর তোমার এই মোহ কোথা হইতে উপস্হিত হইল ? এ যুদ্ধ স্বার্থপ্রণোদিত নহে, ইহা জেহাদ, ধর্মযুদ্ধ । হে পরন্তপ ! তুচ্ছ হৃদয়ের দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও ! জেহাদ অপেক্ষা ইমানদার মোমিনের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছুই নাই । হে ধনঞ্জয় ! এই যুদ্ধ জগৎপিতার নিয়মে স্বয়ং উপস্হিত হইয়াছে । ইহা আমাদের নিমিত্ত জন্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করিবে । অতএব যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও । অন্যথায় মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয়বশত যুদ্ধে বিরত হইতেছ, দয়াবশত নহে । সুতরাং যাহারা তোমাকে বহু সন্মান করেন, তাহাদিগের নিকট তুমি লঘুতাপ্রাপ্ত হইবে । তোমার শত্রুরাও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া অনেক অবাচ্য কথা বলিবে । তাহা অপেক্ষা অধিক দুঃখকর আর কী আছে ? এক হস্তে অধর্মের বিনাশ ও অপর হস্তে ধর্মের প্রতিষ্ঠা নিমিত্ত তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ধর্মভ্রষ্টদিগকে হত্যা করিতে দ্বিধা কিসের ? সুতরাং হে সব্যসাচী, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া উথ্থান করো। সব্যসাচী কহিলেন : ইহা সত্য যে, ইহারা ধর্মভ্রষ্ট । এই কৌরবগণ আমাদিগের ন্যায় ইক্ষাকু বংশজ হইলেও ইহারা ধর্মের অমর্যাদা করিয়াছে । প্রজাপালন বিষয়ে ইহাদিগের দুঃশাসনের কোনও সীমা নাই । ইহাও সত্য যে, আমরা এই বংশেরই অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এই রাজবংশের দুয়ো-রাজকুমার এবং ইহারা আমাদিগকে আশৈশব প্রবঞ্চনা করিয়া আসিতেছে, সাধারণ প্রজাদিগের তো কথাই নাই । সেই হেতু ধর্মপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই ইহাদিগকে ক্ষমতাচ্যুত করা প্রয়োজন । কিন্তু এতৎসত্বেও, স্বজন ও গুরুজনদিগকে বধ করিয়া কীরূপে প্রাণধারণ করিব, এইরূপ চিন্তাপ্রযুক্ত হইয়া চিত্তের দীনতায় আমি অভিভূত হইতেছি । প্রকৃত ধর্ম কী, এ বিষয়ে আমার চিত্ত বিমূঢ় হইতেছে । ধর্মপ্রতিষ্ঠার নিমিত্ত এ আমি কাহার হত্যাকারী হইতে চলিয়াছি ? অতএব হে কৃষ্ণ ! যাহাতে শুভ হয়, আমাকে নিশ্চিত করিয়া তাহা বলো ! শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন : প্রকৃতপক্ষে তুমি কাহারও হত্যাকারী নহ। স্বজন বা গুরুজন যাহাই হউন, যাহারা অন্যায়কারী, প্রজাবৃন্দের প্রতি নির্দয়, অচলায়তন রূপে সমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাঁহারা ধর্মভ্রষ্ট হইয়াছেন । কাল সমুপস্হিত হইলে স্বয়ং শিব ধর্মভ্রষ্টদিগের মহিমাহরণ করিয়া তাহাদিগকে হনন করিয়া রাখেন । এক্ষেত্রেও তাহাই হইয়াছে, তুমি নিমিত্তমাত্র । সত্যের জন্য, ধর্মের জন্য, স্বজন ও গুরুজনদিগের উপর বাণনিক্ষেপ করিলে কদাচ অধর্ম হয় না। সুতরাং, তুমি নিঃসংশয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও । যাহারা সত্যের নিমিত্ত ধর্মের নিমিত্ত পিতৃব্য ও পিতামহ প্রভৃতি স্বজনগণকে নিকেশ করিতে দ্বিধা করেন না, তাহারাই প্রকৃত ধার্মিক । ইতিহাস তাহার সাক্ষী । অতএব, হে পাশুপতধারী মোমিন ! হে দুয়ো-রাজকুমার ! হে বংশদ্রোহী! তুমি যুদ্ধ করো । দ্বিতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : মোহন ( দেবীপুরাণ : পুনঃপাঠ ) ঋষিগণ কহিলেন : হে পণ্ডিতপ্রবর ! যথার্থ পথপ্রদর্শক নেতাই গুরুপদবাচ্য । তাঁহাকে সম্যকরূপে অবগত না-হইয়া তাঁহার অনুসরণ করা উচিত নহে । ইহা জানিয়াও অসুরগণ কী প্রকারে ভুল নেতৃত্বের দ্বারা প্রবঞ্চিত হইলেন, এক্ষণে সে বিষয়ে আমাদিগের কৌতূহল নিবারুণ করুন । বৈশ্যম্পায়ন কহিলেন : বৃহস্পতি ও শুক্রাচার্য উভয়েই ভৃগুর সন্তান হইলেও তাঁহাদের অভিমত ভিন্ন ছিল । সেই কারণে সুরাসুর সংগ্রামে তাঁহারা যথাক্রমে দেবতা ও অসুরগণের পরামর্শদাতারূপে তাহাদের গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন । একদা অসুরগণকে সংযত থাকিতে বলিয়া শুক্রাচার্য্য তপস্যার উদ্দেশ্যে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করিলেন । একথা জানিতে পারিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি স্বল্পকাল অতিবাহিত হইলে শুক্রাচার্য্যের রূপ ধারণপূর্বক তথায় উপস্হিত হইলেন । তাঁহাকে সমুপস্হিত দেখিয়া অসুরগণ তাঁহাদিগের গুরুদেব প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন, এইরূপ প্রত্যয় করিল এবং তাঁহাকে পাদ্য অর্ঘ্য দানে যথাবিহিত সন্মান প্রদর্শনপূর্বক তাঁহার উপদেশের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল । অনন্তর শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি তাহাদিগকে বলিলেন, বৈরিতা কুলক্ষয়ের কারণ । বৈরিতার কারণ বাসনা, অতএব বাসনা পরিত্যাগ করো । বাসনা না থাকিলে কেহই তোমাদিগকে বশীভূত করিতে পারিবে না । অতএব তোমরা বাসনামুক্ত হও, মস্তকমুণ্ডনকরতঃ গৈরিক বস্ত্র ধারণ করিয়া আচারনিষ্ঠ হও । আচারনিষ্ঠগণকে দেবতাও জয় করিতে পারিবে না । গুরুদেবের আদেশ শিরোধার্য করিয়া অসুরগণ তাহাই করিতে লাগিলেন । ইহার ফলে তাহাদিগের হৃদয় হইতে অসূয়াভাব ক্রমে তিরোহিত হইতে লাগিল । ইট্যবসরে, দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্য তাঁহার তপস্যা সমাপনান্তে তথায় সমাগত হইলেন । দেবগুরু বৃহস্পতিকে অসুরগণের গুরুপদে অধিষ্ঠিত দেখিয়া তিনি যারপরনাই বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া অসুরগণকে কহিলেন--- এ কাহাকে তোমরা আমার আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছ ? ইনি যে দেবগুরু বৃহস্পতি, তাহা কি তোমরা উপলবদ্ধি করিতে পারো নাই ? তোমাদিগকে বিপথগামী করিবার জন্য আমার অনুপস্হিতির সুযোগ গ্রহণ করিয়া এ প্রবঞ্চক তোমাদিগের সহিত প্রতারণা করিয়াছে । ইনি আমাদিগের ন্যায় স্বর্গদ্রোহী নহেন । তোমাদের নেতার আসন গ্রহণ করিয়া তোমাদের সংগ্রামকে ধ্বংস করাই এই প্রতারকের একমাত্র উদ্দেশ্য । ইহা শুনিয়া শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি কহিলেন : হে অসুরগণ! অবধান করো ! আমার উপদেশে তোমরা অজেয় হইতে চলিয়াছ দেখিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি তোমাদিগকে প্রতারণা করিবার উদ্দেশ্যে এক্ষণে আমার রূপ ধারণ করিয়া তোমাদিগের সন্মুখে উপস্হিত হইয়াছেন । ইনি দেবগুরু বৃহস্পতি । অবিলম্বে ইহার মুখে চুনকালি দিয়া গর্দভের পৃষ্ঠে আরোহন করাইয়া পশ্চাতে হ্ল্লা লাগাইয়া দাও এবং বিতাড়ন করো । অসুরগণ তাহাই করিল । কিয়ৎকাল অতিবাহিত হইলে, অসুরগণ একদিন হৃদয়ঙ্গম করিল, তাহারা প্রবঞ্চিত হইয়াছে । কিন্তু তখন তাহাদিগের আর কিছুই করিবার রহিল না । এইভাবে অসুরগণ ছদ্ম-দেবদ্রোহীকে তাহাদের নেতারূপে বরণ করিয়া মোহগ্রস্ত হইয়াছিল এবং সম্পূর্ণরূপে প্রবঞ্চিত হইয়াছিল । তৃতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : স্তম্ভন ( মুক্তধারা : পুনঃপাঠ ) এক যে ছিল রাজা । তার ছিল দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। সুয়োরানি সুখে থাকে রাজপ্রাসাদে আর দুয়োরানি থাকে বনের প্রান্তে, ছোট নদীর ধারে, কুঁড়ে ঘরে। দুয়োরানির ছেলে সেই নদীতে নৌকাবায় । পারানির কড়িতে তাদের দিন কাটে । কিন্তু একদিন তার সাধের নদী শুকিয়ে গেল । কারণ, দেশের রাজ-বিভূতি বাঁধ বেঁধেছেন । কেবল জলধারা নয়, ঈশ্বরের করুণার সকল ধারার সামনেই বাঁধ বেঁধেছেন তাঁরা । লোকে বিস্বাসই করতে পারল না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন, কোনও মানুষ তা বন্ধ করতে পারে । কিন্তু বন্ধ হল, করুণাধারার সব শাখাই ক্রমশ শুকোতে লাগল, আর প্রজাদের জীবন উঠল অতীষ্ঠ হয়ে । এদিকে একদিন দুয়োরানির ছেলে জানতে পারল সে রাজপুত্তুর । সে গেল রাজার কাছে, বললে, রাজপুত্রের অধিকার চাইনে । কেবল ঈশ্বরের করুণাধারার সামনে দেয়া তোমাদের ওই বাঁধগুলো খুলে দাও, এই প্রার্থনা । শুনে সুয়ো-রাজপুত্রেরা অবাক হলো । তারা সেপাই ডাকল, সান্ত্রী ডাকল । ঘাড়ধাক্কা দিয়ে রাজবাড়ি থেকে বার করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায় । ধুলো ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল । তারপর গেল শিবতরাইয়ের প্রজাদের কাছে । সেখানে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল । সে দেখল, ধনঞ্জয় বৈরাগীর ছদ্মবেশে সুয়োরানির এক ছেলে । আর, তার পেছনে শিবতরাইয়ের মানুষগুলো চলেছে মুক্তধারার বাঁধ ভাঙতে । তখন সেই দুয়ো-রাজকুমার সবাইকে ডেকে বলতে লাগল, ওই বৈরাগী আসল বৈরাগী নয়, ও তো ছদ্মবেশী সুয়ো-রাজকুমার, ও তোমাদের ঠকাবে । এক নদীর মুখেই ওরা বাঁধ বাঁধেনি । সর্বহারার মুখেই ওরা বাঁধ বেঁধেছে । সেগুলি ভাঙতে হলে, তাদের রহস্য জানতে হবে । সেসব আমি জেনে এসেছি । আমার কথা শোনো । কিন্তু দু'চারজন আধপাগলা ছাড়া কেউ তার কথায় কান দিল না । কথাটা গেল মিথ্যে-বৈরাগীর কানে, সে বললে -- ওটা বদ্ধ পাগল । ছন্নছাড়া । খেতে পায়না, হাংরি, তাই মিথ্যে কথা বলে । ওর মুখে চুনকালি মাখিয়ে গর্দভের পিঠে চড়িয়ে পিছনে ভিড়ের হল্লা লাগিয়ে দাও । মজা পেয়ে প্রজারা তাই করলে । এরপর গাধার পিঠে সওয়ার দুয়ো-রাজকুমারের আর কিছুই করার রইলো না । তাই সে কেবল চিৎকার করে । চিৎকারের জন্য চিৎকার । চিৎকারের ভিতরে চিৎকার । চিৎকার করতে করতে একদিন সে বিস্মৃতিলোকে চলে গেলো । তারপর অনেকদিন কেটে গেলে, শিবতরাইয়ের প্রজারা বুঝল তারা ঠকেছে । অতএব, তারা খোঁজ করতে লাগল সেই দুয়ো-রাজকুমারের, যে জানত সব বাঁধের রহস্য । কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না । তখন যে আধপাগলারা সেসময় তার কথা শুনেছিল মন দিয়ে, তাদেরকে ধরা হলো । বাঁধ ভাঙার রহস্য ওই আধপাগলারা দুয়ো-রাজকুমারের কাছ থেকে জেনে-বুঝে নিয়েছিল কি না, সেটা জানার জন্য । কিন্তু কেউই সেসব কথা ঠিকঠাক বলতে পারল না । রাজপ্রাসাদ থেকেও দুয়ো-রাজকুমারের খোঁজখবর করা হলো । কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না, পাওয়া গেল তার গাধাটাকে । তাকেই নিয়ে এসে ফুলমালা দিয়ে চন্দনের টিপ পরিয়ে রাজসভায় আনা হলো । রাজা সেই গাধাটাকেই শিরোপা দিলেন আর রাজপুরোহিত দিলেন আশীর্বাদ । সবাই বলে উঠল -- সাধু, সাধু ! চতুর্থ পর্ব : ষড়যন্ত্র : বিদ্বেষণ ( অভিচারতন্ত্র : পুনঃপাঠ ) মানুষের উপর মানুষের চড়ে বসাকে বলা হয় 'অভিচরণ' বা 'অভিচার' । আদিকালে সর্বপ্রথম যে-পদ্ধতির সাহায্যে এই কর্মটি করা হতো, তাকে বলা হতো 'শ্যেনযাগাদি' অর্থাৎ অন্য গোষ্ঠীর লোকেদের উপর দলবদ্ধ লুঠতরাজ বা ছিনতাই । তবে সে সবই ছিল সাময়িক । তার সাহায্যে বহুকালের জন্য বা চিরকালের জন্য কারও উপর চেপে বসা যেত না । সেই উদ্দেশ্যে একদিন ভারতবর্ষ আবিষ্কার করে এক অভিনব প্রক্রিয়া ---'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ'। এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে সমাজের স্বাভাবিক জ্ঞানপ্রবাহের উপর বাঁধ বাঁধা হয় ও বৈদিকযুগের সূত্রপাত করা হয় । এটিই পৃথিবীর প্রথম বাঁধ ও আদি বাঁধ । ঈশ্বরের করুণার অন্যান্য ধারাগুলিকে বাঁধ বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করার কথা তখনও ভাবা হয়নি । তা সে যাই হোক, সেই 'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ' উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি বলে এখনও আমরা 'বড়ো শত্রুকে উঁচু পিঁড়ি' দিই ; যার সর্বনাশ করা দরকার তার মূর্তি গড়ে পূজা করি ও তার নীতি অমান্য করি এবং এভাবেই আমরা আজও শিব রাম গান্ধী মার্কস রবীন্দ্রনাথের পূজা করি ও তাঁদের নীতি অমান্য করে থাকি। দুষমনকে 'পূজা করে মেরে ফেলার' এই বৈদিক নীতির বিপরীতে একসময় তান্ত্রিক নীতিরও জন্ম হয় এই ভারতবর্ষেই । 'নিয়ন্ত্রণসাধন'কে তখন বলা হতিও যন্ত্র, যা দিয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হতো, ঘাড়ের উপর চেপে বসা ক্ষমতাকে উৎখাত করার চেষ্টা চালানো হতো । তান্ত্রিকেরা শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় হিসেবে ছয় রকম 'নিয়ন্ত্রণসাধন' বা যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন--- মারণ, মোহন, স্তম্ভন ( শত্রুকে স্ট্যাগন্যান্ট করে দেয়া ), বিদ্বেষণ ( ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল ), উচ্চাটন ( স্বদেশভ্রংশন বা শত্রুকে তার কনটেক্সট থেকে উৎখাত করে দেয়া ) ও বশীকরণ । এই যন্ত্রগুলি প্রধানত বাঁধ ভাঙার কাজেই ব্যবহৃত হতো । বৈদিকদের পূজা করে মেরে ফেলার বিপরীতে তান্ত্রিকেরা এই ছয় রকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন বলে, বৈদিকপন্হীদের কালচারে এই 'ষড়যন্ত্র' ঘৃণ্য ও নিন্দাজনক হয়ে যায় এবং আধুনিক যুগে পৌঁছে পরিণত হয় 'কন্সপিরেসি'তে, যদিও তান্ত্রিক কালচারে 'ষড়যন্ত্র' যথারীতি প্রশংসাযোগ্য ও গৌরবজনক হয়েই থেকে যায় । অর্থাৎ কিনা, ভারতের তান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসারে ষড়যন্ত্রের প্রয়োগ অত্যন্ত ভালো কাজ এবং তা আদৌ কন্সপিরেসি নয়। তবে নিয়ন্ত্রণসাধনের এই চর্চা এখানেই থেমে থাকেনি । যুগ বহুদূর এগিয়ে চলে এসেছে, যন্ত্রকে করে তোলা হয়েছে 'মোস্ট সফিসটিকেটেড', ক্ষমতা হয়েছে নিরঙ্কুশ । শাসক ও বিদ্রোহীর হাতে ওইসকল যন্ত্রের বিপুল বিকাশ ঘটেছে । বিকাশ ঘটেছে শাসক এবং বিদ্রোহীরও । এখন শাসকের বহু রূপ, বহু সুয়ো ; বিদ্রোহীরও বহু রূপ, বহু দুয়ো । বহু ক্ষেত্রে শাসকই বিদ্রোহীর পোশাক পরে নেয়, কোনও কোনও দুয়ো ভুয়ো-বিদ্রোহী হয়ে সুয়োর দলে ভিড়ে যায় । তাছাড়া, এখন বাঁধের সংখ্যাও প্রচুর, যত ধারা ততো বাঁধ, বাঁধের নিচে বাঁধ, উপরে বাঁধ, সাপোর্টিং বাঁধ, কতো কী ! এমনকি লোকদেখানো মিথ্যে বাঁধও রয়েছে, বিদ্রোহী জনগণের আক্রোশ যার উপর ফেটে পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, ডায়লুট ও ডাইভার্টেড হয়ে যেতে পারবে, অথচ প্রকৃত বাঁধটা থেকে যাবে অক্ষত । আরও আছে, এখনকার প্রতিটি বাঁধের পাথরপ্রতিমার রূপগুণও ভিন্ন ভিন্ন, পৃথক পৃথক স্পেশালিস্ট বা দক্ষ বিভূতিদের দিয়ে বানানো । এসব বাঁধ ভাঙতে গেলে বিদ্রোহীদেরও ভিন্ন ভিন্ন শাখার স্পেশালিস্ট হতে হয়, দক্ষ হতে হয়, অনেক তপজপ করতে হয় । কেননা এমন ব্যবস্হা করে রাখা হয়েছে যাতে কৃষিবিজ্ঞানী সাংস্কৃতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন, জীববিজ্ঞানী রাজনৈতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন...ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ প্রতিটি বাঁধই সেই সেই বিষয়ের প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে গড়া । তাই, একালে একজন দুয়ো-রাজকুমারে কিছুই হবার নয় । যতোগুলি বাঁধ, বলতে গেলে ততোজন দক্ষ দুয়ো-রাজকুমার লাগে সেগুলি ভাঙবার আয়োজন করতে। তাই একালে দুয়ো-রাজকুমারের সংখ্যাও খুব কম নয় । এর ভিতর আবার জালি দুয়ো-রাজকুমার তো রয়েছেই । তার ওপর, কখনও বা কোনও কোনও দক্ষ দুয়ো-রাজকুমারকে রাতারাতি ফুটপাত বদল করতেও দেখা যায় । অবশ্য তার জন্য তাদের ফ্ল্যাট নিতে হয় 'কনখল'-এ । 'কনখল' সেই বিখ্যাত কমপ্লেক্স, যেখানে দাঁড়িয়ে আদি দক্ষ বলেছিল, 'কৌ ন খল অর্থাৎ কে খল নহে ? সব্বাই খল । অতএব আমিও কেন খল হবো না ?' এই বলে, সেও খল হয়ে যায় । সেই জন্য, সেই ভিত্তিভূমির নাম হয়ে যায় 'কনখল' । এলাকার ফুটপাত-বদল-পারদর্শী দক্ষেরা সেই কমপ্লেক্সে আশ্রয় নিয়ে ঘোষণা করে, 'কে খল নহে ? সব্বাই খল । কেউ কথা রাখেনি । অতএব আমিও কথা রাখব না ।' ---এই বলে তারা সুযোগ পাওয়া মাত্রই সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে যায় । তাই প্রকৃত বিদ্রোহী দুয়ো-রাজকুমারকে চিনতে পারা এযুগের এক কঠিন সমস্যা । আবার বাঁ৭ ভাঙার ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা । পালটা প্রতীকের পাথরপ্রতিমা না বসিয়ে বাঁধের বর্তমান পাথরকে সরানোর কোনও উপায় রাখা হয়নি । আর সেটা করতে গেলেই নতুন প্রতীকের বাঁধ নির্মিত হয়েযায় । ফলে, যে ভাঙতে আসে, দেখা যায়, পাকে চক্রে সে আগের বাঁধ ভেঙে তার স্হানে নতুন আর একটা বাঁধ বেঁধে ফেলেছে নিজের অগোচরেই । এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে, সাম্প্রতিক কালের অধুনান্তিক ( পোস্টমডার্ন ) তান্ত্রিক বিদ্রোহীরা একটি অভিনব পন্হা উদ্ভাবন করেছেন । বাঁধের উৎখাতযোগ্য পাথরপ্রতিমাকে অত্যন্ত স্বল্পায়ু প্রতীক দিয়ে সরিয়ে ফেলা । এ যেন মানববোমা । উদ্দিষ্ট প্রতীকটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নিজেও মরে যাবে । এমন জ্ঞানের ব্যবহার, যা পুরোনো জ্ঞানকে মেরে ফেলবে অথচ নতুন 'জ্ঞানের বোঝা' হয়ে দেখা দেবে না । পঞ্চম পর্ব : যড়যন্ত্র : উচ্চাটন ( অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং : অ্যান আইটি এক্সপ্লোর ) সবাই জানেন কমপিউটারের দুনিয়ায় উইনডোর নানা ভারশন প্রকাশিত হয়েছে । উইনডো ৯৫, উইনডো ০৭, উইনডো ৯৮ ভারসন ১, উইনডো ৯৮ ভারসন ২, উইনডো মিলেনিয়াম ভারসন ইত্যাদি ইত্যাদি । তবে যেটা অনেকেই নজর করেননি, তা হল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতারও অনেকগুলি ভারসন আমাদের মার্কেটে চালু আছে । প্রতিটি ভারসনের আবার অনেকগুলি করে এডিশন রয়েছে । যার যেটা পছন্দ তিনি সেটা কেনেন, ব্যবহার করেন । ক্রেতার অবগতির জন্য এখানে কয়েকটি ভারসনের একটি করে এডিশন-এর অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হল । ষষ্ঠ পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ১ ( লঞ্চড বাই শিবশম্ভু পাষণ্ড/সনাতন এডিশন ) ইট ইজ আ প্রিমিটিভ এডিশন অ্যান্ড প্রেজেন্টলি নট অ্যাভেলেবল ইন দ্য মার্কেট। সপ্তম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ২ ( লঞ্চড বাই বাল্মীকি/চণ্ডাশোক এডিশন ) ১) শাসক...ব্রাহ্মণ ২) শাসিত...ক্ষত্রিয় বৈশ্য শুদ্র ও অন্যান্য ম্লেচ্ছ সম্প্রদায় ৩) বিরোধের কারণ...সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ ৪) বাঁধের কারিগর...কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস ও তাঁর শিষ্যগণ ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...সামাজিক প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে দিয়ে ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে ৭) সুয়ো-রাজকুমার...রাবণ অ্যাসোশিয়েটস ৮) দুয়ো-রাজকুমার...রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...বিভীষণ ১০) বিদ্রোহের নেতা...দাশরথীগণ ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...রাম নাম সত্য হ্যায় ১৩ ) আধপাগলা...জটায়ু ১৪ ) গাধা...হনুমান অষ্টম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৩ ( লঞ্চড বাই কে.ডি.বেদব্যাস/রিঅ্যাকটিভ এডিশন ) ১) শাসক...দেবগণ ২) শাসিত...অসুরগণ ৩) বিরোধের কারণ...সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ ৪) বাঁধের কারিগর...বিশ্বকর্মা ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...সামাজিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে ৭) সুয়ো-রাজকুমার...গন্ধর্বগণ ৮) দুয়ো-রাজকুমার...শঙ্করাচার্য ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...কুমারিল ভট্ট ১০ ) বিদ্রোহের নেতা...জরৎকারুপুত্র আস্তীক ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ ১২ ) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...চাতুর্ব্বর্ণ্যব্যবস্হানং যস্মিন দেশে প্রবর্ততে । আর্যদেশঃ স বিজ্ঞেয় ১৩ ) আধপাগলা...লোমশ মুনি ১৪ ) গাধা...যাদবগণ নবম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৪ ( লঞ্চড বাই কার্ল মার্কস/প্যারি কমিউন এডিশন ) ১) শাসক...সহস্রমুখ বুর্জোয়া ২) শাসিত...সর্বহারা শ্রমিক কৃষক পেটিবুর্জোয়া শ্রেণি ৩) বিরোধের কারণ...কেবলমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধগুলি ৪) বাঁধের কারিগর...যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...বন্দুকের নল । পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে ৭) সুয়ো-রাজকুমার...সাম্রাজ্যবাদী নবীন বুর্জোয়া/প্রতিবিপ্লবী ৮) দুয়ো-রাজকুমার...ডিক্লাসড ( অবক্ষিপ্ত ) বুদ্ধিজীবী ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...পাতিবুর্জোয়া ১০ ) বিদ্রোহের নেতা...কমিউনিস্ট বিপ্লবী ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...অতিবিপ্লবী ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...ইনকিলাব জিন্দাবাদ/জাগো জাগো জাগো সর্বহারা ১৩) আধপাগলা...কমিউনিস্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মী ১৪ ) গাধা...একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট কর্মী ( শ্রমিক কৃষক ) দশম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৫ ( লঞ্চড বাই রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোর/সেকেন্ড ওয়র্ল্ড ওয়ার এডিশন । ) ১) শাসক...রাজা রণজিৎ ২) শাসিত...উত্তরকূট ও শিবতরাইয়ের প্রজাবৃন্দ ৩) বিরোধের কারণ...মুক্তধারার উপর নির্মিত বাঁধ ৪) বাঁধের কারিগর...যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...ঃঃঃঃঃঃঃঃ ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...ছিদ্রস্হানে আঘাত ৭) সুয়ো-রাজকুমার...ঃঃঃঃঃঃঃঃ ৮) দুয়ো-রাজকুমার...'স্বজনবিদ্রোহী' খুড়ো বিশ্বজিৎ ও যুবরাজ অভিজিৎ ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...ঃঃঃঃঃঃঃঃ ১০) বিদ্রোহের নেতা...ধনঞ্জয় বৈরাগী ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...বাঁধ ভেঙে দাও বাঁধ ভেঙে দাও দাআআআআও ১৩) আধপাগলা...গণেশ ১৪ ) গাধা...সঞ্জয় একাদশতম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৬ ( লঞ্চড বাই পবং এক্সক্লুসিভস / লেটেস্ট এডিশন ) ১) শাসক...প্রগতিশীল ( মার্কসবাদী, কমিউনিস্ট, বিপ্লবী) ২) শাসিত...জনগণ ৩) বিরোধের কারণ...সর্বহারার মুখে নির্মিত বাঁধসমূহ ৪) বাঁধের কারিগর...প্রত্যেক ধারার নিজ-নিজ যন্ত্ররাজ বিভূতি ও তত্তদ সন্ন্যাসীর দল ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...তত্তদ ধারার নিজস্ব প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...ছিদ্রস্হানে আঘাত । সেই ধারার পালটা প্রতীক দিয়ে প্রতীকবদল । ৭ ) সুয়ো-রাজকুমার...বাবুবংশের উত্তরাধিকারীগণ, বাবুভায়াগণ ৮) দুয়ো-রাজকুমার...হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী, নকশাল, বিচ্ছিন্নতাবাদী, পোস্টমডার্ন ইত্যাদি ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী ১০) বিদ্রোহের নেতা...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী, অতিবিপ্লবী, উগ্রপন্হী ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...কে চেল্লায় শালা, কে চেল্লায় এই ভোরবেলা ১৩ ) আধপাগলা...শম্ভু রক্ষিত অ্যান্ড অ্যাসিসিয়েটস ১৪ ) গাধা...সেকেন্ড লাইন হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী ও নকশাল এবং ফোর্থ লাইন মার্কসবাদী দ্বাদশতম পর্ব : 'প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : মিলেনিয়াম ভারসন' ( দিস প্রডাক্ট ইজ নাউ অ্যাবানডন্ড । অ্যাকর্ডিং টু কমপিউটার ইনজিনিয়ার্স, দ্য এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং ইজ বিকামিং অবসলিট ইন দ্য প্রেজেন্ট কনটেক্সট । ) বলে রাখা ভালো, এই অ্যান্টি-এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং স্বভাবতই ভালনারেবল । কোনো অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবস্হাই একে বাঁচানোর ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি । অর্থাৎ এই প্রোগ্রাম আদৌ ভাইরাসপ্রুফ নয় । যখন তখন ক্র্যাশ করে যায় । এই প্রোগ্রামিং যে আজকাল আর তেমন বিকোচ্ছে না, সেটাই তার অন্যতম কারণ । আরও কারণ আছে । আজকের মানবসমাজ একাকারের যুগে পা রেখে ফেলেছে । ফলে, শাসক-শাসিতের অ্যান্টাগনিজম ক্রমশ কমপ্লিমেন্টারির দিকে টাল খেয়ে যাচ্ছে । গোটা ব্যবস্হাটা, তার সমগ্র প্রেক্ষাপট ,সবই 'এফেক্টিভ ফ্যাক্টর' রূপে সক্রিয় হয়ে উঠেছে । মানবসমাজ, জীবজগৎ ও জড়জগৎকে নিয়ে যে-সমগ্রব্যবস্হা, সেটি ঠিক থাকছে কি না, মানব সভ্যতার অস্তিত্বের পক্ষে অনুকূল থাকছে কি না, সেসব কথাও আজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে । অথচ প্রচলিত ধনতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্হাগুলি এই পরিস্হিতির তুলনায় সেকেলে হয়ে গেছে বা যাচ্ছে । বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান-এর মতে, ...neither greedy capitalists nor dogmatic communists have sufficient respect for the larger system of which we are merely a part. স্বভাবতই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংগুলিও আজকের প্রেক্ষিতে সেকেলে হয়ে গেছে । সন্মুখস্হ পরিস্হিতির বিচার বিবেচনা করে আজকের দিনের পোস্টমডার্ন চিন্তাবিদরা এমন অদ্বৈত প্রোগ্রামিং-এর কথা ভাবতে শুরু করেছেন, যা বদ্ধধারাগুলিকে কেবল মুক্তধারাতেই পরিণত করবে না ; সমগ্র ব্যবস্হাটিকেও আরও সুসংহত করবে । আর, সেটা করতে গিয়ে তাঁরা বিগত যুগের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংসমূহের সমস্ত অর্জনগুলিরও সারসংগ্রহ করে নিচ্ছেন । সংগৃহীত ও সারে কী রয়েছে ? শাসক-শাসিতের ( পুরুষ-প্রকৃতির, কনটেন্ট-ফর্মের ) দ্বৈতাদ্বৈত অস্তিত্বের পরিবর্তনের মূল যে-কারিকা, তার সরবরাহ ঘটে শাসিতের তরফ থেকে নয় ; শাসকের তরফ থেকেই । শাসিত তো শাসকের বিরোধী হয়ে থাকেই । কিন্তু তাতে কিছু হয় না । যে গোপন কথাগুলির ওপর ক্ষমতা টিকে থাকে, তার সব কথা শাসিতেরা কখনও জানতে পারে না বলেই শাসন সম্ভব হয় । জানতে পারে তারাই যারা ওই প্রাসাদের অংশ, উত্তরাধিকারী । সেই কারণে দলছুট প্রাসাদত্যাগী দুয়ো-রাজকুমারেরা বিদ্রোহীর দলে যোগ না দিলে কোনও রাজপ্রাসাদেরই পতন সম্ভব নয় ; এটাই ছিল এতদিনের অঙ্ক। তাই শাসনের সমস্ত খেলাই এতদিন ছিল ওই বিদ্রোহী রাজকুমারের আসনটিকে ঘিরে । কারণ তার ভূমিকার ওপরই নির্ভর করত ব্যবস্হাটি বদলাবে কি না । সেই কারণে দুয়ো-রাজকুমারের তপস্যা ভেস্তে দেওয়ার খেলা, তার ভূমিকাকে নানাভাবে বিগড়ে দেয়ার খেলাই ক্ষমতার অন্যতম খেলা ছিল । সেই কারণে, বিদ্রোহী নেতা ও দুয়ো-রাজকুমারকে আগেভাগে গুমখুন করে তার আসনটি শাসকই ছদ্মবেশীদের বসিয়ে দখল করে রেখে দিত । কিন্তু সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সির ডাক দিয়ে বিশ্বের সমস্ত দুয়ো-রাজকুমারেরা ক্ষমতার সেই সব খেলাই ভেস্তে দিয়েছে, দিচ্ছে । এখন কেবল ডিসক্লোজ করে যাও । কেবল মেলে ধরা, যাতে সবাই সবকিছি দেখতে পায় । এতে শাসক-শাসিতের পরিচালক-পরিচালিতে উন্নীত না হয়ে কোনও উপায়ই থাকে না । শাসন অবসানের এযুগের এই পথ । ত্রয়োদশতম পর্ব : 'ষড়যন্ত্র : বশীকরণ' ( শেষ দুয়ো-রাজকুমারের কলাপ : এক ডক্টরেরটকামী ছাত্রের থিসিস থেকে ) বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুয়ো-রাজকুমার ঠিক কী কী করেছিলেন, তা জানার জন্য আমি তাঁর বিষয়ে অনুসন্ধান চালাই । এক সময় জানতে পারি, তিনি যাদের সঙ্গে থাকতেন, সেই আধপাগলা মানুষগুলি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন । তাঁর অনেক নথিপত্রও নাকি তাঁদের কাছে রয়েছে । একথা জানতে পারার পর, আমি সেই আধপাগলা মানুষগুলির খোঁজখবর করি এবং অনেক তেল পুড়িয়ে অবশেষে তাদের দু;জনকে খুঁজে বার করতে সক্ষম হই । তাঁদের সঙ্গে আমার যে কথোপকথন হয়েছিল, তা নিম্নে বর্ণিত হল : আমি : শুনেছি, আপনাদের সঙ্গে দুয়ো-রাজকুমারের ক্লোজ রিলেশান ছিল? আধপাগলা ১ : ক্লোজ রিলেশান কোথায় দেখলে ? ও তো ডিসক্লোজ রিলেশান । যতো পারো ডিসক্লোজ করে দাও । কোনও আবরণ যেন না থাকে । আবরণেই তো বাধা । আটকা আটকি । ঢেকে চেপে রাখা । অন্ধকার করে রাখা । অন্ধ করে রাখা । অন্ধকারে কী হয় জানো ? জানো না ? শ্বাপদেরা বাসা বাঁধে । আমি : বলছিলুম কী, দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে ? আধপাগলা ২ : সে অনেক কথা । পেথম সে এসেচিল ভোলানাথ সেজে । আমার ঠাকুদ্দার বাবার বাবাদেরও আগে, অনেকেই তাকে দেখেছিল । আমি : তার কথা আমি জানতে চাইছি না । যার সঙ্গে মুক্তির দশক এবং তারপরেও আপনাদের দেখা হয়েছিল, তার কথা বলুন । তার সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে, ঘনিষ্ঠতা হল কেমন করে ? আধপাগলা ২ : ঘনিষ্ঠতা আর হল কই ? ঘন হবার আগেই তো ইষ্টদেবতা বাধ সাধলেন । গাধা এলো, গাধার টুপি এলো, চুনকালি মাখানো হল, তারপর সব হাহা হিহি হয়ে গেল । তাতে ইষ্ট ছিল না অনিষ্ট ছিল সে তো আর ঠাহর করা গেল না । আধপাগলা ১ : যতদূর জানি, ও এসেছিল অঙ্গদেশের পাটলিপুত্র থেকে । শুনেছি বাবুকালচারের যে দুয়োরানি বাংলার বাইরে প্রত্যন্ত শহরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছিল, ও তাদেরই এক সন্তান । সাবর্ণ চৌধুরী নামে কলকাতার যে-বিখ্যাত বাবু রাজবংশের প্রতিষ্ঠা, ও সেই বাবুকালচারের একজন অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার । আমি : শুনেছি, ওই দুয়ো-রাজকুমার যাচ্ছেতাই গালাগালি করত, অশ্লীল ভাষায় কথা বলত, অশালীন গান গাইত, গাঁজা ভাঙ খেতো, নোংরা জীবন যাপন করত -- এসব ক সত্যি ? আধপাগলা ১ : আমরা তো সবাই বস্তিতে থাকি, থাকি গণ্ডগাঁয়ে, আর ও তো আমদের সাথেই থাকত । আমাদের জীবন যাপন যেরকম, সেরকমই থাকত । সেটা অশ্লীল কি অশ্লীল নয়, সে আপনারাই জানেন । আর গালাগালির কথা যদি বলেন, সে তো আপনি থাকলেও করতেন । নিজের ভাই হয়ে সুয়ো-রাজকুমাররা ওর সাথে কোন মন্দ ব্যবহারটা করতে বাকি রেখেছিল শুনি ? ও যে ডেলি দু'চারটা খুনখারাবি করেনি, কেবল শালা-বাঞ্চোৎ করেছে, সেটাই তো অনেক ভদ্র ব্যবহার । আমি : শুনেছি, সেপাইরা ওকে যখন জেলখানায় নিয়ে যায়, তখন এক-দু'জন সুয়ো-রাজকুমারই ওর হয়ে সত্যিমিথ্যে সাক্ষ্য দিয়েছিল, বলেছিল. 'কই, ও তো রাজার মাকে ডাইনি বলেনি, যে ওটাকে ছেড়ে দে ।' কথাটা কি ঠিক ? আধপাগলা ২ : আরে সেটাই তো কাল হল । যে এক-দু'জন দুয়ো রাজকুমার 'কনখল' কমপ্লেক্সে ফ্ল্যাট কিনে সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে গিয়েছিল, তারাই ওরকম সাক্ষ্য দয়েছিল । তাই, ওর মনের এক কোণায় একটা বিশ্বাস থেকে গেল যে, সকল সুয়ো-রাজকুমার সমান শয়তান নয়, এক-দু'জন ভালো হয় । কিন্তু 'কনখল'-এর বাসিন্দা মাত্রেই যে 'সচ্ছল' ( সচ-ছল বা সৎ সেজে ছলনাকারী ) হয়, সেটা সে খেয়াল করেনি । অনেকে বলে, ওই বিশ্বাসের জন্যেই ও নাকি হেরে গেল । আমি : সাংস্কৃতিক-বাঁধ ভাঙার কলাকৌশল সে নাকি খুব ভালোভাবেই জানত, আর সে-রহস্য আপনাদেরকে সে নাকি বলে গিয়েছে । কথাটা কি সত্যি ? আধপাগলা ২ : আমাকে ওসব বলেনি বাবা । আমি সেসব কতা শুনিনি । বিশ্বাস করো ভাই, ওসব কতা আমি এক্কেরে শুনিনিকো । রাজার দেয়া বাঁধ বলে কতা । ভাঙব বললেই হল । সেপাই আচে না, সান্ত্রী আচে না । আধপাগলা ১ : দেখো বাছা । প্রত্যেক বাঁধের একটা না একটা ছিদ্র থাকে । সেটা সে জেনেছিল । সেখানে যন্ত্রাসুরকে আঘাত করলেই বাঁধটা ভেঙে পড়ে । কিন্তু কোন বাঁধের কোথায় ত্রুটি সেসব কথা আমার জানা নেই । যে দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আমার দেখা হয়েছিল, সে কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতির বাঁধের রহস্যগুলো বলত । তার সব কথা ভালো বোঝাও যেত না । তার দেওয়া একটা কাগজ আছে আমার কাছে, সেটায় সেসব সে লিখেও দিয়েছিল । তার কোনো কথাই আমার মাথায় ঢোকেনি । দেখো, তুমি বুঝতে পারো কি না । শেষ পর্ব : ম্লেচ্ছিতবিকল্প সাহিত্য সংস্কৃতির সাবলীল ধারার সামনে ওরা বাঁধ বেঁধেছে অজস্র প্রতীকের পাথর দিয়ে । সেগুলিকে সাময়িক প্রত্যয়ের পাথরপ্রতিমা দিয়ে রিপ্লেস করে ফেলা দরকার । বাঁধটা যেহেতু বিশাল, অজস্র পাথর গেঁথে গেঁথে তৈরি, তাই এই ভেঙে ফেলার কাজটাও বিশাল । এটা সফল করবার জন্য আরও অনেকের হাত লাগানো দরকার । আমি আমার সধ্যমতো এই রিপ্লেসমেন্টের কাজগুলো করার চেষ্টা করে থাকি এইভাবে :- ১) শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা ( একালের ) কবিতা রচনার প্রধান শর্ত । ২) আমার রচনা বাংলা ভাষার একটি বিশেষ কাঠামোকে সর্বজনীন করে তোলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ । প্রতিবাদ সংস্কৃতি পিটিয়ে কলকেতিয়া করে তোলার বিরুদ্ধে । ৩) পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকরা ঐতিহ্যের যে মানদণ্ড গড়ে ফেলেছেন তাকে অস্বীকার করাটা যেন তাঁদেরই অপমান করার উদ্দেশ্যে, এমন একটা ধুয়ো আজ সর্বজনস্বীকৃত । তাই শিল্প বানাবার বাঙালি চেতনা থেকে কবিতাকে মুক্ত করার চেষ্টাকে ভালো চোখে দেখা হয় না । ওদিকে কবিতা থেকে সিমবলিস্ট এবং সুররিয়ালিস্ট চাপ বাদ দেবার আইডিয়া আমার মাথায় ঘুরঘুর করছিল । ৪) আমি মনে করি, কবিতায় ভাষার খেলা, ইমেজ গেম, রিদম গেম, মেটাফিজিক্স গেম অবশ্য বর্জনীয়, কেননা ওগুলির সাহায্যে মানুষের অসহায়তা নিয়ে জোচ্চুরি করা হয় । ৫) আমি তো সিমবলিস্ট কবি নই যে একটা চিত্রকল্পকে কোনো কিছুর পপতীক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করব । ( বিষয়, আঙ্গিক, উপমা, ছন্দ, প্রতীক, রূপক, অলঙ্কার -- সর্বত্রই অ্যাটাক ) । ৬) একদিকে চিৎকার, বিপরীতে ফিসফিসানি -- এই দিয়ে আমি কবিতার আধুনিক স্বরকে ভেঙে দিই । ৭) প্রেম ও অপ্রেম, শরীর ও মন ইত্যাদি যুগ্মবৈপরীত্য যেভাবে বাংলা কবিতায় তোয়াজ করা হয়েছে এতাবৎ এবং তার অন্তর্গত সন্ত্রাসটিকে কবিরা এতকাল যে-চেতনা প্রয়োগে বানচাল করেছেন, আমি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রেমকে সেনসরহীন স্বরূপে উপস্হাপন করি । প্রেম বা কবিতা এখন বিনোদন নয় । ৮ ) আমি ষাটের দশকের শুরু থেকেই অলঙ্কার বর্জনের কথা বলে আসছি । অধুনান্তিক চেতনাটি নিরাভরণ । আমার কবিতায় কবিত্বের সন্ত্রাসকে উৎসাহিত প্ররোচিত করার প্রয়াস যাথার্থ দিতে চায় অলঙ্কারহীনতাকে । আমার কবিতা দার্শনিক স্তরে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-আর্থিক-নৈতিক স্হিতাবস্হার বিরুদ্ধে একটি স্ব-স্বীকৃত দ্রোহতর্ক । ৯ ) আমি সত্যিই শিল্পের বিরুদ্ধে ও সংস্কৃতির স্বপক্ষে বলতে চেয়েছিলুম । পরাবাস্তববাদের আদলে শিল্পবিরোধিতার পালটা শিল্পের কথা বলিনি । ১০) সমস্ত কবিতার ক্ষেত্রে এক নিয়ম হতে পারে না । কনটেক্সট অনুসারে প্রত্যেকটির বয়নই তার মতো ।এমন কবিতাও অতএব হতে পারে, যেখানে 'আলো' প্রতিনিধিত্ব করে না কান্টিয় বা বৈদিক আলোর । কেননা এমন পরিস্হিতি তো দেখাই যাচ্ছে যেখানে 'আলো' নামক লোগোটি ঘৃণ্য হয়ে গেছে । রেললাইনে হাত-পা বাঁধা যে পড়ে আছে, তার কাছে আগন্তুক আলো কী ? কিংবা যে আগুনের পরশমণি থানার সেপাইদের জ্বলন্ত সিগারেট হয়ে কয়েদি চাষির লিঙ্গে ছ্যাঁকা হয়ে লাগে, তাকে কী বলা হবে ? এসব ক্ষেত্রে প্রথাবাহিত সাংস্কৃতিক অনুমানগুলিকে আমার কবিতা নস্যাৎ করতে চায় । কবির কন্ঠস্বর নামক বদল্যারীয় জীবনানন্দীয় তর্কটি এর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং উত্তরাধিকারমুক্ত করা হয় কবিত্বকে । ১১ ) গতানুগতিক কবিতার অনুশাসনকে ছন্দের তেল চটচটে আঙ্গিকেই ভেঙে ফেলতে চাই বলে আমি কখনও কখনও ভাষার অনচ্ছ বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে থাকি, যাতে এমন একটা আদল পাওয়া যায়, যা বর্তমান অসম্বদ্ধতাকে অসংলগ্নতাকে আকস্মিকতার সন্নিবেশকে স্বতঃস্ফূর্ত করতে পারে । সেক্ষেত্রে তাই আমার কবিতার পাঠকৃতিটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছেতরানো, ছেঁড়াখোঁড়া, তাপ্পিমারা, বহুরঙা ও আসক্তিবিরোধী । ১২ ) ইংরেজরা বিদেয় হবার পর এবং দিল্লির দরবারে অজস্র জোকারের আবির্ভাবের ঘনঘটায় যে-ইতিহাসোত্তর কালখণ্ডটির হামলায় শব্দজগৎ ও ভাষাপৃথিবী আক্রান্ত, কবিতার ওই প্রোটোকলবর্জিত প্রতীকবাদবিরোধী এলাকাটির দখল নেয়া জরুরি । ১৩ ) 'সত্য' যে সর্বজনীন নাও হতে পারে, সে কথাটা বলা দরকার বলেই বলি । ১৪ ) আমি মনে করেছিলুম যে, একজন কবি হিসেবে মন ও দেহের যুগ্মবৈপরীত্যের তত্বটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো দরকার আর সেটাই আমি করেছি, যেখানে পেরেছি । ১৫ ) বাস্তবের তৈরি অবাস্তবতায়, স্হিরতার গড়া অস্হিরতায়, মুহূর্ত দিয়ে গড়া কালপ্রবাহে, অগতি থেকে উৎসারিত গতিতে, অবজেক্ট/সাবজেক্ট বিভাজনটি ভেঙে পড়ে । ১৬ ) দাঙ্গাকে প্রান্তিকের ওপর চাপিয়ে দেয় কেন্দ্র অথচ তা মসনদের চাকুমালিকদের অন্দরমহলের গল্প । তারা যেহেতু ক্ষমতার কেন্দ্রে, সত্যের নিয়ন্তা তারাই । শাসক মাত্রেই আধিপত্যবাদী, তা সে যে-তত্বেরই মালিক হোক । ১৭ ) কবিতায় ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ির ভাঙা দরজার মেলবন্ধন তখনই সম্ভব যখন বাস্তবে আধিপত্যবাদী শর্তগুলো মেনে নেওয়া হচ্ছে । আমার রচনার গেম-প্ল্যান মূলত সেই আদি সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা থেকে উপজাত । হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অবিদ্যমান যুদ্ধ'-এর মতো যা অবর্তমান সেইটেই আমার রচনায় উপস্হিত হয়ে দশ পঙক্তির খেলা করে । খেলাটি সমাপ্ত হিসাবে ঘোষিত হবে তখনই, যখন ধাঁধাটির সমাধান হবে। নয়তো চলতে থাকবে মর্মার্থ-সঙ্কটাপন্ন শব্দাবলীর ঝোড়ো হাওয়া । মাত্রাতিরিক্ত মিলের মাত্রাতিরিক্ত নাটুকেপনা চলতে থাকবে । ১৮ ) ছবিগুলি ভাষার সাংস্কৃতিক নির্দেশের অন্তর্গত এবং তা দাঙ্গার সন্ত্রাসের বাইরেকার 'আমির' আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে । দাঙ্গার সন্ত্রাস স্ট্রাকচার্ড হয় । রাজপথে পড়ে থাকা সন্ত্রাস-পরবর্তী টুকিটাকি প্রকৃতপক্ষে অবাস্তব ঘটনাবলীর সত্য । ১৯ ) প্রত্যন্তকে, আধুনিকতা যে নান্দনিক সন্ত্রাসে নিয়ে গিয়ে আছড়েছে, স্বগতোক্তি ছাড়া সমস্ত শব্দ এবং ধ্বনি সেই চত্বরে অর্থহীন । সন্ত্রাসের উপাদান এক্ষেত্রে স্তব্ধতা, শিশির, ঝিঁঝি, নক্ষত্র, শীত, পাথর ইত্যাদি যা সনাতনি কবিতায় তথাকথিত সৌন্দর্য বানাবার কাজে লাগে । মাত্রা গুনে-গুনে যে ধরণের ডিজিটাল কবিতা বাজারচালু, সেই ডিজিটাল যান্ত্রিক কবিত্ব ভাঙা হয়েছে । ছন্দের ভেতরে ভেতরে কোনও মানে ঢোকানো নেই, যা কিছু মানে তা উপরিতলেই ভাসছে । ২০ ) ছয়ের দশকেও বাংলা কবিতায় থাকত চিত্র, চিত্রকল্প । আমি ব্যবহার করি উপচিত্র । রূপক নয়, লক্ষণগুলোই আমার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ । ২১ ) লিরিকের জমিতে রোমান্টিক চেতনার চাষ ভালো হয়, কেননা লেখকের কোনো নৈতিক দায় থাকে না । আমি কবিতায় ভঙ্গুরতা আগাগোড়া বজায় রাখি কাঠামোটিকে 'অ্যান্টিলিরিক' করে তোলার জন্য । একদিকে লিরিকের অচলাবস্হা থেকে এবং অপরদিকে ক্ষমতার তাত্বিক খবরদারি থেকে দূরে থাকা দরকার । লেখাকে তাই কাউন্টার-হিগেমনিক করে তোলা দরকার । ২২ ) প্রতিষ্ঠিত ফর্ম মাত্রেই প্রতিষ্ঠানের কুক্ষিগত, তাই তাকে ভাঙা জরুরি । জরুরি প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় মনোভাবের অবিনির্মাণ । পাঠকৃতি যেন স্বেচ্ছায় আত্মদীর্ণ, অসমতল, দ্বন্দ্ব-আবিল, অক্ষহীন, দলছুট, আপত্তিসূচক, উভমুখী, অসংহত, ঘরাণা-বহির্ভূত এবং চোরা-আক্রমণাত্মক হয়ে যায় । কারণ কবি মানেই তো 'চোরাযোদ্ধা' । ২৩ ) অত্যন্ত বেশি ব্যাকরণবোধ থেকে সাজানো-গোছানো সমাজের ধান্দার দরুন পয়দা হয় ওদের স্তালিন ও আমদের সঞ্জয় গান্ধির আদর্শ । শুভর কুহকে আত্মসমর্পণ করে নাৎসিরা অশুভর রাজপথ উদ্বোধন করেছিল । সবাইকে পিটিয়ে সমান করার ব্যাষ্টিবাদের শুভত্ব মূলত একটি মৌলবাদী জবরদস্তি যা গদ্য কবিতাকেও ঢোকাতে চায় ছন্দের তালিবানি জেলখানাণ এবং আধমাত্রা সিকিমাত্রার বেয়াদপিকে শায়েস্তা করতে চায় অ্যাকাডেমিক গেস্টাপোদের নাকচের অস্ত্র দ্বারা । আমার রচনা তা মানে না এবং না-মানার ঝুঁকি নেয় । ২৪ ) কবিতায় আমি আপইয়েলিং ঢোকাই । আপওয়েলিং কোনো নির্মাণ নয়, সৃজনশীলতা নয়, পুনরাবৃত্তি নয়, ভাষাবয়ন নয় । ফ্রেম থেকে যাতে উপচিত্রগুলো বেরিয়ে যায়, তাই তাদের মধ্যে কোনও বার্তা পুরে দিই না । তারা অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন । যা চোখের সামনে তুলে ধরা যায় না, তাকেই তুলে ধরা । বিজ্ঞানীরা যেমন বলেন, যা চোখে দেখা যায় তার অস্তিত্ব নির্ভর করে, যা চোখে দেখা যায় তার ওপর। যেটা উপস্হিত ।

Hungryalist Leader Malay Roychoudhury's Ancestry

Malay Roychoudhury (1939), and his elder brother Samir (1933), of the Hungry Generation (Hungryalism) literature Movement (1961-1965) fame, belong to the Uttarpara (District Hooghly, West Bengal, India) clan of the Sabarna Choudhuries. Having been born in to this clan has given them a sense of being rooted to the pre-colonial history of West Bengal, as well as an organic geographical sense of belonging to the soil, which most of the contemporary Bengali writers are deprived of. It was natural that these two brothers alongwith Shakti Chattopadhyay, resident of Joynagar-Majilpur, formed the core of the Movement. The Sabarna Choudhury clan of Uttarpara, like the clans at Halishahar, Birati and Kheput, is a branch of the Behala-Barisha (Kolkata) Sabarna Choudhuries. However, the clan did not suddenly emanate at Behala-Barisha. Like all rarhishreni Brahmins, this family also traces its origin in pre-Islamic Bengal, reportedly, from one of the five Kannaujia Brahmins, brought to his kingdom by Adisura-Sriharsa. Atul Krishna Ray in his book ‘Lakshmikanta: A Chapter in the Social History of Bengal’ (1928) has mapped the course of the descendants of one of such 10th Century Brahmins in this order: Vedagarbha (980AD), Shobhana, Shauri, Pitambara, Damodara, Kulapati (1182), Shishoo, Gadadhara, Halayudha (1282), Ayurama, Binayak, Jiyo, Paramshwar and Panchanan. The historical mist gets clearer from the time of a person in flesh and blood at Amati village of Katoa in Burdwan who shifted to Gohatya-Gopalpur (now Goghat) in Hooghly district. His name is Panchanan Gangopadhyay, who gave up hereditory brahminical vocation of religious activities, and joined Humayun’s Afghan cavalry. There is no record as to how he developed the skills of a sword fighter; nevertheless, his ingenuity, bravery and quality of leadership during the reign of Emperor Jalaluddin Muhammad Akbar entitled him to be conferred the military title of ‘Sakhtkhan’, and a promotion to commandant’s grade. He came to be known as Panchu Shakti Khan, a hero of oral ballads. Malay and Samir carry his genes. The wealth he had amassed as a commandant allowed him to shift his base to a place which later came to be known as Halishahar. He had built a haveli or a palace, and the town was called Haveli-Shahar at that time. He invited vaidyas of Bikrampur, kayasthas of Konnogar, yajurvedi Brahmins from Orissa and Tamilnadu for settling at Havelishahar. Since vocations were caste-based at that time, he had arranged for the settlement of artisans, craftsmen and traders from various areas. Panchu Shakti Khan’s son Shambhupati (1500) reverted to Gangopadhyay title, and engaged himself in developing the area as a business centre; the centre was connected by river route with Bhushana (now in Bangladesh). Shambhupati’s son Jia (1535-1620) broke the newly-built family tradition and reverted to religious inclinations. He moved from one temple to another with his wife Padmavati, probably because she was unable to bear a child. The couple visited the then Kalikshetra Kalipeeth, now known as Kalighat, the abode of goddess Kali. The legend, narrated in Kalikshetra Deepika by Suryakumar Chattopadhyay and Kalighat Itibritta by Upendranath Mukhopadhyay is that Padmavati in her trance saw a halo of light descend on the adjacent pond; she wanted to take a dip in that halo of light, which she did, and became pregnant. Hence the custom of childless couples taking a bath in the adjacent water-body. Presently it is waiting to be cleaned of filth. Next day Padmavati saw a hand right in the middle of the pond, signaling her to find out what is concealed at the bottom. On excavation, a piece of goddess Sati’s feet was discovered, reported to be locked in the temple-chest forever. Padmavati gave birth to a son, and as the story goes, died after three days. Jia renounced samsara, and became an ascetic and moved to Varanasi; thenceforth he was known as Mahatma Kamdev Brahmachari, having been ordained by his guru Atmaram Brahmachari who was well versed in Persian, Arabic, Hindvi and Sanskrit. The present image of goddess Kali at Kalighat was installed by Kamdev Brahmachari. Since then ‘Sabarna’ is a password for clan members to enter the sanctum sanctorum of this overcrowded temple. Malay and Samir do have the spiritual tolerance of Kamdev Brahmachari. Jia’s son was reared, educated and trained by Atmaram Brahmachari and his assistant Ananda Giri. The boy was named Lakshmikanta (1570-1649). The Sabarna Choudhury clan starts from him. Lakshmikanta was trained in the traits of Panchu Shakti Khan; the boy was a mathematical wonder. His mathematical prowess, command over several languages and wrestling skills drew the attention of feudal lord Srihari Guha of Gaud, who was a minister at Afgan Sultan Daud Khan’s court. Lakshmikanta got a job at Saptagram revenue department, and rose to become an advisor to Srihari Guha’s son Pratapaditya. In Bangadhip Parajay written by Pratapchandra Ghosh, and Jashohar Khulnar Itihas written by Satishchandra Mitra, when Daud Khan was defeated by the Moguls in 1576, Srihari Guha divided his fiefdom, gave 70% to Pratapaditya and 30% to his brother Basanta Ray. Pratapaditya started encroaching upon the fiefdoms of other feudal lords and increased his domain spreading over Khulna, Jessore and 24 Pargana. Lakshmikanta’s diplomacy ensured a pact between Mogul subedar Islam Khan and Pratapaditya. Pleased with the quantum of revenue, Emperor Akbar conferred the title of Maharaja to Pratapaditya, and Majmuadar (Revenue Commissioner) to Lakshmikanta. The title of Maharaja changed Pratapaditya to a different man. He broke the conditions of the pact, and along with eleven other feudal lords, refused to pay requisite quantam of silver to the coffers of the Emperor. He also conspired to kill his uncle Basanta Ray and his son. Lakshmikanta refused to be a part of the conspiracy, and fled to Halishahar. Akbar had sent a couple of military expeditions to defeat Pratapaditya but did not succeed; later, Emperor Jahangir sent a huge army contingent under Man Singh. On his way to Bengal, Man Singh had sought the blessings of Mahatma Kamdev Brahmachari at Varanasi. After capturing Pratapaditya, Man Singh requested the Emperor to establish Kamdev’s son Lakshmikanta as a feudal lord. Lakshmikanta was conferred with the titles of ‘Roy’ (for an annual fortune of one million silver) and ‘Choudhury’ (for a huge tract of land by the sea). Roy Lakshmikanta Majmuadar Choudhury, the name did not go well with the brahmin caste to which he belonged. Since Gangopadhyay brahmins are sabarna gotra, his priests and the advisors decided to call the family Sabarna Choudhury. His kingfdom being spread over Behala to Dakshineshwar, Pargana Magura, Khaspur, Kolkata, Poikan, Anwarpur, Amirabad, Havelishahar, Hatigarh and a large area of Sundarbans, Laksmikanta established revenue collection centres at various places, important ones being Behala and Dihi Kolkata. The East India Company arrived and these two centres became quite busy. Malay and Samir have the organizational skills of Lakshmikanta, otherwise Hungryalist Movement would not have been possible. According to Atul Krishna Ray, Lakshmikanta had seven sons: Ram (1590-1650), Gauri (1600-69), Gopal, Bireswar, Krishna, Gopi and Mahadeva (1639-1730). Ram had three sons: Ramballav, Subuddhi and Jagadish (1620-1690). Jagadish had four sons: Vidyadhar (1640-1720), Raghudeva (1642-1722), Ratneswar (1670-1720) and Rameswar (1674-1739). According to ‘Bangsha Parichay’ (1911) written by Amarnath Bandyopadhyay, Ratneshwar is Vidyadhar’s son. However, from this generation onwards the title Majmuadar was dropped, and Roychoudhury was exchanged for Gangopadhyay. Vidyadhar established himself at Behala-Barisha, and the Sabarna Choudhuries of this area are his decendants. It was Ramchand (1658-1732), son of Vidyadhar, who with his cousins, Manohar (1730), Pran (1653-1700) and Rambhadra (1700), signed the deed of transfer of rent collection of three villages i.e. Dihi Kolkatah, Sutanuti and Govindapur to East India Company. These three villages came to be known as Calcutta (now Kolkata). The story of the Uttarpara clan of Sabarna Choudhuries starts from Ratneshwar. Mahatma Kamdev Brahmachari had advised the family to spread out west of Ganges (Hoogly river in West Bengal), Varanasi being on the western bank of the river. In 1709 Ratneshwar purchased the northern tract of Chakbali of Sheoraphuli fiefdom of Manohar Roy; the area being on the north of Chakbali, it came to be known as Uttarpara. His palace, which has since been demolished for constructing a housing colony, was known as Sabarna Villa. In his book Atul Krishna Ray has dealt with the genealogy of Behala-Barisha and Halishahar clans. For Uttarpara clan the book by Amarnath Bandyopadhyay is authentic, as it enlists all the families of Uttarpara in 1911. Malay Roychoudhury himself though did not get a copy of this book when he wrote Chhotoloker Chhotobela (2004) and Autobiography in Volume 14 & 215 of Contemporary Authors Autobiography Series. We may chart out the genealogy in this manner as given by Bandyopadhyay: Ratneshwar->Ramjivan->Madhusudan->Gangaram->Ram Narayan. Ram Narayan had four sons: Chandicharan, Bhavanishankar, Bharatcharan and Gourmohan. Since we are interested in Malay and Samir’s ancestors, we proceed from Chandicharan (1691), whose son Jay Gopal (1718) had four sons: Jadunath, Trailokyanath, Kalachand and Kedarnath. Jadunath had three sons: Baikunthanath, Harinarayan and Lakshminarayan (1799). Lakshminarayan’s sons are: Pramod, Sushil, Ranjit, Anil, Sunil and Bishwanath. Malay and Samir are Ranjit’s sons. Lakshminarayan left Uttarpara and reached Lahore where he learned photography and painting from the Museum Curator John Lockwood Kipling, Rudyard Kipling’s father. Thereafter he, with his wife and children, was always on the move from one princely state to another, painting huge portraits of the members of royal families. Assisting him, his children learned photography and painting. Lakshminarayan died at Patna while drawing portraits of family members of Darbhanga maharaja. The brothers were forced to settle at Patna, whereas Apoorvamoyee, Lakshminarayan’s wife, along with Anil, went back to their twelve-room Uttarpara bungalow. Promod joined Patna Museum as Keeper of Paintings and Sculpture. Sushil opened a photography studio at Chhapra, Anil at Uttarpara, and Ranjit at Patna. Malay and Samir were also trained in the trade. The two young boys, guided by uncle Promod, had the rare opportunity to spend their holidays in the corridors of Patna Museum, and this experience has given them a sense of history of the micro and macro-level world that would be impossible to get by reading books. This experience has definitely been a contributory factor to the Hungry Generation Movement. Ranjit was married to Amita (Bandyopadhyay) of Panihati, a vaishnava centre across the river. Amita’s ancestry is traceable from Durgadas Bandyopadhyay, who was incarcerated by the British in 1857 for inciting soldiers in the guise of religious preaching. His son Nanilal was a part of the 19th Century renaissance, and got his three sons Lalmohan, Haridas and Kishorimohan educated in science, law and English language. Amita is Kishorimohan’s daughter. Kishorimohan wrote articles in English and Bengali, and subscribed to various radical magazines of his time. He was made a member of the Royal Malaria Commission (1899) and assisted Ronald Ross as a field investigator. Ronald Ross was awarded the Nobel Prize in 1902 for discovering the reasons and cure for Malaria. The responsibility of anti-Malaria campaigns rested on Kishorimohan. He traveled most of the affected areas in India, and used slide-shows for anti-Malaria campaigns. In 1910 the Imperial Government awarded him with a 500gm gold medal at a function at Kolkata, which was attended by a large number of intellectuals and politicians. He was also one of the founder members of Panihati Cooperative Bank, having made an initial contribution of Rs. 100000 and 1000gms of gold. Malay and Samir have Kishorimohan’s socio-political sensitivity. Neither Malay nor Samir reside in any of their clan sites. They live in Kolkata and try to keep in touch with the Sabarna network, which by now has 20000 members spread all over the world. Malay’s son Jitendra (1975) and daughter Anushree (1969) also do not reside in any of the clan sites. Malay’s uncle Sunil’s children and grandchildren, however, live in the housing colony built on the land where once Ratneshwar’s palace stood in architectural glory.
Malay Roychoudhury Biblio : Compiled by Prabir Chakraborty [Malay Roychoudhury writes in Bangla---one of the most important native languages of South Asia---and sometimes in English. One of the founders of Hungryalist literary movement (1961), Roychoudhury has been sought out by such notable writers as Mexican Nobel Prize winner Octavio Paz, American poet Allen Ginsberg, and Nicaraguan poet and priest Ernesto Cardenal. In addition to being a poet, Roychoudhury (better known as Malay) is also a counter-culture novelist, essayist, dramatist, short story writer, translator, and critic. An autobiographical essay by Malay has been included in volume#14 [revised in volume#215] of Contemporary Authors Autobiography Series published by The Gale Group Inc., 27500 Drake Road, Farmington Hills, MI 48331-3535, USA. He is the only Indian writer who has refused to accept Sahitya Academy Award, a coveted literary award conferred by the Government of India. Malay was born on 29 October, 1939 in Patna, Bihar, India; son of Ranjit ( a photographer and painter) and Amita (Bandyopadhyay). Married Shalila Mukherjee, field hockey player, in 1968; children: Anushree (daughter) and Jitendra (son).] Prabir Chakrabarty had compiled the under-noted bibliography for the book ‘Malay’ edited by Murshid A.M., published from Avishkar Prakashani, Bansdroni, Kolkata 700 070, India, and Ratan Biswas had prepared list of writings not included in any book for the commemorative issue of AHABKAL magazine. 1. Marxbader Uttaradhikar(nonfiction), Shakti Publications (Kolkata, India), 1962. 2. Shoytaner Mukh (collected poems), Krittibas Prakashani (Kolkata, India), 1963. 3. Amimangshita (book-length poem), Zebra Publications (Kolkata, India), 1965. 4. Stark Electric Jesus (book-length poem), Tribal Press (Washington, DC), 1966. 5. Jakham (book-length poem), Zebra Publications (Kolkata, India), 1966. Second edition published by Kabitirtha ( 50/3, Kabitirtha Sarani, Kolkata 23, India. Tel. [91]033 2401 0954), 1998. 6 Hungry Andoloner Kavyadarshan (manifesto), Debi Roy (Howrah, India, )1965. 7. Hungryalist Manifestoes/Ishtahar Sankalan (collection of manifestoes), Dedicated to Malabika Das. Cover designed by Charu Khan. Mahadiganta ( Padmapukur Mor, Baruipur, 700144,WB., India),1986. 8. Kobita Sankalan (collected poems), Dedicated to mother Amita Roychoudhury. Cover designed by Charu Khan. Mahadiganta, ( Padmapukur Mor, Baruipur, 700144, WB., India), 1986. 9. Medhar Batanukul Ghungur (collected poems), Dedicated to wife Salila Roychoudhury. Cover designed by Jogen Choudhury. Illustrations by Prakash Karmakar. Mahadiganta, ( Padmapukur Mor, Baruipur, 700144, WB.India),1986 10. Hattali (book-length poem), Mahadiganta, ( Padmapukur Mor, Baruipur, 700144, WB, India), 1989. 11. Selected Poems, Writers’ Workshop, (Kolkata, India), 1989. 12. Dubjaley Jetuku Prashwas (novel), Dedicated to father Ranjit Roychoudhury. Cover designed by Sanchari Lahiri. Howa49 Publishers ( B24 Northern Park,Kolkata, India), 1994. Second edition published by Avishkar Prakashani, (Bansdroni, Kolkata 70, India. Tel. [91]033 2410 5132), 2001. 13. Hungry Kimvadanti (memoir), Illustrations and cover designed by Subimal Basak. Dey Books (Kolkata, India), 1994. 14. Chitkar Samagra (collected poems), Dedicated to Al Mahmud, Shankha Ghosh and Sunil Gangopadhyay, the last remnants of modernism. Kabita Pakshik (36D,Harish Chatterjee Street, Kolkata 26, India. [91] 033- 2455-6325), 1995. 15. Chhatrakhan (collected poems), Dedicated to Mala Ray & Debi Ray and Sunita Ghosh & Saileshwar Ghosh. Kabitirtha (50/3 Kabitirtha Sarani, Kolkata 23, India. [91] 033 2401 0954),1995. 16. Postmodernism (nonfiction), Howa49 Publishers (B24 Northern Park, Bansdroni, Kolkata 70, India), 1995. 17. Allen Ginsberg’s Kaddish (translation), Kabitirtha (50/3 Kabitirtha Sarani, Kolkata, 700023, India. [91] 033-2401 0954),1995. 18. Bhenno Galpo (short story collection), Dedicated to elder brother Samir Roychoudhury. Cover designed by Raju Debnath. Dibaratrir Kavya (Kolkata, India), 1996. 19. Jalanjali (novel), Dedicated to Tarun Sur, Subarna Upadhyay and Barindranath Gupta. Cover designed by Prakash Karmakar. Raktakarabi (Kolkata, India), 1996. 20. Tristan Tzara’s Poems (translation), Kalimati (3 Atasi Road, Pramathanagar, Jamshedpur 831 002, India), 1996. 21. Allen Ginsberg’s Howl & Other Poems (translation), Kabita Pakshik ( 36D Harish Chatterjee Street,Kolkata 26, India), 1996. 22. Ja Lagbey Bolben (poems), Dedicated to Shakti, Shila & Minakshi. Cover designed by Kamal Chakraborty. Kaurab Prakashani (Jamshedpur, India), 1996. 23. Jean Cocteau’s Crucifixion (translation), Dedicated to Falguni Ray. Kabita Pakshik (36D Harish Chatterjee Street, Kolkata 26, India),1996. 24. Blaise Cendrar’s Trans Siberian Express (translation), Dedicated to Uttam and Malabika. Amritalok Prakashani ( Mitra Compound, Station Road, Midnapur 721 101, WB., India), 1997. 25. William Blake’s Marriage of Heaven and Hell (translation), Dedicated to Jahar Sen Majumdar. Grafitti (2A Tipu Sultan Road,Kolkata 700026, India), 1998. 26. Natoksamagra (collection of Illot, Hibakusha and Napungpung drama), Kabitirtha (50/3 Kabitirtha Sarani, Kolkata 23, India. [91] 033 2401 0954), 1998. 27. Awe (deconstruction of 23 poems), Dedicated to Debiprasad Bandopadhyay. Cover designed by Anil Karanjai. Kabita Pakshik( 36D Harish Chatterjee Street,Kolkata 26, India), 1998. 28. Naamgandho (novel), Sahana (Dhaka, Bangladesh), Dedicated to Murshid A.M. and Kalim Khan.1999 second edition published by Avishkar (Bansdroni, Kolkata 70, India. [91] 033-2410 5132), 2002. 29. Autobiography of Paul Gaugin (translation), Grafitti (2A Tipu Sultan Road, Kolkata 700026, India), 1999. 30. Jean Arthur Rimbaud (biographical-criticism), Cover designed by Prabir Sen. Kabitirtha (50/3 Kabitirtha Sarani, Kolkata 700023, India.Tel. [91] 033-2401 0954), 1999. 31. Allen Ginsberg (biographical-criticism, includes correspondence), Prabir Sen. Kabitirtha ( 50/3 Kabitirtha Sarani, Kolkata, India. Tel. [91] 033 2401 0954), 2000. 32. Atmadhangser Sahasrabda (collection of poems edited by Rabindra Guha), Dedicated to Sukumar Choudhuri and Rabindra Guha. Cover designed by Shormi Pandey. Grafitti (2A, Tipu Sultan Road, Kolkata 700026, India), 2000. 33. Surealism/Paravastavbad (nonfiction), Dedicated to Susweta Chakraborty and Kamal Chakraborty. Illustrations by Subimal Basak. Ebong Prakashani (Kolkata, India), 1997. 34. Hungryalist Interviews, edited by Ajit Ray (collection of Malay’s interviews taken by Adrish Biswas, Sayed Samidul Alam, Shankar Sarkar, Bibekananda Chattopadhyay, Dipen Ray, Arunesh Ghosh, Kunal Mandal, Mandira Pal, Gopinath Karmakar, Abhash Mitra, Partho Mukhopadhyay, and Farzana Warsi), Dedicated to Shormi Pandey and Shubhankar Das. Mahadiganta ( Padmapukur Mor, Baruipur, 700144, WB. India),1999. 35. Matantar (nonfiction), Ataeb Prakashani ( Nimta, Kolkata 700049, India), 2000. 36. Postmodern Kalkhando O Bangalir Patan (nonfiction), Dedicated to Rabindra Guha. Cover designed by Sukumar Choudhuri. Khanan (215 Vasant Vihar,Lava Road, Wadi, Nagpur 440023, India), 2000. 37. Uttor-Ouponobeshik Postmodernism (nonfiction), Dedicated to Shankar Sarkar. Bakprotima . (Mahishadal, Midnapur,India), 2001. 38. Salvador Dali (based on Dali’s The Secret Life of Salvador Dali), Grafitti (2A, Tipu Sultan Road,Kolkata 26, India), 2001. 39. Ei Adham Oi Adham (novel), Dedicated to Arabinda Pradhan. Cover designed by Tridib Mitra and Alo Mitra. Photograph on dust-jacket by father Ranjit Roychoudhury. Kabitirtha (50/3, Kabitirtha Sarani, Kolkata 23, India Nobile Tel.No.09231859988), 2001. 40. Postmodern Bangla Poetry 2001: An Overview (nonfiction), Haowa49 Publishers, (B24 Northern Park, Bansdroni, Kolkata 70, India), 2001. 41. Postmodern Bangla Short Stories: An Overview (nonfiction), Haowa49 Publishers, (B24 Northern Park, Bansdroni, Kolkata 70, India), 2001. 42. Dada Manifestoes Of Tristan Tzara (translation), Cover designed by Shormi Pandey. Grafitti (2A,Tipu Sultan Road, Kolkata 700026, India), 2002. 43. Nakhadanta (novel), Dedicated to Surojit Sen, Ratan Biswas and Haraprasad Sahu. Cover used from a dictionary page of Gyanendramohan Das. Haowa49 Publishers ( B24 Northern Park, Bansdroni,Kolkata, India), 2002. 44. Kounaper Luchimangsho (collection of poems), Dedicated to Dr. Bhumendra Guha. Cover designed by Sukhendu Pal. Kobita Campus ( 48/2 Bhairab Datta Lane, Salkia, Howrah 711106, India. Mobile Tel. No. 09830357424), 2003. 45. Postmodern Jibonananda (nonfiction), Dedicated to Ajit Ray, Kajal Sen and Shyamal Sil. Cover designed by Shormi Pandey. Grafitti (2A, Tipu Sultan Road,Kolkata 26, India), 2003. 46. Postmodern Bangla Poetry 2003: An Overview (nonfiction), Haowa49 Publishers. (B24 Northern Park, Bansdroni, Kolkata 70, India), 2003. 47. Postmodern Bangla Short Stories 2003: An Overview (nonfiction), Haowa49 Publishers (B24, Northern Park, Kolkata 700070, India), 2003. 48. Adhunantik Bangla Kavita edited by Samir Roychoudhury and Om Nishchal (nonfiction in Hindi), Parmeshwari Prakashan (B-109, Preet Vihar, Delhi 110 092, India), 2004. 49. Pratiswa Parisarer Abinirman (self-interview), Cover designed by Tarun Dey. Dahapatra (Ghatakbagan,Chandan Nagar 712136, Hooghly, India), 2004. 50. Bishoy Postmodernity (collection of post-Hungryalist interviews edited by Aravinda Pradhan. Interviewers are : Sudakshina Chattopadhyay, Debashis Hajra,Anurag Mahato, Mrinalkanti Rakshit, Chitrabhanu Singha, Prabuddha Bhattacharjee, Gargi Ghosh Dastidar, Ajitkumar Bhowmik, Sayantani Pal, Debaprasad Sarkar, Indrani Ghosh, Shatadal Dutta, Shyamal Sil, Bapi Chakraborty, Durbadal Dutta, Tarjani, Dhurjati Chanda, Ratan Biswas, Anadiranjan Biswas, Murshid A.M., Arabinda Pradhan, Kalim Khan, Tapas Mitra and Pranabendu Debnath), Dedicated to Saswata Sikdar and Biswajit Sen. Cover designed by Shormi Pandey. Grafitti (2A, Tipu Sultan Road, Kolkata 26, India), 2004. 51. Chhotoloker Chhotobela (childhood memoir), Dedicated to Janab Mijanur Rahaman and Begam Noorjahan Bakshi. Cover designed by Saswata Sikdar. Photograph used on cover was shot by uncle Biswanath Roychoudhury. Quark Publishers (10/9, Siddhi Nath Chatterjee Road,Kolkata 34, India. Mobile Tel No.09830015525), 2004. 52. Kobita 2004-1961 (collection of all poems written between 1961 and 2004), Cover designed by Debabrata Ghosh. Illustrations by Prakash Karmakar. Malay’s photograph by Subimal Basak. Avishkar Prokashani (Bansdroni, Kolkata 70, India. Mobile Telephone No. 09830331092), 2005. 53. Hungry Andoloner Ishtahar ( Hungryalist manifestoes with introduction. Includes copies of covers and old photographs), Dedicated to Dr. Tapodhir Bhattacharya. Abar Eshechhi Phirey Publications (Bhagabangola, Murshidabad 742135, India), 2007. 54. Charles Baudelaire (biographical-criticism), Dedicated to Mandira Pal and Tripti Santra. Cover designed by Utpal Bhattacharjee. Kabitirtha (50/3, Kabitirtha Sarani,Kolkata 23, India. [Mobile Tel.No.09231859988]), 2007. 55. Aprakashito Chhotogalpo (collection of short stories), Dedicated to Adrish Biswas and Prabir Chakraborty. Cover designed by Saswata Sikdar. Quark Publishers (10/9, Siddhi Nath Chatterjee Road,Kolkata 34, India.( Mobile Telephone No. 09830015525 ), 2007. 56. Adhunikatar Biruddhey Kathavarta (nonfiction), Dedicated to Utpal Bhattacharjee. Cover designed by Prabhat Choudhuri. Kabita Pakshik (36D, Harish Chatterjee Street,Kolkata 26, India), 1995. NOT INCLUDED IN ANY BOOK AS YET Fiction *Han-mukh Sandhan (memoir-based story). Ekaler Raktakarabi magazine. January 2004 issue. Editor Pradip Bhattacharjee. *Chandrahas (memoir-based story). Ekaler Raktakarabi magazine. September 2005 issue. Editor Pradip Bhattacharjee. *Owao (short story) Kabitirtha magazine. October 2005 issue. Editor Utpal Bhattacharjee. *Boikunthalok (political short story). Ekaler Raktakarabi magazine, Novermber-December 2005 issue. Editor Pradip Bhattacharjee. *Kangshalra Sukhey Achhen (short story). Khanan magazine, May 2006. Editor Sukumar Choudhuri. *Nei Achhay (cut-up short story). Kabitirtha magazine, September 2006 issue. Editor Utpal Bhattacharjee. *Sarbatmak (political fairy tale). Padakshep magazine, December 2006 issue. Editor Asim Kumar Basu. *An O hoi Abar Un O Hoi (political fairy tale). Teer Purni magazine, January 2007 issue. Editor Sudeb Bakshi. *Prabhanjaner Shuruta (political fairy tale). Notun Shatak magazine, January 2007 issue. Editor Shirshendu Datta. *Shurpanakha, Heritage (political fairy tale). Kobita Campus magazine, January-August 2007 issue. Editors Aloke Biswas and Pranab Pal. *Gawhartirther Kushilab (political fairy tale). Horinahorinir magazine, April 2007 issue. Editor Saswata Sikdar. *Jinnatulbilader Rupkatha (political fairy tale). Kabitirtha magazine, May 2007 issue. Editor Utpal Bhattacharjee. *Pakasthali (short story). Kalimati magazine, April-June 2007 issue. Editor Kajal Sen. *Kuharbhumey Nishidishi (political fairy tale). Amritalok magazine, September 2007 issue. Editor Samiran Majumdar. *Kukshimbhari (political fairy tale). Aikya Patrika magazine, September 2007 issue. Editor Gaurishankar Sarkar. *Bhedgranthir Rupkatha ( political fairy tale). Kabitirtha magazine, October 2007 issue. Editor Utpal Bhattacharjee. *Arup Tomar Entokanta (novel bases on Hungryalist days). Bishoymukh magazine. July-December 2007 issue. Editors Debashis Biswas and Bikash Gana Choudhury. Memoirs *Abhimukher Upajibya(first instalment). Bishoymukh magazine. January-June 2004 issue. Editors Debashis Biswas and Bikash Gana Choudhury. *Abhimukher Upajibya(second instalment). Bishoymukh magazine. January-June 2005. Editors Debashis Biswas and Bikash Gana Choudhury. *Abhimukher Upajibya ( Last instalment). Bishoymukh magazine. 2006 issue. Editors Debashis Biswas and Bikash Gana Choudhury. Non-fiction *FIR. Zebra magazine. 1966. Editor Malay Roychoudhury *Bangla Gadyer Simabaddhata. Godhulimone magazine. March 1982. Editor Ashok Chattopadhyay. *Shibnarayan Rayer Sangey Kichhukshan. Mahadiganta magazine. 1986. Editor Uttam Das. *Srijansheel Atmahatyar Nayika Sylvia Plath. Amritalok magazine. September 1987. Editor Samiran Majumdar. *Bangali Jubak Jubatir Naach. Ebang magazine. October 1987. Editor Dhurjati Chanda. *Samaskritir Sankat: Sarvabharatiya Bangali Criminaler Abhab. Ebang magazine. December 1987. Editor Dhurjati Chanda. *Sati Teer: Red Indian Lekhaker Best Seller. Phooo magazine. 1992-93. Editor Pradip Choudhuri. *Meyemanusher Biruddhe. Haowa49 magazine August 1997. Editor Samir Roychoudhury. *Gadyer Prajuktibid Marcel Proust. Furnace magazine. May-June 1988. *Kobitar kaj:Kajer Kobita. Kabitirtha magazine.1989. Editor Utpal Bhattacharjee. *Kobitwer Andhakar: Lathkhorer Bidroho. Mahadiganta Magazine. 1990. Editor Uttam Das. *Aami Kothay? Paa magazine. January-April 1992. *Dantasfuta Jayadhwani. Megh magazine. 1994. Editor Sanchita Sen. *Ei Sheeter Tatwa. Kavita magazine. 1995. Editor Supriya Bagchi. *Pradip Choudhurir Kabita. Haowa49 magazine. January 1995. Editor Samir Roychoudhury. *Adhahpataner Jathartho. Kabitirtha magazine. October 1996. *Pathaker Mrityu. Majhi magazine. 1996. Editor Prashanta Ray. *Bangla Sahitye Hungry Andolon. Commemorative issue of 17th Annual Bengali Conference of North America 1997. Editors Susanta Ray, Debajyoti Das and Jiten Mohanti. *Jatilata. Haowa49 magazine. May 1998. Editor Samir Roychoudhury. *Kobitar Janmo. Kabitirtha magazine. September 1998. Editor Utpal Bhattacharjee. *Shabdartho Jar Muluk Tar. Ekaler Raktakarabi magazine. September 1998. Editor Pradip Bhattacharjee. *Rearview Aynay Kourab. Kourab magazine. October 1998. Editor Kamal Chakraborty. *Allen Ginsberger Sakshatkar (translation of Harvey Kubernik). Kavita#53 magazine. 1999. Editor Supriya Bagchi. *Pragadhunik Danrakobi Adhunik Danrakobi. Mahadiganta magazine. January-March 1999. Editor Uttam Das. *Premik Baudelaire. Disha Sahitya. October 1999. Editor Anindya Ray.. *Allen Ginsberger Sakshatkar (translation of Gloria Glikston Bram). Sannidhya. October 1999. *Ki Boi Porbo Keno Porbo. Sahitya Setu magazine. 16 September 1999. Editor Jagabandhu Kundu. *Colonial Modernity Banam Arabinda Pradhan Ki Ajib Dastan. Anuttar magazine. September 1999 *Kshudha Prem Aguner Senk.(about probasi Bengali). Padakshep magazine. September 1999. Editor Samir Basu. *Kedar Bhadurir Sakshatkar. Mahadiganta magazine. July-September 1999. Editor Uttam Das. *Ki Bhabey Bujhben Kobitati Postmodern. Kalimati magazine. October 1999. Editor Kajal Sen. *Jounata. Shahar magazine. October 1999. Editor Ajit Ray. *Adhunikata, Uttaradhunikata, Jibanananda. Godhulimone. September-October 1999. Editor Ashok Chattopadhyay. *Postmodern Kabita Kakey Baley. Ebang Arbachin magazine. October 1999. Editor Koushik Ray. *Bangalir Prabas. Padakshep magazine. October 1999 issue. Editor Samir Basu. *Jibanananda Problematique. Lokakriti magazine. November 1999. Editor Haraprasad Sahoo. *Dipankar Datter Sakshatkar. Arbachin magazine. 2000 issue. Editor Shormi Pandey. *Allen Ginsberger Sakshatkar (several interviewers). Kobita Ishtahar. January 2000. *Pratik O Pratikbadi Andolon. Dadhichi magazine. 2000. Editor Dolly Datta. *Kobitwer Kalgham:Kano Je Likhi. Kabitirtha magazine. September 2000.Editor Utpal Bhattacharjee. *Kobitar Rhizomatic Boishishtya. Ekhon Nidagh magazine. April 2000. *’Amar’ Biswas ki ‘Tomar’ Biswaser Cheye Shreya? Kabita Campus magazine. January-March 2000. Editor Alok Biswas and Pranab Pal. *Unishatama Ashwarohi. Mizanur Rahamaner Troimasik Patrika. July-September 2000 issue. Editor Mizanur Rahaman. *Postmodern Little Magazine. Sahitya Setu magazine. March 2001. Editor Jagabandhu Kundu. *Achabhuyar Bombachak. Kabitirtha magazine. June 2001. Editor Utpal Bhattacharjee. *Postmodernism O Atharvabed. Kalimati magazine. July 2001. Editor Kajal Sen. *Pratik O Pratikvadi Andolon. Dadhichi magazine. August 2001 issue. Editor Dolly Datta. *Postmodern Sampadakiya. Kledaja Kusum magazine. September 2001 issue. Editor Pranab Kumar Chattopadhyay. *Adolf Hitlerer Sakshatkar (translation). Sahitya Suchipatra. November 1999-April 2000. *Lakshmikanto: Ekjan Sthanik Akshanvyakti. Kobititha. October 2001. Editor Utpal Bhattacharjee. *Atlas O periplus. Ekhan Nidagh magazine. Boimela 2001 *Dipak Majumdar: Ani Bani Jani Na. Dahapatra magazine. June-December 2002 issue. Editors Surojit Sen and Kamalkumar Datta. *Postmodern Brouhaha. Zero Hour. July 2002 issue. Editor Dipankar Datta *Bhashabadaler Kobita. Kabita Campus magazine.july-December 2002 issue. Editors Alok Biswas and Pranab Pal. *Aparder Best Seller. Haowa49 magazine.August 2002 issue. Editor Arabinda Pradhan. *Shankarnath Chakrabartyr Postmodern Pratilekh. Haowa49 magazine. November2002 issue. Editor Samir Roychoudhury. *Sabuj Mahishasur. Mansai Times magazine. January 2003 issue. Editor Biswadeb Chattopadhyay. *Apurbamoyeer Micronarrative. Sarvanam magazine. February 2003 issue. Editor Krishna Ghoshal.. *Barin Ghoshaler Panoptocon. Notun Kobita magazine. April-September 2003 issue. Editor Ranjan Moitra. *Krittibas Thekey Hungry Andolon. Kabitirtha magazine. July 2003 issue. Editor utpal Bhattacharjee. *Atmaprasanga. Khanan Patrika. October 2003 issue. Editor Sukumar Choudhuri. *Sabarna Choudhurira Sab Galo Kothyay. Disha Sahitya magazine. Utsab 2003 issue. Editor Anindya Ray. *Hungry, Angry O Beat Pratisandarbha. Amritalok magazine. November 2003 issue. Editor Samiran Majumdar. *Diasporic Adhunantikata. Haowa49 magazine. December 2003 issue. Editor Samir Roychoudhury. *Hungry Andoloner Majagulo. Disha Sahitya. Sharad 2003 issue. Editor Anindya Ray. *Case History: Ichchakrita Gadya. Madhyabarti magazine. January 2004 issue. Editor Biswarup Dey Sarkar. *Bishyayan O Pashchim Banglar Samskriti. Padakshep magazine. January 2004 issue. Editor Samir Basu. *Subimal Basaker Sakshatkar. Anyabhumi magazine. April 2004 issue. Editor Utpal Sarkar. *Jibanshaili: Ekti Adunantik Abhidha. Dadhichi magazine. April 2004 issue. Editor Dolly Datta. *Allen Ginsbergkey Amra Kibhabey Probhabito Korechhi.Ekaler Raktakarabi magazine. June 2004 issue. Editor Pradip Bhattachajee. *Hungry Pratisandarbha. Digangan magazine. Utsab 2004 issue *Hungry Andoloner Sakshya: Sonar Danter Gathakavya. Ebam magazine. August-October 2004 issue. Editor Dhurjati Chanda.. *Hungry Andolon. Rishra Samachar news-magazine. October 2004 Sharad issue. Editor Dilip Sarkar. *Rimbaud Rahasya. Kabitirtha magazine. January 2005 issue. Editor Utpal Bhattacharjee. *Aamar Baba. Sunrito magazine. January 2005 issue. Editor Ahmed Sayem. *Gyanchoutisha: Ananda O Duhkha. Grafitti magazine. February 2005 issue. Editor Subhankar Das. *Hungry Andolon. Sharadiya Jugasankha. 2005 issue. Editor Bikash Sarkar. *Aamar Ma. Kanakodi magazine. January-March 2005 issue. Editor Bishal Bhadra. *Nikhonj Shashurmashay. Horinahorinir magazine. May 2005 issue. Editor Saswata Sikdar. *Pratham Adhunika, Rajlakshmi Didikey Chenen? Prabase Nijabhase magazine. January 2008 issue. Editor Mandira Pal. ( For the magazines researchers may visit Little Magazine & Research Centre, 18 M, Tamer Lane, Kolkata 700009.Information relating to availability of books may be ascertained from Avishkar, Bansdroni, Kolkata 700 070, India. Mobile Telephone No: 09830331092. Land line phone No. 91-033-24105132 ).

Malay Roychoudhury -- My Dad : Anushree Prashant

It is almost as if I can see him growing up. Feel his desperation and his need for independence. His solitary soul forces him to try to break away, repeatedly, unsuccessfully from all the ties that bound him. The responsibility and the love for his family, and his writing, like stretched elastic, playing a tug-o-war amongst themselves. My grandfather was no mean storyteller, but the most enjoyment I got was from hearing about Bapi’s escapades. Thakuma, my grandmother, felt, understood and forgave his spirit, loved him and was always afraid for him. I could always sense it in her voice. And at the same time, I believe, she felt an inordinate amount of pride at his repeated jaunts; when she would be scared to death fearing the worst, and also, hoping that this time round his desire for freedom would have been satiated. I remember the quiet pride in my grandfather’s voice, as he would reminisce about Bapi, on the quiet evenings and weekends when he would teach me the rudiments of photography in the darkroom, after school hours, interspersed with terse directions. And then in the bright light outside, he would talk angrily about how Bapi gave Thakuma a scare when he was seventeen. He had hitched a ride atop a truck to Assam, with a large number of smelly goats for company, and had disappeared without a trace for three whole weeks and they knew nothing about his whereabouts. He never said he had been worried, but always, that Thakuma had been. I can see Bapi, ten year old, with his pockets full of pebbles and dead decaying frogs, rats and chicks, he might have collected for the pleasure of doing so, and then as soon forgot about them. I can still see the amusement in Thakuma’s eyes, as she recalled to me, about the discovery of the decaying remains. I never saw the disgust that might have been more natural on her part when she had to wash the smell out from those clothes. Dadu, my grandfather, was proud that his younger son had the intellect to choose Rural Development and Agricultural Banking as his career, and had not joined him in the family business. I wonder if he ever felt the lack of not having either of his two sons join. But he never showed it. Seen through the hazy pupils of my grandparent’s eyes, Bapi assumed almost mammoth proportions. And he became the idol. I wished to emulate. My story-time was in the afternoons after lunch or at night, when I would sit patiently for Dadu or Thakuma to slowly talk about their eternal ‘paan’ (betel leaf). The stories were many and varied, from the ‘Panchatantra’ to the ‘Mahabharata’, from Sukumar Ray’s nonsense verse to those they created themselves as the story progressed. But my most favourite ones were about the antics and escapades of my father. About the time, when as a small child Bapi had been befriended by a Muslim bangle maker, and would get home coloured bangle pieces of glass in his pockets for a week till he had hurt himself enough while unloading them on my unsuspecting Thakuma, or probably because he had tired of the pastime. Or about the time when he was sent out to buy a bottle of mustard oil, he found the chore suddenly becoming fun, as the shopkeeper fished out a dead rat from the can of oil before filling his bottle. He recounted it with such glee, I wonder the feelings that this news might have evoked in my grandparents at the time, whether they had already consumed the oil or it was awaiting consumption. Knowing Bapi, I am sure he would have told, after they had consumed it, just to see whether one felt any after-effects of consuming poisoned oil. Bapi recalled the poverty of his childhood days with a fair amount of nostalgia, always with a far away look in his eyes, which never showed any sorrow, but instead a lot of joy at the incidents he remembered of those times and which he took delight in sharing with us. He always recounted the ones when he had either evoked laughter or even when he had been able to enjoy himself, never the ones that might let us have a taste of the grim realities of those times. In his way, he could rouse within us a feeling of delight, as yet unsurpassed by any storyteller I have met since then. I was very young, when once he said, in answer to a comment made by a relative, with complete disinterest, that no one has a right to claim as inheritance, that one has not worked hard and sweated for. Looking back, it seems to me that I grew up that day, in that single moment and learnt to hold my head that much higher. Today when I recollect those words, I do so with the knowledge and the pride that he sincerely followed what he preached even unconsciously. But he nevertheless was hurt, when he learnt that our near-relative, took away everything. He never felt bad about the loss of the monetary value of the property. But even his inheritance of memories within those walls were broken down to accommodate the dowry from the newest addition to the family. And he and his beloved parents, like just so much dust, were swept away and washed out even from the minds of the nephews and niece who he had cherished and loved as his own kin. I would like to claim that he recovered from this utter disillusionment, but in truth that would be a falsity. As far back as I can, I remember the far away look in his eyes, when he would be lost to everything around him; when people around him assumed the form of furniture, when their conversation was like the transistor radio, blasting away ephemeral and vacuous messages; when he would look through the person opposite him with his unseeing eyes, all the while concentrating on capturing that elusive thought whirling around in his mind like a transitory snowflake. I also remember the time when he would come to pick me up from school, standing in the shade of an accommodating tree, completely lost in his own world. He would come with a jerk, when I tugged at his shirt, and would sheepishly ask me how long I had been standing there. My brother and I always recollect those moments with great happiness, as I could chat with my friends for that extra bit of time, and my brother could play the fool to his heart’s content, and Bapi would not come to know, till we reminded him of our existence. But our mother must have found this trait particularly wearying and hard to comprehend. Sometimes she would get irritated, and then my brother and I would gang up against her and have a lot of fun pulling her leg. And sometimes she would feel sad and lonely; at those times we would try to cheer her up and amuse her, and try to take her mind away from the thoughts within. Our mother always came across as ambitious, never for herself, but for her husband and children. She could never understand the moods and vagaries, eccentricities and idiosyncrasies of Bapi, and always had to explain them to herself, giving improbable and plausible reasons for his maverick behavior. Mummy has taken a long time to understand Bapi, almost her entire married life. That too she only did so through trying to understand me. I am quite like Bapi. He let me run free, as he himself wanted to be, away from all tries and trammels of civilization but never could be. I read his poems when still in the process of learning my Bengali alphabet. I formed words and images slowly in my mind, and read his much acclaimed poems of Medhar Batanukul Ghungoor, and felt the thrill of immediately being transported to higher echelons, among the clouds. I learnt all about visual and sound poetry from reading Bapi’s works. His metaphors and picturesque imagery still enthralls me. He could bring to life the most common phenomena, with so much zest. Each word pieced together with utmost care, placed carefully on the tracery of his work; almost like pointillism. And they would turn out to be unique masterpieces. I grew up under his shadow, but never under his shadow, as , with apt timely criticism he would immediately drive me to better my work, be it in academics or otherwise. One harsh word and I would try to supersede my own goals and surpass his expectations of me. I always looked at myself through Bapi’s eyes, trying as hard as I could to win his approval and be a person of merit. Always racing to run ahead of his ambitions for me, striving, but never quite succeeding. But it has made me stronger, built in me a spine of stainless steel, able to bear sorrows, and joy with equanimity. I am thankful to him for being the way he always has been, and hope he continues to inspire me and be there always, for me. (Reprinted from Malay Roychoudhury Compendium (2001) edited by Murshid A.M. and Arabinda Pradhan. Anushree Prashant lives in Holland with her husband and two daughters.)

Saturday, October 23, 2021

বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর পৌরুষ

বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর পৌরুষ ----------------------------------------- মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে হঠাৎ লিখছি কেন? এইজন্যে নয় যে আমার বই বেরোচ্ছে, আর বইএর ব্লার্বে তিনি যাচ্ছেতাই রকমের ভালো লিখে দিয়েছেন। সে তিনি অমনিও লিখতেন। (কাজ আদায় হয়েই গিয়েছে ) আমায় স্নেহ করেন, ভালোবাসেন একটু। আমি তাঁর বেশ-বয়সের অবন্তিকাদের মধ্যে একজন। ডিট্যাচড, পড়ুয়া, চোখে চশমা আঁটা, উচ্চাশী অবন্তিকা। তিনি আমার পিতৃপ্রতিম। জাগতিকে তাঁকে তেমনই ভালোবাসি। আর অন্য এক জায়গায় তাঁকে ভালোবাসি, যেমন ক’রে তাঁর অসাধারণ উপন্যাস “ডিটেকটিভ নোংরা পরীর কঙ্কাল প্রেমিকে”, অনেক আগে মরে যাওয়া কঙ্কালকে, এক বৃদ্ধের কংকালকে, তার জীবনের কনসেপ্টকে ভালোবেসে ফেলেছিল ইন্সপেক্টর রিমা খান। কেন? সেই গণিতবিদ, উৎশৃংক্ষল কংকালের পৌরুষের জন্য। আমি এই অদ্ভুত আখ্যানটি লিখছি কারণ, কবে এই কিংবদন্তীস্বরূপ বৃদ্ধ ফট ক’রে মরে যাবেন। এখনো দেখা করিনি। ফোন করিনি। যদি মরে যান, একা ফ্ল্যাটে ছটফট করবো শোকে। সেই ভয়ে, এখন কিছু দিয়ে রাখা। টিকে যেতেও পারেন অনেকদিন আরো। ভীষণ জীবনীশক্তি। জীবনকে ভালোবেসে চুষে খাবার ইচ্ছে। মলয় রচৌকে দাদা বলার দূরভিলাষ হয় নি কখনো আমার। এই গ্যালিভার কেন যে লিলিপুটের সংসারে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় সারা শরীরে তাদের মই বেয়ে উঠতে দেন, সেই নিয়ে আমার এক চাপা ক্ষোভ ছিল। ইনি ভীষন পণ্ডিত। বাকি বড় বড় কবিদের মতো দূর থেকে কিছু কিছু জ্ঞানের কথা লিখলেই লোকে আশেপাশে ঘুরতো বেশী বলে আমার বিশ্বাস। তাও আমাদের মতো নতুন শিঙওলাদের, এবং আমাদের চাইতেও আরো আরো খাজা জনগণকে উনি প্রশ্রয় দেন। এই মার্কেটিঙের স্টাইলটা আমার পছন্দ নয়। কিন্তু পুরুষালী কড়া মদের মতো তীব্র আত্মবিশ্বাসে উনি যে এটা ক’রে যান, প্রচণ্ড টেক-স্যাভি, সরাসরি, আড়ালহীন প্রচার, এটাও আমার আজকাল ভালই লাগে। তাঁর হাত দিয়ে যে কবিতা বেরিয়েছিল, (“প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ১৯৬৩ সালে ভারতীয় কবি মলয় রায়চৌধুরী রচিত ৯০ লাইনের একটি জলবিভাজক কবিতা। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে।প্রকাশের পর সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগে কবিতাটি নিষিদ্ধ করা হয়। ভারতীয় আদালতে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তিনটি ধারায় মামলা হয় এবং মলয় রায়চৌধুরীসহ অন্যান্য আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে মামলাটি নাকচ হয়ে যায়। মামলা চলাকালীন সময়ে আমেরিকা ও ইউরোপে মলয় রায়চৌধুরীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, এবং বিভিন্ন ভাষায় কবিতাটি অনুদিত হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত 'মর্ডান অ্যান্ড পোস্টমর্ডান পোয়েট্রি অফ দ্য মিলেনিয়াম" সংকলনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র কবিতা হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।” (উইকিপিডিয়া থেকে)), সেই কবিতা কারোর হাত থেকে বেরোনো শক্ত। সারা পৃথিবীর কবিতাপ্রেমী তা জানে। আমি আর তা নিয়ে বলি কেন। ওরকম একটা কোনদিন নামাতে পারলে বুঝতাম, হুঁ, কিছু করা গেলো। হবে না। সে আধার নেই আমার। তাই বলে ওনার এখনকার অনেক কেমন-যেন কবিতাকে লাইক টাইক দিতে পারি না। প্রয়োজনও নেই। যার এত উপন্যাস আছে, তাকে কেবা কবিতায় যাচে? মলয় রচৌএর উপন্যাসগুলি ভীষণ ভীষণ আণ্ডাররেটেড। বাংলা সাহিত্যে ঠিক ওরকম উপন্যাস বেশি লেখা হয় নি। ভালোয় মন্দে শুধু না, অদ্ভুত অন্য ধারার জন্য। কেন লেখা হয় নি তার বড় কারণ আমার মতে এই যে, ওরকম টেস্টোস্টেরন সম্বলিত প্রেমিক পুরুষ খুব বেশী নেই মনে হয় বাংলা সাহিত্যজগতে। এই জগতের ক্যাচাল আমি তেমন জানি না। কিন্তু মলয় রচৌ, মাঝে মাঝেই কাজের মেয়ে না এলে স্ত্রীএর সঙ্গে মন দিয়ে রান্নাবান্না বাসনমাজা, কাপড় কাচা ইত্যাদি করে ফেলেন। করার তো কথাই। জানি না তিনি জীবনে কতটা বিশ্বাসী অবিশ্বাসী ছিলেন সামাজিক অর্থে। খালি জানি, ইনবক্সে যখন কোন প্রশ্নের উত্তরে বলেন “বলে ফ্যাল । আজকে কাজের বউ আসেনি । বুড়ো-বুড়িকে অনেক কাজ করতে হবে । লাঞ্চে খিচুড়ি । ডিনারে প্যাটিস।”, কি ভালো যে লাগে! এই বুড়ি, যাঁকে আমি খালি ছবিতে দেখেছি, একসময়ের দাপুটে হকি খেলোয়াড়, তাঁকে এই “অ-কংকাল প্রেমিক” ভীষণ দাপটে ভালোবেসে গেছেন, এমন একটা ছবি বেশ মনে মনে আঁকতে পারি, এঁকে ভালো লাগে। মলয় রচৌএর উপন্যাসের পুরুষদের মতো প্রেমিক আমি বাংলা উপন্যাসে কম দেখেছি। তাঁর “ডিটেকটিভ নোংরা পরির কংকাল প্রেমিক” উপন্যাসে, এক গণিতবিদ, বহুগামী অবিবাহিত পুরুষ, হঠাৎ এক স্বল্পপরিচিত সহকর্মী মহিলার “চলুন পালাই” ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গিয়েছিলেন বিন্ধ্যপর্বতের অন্য দিকে, তামিল দেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। নাগরিক সভ্যতার থেকে পালাতে চেয়েছিলেন এই উচ্চশিক্ষিতা তরুণী মায়া, আর মায়ার ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে গেছিলেন সেই গণিতবিদ। এই উপন্যাসটি ছোট্ট, গোগ্রাসে গেলার মতো, নানান ভাবে রগরগে, আর নানান ভাবে ভীষণ ভীষণ সেরিব্রাল, মস্তিষ্কপ্রবণ। এই উপন্যাসে, জঙ্গুলে জীবনে ফিরতে চাওয়া মায়ার ঋতুস্রাবকালে, তাকে নিজ হাতে ধুইয়ে দিয়েছে তার প্রেমিক। অথচ দুজনে দুজনকে ডেকেছে “আপনির” দূরত্বের পবিত্রতায়, নিজেদের স্বত্ত্বাকে আলাদা বোঝাতে, “পবিত্রতার মতো অস্পষ্ট” শব্দকে ধূলিসাৎ করেও। এই উপন্যাসটির একটি রিভিউ আমি আগেও করেছি। বিশদে যাবো না। শুধু, এই প্রেমিকের প্রতি আমার গভীর মায়া যে বলে “চাল-পোড়া তো খাওয়া যাবে না , তাই মায়া চাল দাতাকে অনুরোধ করেছিল যে আমাদের একমুঠো ভাত দিলেই চলবে, কাঁচকলা পোড়া বা কাঁঠালবিচি পোড়া দিয়ে খেয়ে নেয়া যাবে, লঙ্কার টাকনা দিয়ে । প্রায় প্রতিদিনই ভাত পেতে লাগলুম , যদিও কলকাতায় যা খেতুম তার চেয়ে অনেক কমই, কিন্তু কম খেয়ে আর রাতে না খেয়ে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছিল কম খাবার । আমি চাইতুম মায়া বেশি খাক, মায়া চাইত আমি বেশি খাই । আমি একদিন বলেই ফেললুম, প্রকৃত ভালোবাসা কাকে বলে জানি না, কেবল যৌনতাই জেনে এসেছি এতকাল, আপনি ভালোবাসতে শেখালেন। জবাবে মায়া বলেছিল, অতীতকে আনবেন না প্লিজ, আপনি কী ছিলেন, কী করেছিলেন, সব ভুলে যান, সমস্তকিছু মুছে ফেলুন, আমি কি কোনো স্মৃতিচারণ করেছি?”। বা যে বলে “জীবনের বাঁকবদলগুলো, যতবার ঘটেছে বাঁকবদল, সব সব সব সব নারীকেন্দ্রিক ; নারীর ইচ্ছার, নির্দেশের, দেহের, আকর্ষণের, রহস্যের মোহে । স্কুলের শেষ পরীক্ষায় ভাল, সান্মানিক স্নাতকে খুব-ভাল , স্নাতকোত্তরে অত্যন্ত ভাল, তাদেরই কারণে , প্রভাবে, চাপে, আদরে । চাকরিতে যোগ নারীর জন্যে উন্নতি নারীর জন্যে, চাকরি ছাড়া নারীর জন্যে , ভাসমান জীবিকা নারীর জন্যে , অবসরে পৈতৃক বৈভবে পরগাছাবৃত্তি নারীর কারণে । কে জানে, হয়তো মৃত্যুও নারীর হাতেই হবে । জীবনে নারীদের আসা-যাওয়া, সেনসেক্স ওঠা-পড়ার মতন, না ঘটলে, আমার ব্যর্থতা, ব্যথা, পরাজয়, গ্লানি, অপরাধবোধ, এ-সবের জন্যে কাকেই বা দায়ি করতুম ! কাকেই বা দোষ দিতুম আমার অধঃপতনের জন্যে ? লোভি লম্পট মাগিবাজ প্রেমিক ফেরারি হয়ে ওঠার জন্যে ? হবার, নাকি হয়ে ওঠার ? আসলে আমি একটা কুকুর । আগের সিডিতে লিখেছি, তবু রিপিট করছি শেষনির খাতিরে । যে-মালকিনির হাতে পড়েছি , সে য-রকম চেয়েছে, যে-রকম গড়েছে , তা-ই হয়েছি । সেবার কুকুর, কাজের কুকুর, প্রজননের কুকুর, গুপ্তচর কুকুর, ধাঙড় কুকুর, কুরিয়ার কুকুর, প্রেডাটার কুকুর, পাহারাদার কুকুর, মানসিক থেরাপি কুকুর, শোনার কুকুর, শোঁকার কুকুর, চাটার কুকুর, রক্ষক কুকুর, গাড়িটানার কুকুর, কোলের কুকুর, আদরের কুকুর, এই কুকুর, ওই কুকুর, সেই কুকুর ইত্যাদি । কিন্তু একমাত্র কুকুর যেটাকে আমি ভালবেসেছি, তা হল মালকিনিকে উন্মাদের মতন ভালবাসার কুকুর । কিন্তু আমার লেজটা জন্মের সময়ে যেমন আকাশমুখো ছিল , চিরকাল তেমনই থেকে গেছে।”। আমি নিশ্চিত যে, মলয় রচৌও এরকমই আকাশমুখো লেজের কুকুর। তিনি প্রবলভাবে, ভিতর থেকে, লিঙ্গসাম্যে বিশ্বাসী। “অরূপ, তোমার এঁটো কাঁটা” উপন্যাসে তিনি যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মহিলা চরিত্র বানিয়েছেন, যে লোভে লালসায়, ভালোবাসায়, প্রতিশোধে, ভীষণ রকম জীবন্ত ও অসহায়, মেয়েদের সবটুকু নিয়ে সবটুকু দিয়ে ভালো না বাসতে পারলে, রূপের মধ্যে ওরকম অরূপ, আর তার এঁটো কাঁটাসহ মচ্ছগন্ধ ধরে রাখা যায় না। এখানেই মলয় রচৌএর পৌরুষ। যে রকম পৌরুষ “দেহি পদপল্লবম উদারম” এর মতো উদাত্ত হাঁক দিতে পারতো জয়দেবের কালে, পারে একালেও। তাঁর “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” আর “ছোটোলোকের যুববেলা” তেমনই অকপট, দাপুটে, উজ্জীবিত, ভিগরস। নিজেকে বিশ্রেণীকরণ করেছেন শুধু জোর করে নয়। তিনি সেরকম হয়েও উঠেছেন। তাঁর মেজদার জন্মরহস্য পড়ে এক একবার মনে হয়েছে, সবটা বলে দেওয়া কি তাঁর ঠিক কাজ হয়েছে পরিবারের প্রতি? আবার এক একবার মনে হয়েছে, বেশ করেছেন, ঠিক করেছেন। বিহারের প্রান্তিক মানুষের জীবন, তাঁর লেখায় দারুণ উঠে এসেছে। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাস যেমন লিরিক্যাল কোথাও কোথাও, তেমনই, গভীর রাজনৈতিক চেতনায় প্রোথিত। তাঁর অনেক উপন্যাসই তাই। খুব কাটাকাটা, খুব ন্যাকামোহীন, নির্মোহ, নিজের প্রতিও, নিজের নায়কদের প্রতিও, অনেকটা নায়িকাদের প্রতিও। এরকম ধারাবিবরণী বাংলায় লেখা কম উপন্যাসেই আছে। খানিকটা সমরেশ বসুর “যুগযুগ জীয়ে”তে কাছাকাছি কিছু স্বাদ পাই। তাও, এই উপন্যাসগুলি লেখার ধরণে অনেক আলাদা। আর এই সবের পরেও রচৌকে জিগালে, তাঁর সব জীবনদর্শনের মধ্যে, সব ছাপিয়ে, হয়তো কৈশোরের ভুবনমোহিনী রাণা উঠে আসবে, প্রথম চুমুর টেণ্ডারনেস নিয়ে। কিশোর পুরুষে। এই লেখাটা আবেগতাড়িত। খাপছাড়া। কর্মক্লান্ত দিনের শেষে রাত দেড়টা থেকে তিনটের মধ্যে আজ লিখবোই, বলে লিখে ফেলা। পরে হয়তো সংশোধন করবো আরো। উপন্যাসগুলোর, প্রবন্ধগুলোর, কবিতাগুলোর, ইদানীং লেখা ওনার কিছু কেমন-যেন-ভাল-না কবিতাগুলোও আলোচনা করা যাবে আরো কিছু। তবে এই লেখা অনেকাংশে ব্যক্তিগত ভাবের লেখা। তাই এভাবেই অকপটে লিখছি। আমার গবেষণাপত্রটি যখন শেষও হয় নি, রচৌ আমাকে তখনই খুব উতসাহ দিতেন। আমাকে নিয়ে তাঁর যে অবন্তিকা, তা তখনই লেখা। পরে যখন গবেষণাপত্রটি বেরোলো, আমার ক্ষীণ অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও, ফেসবুকে প্রায় সাতশোবার শেয়ার হওয়া এই লেখা, এবং আরো অনেকবার শেয়ার হওয়া লেখার নানান রেফারেন্স কিছুতেই টুইটারের মুখ দেখলো না বাঙ্গালি সমাজে। অথচ টুইটার কাউণ্টই জার্নাল মেট্রিক গ্রাহ্য করে। এই অশীতিপর বৃদ্ধ তখন, না বলতেই, বহুবার, চুপচাপ, এন্তার লোককে, সংস্থাকে ট্যাগ করে, টুইট করেছেন আমার গবেষণার লিংক, বহুদিন। ভালোবাসি কি সাধে? আমি যখন ভুলভাল কবিতা লিখতাম, একেবারে বাজে লিখতাম, একবার ওনাকে বলেছিলাম, “এই ছাপোষা জীবন! কোথাও যাই না। চাকরি, ছেলে, আর পড়াশুনো। কবিতায় প্রেমের, পৃথিবীর, মানুষের হাওয়া লাগবে কী করে?”। উনি দুকথায় বলেছিলেন “এটা কোন কাজের কথা না। লিখে যাও। হবে”। তারপর বলেছিলাম, “এখন চাকরি, গবেষণা (গবেষণা না ছাই)। সাহিত্য বাকি পরে পড়বো”। উনি বলেছিলেন, “এটা কোন কাজের কথা না। কমবয়সে না পড়লে রেসেপটিভিটি থাকে না, এখনই পড়তে হবে”। এই দুটো আপাতঃসাধারণ কথা, ওনার গম্ভীর পৌরুষের জোরেই, আমায় পালটে দিয়েছিল অনেকটা। এখন হাবিজাবি যা একটু লিখি, মনের দরজা খুলে গেছে তাই। মলয় রচৌরা বাংলাভাষাকে স্পর্ধা আর সাহস এনে দিয়েছিলেন। আমাকে, আমাদের এখনো সেই সাহস ভাঙ্গিয়েই খেতে হয়। আমাকে নিয়ে লেখা সেই কবিতাটা- বহতা অংশুমালী, তোর ওই মহেঞ্জোদারোর লিপি উদ্ধার কী গণিত কী গণিত মাথা ঝাঁঝা করে তোকে দেখে ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই অনন্তে রয়েছে বটে ধূমকেতুর জলে তোর আলোময় মুখ প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে রকেটের ফুলঝুরি জ্বেলে কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরে ওরে ইউক্লিডিনি কবি নিঃশ্বাসের ভাপ দিয়ে লিখছিস মঙ্গল থেকে অমঙ্গল মোটেই আলাদা নয় কী রে বাবা ত্রিকোণমিতির জটিলতা মারো গুলি প্রেম-ফেম, নাঃ, ফেমকে গুলি নয়, ওটার জন্যই ঘামের ফসফরাস ওড়াচ্ছিস ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে গুণ ভাগ যোগ আর নিশ্ছিদ্র বিয়োগে প্রবলেম বলে কিছু নেই সবই সমাধান জাস্ট তুমি পিক-আপ করে নাও কোন প্রবলেমটাকে সবচেয়ে কঠিন আর সমস্যাতীত বলে মনে হয়, ব্যাস ঝুঁকে পড়ো খোলা চুল লিপ্সটিকহীন হাসি কপালেতে ভাঁজ গ্যাজেটের গর্ভ চিরে তুলে নিবি হরপ্পা-সিলের সেই বার্তাখানা হাজার বছর আগে তোর সে-পুরুষ প্রেমপত্র লিখে রেখে গেছে মহেঞ্জোদারোর লিপি দিয়ে ; এখন উদ্ধার তোকে করতে হবেই বহতা অংশুমালী, পড় পড়, পড়ে বল ঠিক কী লিখেছিলুম তোকে– অমরত্ব অমরত্ব ! বহতা অংশুমালী, বাদবাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে আমার চিঠির বার্তা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে তুই আমাকে জানাস ------------------------------------------------------ লেখায় বানান ভুল আছে নিশ্চই। কাল ঠিক করবো। কত কথা বাদ গেলো। পরে ঢোকাবো। কিন্তু অনেক সন্তানের বৃদ্ধ পিতাকে প্রস্টেটের ওষুধ খাওয়াতে খাওয়াতে সবচে’ ছোট মেয়েটা যেমন পৌরুষের বেঞ্চমার্ক তৈরি ক’রে মনের মধ্যে সেই বেঞ্চমার্কের উপরের রাজকুমার খোঁজে, তেমনই এই অশীতিপর পিতৃপ্রতিমকে দেখি। আর যেমন ক’রে রিমা খান কঙ্কাল প্রেমিককে ভালোবাসে, ভালোবাসি এঁকে। স্বধর্মে স্থিত, অতি প্রচারমুখী, ঝপঝপ কমেণ্ট ক’রে মুশকিলে ফেলে দেওয়া স্নেহার্দ্র, প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। আমাদের খুব কাছে আছেন বলে, বড় বেশি ছোঁওয়া লেগে গেলো। দূরে চলে গেলে, মানুষ বুঝবে, গেলো কেউ। আর আমরা কেউ কেউ, একা ফ্ল্যাটে হাপসে কাঁদবো।

Friday, October 22, 2021

হাংরি আন্দোলনের কবি ফালগুনী রায় : জহর সেনমজুমদার

পুনর্জীবিত শব্দভাণ্ডারে ফালগুনী রায় : জহর সেনমজুমদার এক ঘরোয়া আলাপচারিতায়, কবিতাপ্রসঙ্গে আলোচনা চলতে চলতে হঠাৎ আমাদের কবি প্রভাত চৌধুরী বললেন, ‘একজন কবি মৃত্যুর পরেও যখন বারবার পরবর্তী সময়ে মুদ্রিত হন কিংবা পুনর্জীবিত হন তখন বোঝা যায় সেই কবি অস্তিত্বকে প্রসারিত করে দিতে পেরেছেন এবং কবিতার ক্ষেত্রে নিজেকে মূল্যবান করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।’ কথাটা বলেই তিনি নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিলেন । আমরাও চুপ করে ভাবছিলাম এই অমোঘ সত্যতাকে । ফালগুনী রায়-এর কবিতা পাঠ করতে করতে প্রভাত চৌধুরীর ঐ কথাটাই যেন ফিরে এলো নতুনভাবে এই মুহূর্তচেতনায়, এই ভাবনাবলয়ের কেন্দ্রভূমিতে । ‘দরগা রোড’ পত্রিকায় উৎপলকুমার বসু ফালগুনী রায়ের ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসন’ গ্রন্হটিকে ‘ভয়ঙ্কর’ এবং ‘আততায়ীর হাসির মতো’ বলেছেন । কেন বলেছেন -- যদি এই প্রশ্ন আজ নিজের কাছে নিজেই করি ? হয়তো, তাহলেই বোঝা যাবে ফালগুনী রায়ের অমোঘ সংক্রমণ সময়ধূসরতাকে পেরিয়ে গিয়ে, লিরিককুয়াশাকে পেরিয়ে গিয়ে নতুন কবিতাভাবনার ‘নেশাতুর চাউনি’কে সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠা দিতে সফল হয়েছে । ফালগুনী রায় এভাবেই তাঁর দুর্বিনীত মাথাঝাঁকানির কবিতাসহ আজ গৃহীত হচ্ছেন এবং কালও গৃহীত হবেন । আমরা জানি গৃহীত হবার পথ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতোই দুরুহ । কিন্তু গ্রহণের দায় থেকে আমরা যে গ্রহণের দ্বীপ গড়ে তুলেছি, অন্তত মনের ভেতর বা মনে-মনে, সেইখানে ফালগুনী রায় কি জমা দিলেন কি কি জমা দিলেন ? এইসূত্রে মনোজগতের রহস্যময় বাক্সে জমা পড়া কিছু বহু উজ্জ্বল পঙক্তির উল্লেখ করা যায় যা পাঠক ‘ফালগুনী রায় সংকলন’-এ পড়ে ফেলেছেন । রবীন্দ্রনাথে বাস করেও জীবনানন্দ যেভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে আক্রমণ করেছিলেন, মূলত জীবনানন্দে বাস করা ফালগুনী রায় দ্বারা জীবনানন্দও একইভাবে আক্রান্ত হয়েছেন । কবিতার ইতিহাস তো এভাবেই আক্রান্ত হয়, বিবর্তিত হয় । পুনর্জীবিত থাকবার প্রথান ও স্বাস্হ্যকর লক্ষণ তো নিজের ভেতর থেকে উঠে আসা অমোচনীয় শব্দভাণ্ডার । ফালগুনী রায় সেই শব্দভাণ্ডারকে ধারণ করবার ক্ষমতা রাখেন বলেই তিনি রবীন্দ্রনাথ নন, জীবনানন্দ নন, তিনি ফালগুনী রায়, ব্রহ্মতালুর ঘি জ্বালিয়ে কবিতাশিকারী ।

কাজী শোয়েব শাবাব : চার্মিনার ঠোঁটে ফালগুনী রায়

কাজী শোয়েব শাবাব : চার্মিনার ঠোঁটে ফালগুনী রায় হাংরি জেনারেশন শব্দ দুটো প্রথমে শুনেই চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল ক্ষুধার্ত প্রজন্ম। শব্দ দুটো শুনলে কেন যেন শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়া, আন্দোলন, দুর্ভিক্ষ, অন্যায়, শোষণ, ঘাম ঝরানো রোদে পোড়া কালো শরীর, অনাহার, অর্ধাহারে থাকা প্রোলেতারিয়েত মানুষের ছবিই ভেসে ওঠে মস্তিষ্কে। বাংলা সাহিত্যের স্থিতাবস্থা ভাঙার লক্ষ্যে ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে ভারতের পাটনা শহর থেকে শিল্প ও সাহিত্যের এক আন্দোলন শুরু হয় ১৯৬১ সালে। যদিও ১৯৬৫তে তা থেমে যায়। থেমে যায় বললেই কি থেমে যায়? থেমে যায় কাগজে-কলমে। হাংরি আন্দোলনের বিশাল ঢেউ লেগেছিল তখনকার তরুণ কবি-শিল্পী সমাজে। তেমন এক শক্তিমান কবি ফালগুনী রায়। শার্ল বোদলেয়ারের মতো নিজেকে কষ্ট দিয়ে (অতিরক্তি মদ্যপান, যথেচ্ছ জীবনযাপন) সৃষ্টি করে গেছেন শিল্প। ফালগুনী রায়ের আটটি কবিতা নিয়ে কিছু লিখব বলে কলম ধরেছি। শুরু করা যাক। ১. ইট ইজ ক্রিকেট : জীবন এখানে ক্রিকেটের সমার্থক। জীবনের প্রথম ইনিংসে যখন শূন্য রান, দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরির প্রস্তুতি। পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর সাহস। কিছুতেই হার না মানার ঘোষণা। কটাক্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বতন্ত্র ফালগুনী রায় হয়ে ওঠার ঘোষণা। কবিদের সাহস থাকতে হয়। সাহস না থাকলে লেখতে আসার মানে হয় না। কবিতার শেষাংশে যখন লেখেনÑ ‘আসলে আমি জেনে গেছি এখন/গিলক্রিস্টের রুদ্ররোষই পৃথিবীর সব নয়,/জীবনে ওরেলের শান্তচোখও আছে’। শেষ লাইন পড়ার পরই নেটে খুঁজে দেখেছি ক্রিকেটার ফ্রাঙ্ক ওরেলের শান্তচোখ। কী শান্ত, স্থির মায়া। মন ঠা-া করে দেওয়ার মতো। অনেকটা আশ্রয়ও আছে বোধহয়। ঠিক যেমন ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’ Ñমনে পড়ে গেল। একদিকে ওরেলের শান্তচোখ, অন্যদিকে বনলতার পাখির নীড়ের মতো চোখ। দুজোড়া চোখই আশ্রয়ের আধার হয়ে ওঠে; জীবনের ক্ষত নিয়ে পলায়নপর কবির আশ্রয়। ২. ক্রিয়াপদের কাছে ফিরে আসছি : ঞযরহশ ড়ঁঃংরফব ড়ভ ঃযব নড়ী. আরোপিত প্রথার বাক্সে বন্দি চোখ বাক্সের বাইরে দেখে না কিছুই। প্রথা ভাঙার আওয়াজ আছে, আছে খোলস ছিঁড়ে বেরোনোর ক্ষমতা। গোঁড়ামিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। যন্ত্রণাকাতর ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার যখন বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন অসহ্য যন্ত্রণায় কবির কলম প্রসব করে, ‘আমি সোনার তরীর সব ধান লুট করে বিলিয়ে দেবো শান্তি নিকেতনের ভিখিরিদের ভেতর তারপর খালি নৌকায় চেপে গান গাইবো বাইশে শ্রাবণের জল ভর্তি কর্পোরেশনের কলকাতায়Ñ কে যাবি পারে ওগো তোরা কে’ পুঁজিবাদের গালে কষে চড় বসিয়ে দিয়েছেন ফালগুনী। তথাকথিত সামাজিকতার তোয়াক্কা না করেই বলতে পারেন, ‘আমি নেশাগ্রস্ত তাই সংসারী সাত্বিক বন্ধুরা দূরত্ব বজায় রাখে ঠিক ট্রামে ট্রেনে বাসে ফুটপাথেÑ আমি আন্দাজ মেপে কথা বলতে পারি না কিছুতেই’ আবেগ নয়, পোশাকি নয়, নিরেট বাস্তবতার প্রকৃত (নগ্ন) মূর্তি চোখের সামনে এনে বসিয়ে দিলেন। ‘আমি বাবামার ভালোবাসার আড়ালে যৌন বনিয়াদ’ ৩. ব্যক্তিগত বিছানা : মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তির বাইরে নয়। ভলোমানুষি দেখাতে গিয়ে আমরা মুখোশকে মুখ হিসেবে শুধু মেনেই নিই না বরং তা প্রতিষ্ঠা করতে উঠেপড়ে লেগে পড়ি। যা করি তা বলি না, যা বলি তা কতটুকু করি তাও ভেবে দেখা প্রয়োজন। ‘শুধুই রাধিকা নয় গণিকাও ঋতুমতী হয় তিন সন্তানের পিতা পরিবার পরিকল্পনার আদর্শপুরুষ কৈশোরে করে থাকে আত্মমৈথুন করে না কি’ এক পাশে জন্ম, অন্য পাশে মৃত্যু। এক সরলরেখার দুপ্রান্তে দুটি। মাঝরেখা বরাবর যাপিত জীবন। এক পাশে নতুন প্রাণের স্পন্দন, অন্য পাশে স্পন্দন থেমে যাওয়া দেহের অন্তিম পরিণতিÑ দাহ শেষে কয়েক মুঠো ছাই। মাঝখানে বসে কবি লেখেন, ‘আমি যে রাস্তায় থাকি তার একপ্রান্তে প্রসূতিসদন অন্যপ্রান্তে শ্মশানঘাট’ ফালগুনীর বিপ্লব সশস্ত্র না হলেও কলমই তার অস্ত্র। লেখাই বিপ্লব। বিট জেনারেশনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ফুলকে অস্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন। ‘ফ্লাওয়ার পাওয়ার’ শব্দবন্ধ তারই সৃষ্টি। ১৯৫৫ সাল থেকে আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে দেশটির রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা এর বিরোধিতা করেন। যুদ্ধবিরোধী এই আন্দোলনে গিন্সবার্গ ছিলেন সামনের সারিতে। তিনি সারা আমেরিকার আন্দোলনকারীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, আন্দোলনে ফুলের ব্যবহার করতে। পুলিশ আন্দোলনে বাধা দিতে এলে হাতে তুলে দেওয়া হতো ফুল। ‘ফ্লাওয়ার পাওয়ার’ যুদ্ধবিরোধী শান্তিপূর্ণ এক মুভমেন্টে পরিণত হয়েছিল। রাইফেল আর কবিতার মধ্যে একটা মিল আছে। রাইফেল থেকে ছোড়া বুলেট শরীর বিদ্ধ করে আর কবিতার শব্দ বা পঙ্ক্তি মর্মমূলে বিঁধে যায়। ‘ম্যাগাজিন শব্দটি আমি লক্ষ্য করেছি রাইফেল ও কবিতার সঙ্গে যুক্ত’ ৪. নির্বিকার চার্মিনার : ‘মা, আমি আর তোমাদের অভিজাত সমাজের মাজাঘষা বাঁকাহাসি হাসতে পারবো না’ স্পষ্ট কথা। কৃত্রিম হাসি মুখে ঝুলিয়ে রেখে হয়তো সবাইকে সন্তুষ্ট রাখা যায়, কিন্তু নিজের শান্তিপ্রাপ্তি ঘটে না। ভেতরে এক আর বাইরে আরেকÑ এই দ্বিমুখিতা কবির প্রকৃতিবিরুদ্ধ। ‘আমি পারবো না অসুখী লিঙ্গ নিয়ে প্রাক্তন প্রেমিকার গায়েহলুদের দিন দেবদাস হতে খালাসীটোলায়’ অনুভবের সঙ্গে লেখার ফারাক নেই। ওই যে ‘ভেতরে এক, বাইরে আরেক’ এটা করতে পারেন না ফালগুনী রায়। এই বৈশিষ্ট্যই তাকে ফালগুনী রায় করে তুলেছে। ‘পাড়ার দাদারা ধর্মের দোহাই দিয়ে দোলের দিন টিপে দ্যান পাড়াতুতো বোনদের মাই’ আসলে আমরা সুযোগের অভাবে সৎ। সুযোগ পেলে সততার পেট বাঁধাতেও সময় লাগে না। ‘বেলুড় মন্দিরে প্রণামরতা এক বিদেশিনীর স্কার্ট ঢাকা আন্তর্জাতিক পাইথনপাছা দেখে জেগেছিল আমার সীমাহীন যৌনতা’ এই স্বীকারোক্তি সত্য, সরল। অনেকে ছিঃ ছিঃ করতে পারেন। কিন্তু আপনি বুকে হাত রেখে বলুন তো, দুটো লাইন পড়ার পর এই দৃশ্য আপনি দেখতে পাননি। তার পর কিঞ্চিত শিহরণ জাগেনি (শরীর বা মনে)। যৌনতা খারাপ কিছু নয়, জীবনেরই অংশ। যৌনতাই আপনার অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। এটা স্বীকার করতে এত আমতা আমতা করার কী আছে? কে বলতে পারেন জীবনে একবারও আত্মরতিতে মগ্ন হননি। অনেককেই দেখেছি মুখে সাধুপুরুষ। যৌনতার কথা শুনলেই একশ গজ দূরে সরে যান। অথচ মেমোরি তার অজস্র্র নীল ছবির ভা-ার। অনবরত চিন্তায় আর চোখ দিয়ে করে চলেন বলাৎকার যত্রতত্র। তা হলে ভ-ামি কেন? যৌনতার কথা উঠলেই নাক সিটকানোর কী আছে? যৌনতা আমার কাছে নমস্য। কিন্তু ধর্ষণ কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না (যদিও ধর্ষকাম প্রবণতা অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই থাকে)। কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এটুকু সংযম না থাকলে নিজের শিশ্ন টেনে নিজেরই গুহ্যদেশে ঢুকিয়ে রাখা উচিত। ৫. নষ্ট আত্মার টেলিভিশন : কবিতাটা শুরুই হয় ভাগ্যের ফিরিস্তি দিয়ে। যদিও ভাগ্য বা অদৃষ্টের বদলে নিরেট বস্তুজগৎই ফালগুনীর কবিতার চারণভূমি। আপাত চামড়া ও পেশির আবরণে ঢাকা সুঠামদেহ দৃশ্যমান থাকলেও ফালগুনীর চোখ কঙ্কালই দেখে ফেলে। তার এই দেখার ক্ষমতাই তাকে করে তোলে আলাদা, যা প্রকৃত কবির বৈশিষ্ট্য। ‘আসলে মানুষ দেখে ফেলে যৌনতা ও অর্থনীতি দিয়ে তৈরি বাবা-মা-ভাইবোন নিজের বউ পরের বউময় সমাজ’ বিপ্লবীরা বড় প্রেমিক। বিপ্লব মানে শৃঙ্খলমুক্তি, মানে অধিকার বুঝে পাওয়ার আন্দোলন। প্রেমই বিপ্লবের শেকড়। এ কথা লিখতে গিয়েই আশির দশকের কবি সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের একটি কবিতার দুটো পঙ্ক্তি মনে এসে গেল। ‘চে বলেছেন, হাস্যকর মনে হলেও হতে পারে, এটাই সত্য প্রকৃত বিপ্লব উৎসারিত হয় গভীর ভালোবাসা থেকে।’ এবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ চলে আসছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত বলে কিছু থাকে না। অনেকের সঙ্গে মিলে অনেকের হয়ে যায়। কেবল অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাবে প্রেমিকা চলে যায় পুঁজিপতির বিছানায়Ñ এই বাস্তবতা নতুন নয়। আর এ বিচ্ছেদপর্বে বেচারা বেকার প্রেমিকের অবস্থা আপনাদের জানা। হুমায়ুন আজাদের ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ স্মরণে আসছে এখন। যৌনতা দিলেই যদি প্রভু, মেটানোর আধার দিলে না। একটা প্রশ্ন থাকছে। আমাদের সৃষ্ট সমাজব্যবস্থায় একটা ছেলে বা মেয়ের যৌন উপলব্ধির পর কম করে হলেও ১০ থেকে ১৫ বছর লেগে যায় বিয়ে পর্যন্ত গড়াতে। বিয়ে মানে শুধু মানসিক বিষয় নয়, জৈবিক প্রয়োজনও। যৌনক্রিয়ার সমাজস্বীকৃত সনদ। তো বিবাহপূর্বের এই ১০-১৫ বছরের যৌনতা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না। অবদমনের ওপর দিয়েই চালিয়ে দেন। সঙ্গে যুক্ত হয় আরোপিত নৈতিকতা। অতিরিক্ত অবদমনের বিস্ফোরণ কিন্তু ভয়ঙ্কর। এই বয়সটা যাপন করেন সবাই, যৌনজটিলতায় হাবুডুবুও খান, কিন্তু বলেন না কেউ। সমস্যা সমস্যাই থেকে যায়। ‘যৌনতা থাকে কিন্তু প্রয়োগ করবার জন্যে আধার বা/রাধা বা রমণী মানে মেয়েছেলে থাকে না মেয়েছেলে থাকে/যৌনতা থাকে না’। মেন্ডেলের বংশগতিবিদ্যা মানে বংশপরম্পরায় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পুনরাবৃত্তি আমাদের জানা। আর সেখান থেকেই হয়তো বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের বংশ সম্বন্ধে জানার বিষয়টার উদ্ভব। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবার ও পরিবেশের অবদান অনেক। আর বাকিটা শিক্ষার (শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়) ওপরে বর্তায়। ‘মিস্টার খান্না হিন্দিভাষী কিন্তু কি আশ্চর্য তার স্ত্রী বাঙালী হওয়ায় মিস্টার খান্নার পাঁচ বছরের ছেলে বাঙলা হিন্দি দুটোই বলতে পারে জিভ দাঁত তালু কণ্ঠ ওষ্ঠের সম্যক ব্যবহারে’ ভার বইতে বইতে এক সময় মানুষ নির্ভার হতে চায়, হয়ে যায়। একটা ইৎবধশ বাবহ ঢ়ড়রহঃ-এ এসে দাঁড়ায়, যেখানে কোনো লাভও নেই লোকসানও নেই। অথবা একটা সংখ্যারেখার শূন্যতে। না ধনাত্মক না ঋণাত্মক। একেবারে নির্লিপ্ত। এমন অবস্থানে বসে ফালগুনী লেখেন, ‘দাঁড়িয়ে আছি চার্মিনার টানার উৎসাহ নেই ।কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বসে আছি আমি নিগ্রন্থ মানুষ’ ৬. কবিতা বুলেট : ‘বঙ্গসংস্কৃতির প্যান্ডেল উঠিয়ে নিলে পর ময়দানে সে জায়গায় চরে বেড়ায় ভেড়া .................. কবিদের যোগ্যতা আমি চাই বিচার্য হোক কেবলি কবিতায়’ খালি কলসি বাজে বেশি। অকবিদের আস্ফালন বেশি। উইপোকার মতো, মুখ শক্ত, পশ্চাদ্দেশ নরম। মুখ দিয়ে বিশ্বজয় করবে। এরা কবিতার নাম নিয়ে কবিতাকেই ধর্ষণ করে। আরে মূর্খ, শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে অন্ত্যমিল দিলেই কবিতা হয় না। ঘটে কিছু মাল থাকতে হয়। বেশিরভাগই গড্ডলিকা প্রবাহে (ভেড়ার পাল) মিশে যায়। এদের আস্ফালনেই পাঠক পালিয়েছে কবিতার পাঠ ছেড়ে। পাঠক বোকা নয়Ñ এ কথা ওদের খুলির ভেতরে ঢুকবে কবে? প্রিন্টিং লাইন এত সহজ হয়ে গেছে। টাকা থাকলেই দুম করে বই বের করা যায়। আরও আছে পদ ও পদবি। ক্ষমতার জোরে নামধারী কবি। কবিতার ‘ক’-ও বোঝে না অথচ বছর বছর চলে তাদের বই প্রকাশের ঢল। চলে পুরোদমে মার্কেটিং আর পদের জোরে প্রোমোটের পাঁয়তারা। তটস্থ মিডিয়াওÑ জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর। পরিস্থিতি যখন এই তখনও আশা আছে। প্রকৃত কবিরা নীরবে ধ্যানমগ্ন কাব্যসাধনায়। ফোটাচ্ছেন সৌরভ ছড়ানো বর্ণিল ফুল। ৭. নভোযান : সমাজ ব্যবস্থাটাই একটা নভোযানের মতো। আমাদের নিয়ে ছুটছে কোনো অজানা গন্তব্যে। আমাদের ইচ্ছা থাক বা না থাকÑ এই নভোযানই আমাদের গ-ি। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছিÑ তা খুব স্পষ্ট নয়। ভালো না লাগলেও এই যানেই থাকা বাধ্যতামূলক। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ ক্ষীণ। একটা চলমান কয়েদখানাও বলা যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এ এক এমন অদ্ভুত গ-ি, যেখানে যার যা কাজ নয় তাকেই সেটা করতে হয়। বেঁচে থাকার বা জাগতিক ভালো থাকার লোভনীয় মুলো পরিকল্পিতভাবে নাকের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আসলে জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি এক ত্রিশঙ্কুদশা। ‘কবিদের দিয়ে হিসেব করাবে ব্যবসাদার আর কবিরা তার বিনিময়ে বৌ-বাচ্চা সংরক্ষণের অর্থ করে নেবে’ যাদের তলা ফুটো তারাই অন্যের ফুটো খুঁজে বেড়ায়। পারলে খুঁচিয়ে ফুটো তৈরি করে জনসমক্ষে ঘোষণা করে ‘অমুকের তলায় ফুটো আছে’। অথচ নিজের তলার ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসা ইজ্জত সবার সম্মুখে, সেদিকে খেয়াল নেই। ফালগুনী সে বিষয়ে লিখলেনÑ ‘এমন কি খিস্তিবাজরাও আমার কবিতায়/খুঁজে পাবে অশ্লীল শব্দ। চোররা আমায় ভাববে জোচ্চর’ ৮. ব্রেনগান : কখনো এমন সময় আসে যখন সবকিছুর মধ্যে থেকেও নিজেকে নির্বাসিত মনে হয়। সবার মধ্যে থেকেও একা। কবির লড়াই নিজের সঙ্গে। কবি ভীষণ একা, সম্ভবত ¯্রষ্টাও। ফালগুনীর কবিতা নিয়ে আমি আর লিখতে পারছি না। ব্রেনলাইন বরাবর একটা বন্দুক তাক করা আছে। সময়টা আততায়ী। আপনারা ফালগুনীর কবিতা পড়–ন। চার্মিনার নেই, ডার্বি ঠোঁটে নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক বিদায় নিচ্ছি।

হাংরি আন্দোলনের কবি ফালগুনী রায় : উৎপলকুমার বসু

ফালগুনী রায় : অগ্নি যাহাকে দগ্ধ করিতে পারে না : উৎপলকুমার বসু কবে শেষ হল আধুনিকতার যুগ ? কেউ কেউ বলেন, ১৮৮৯ সালের ৩ জানুয়ারি যেদিন চিকিৎসকেরা জানালেন যে নীৎশে সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছেন । আরেকদল বলেছেন, ১৫ জুলাই ১৯৭২ বিকেল তিনটে বত্রিশে যখন আমেরিকার সেন্ট লুইস শহরের এক দল নিম্ন মধ্যবিত্ত নাগরিক তাদের আধুনিক বহুতল বাসগৃহ কমপ্লেক্স বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় । ঐ বাড়িগুলি কর্বুসিয়ের-এর ‘মেশিন ফর লিভিং’ বলে খ্যাত হয়েছিল । যেদিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি ঘাতকের গুলিতে নিহত হন ( ১৯৬৩ ), তখনই আধুনিকতার যুগের শেষ হল । এই তালিকায় আধুনিকতার আরো একটি সম্ভাব্য মুহূর্তের উল্লেখ আমি করে রেখি । বুঝি একটু দুর্বিনয়ের ছোঁয়া লাগবে । তা পৃথিবীর সব দাবীই অল্পবিস্তর দুর্বিনীত । আমি বলি, ১৯৭৮ সালের মধ্য বৈশাখে যখন ফালগুনী রায় ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসন’ বইটি আমার হাতে তুলে দেয় । বই বললে অবশ্য সেই ক্ষীণ সংগ্রহটিকে অপ্রয়োজনীয় সম্মান দেখানো হবে । তকন বেলা এগারোটা । ফালগুনী শুখো নেশায় চুর । ফুটপাথে টলছে । বইটি এগিয়ে দিতেই আমার সন্দেহ হয় এটি পর্নোপুস্তক কিনা । সেইভাবে, গোপনে, সে বইটি আমার হাতে গুঁজে দেয় এবং আমি খানিকটা চমকেও উঠি । কেননা তাকে আমি চিনতাম না । সে তকন আমার কানে-কানে বলে -- পট্টভির পরাজয়, আমার পরাজয় । ঐ তার সঙ্গে আমার প্রথম ও শেষ দেখা । তারপর কতজনের কতসত কাব্যগ্রন্হ বেরোল, হারিয়ে গেল ও পুরস্কৃত হল ( এবং হল না ), এডিশান হল ( এবং হল না ), কত কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকাশক হাত নেড়ে বলে গেলেন, না না, কবিতার বইয়ের সেল-টেল কিছু নেই । কিন্তু সবকিছুর উপর আমাদের এই লেনদেন, দেওয়া-থোওয়া, পাওনা-গণ্ডার সমাজসাহিত্যের উপর---- ফালগুনী রায়ের এই ভয়ঙ্কর বই আততায়ীর হাসির মতো আজো অম্লান । কেউটের চোখের মতো নিষ্পলক তার নেশাতুর চাউনি । আটের দশকের প্রম দিকে ফালগুনী মারা যায় । অনতিকাল পরে মারা যায় ওর দাদা তুষার রায়, যে ছিল আমার বন্ধু । তার কাছে শুনেছিলাম, যে ফালগুনী নাকি শেষ দিকে এখানে-ওখানে আমার খোঁজ করে বেড়াত । কেন, কে জানে ? ফালগুনীর সৎকারে কোনো ধুমধাম হয়নি । সামান্য কয়েকজন শ্মশানবন্ধু ছিলেন । বিউগল বাজেনি । একুশটি তোপধ্বনিও হয়নি । খোলা চিতায় তার অবহেলিত দাহ হয় । বৈশাখের তপ্ত বাতাসে, আজ যেমন তার কবিতার বইয়ের পাতাগুলি, পপায় তেমনই অবহেলায় উল্টে যাচ্ছে নিজে নিজেই ।

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...