Showing posts with label Court Case. Show all posts
Showing posts with label Court Case. Show all posts

Tuesday, May 26, 2020

অলোক গোস্বামী : হাংরি আন্দোলনের নেতৃত্ব ও মামলা

বইমেলা থেকে ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরলাম। কাঁধে করে নিয়ে এলাম ক্ষুধার্ত পত্রিকা এবং ক্ষুধার্ত লেখকদের বইপত্র। মাথার ভেতর ঠেসে আনলাম অরূপ বাণী--হাও টু বি এ গুড প্রতিষ্ঠান বিরোধী ( ওরফে ক্ষুধার্ত)। শুধু মাথায় রাখাটা যেহেতু যথেষ্ট নয় তাই সেসব জ্ঞান উগরে দিলাম যে যার কলমে। প্রকাশিত হোতে শুরু করলো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।যথারীতি বিজ্ঞাপনের তোয়াক্কা না রেখে পকেটের টাকায়।
মনোজ রাউতের ধৃতরাষ্ট্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করা হলো শৈলেশ্বর ঘোষের প্রবন্ধ সংকলন, ‘প্রতিবাদের সাহিত্য।’ অরুণেশ ঘোষের গদ্যগ্রন্থ,‘অপরাধ আত্মার নিষিদ্ধ যাত্রা।’ গাঁটের একটা কড়িও না খরচ করে বই প্রকাশের মত মহান ঘটনা দুজনের জীবনেই সেই প্রথম।
যথারীতি তুলকালাম কান্ড ঘটে গেল উত্তরবঙ্গের সাহিত্য জগতে। আমাদের ভেতরে ক্ষুধার্ত আন্দোলনের পুনরুত্থানের ভূত দেখতে থাকলো উত্তরবঙ্গ সাহিত্য প্রতিষ্ঠান। কিভাবে আমাদের প্রতিহত করা যায় সেসবের পরিকল্পনা ভাঁজা শুরু হলো। সে এক উৎকট পরিস্থিতি। প্রতিষ্ঠানের স্ব-নিযুক্ত দালালবৃন্দ না পারছে আমাদের অস্বীকার করতে, না পারছে স্বীকার করতে।
ঘটনা প্রবাহ যেদিকে চলছিল তাতে হয়তো সত্যি সত্যিই ক্ষুধার্ত আন্দোলনের পুনারুত্থান ঘটে যেত এবং নকশাল আন্দোলনের মতো উত্তরবঙ্গই হোত তার এপিসেন্টার। কিন্তু কী আশ্চর্য, ঘটনা গড়ালো উল্টো দিকে! ক্ষুধার্তদের বই/পত্রিকা যত পড়ি তত বিভ্রান্তি বাড়ে। আবিষ্কার করি, সুভাষ এবং শৈলেশ্বরের চিন্তা ভাবনার মধ্যে থাকা বিস্তর ফারাক! প্রদীপ চৌধুরীর পত্রিকা পড়ে বিভ্রান্তি বেড়ে দ্বিগুণ হয়। অরুণেশ ঘোষের লেখাপত্র থেকে সেই বিভ্রান্তি বেড়ে দাঁড়ায় চৌগুণ। সুবো আচার্য তো শ্রীশ্রী ঠাকুরের পাদপদ্মে বিশ্বরূপ দর্শন করছেন! সুবিমল বসাক সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না। কেন?
ভাবনায় পড়ে যাই, কোনটাকে বলব ক্ষুধার্ত চেতনা! কেউ লিখছেন প্রতিবাদের সাহিত্য কেউ বলছেন প্রতিবাদ নাকি প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়! কেউ একগাছা দড়ির এক প্রান্ত নিজের কোমরে বেঁধে অন্য প্রান্ত অসীমের কোমরে বাঁধার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে তো অন্য জন গা-গতরের শব্দ ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছে! কেউ লিখছে জাদুবাস্তববাদী গল্প কেউ বলছে লেখাকে মিথ, মেটাফর, অ্যালিগরি মুক্ত করতে। যামু কই? একজন ক্ষুধার্ত আন্দোলনের মৃত্যু ঘোষণা করছেন, অন্যজন সর্বধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টা করে বলেছেন, ক্ষুধার্ত চেতনা যার যার তার তার। বেশ। মেনে নেয়াই যেত কিন্তু তাহলে ক্ষুধার্ত সাহিত্য ওদের ঘোষনা মোতাবেক আন্দোলন হয় কিভাবে! বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিকে আন্দোলন বলা যায়?
আমাদের এই দোলাচলের মাঝে ঘটে গেল আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সাহিত্য সমুদ্রে মাথা চাড়া দিলো সাবমেরিন মলয়।মলয় রায়চৌধুরীকে সাবমেরিন বলার কারণ মামলার নিষ্পত্তির পর মলয় রীতিমত ডিক্লেয়ার করে ক্ষুধার্তদের সঙ্গে যাবতীয় সংশ্রব ত্যাগ করেছিলেন এবং জীবিকার উন্নতিতে মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু উনি যে তলে তলে আক্রমণ হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সেটা বোঝা যায়নি।
সব জানপহেচান চুরমার করে দিতে ‘পথের পাঁচালি’ পত্রিকায় ভেসে উঠলেন মলয়।এবং কামান দাগলেন। খানিকটা চুনসুরকি খসে পড়লো। উঁকি দিলো ইটের সামান্য অংশ। জানা গেল, শৈলেশ্বর ঘোষ নয়, মলয় রায়চৌধুরীই ছিলেন ওই আন্দোলনের মূল হোতা। জানা গেল, ক্ষুধার্তদের অনেকেই হাজতে মুচলেকা দিয়ে জামিন নিয়েছিলেন। এবং সে কারণেই মলয় রায়চৌধুরীর জামিন মিলতে ঝামেলা হয়েছিল।
সামান্য চুনসুরকির খসে পড়া থেকে খানিকটা জানা গেল বটে কিন্তু মানা গেল কি? না। সেটা সম্ভবও নয় কারণ একেই তো ভিন্ন ইতিহাস জানছি অন্যদিকে জানা ইতিহাসের মালিকরা চোখের সামনে। সেদিক থেকে মলয় রায়চৌধুরী সম্পূর্ণ অচেনা। তার ওপরে আবার বাড়তি বোঝা মলয়ের উৎকট বুক চাপড়ানি। তাছাড়াও ওই লেখায় এত আঙসাঙ কথা ছিল যে চট করে বিশ্বাস করতে অসুবিধেই হয়েছিল।
হয়ত খামতিটা মলয়ও বুঝেছিলেন তাই পরের মিসাইলটা দাগলেন ডঃ উত্তম দাশের হাত দিয়ে। ডঃ দাশ তার ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকায় ক্ষুধার্ত আন্দোলন বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখলেন, তাতে মালমশলা হিসেবে ব্যবহার করলেন মামলা সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র। কেস ডায়েরি, মুচলেকা, সাক্ষদান পর্ব, আদালতের রায়, সবকিছুর সার্টিফায়েড কপি এই প্রথমবার প্রকাশ্যে এলো। ফলে এই বিস্ফোরণটির তীব্রতা ছিল মারাত্মক। প্রকৃত সত্য জানাজানি হয়েছিল। আমরাও বুঝলাম একদা শৈলেশ্বর দ্বারা পেশ করা তথ্যের পুরোটাই ছিল গোঁজামিলে ভরা।
মহাদিগন্ত পত্রিকাটা আমার হাতে এসেছিল অদ্ভুত ভাবে। এবার সেই গল্প।
কোচবিহার থেকে অরুণেশদাকে নিয়ে আমি, রাজা, মনোজ রওনা দিয়েছিলাম মাথাভাঙার উদ্দেশ্যে।হঠাৎ মাথাভাঙা কেন? কারণ পৃথিবীতে ওটাই একমাত্র স্থান যেখানে অরুণেশদা খুব স্বচ্ছন্দ থাকতেন। এই স্বাচ্ছন্দ যোগানোর দায়ভার স্বেচ্ছায় নিয়েছিল মাথাভাঙা বয়েজগণ। কারা তারা? তারা প্রায় প্রত্যেকই বিখ্যাত কবি। যেমন নিত্য মালাকার,সন্তোষ সিংহ, অনুভব সরকার, কমল সাহা।

নবদ্বীপ থেকে মাথাভাঙায় গিয়ে থিতু হওয়া নিত্য মালাকারের কবি পরিচয় বাংলা কবিতা জগতের প্রায় সবাই জানেন। জানেন সন্তোষ সিংহের কথাও। তবে সন্তোষদা সম্পর্কে একটা বিশেষ তথ্য হয়ত অনেকের জানা নেই সেটা হলো স্বপ্নে পাওয়া বেশকিছু কবিতা নিয়ে একটা বই আছে সন্তোষদার যার ভূমিকা লিখেছিলেন ডঃ অশ্রুকুমার সিকদার।
সবচে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো স্বভূমিকায় এরা প্রত্যেকে উজ্জ্বল হওয়া সত্বেও এদের অরুণেশ অনুরাগ ছিল অসীম। প্রায় শেষদিন পর্যন্ত অরুণেশ ঘোষকে ওরা ভালোবাসা দিয়েছেন। সব রকম ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন অরুণেশ ঘোষের।
বিষয়টাকে আশ্চর্যজনক বলার কারণ অসূয়াক্লিন্ন সাহিত্য পরিবেশে এমন প্রীতি সহজে চোখে পড়ে না। বলাবাহুল্য অরুণেশদারও যথেষ্ট প্রিয়স্থান ছিল মাথাভাঙা, তা তিনি যতই বলুন না কেন জটেশ্বরের বেশ্যাপাড়ার পরিবেশই ছিল তাঁর কাছে প্রিয়তম স্থান।
মাথাভাঙার কথা বলতে গিয়ে আরও একজনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে--সুব্রত রায়। কবিতা লেখা এবং কবিতা কেন্দ্রিক জীবন যাপন, দুটো নেশাতেই বুঁদ ছিল। এমন ছেলের কাছে অরুণেশ ঘোষ যে একমাত্র অনুসরণযোগ্য কবি হবেন তাতে আর সন্দেহ কিসের?
বেশীদিন কবিতা লিখতে পারেনি সুব্রত। বেঁচে থাকলে তো লিখবে? আত্মহত্যা করেছিল। হয়ত আরো আগেই কাজটা করে বসতো নেহাত সন্তোষদা প্রতিনিয়ত তার প্রিয় ছাত্রটিকে আগলে রাখার চেষ্টা করতেন তাই কিছুদিন বাড়তি আয়ু পেয়েছিল সুব্রত।
আমরা অনন্য, ফালগুনি এবং এরকম আরও কিছু নাম জানি কিন্তু পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে ওরকম কত যুবক যে উন্মাদের মতো সাহিত্যকে ভালোবেসে সর্বস্বান্ত হয়েছে তাদের খবরও রাখি না! আজ মনে হয়, সাহিত্যকে বোধহয় পরস্ত্রীর মতো ভালোবাসতে হয়। কামনা যতই উদগ্র হোক তাতে বাধ্যতামূলক ভাবেই খানিকটা সংযম বজায় রাখতে হয়।এই সম্পর্ককে কখনও পরিণতি দিতে চাইতে নেই, চোরাগোপ্তা আকর্ষণটুকু বজায় রেখে চলতে হয়।
থাক তত্ত্বকথা, ওই সফরেই অরুণেশের ব্যাগে আচমকা পেয়ে গিয়েছিলাম ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকার সেই সংখ্যাটি। কিন্তু অরুণেশদা কিছুতেই দেবেন না পত্রিকাটা, ভালো কইরে বোঝার চেষ্টা করো হাংরি ফিলজফিটারে। আগেই এই সব ল্যাখা পড়লে সব গুলায় যাবে।
কিন্তু আমাকে রুখিবে কে! প্রায় জবরদস্তি ম্যাগাজিনটা কেড়ে নিয়ে কোচবিহার থেকে মাথাভাঙা যাত্রাপথে ভিড় বাসের মেঝেতে বসে পত্রিকাটা শেষ করেছিলাম। এবং স্বীকার করতে বাধা নেই, সত্যিই মাথার ভেতরটা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। 
 সেদিনই তথ্য প্রমাণে জেনেছিলাম শৈলেশ্বর ঘোষ রচিত ‘তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি শূণ্য বিছানায়’ কবিতাটা নয় বরং মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটাকেই অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। জেনেছিলাম, হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট মলয়ের নেতৃত্বেই ঘটেছিল এবং কেসটাও সাজানো হয়েছিল মলয়েরই বিরুদ্ধে।


Wednesday, July 4, 2018

হাংরি আন্দোলন ছেড়ে সুবো আচার্যর পলায়নের ইতিবৃত্ত

( সুবো আচার্য ছিলেন হাংরি আন্দোলনকারী । তাঁর বিরুদ্ধেও গ্রেপতারি পরোয়ানা ছিল । কিন্তু তিনি সেসময়ে ত্রিপুরার একটি গ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দেন। পরে পুলিশ কেবল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে শুনে সুবো আচার্য ত্রিপুরা থেকে ফেরেন, এবং দেওঘরে গিয়ে অনুকূল ঠাকুরের শিষ্যত্ব নিয়ে সাহিত্যজগত থেকে উধাও হয়ে যান । স্টেট ব্যাংকের চিফ ম্যানেজার হিসাবে অবসর নেবার পর কলকাতায় ফিরলে 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার সম্পাদক প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে খুঁজে বের করে এই সাক্ষাৎকারটি নেন । আগ্রহীরা পড়ে সুবো আচার্যের পলায়ন ও পুনরাবির্ভাব ও নির্বাণের গল্প পাবেন সাক্ষাৎকারটিতে । 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকা, বসন্ত সংখ্যা, ২০১৪, ৭ বরদাকান্ত রোড, দমদম, কলকাতা ৭০০ ০৩০, মুঠোফোন : ৯৮৩১৬৭৯৩৭৭ ) 
প্রশ্ন : আপনার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না ।

 হাংরি আন্দোলন মামলায় যাঁরা রাজসাক্ষী হয়েছিলেন, তাঁদের মুচলেকা থেকে তাঁদের পারিবারিক তথ্য পাওয়া যায় । আপনি যদি আপনার জন্ম, বাবা-মা, পরিবার, বাল্যকাল নিয়ে কিছু বলেন তাহলে ভালো হয় । উত্তর: আর দশটা বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা যেভাবে মানুষ হয়, আমিও সেভাবেই মানুষ হয়েছি -- খুব অল্প বয়সেই, দেশভাগের সামান্য আগে আমরা বাঁকুড়ায় চলে আসি --- সেখানেই আমার বড়ো হওয়া --- স্কুল-কলেজের পরে কলকাতায় এসে পড়াশুনো -- প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাধ্যমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ( ড. হরপ্রসাদ মিত্রের সৌজন্যে ) কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ক্লাসে ভর্তি হই -- পরে এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকে, যে একসময় আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে আসি আমার তখনকার বন্ধু প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে -- মূল কারণ ছিল কবিতা লেখা ও জীবনকে দেখা -- এছাড়া আর কিছু নয় --- তখনও হাংরি জেনারেশানের কারুর সঙ্গে আলাপও হয়নি --- আমার এ সিদ্ধান্ধ একজনই মাত্র সমর্থন করেছিলেন -- তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় -- আয়ওয়া থেকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন --"যেভাবে জীবন কাটাতে চাইছ সেটা দিব্য"-- তারও প্রায় বছরখানেক বাদে যোগাযোগ হয় শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব, দেবী রায় আর ফালগুনী রায়ের সঙ্গে --- বন্ধুত্ব হয়, ভাববিনিময় হয়, একসঙ্গে উন্মত্ত জীবনযাপন শুরু হয় -- কলকাতার নাড়িনক্ষত্র, অন্ধিসন্ধি, গলিঘুঁজি দেখতে দেখতে চোখের ওপর থেকে যেন একটা পর্দা সরে যায় -- মলয়ের সঙ্গে জীবনে দুবারই দেখা হয়েছে --- একবার দুমকায় সমীরদার কোয়ার্টারে তাঁর আম্ন্ত্রণে গিয়ে -- দ্বিতীয়বার মলয় যখন সাহিত্যসংক্রান্ত মামলা মিটে যাওয়ার পর সুবিমল আর ত্রিদিবকে নিয়ে আমার তখনকার চাকরি স্হলে এসেছিলেন -- তখন সদ্য পিতৃহীন হয়েছি -- বিধবা মা আর এক দাদার সঙ্গে থাকতাম--- সঙ্গী ছিল গ্রন্হ, গ্রন্হ, গ্রন্হ --- লেখা আর লেখা আর লেখা আর বিরতিহীন, একাকী মদ্যপান আর মৃত্যুচিন্তা-- মৃত্যুর চিন্তা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল -- জীবনের এক বিচিত্র উদঘাটন হতে থাকে আমার কাছে --বাড়ির কাছেই ছিল একটা শ্মশান -- মধ্যরাতে ছাদে দাঁড়িয়ে মদ্যপ এক মৃত্যুচিন্তাকাতর যুবা, যে কয়েকবছর আগেও ধর্মতলা এলাকায় সন্ধ্যেয় ট্র্যাফিক অগ্রাহ্য করে উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাস্তা পেরোতো--- কলকাতা কিন্তু কবিকে অসন্মান করেনি -- নয়তো কবেই মরে যেতুম -- দেঘরে 'সৎসঙ্গ আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমীপে পৌঁছোই মৃত্যুরহস্য জানার জন্য -- তাঁরই নির্দেশে আমার দীক্ষা -- তাঁর দুটি মাত্র ছোট বাক্য বুঝতে আমার বছর আষ্টেক সময় লেগেছিল -- জীবনের দিগন্ত খুলে যেতে থাকে -- তাঁরই অনুপ্রেরণায় আমি যাবতীয় ধর্মগ্রন্হ থেকে হাহরণ করতে থাকি সারকথাগুলি--- জীবনের রাস্তাটাই সম্পূর্ণ বদলে যায় -- কথা যদি আমি বলি যে, তিনি সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে থাকেন-- তাহলে লোকে পাগল বলবে আমায় । এই যে আপনার প্রশ্নগুলির উত্তর লিখছি এখনও তিনি আমার সঙ্গে আছেন --- ফলে সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া বা অহং নিয়ে মত্ত হহোয়ার কোনো উপায়ই নেই । তাঁর অনন্ত করুণা ও দয়ায় আমি গোটা জীবনটাকে দেখতে পাই -- শুধু দেখি না, মৃত্যুর ওপরে বসে প্রার্থনা করি, "অন্ধজনে দেহ আলো, মৃত্যুজনে দেহ প্রাণ--" প্রশ্ন : হাংরি আন্দোলনে আপনি কার মাধ্যমে যোগ দিলেন ? কবে নাগাদ আপনার মনে হল যে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আপনি আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন ? যে কাজকর্মের জন্য ষাটের অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় হাংরিদের খ্যাতি, তাতে কি অংশ নিতেন ? খালাসিটোলা যাওয়া, গাঁজা-হ্যাশিশ টানা, দলবেঁধে যত্রতত্র যাওয়া, ইত্যাদিতে অংশ নিয়েছেন কি ? হাংরি আন্দোলন মকদ্দমায় আপনার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল । পুলিশ কি আপনার খোঁজে গিয়েছিল ? গ্রেপ্তার হলে মুচলেকা দিতেন ? মকদ্দমার সময়ে বন্ধুদের সমর্থনে নিম্ন/উচ্চ আদালতে যেতেন ? মকদ্দমার সময়ে আপনি কোথায় থাকতেন ? উত্তর : আমি, যতদূর মনে পড়ে, শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব এবং প্রদীপের সঙ্গেই মেলামেশা করতাম -- মলয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বহু পরে -- কারুর বেঁধে দেয়া ম্যানিফেস্টো বা নিয়মে লেখার কথা ভাবিনি কখনও, ফলে আমার ব্যাপারটা ছিল আমার মতন । লেখার ব্যাপারে আমার সেরকম কোনও বাসনা ছিল না -- শেক্সপিয়ার এর ঐ লাইনটা আমি খুব সমর্থন করি --"অ্যাম্বিশান ইজ এ থিং হুইচ মেকস অ্যান এনজেল এ সিনার" । প্রতিষ্ঠা বা নানারকম বিশেষণে ভূষিত হওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই । মলয়ের মামলা চলার সময়ে আমি ত্রিপুরায় থাকতাম -- তেলিয়ামুড়া নামে একটা জায়গায় স্কুলশিক্ষক ছিলাম -- কলকাতার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না -- ফলে এদিকের কিছুই জানতাম না । ওখানে ছমাসের বেশি থাকার পর আমি কলকাতায় ফিরে আসি । না, পুলিশ আমার সম্পর্কে কি কি করেছিল জানি না -- তবে, ওরা একটা ক্ষতি করেছিল -- ওদেই অ্যাডভার্স রিপোর্টের জন্য মিনিস্ট্রি অফ এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স এ আমার প্রায় হওয়া একটা চাকরি শেষ অব্দি হয়নি -- মনে পড়ে, খুব ব্যথা পেয়েছিলাম -- বাস্তব ক্ষতি হয়েছিল দুটো -- আমার পিতৃদেব খুব হতাশ অবস্হায় চলে গিয়েছিলেন -- এবং যে মেয়েটি আমার জন্য বহু বছর অপেক্ষা করেছিল, সে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে । কিন্তু এতে ওদের আর কি যায় আসে । আজ আমারও কিছু এসে যায় না । ইট ইজ এ পার্ট অফ দি গেম । ধ্বংস ও সৃষ্টির লীলা ছাড়া একে আর কি বলা যায় ! প্রশ্ন : আপনি কি নিজেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনে করেন ? অনেকে অভিযোগ করেন যে হাংরিরা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে অথচ গোষ্ঠীপতি দাদা ও বইবাজারের বাণিজ্যিক কর্তাদের ধরে সংকলন প্রকাশ করতে এবং তার জন্য টাকা নিতে, তাদের বাধে না । এ বিষয়ে আপনার অবস্হান যদি স্পষ্ট করেন । উত্তর : এই চিন্তা থেকে আমি লক্ষ মাইল দূরে । তাছাড়া আমি বোধহয়, সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিলাম না । শক্তি বা সন্দীপন সম্পর্কে কিছু বলতে পারবো না । তবে এদেশে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি লোভ অনেকেরই আছে । সকলেই তো আর সতীনাথ ভাদুড়ি বা শঙ্খ ঘোষ নন । তাছাড়া লেখাটাই তো কথা, মূল ব্যাপার । প্রশ্ন : 'কথা ও কাহিনি' প্রকাশিত সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন সমীর চৌধুরী । সম্পাদকীয় পড়ে আমাদের মনে হয়েছে যে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সমীর চৌধুরীর কোনো ধারণা ছিল না । তিনি কয়েকজনের রচনা নিয়ে দপ্তরির কাজ করেছেন । আপনি কী বলেন ? উত্তর : আপনার কথাই তো ঠিক । প্রশ্ন : দে'জ থেকে প্রকাশিত হাংরি সংকলনটিকে অনেকে বলেন 'দারা-পুত্র-পরিবার' সংকলন । যে চারজন হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, তাঁদের রচনা এই সংকলনে নেই । যাঁদের কার্যকলাপের জন্য হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি, তাঁদের রচনা নেই । যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরিয়েছিল, তাঁদের অধিকাংশের রচনা নেই । তার পরিবর্তে আছে অমুকের স্ত্রী, তমুকের শ্যালক, তমুকের আত্মীয়, পাঁচের দশকের কবি, ইত্যাদি । আপনি সৎপথের ধার্মিক মানুষ হয়ে কোন তর্কে এই সংকলনে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করলেন ? উত্তর : ঐ সংকলনের কথা আমি জেনেছি 'দেশ' পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে -- প্রদীপ চৌধুরীর টেলিফোন পেয়ে । আমি করলে অবশ্যই অন্যরকম হতো । মলয়কে বাদ দেয়া মানে তো শিরচ্ছেদ করা । প্রশ্ন : আপনি অনুকূল ঠাকুরের শরণাপন্ন কেন হলেন ? আপনি কি হাংরি আন্দোলনের জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বা অধঃপতনের পথে চলে যাচ্ছিলেন ? আপনার কি মনে হয়েছিল যে হাংরিদের জীবন প্রকৃতপক্ষে একটি ইঁদুরকল, এবং তা থেকে মুক্তি প্রয়োজন ? হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কি অনুকূল ঠাকুরের মতবিরোধ আছে ? অনেকে তেমনটাই মনে করেন । আপনি কি বলবেন ? উত্তর : প্রশ্নের প্রথম অংশ সম্পর্কে কিছুই বলবো না । শুধু দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা সম্পর্কে বলি -- বই পড়ে কখনও ভগবানের অনুভূতি হয় না -- ঈশ্বরের জ্ঞান পেতে হলে কি করতে হয় ? ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন, "ঈশ্বর শুদ্ধ মনের গোচর" -- আগে জলে নামতে হবে তবে তো সাঁতার -- ডাঙায় সাঁতার দিলে বুকের ছাল-চামড়া ছিঁড়ে যাবে । কবি সমর সেনের 'বাবু বৃত্তান্ত' পড়লে এমন একটা দৃষ্টান্ত পাবেন যা অফুরন্ত হাসির খোরাক হয়ে আছে । হাংরিরা অসম্পূর্ণ -- ঠাকুর সম্পূর্ণ -- তিনি দ্বন্দ্বাতীতং গান সদৃশং । প্রশ্ন : আপনি কোনো কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ করেননি কেন ? অথচ আপনি আপনার কবিতা 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দে'জ' প্রকাশিত সংকলনে অন্তর্ভুক্তির জন্য দিয়েছেন ? আপনি তো স্টেট ব্যাঙ্কের উঁচু পদে ছিলেন, মাইনেও ভালো পেতেন, তবু কাব্যগপ্রন্হ প্রকাশ করলেন না কেন ? আমরা, সাধারণ পাঠকরা, আপনার একটি কাব্যগপ্রন্হ খুঁজে বেড়াই । উত্তর : ভীষণ টাকার অভাব -- নয়তো, প্রকাশক পেলে হয়তো একটি বই বার করা যেতো । প্রশ্ন : আপনি কি মেডিটেশন করেন ? মেডিটেশনের সময়ে আপনার মনে কি কোনো কবিতার উন্মেষ ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয় ? এখনকার তরুণ কবিদের মেডিটেশান সম্পর্কে কোনো পথনির্দেশ দিতে পারেন কি ? উত্তর : পরামর্শ দিলে কেউ কি শুনবেন ? স্বামী বিবেকানন্দের 'ইন সার্চ অফ গড অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস' পড়েছেন ? সন্ত কবীরের দোহা পড়লে বিস্ময়ে মূক হয়ে যেতে হয় -- এগুলো সবই মেডিটেশনের পথে পাওয়া -- কবীর পড়তে পড়তে আমি বার বার দেখি রবীন্দ্রনাথের অনেক আগেই তিনি অনেক কথা বলেছেন যা রবীন্দ্রনাথে ঘুরে ফিরে এসেছে । তবে ব্যক্তিটি তো রবীন্দ্রনাথ -- অসম্ভব এবং প্রবল পরিপাক শক্তি ছিল তাঁর । কবীরের ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ রবীন্দ্রনাথ বাংলায় এনেছেন ঈষৎ পরিবর্তিত করে । এবং মনে হবে এসবই রবীন্দ্রনাথের । প্রশ্ন : সুভাষ ঘোষ ও বাসুদেব দাশগুপ্ত সিপিএম-এ যোগ দিয়ে ছিলেন, অথচ হাংরি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন । সুভাষ ঘোষের বাড়িতে জ্যোতি বসুর ফোটো ঝোলানো থাকত, লাল ঝাণ্ডার ভাঁড়ার ছিল । তাঁরা দুজনেই সিপিএম-এর মিছিলে অংশ নিতেন । তাঁদের এই রাজনৈতিক কার্যকলাপ কি প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে তাঁদের সুবিধাভোগী প্রমাণ করে না ? আপনার কি মনে হয় ? উত্তর : কি জানি, ওদের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে কখনও আমার সঙ্গে কথা হয়নি । বাসুদেবের শেষ দিকের রাজনৈতিক উপন্যাস আমার একেবারেই ভালো লাগেনি । প্রশ্ন : 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার হাংরি আন্দোলন সংখ্যা ( সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৩ ) পড়ে আপনার কি মনে হয়েছে যে 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দেজ' থেকে প্রকাশিত সংকলনগুলির তুলনায় এটি একটি সামগ্রিক কাজ, এবং সেকারণে প্রশংসনীয় ? উত্তর : কিছুই হয় না --- যতক্ষণ না দেখছি ততক্ষণ কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না । প্রশ্ন : আপনি কি জানেন যে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচ ডি এবং এম ফিল হয়েছে ? ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারিনা ডি হেলার হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেছেন ? ইউটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ফিল্ম তুলে নিয়ে গেছেন ? ইউ টিউবে হাংরি কবিতা পাঠ করে রেকর্ড করেছেন বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা ইত্যাদি দেশের কবিরা ? ফালগুনী রায়ের কবিতা নিয়ে ফিল্ম করেছেন শর্মী পাণ্ডে ? মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটি নিয়ে ফিল্ম করেছেন মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায় ? এই সংবাদগুলো শুনে আপনার কেমন প্রতিক্রিয়া হয় ? 'বাইশে শ্রাবণ' নামে একটি ফিল্মে প্রখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ জনৈক হাংরি কবির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, জানেন ? ফিল্মটি আপনি দেখে থাকলে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইব । উত্তর : সিনেমাটা আমার সেভাবে দেখা হয়নি । তবে গৌতম ঘোষ একজন ব্রিলিয়ান্ট অভিনেতা -- সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের পরে দুজন আমার খুব প্রিয় পরিচালক -- একজন আমার একদাকালের বন্ধু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত -- অন্যজন অবশ্যই দি ম্যাসকুলাইন বয় অফ মাই টাইম, গৌতম ঘোষ । তৃতীয়জন সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় । তবে যা বর্ণনা শুনেছি, আমরা একটু অন্যরকম ছিলাম । দৃশ্যত আমাদের অবয়বেই খানিকটা পাগলামির ভাব ছিল। কিন্তু আমরা আত্মহত্যা করিনি -- একটা অনুসন্ধান ছিল আমাদের -- সেটা অবিশ্যি এক একজনের এক একরকম । অ্যালেন গিন্সবার্গের তো শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধদর্শনে খুব বিশ্বাস হয়েছিল । যদিও ওঁর ঈশ্বরানুভূতির ব্যাপারটা সেভাবে আমাদের প্রভাবিত করেনি -- যা ওঁদের প্রবল ক্ষতি করেছে তা হল নানা রকমের নেশা । বাহিরের চেষ্টায় কিছু হবে না ভাই -- এটা সম্পূর্ণ অন্তর্গত ব্যাপার । প্রণব, শ্মশানে গেলেই কি সব হয় ? ঈশ্বরলাভের জন্য বহু জন্মজন্মান্তের সুকৃতি লাগে । আর লাগে সংকল্প, লাগে "মুখ্য হরিকথা -নিরূপণ" করে যাওয়া । মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঈশ্বরকে বা মূল উৎসকে খুঁজে পাওয়া -- সেটা হলেই সমস্ত অসম্পূর্ণতা তুচ্ছ হয়ে যায় । কবিতা মানে তো আমার কাছে আজ 'দি জার্নি টোয়ার্ডস দি ইটারনাল ট্রুথ -- আমি কি চাই ? এ টাচ অফ দি ইনফিনিট -- এ টাচ- এ রিয়াল টাচ । কোনো অজ্ঞাত কারণে আমার বেঁচে থাকা নয় । শংকরাচার্য বলতেন --ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা-- বুদ্ধও তাই বলতেন -- সূক্ষ্ম ভাবনা থেকে সূক্ষমতর ভাবনায় যেতে হবে -- বাসনার দাস হলে নির্বাণের পথ বন্ধ হয়ে যায় । সেইজন্যেই সহস্রমুখ চেতনার অধিকারী হতে হয় ।

হাংরি আন্দোলনকারীদের মুচলেকা

মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে নালিশ ও হাংরি আন্দোলনকারীদের মুচলেকা


শক্তি চট্টোপাধ্যায় : ( বয়স ৩১ বছর ) পিতা বামাচরণ চ্যাটার্জি । ঠিকানা ৪ অধরচন্দ্র দাস লেন, কলকাতা।
আমার নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায় । আমি একজন স্নাতক এবং লেখক । আমি ইউএসআইস-এ একজন ক্যাজুয়াল অনুবাদক । এটা ঘটনা যে এই আন্দোলন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আমি আরম্ভ করেছিলাম। তারা প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছে দেখে আমি এই আন্দোলনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । আমি হাংরি জেনারেশন নামে পুস্তিকাটি দেখেছি যাতে আমার নাম প্রকাশকরূপে দেখানো হয়েছে । এই তথাকথিত হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং আমি তা প্রকাশ করিনি । আমি মলয় রায়চৌধুরী ও তার দাদা সমীর রায়চৌধুরীএবং সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী ও উৎপলকুমার বসুকে চিনি । আমি মলয় রায়চৌধুরীর হাতের লেখার সঙ্গে পরিচিত । এই পুস্তিকাটি কোথা থেকে ছাপানো হয়েছে এবং কে এর খরচ দিয়েছে তা আমি জানি না ।
আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর রচনাগুলো মানসিক বিকৃতিতে পরিপূর্ণ এবং তার ভাষা নোংরা ।
আমি পুস্তিকাটির একটি কপি দেখেছি এবং মলয় রায়চৌধুরীর লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ শিরোনামের কবিতাটির ঘোর নিন্দা করেছি । ( ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫, স্বাক্ষর শক্তি চট্টোপাধ্যায় ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাক্ষী।
পবিত্র বল্লভ : ( বয়স ২২ বছর ) পিতা ঠাকুরদাস বল্লভ । ঠিকানা ২৮/এ পাইকপাড়া রো, কলকাতা ৩৭।
আমার নাম পবিত্র বল্লভ । ১৯৬৩ সালে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছি । কামারহাটির সাগর দত্ত ফ্রি হাই ইংলিশ স্কুলে আমি সহশিক্ষক । প্রথমদিকে যে আইডয়া নিয়ে হাংরি জেনারেশন আরম্ভ হয়েছিল তা আমি গ্রহণ করেছিলাম কিন্তু প্রাসঙ্গিক পুস্তিকাটি প্রকশের পর আমি বুঝতে পারি যে তারা মূল ধ্যানধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করি । যতোদূর আমার মনে আছে দুই বছর পূর্বে হাংরি জেনারেশনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংখ্যায় আমার নাম কেবল প্রকাশিত হয়েছিল । তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হবার পর আমি কোনো লেখা দিইনি । কোথা থেকে রচনাগুলি প্রকাশিত হয় এবং কে ছাপার খরচ দেয় তা আমি জানি না ।
আমার মতে তাদের রচনাবলী মানসিক বিকৃতিতে পূর্ণ এবং ভাষা বেশ নোংরা । আমি পুস্তিকাটির একটি কপি দেখেছি এবং মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির ঘোর নিন্দা করেছি । আমি মলয় রায়চৌধুরীর হাতের লেখার সঙ্গে পরিচিত । ( ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর পবিত্র বল্লভ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাজানো সাক্ষী ।
শৈলেশ্বর ঘোষ : ( বয়স ২৬ বছর ) পিতা বিশেশ্বর ঘোষ । ঠিকানা ১৬/বি শ্যামাচরণ মুখার্জি স্টপিট, কলকাতা এবং রঘুনাথপুর গ্রাম, পুলিশ স্টেশান বালুরঘাট, জেলা দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ ।
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি ১৯৫৩ সনে বালুরঘাত হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২ সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন থাড়া নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি যে হাংরি জেনারেশন প্রকাশিত হবে । একমাস আগে  তাঁর কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি, তাতে কপিগুলো ছিল। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোট দুবার কবিতা লিখেছি। মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দুতিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে কোন নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এইসব কাগজপত্র আমার ঘরেই থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। আমি উপরোক্ত ঠিকানায় ৪৫ টাকা মাসিক ভাড়ায় আমার আত্মীয় সুভাষ ঘোষের সঙ্গে গত দুই বছর যাবত রয়েছি । ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না। আমি অশ্লীল রচনা লিখব না এবং তা আমার সাহিত্যিক নির্ণয় । বর্তমান বুলেটিনটি ছাপিয়েছেন প্রদীপ চৌধুরী। ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর শৈলেশ্বর ঘোষ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের রাজসাক্ষী ।
                                      
                                        Saileswar Ghosh
সমীর বসু : ( বয়স ২৩ বছর ) । পিতা রাখালচন্দ্র বসু । ঠিকানা ৫/এ মোতিলাল শীল লেন, কলকাতা ১১
আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ও বর্তমানে বেকার । আমি একজন লেখক এবং কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে প্রায়ই যেতাম, যেখানে সন্ধ্যাবেলায় কলকাতার কমবয়সী লেখকরা একত্রিত হন । আমি হাংরি জেনারেশনের উদ্যোক্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, মলয় রায়চৌধুরী ও সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে জানতে পেয়েছিলাম ।
আমি এবং আরও কয়েকজন লেখক অর্থাৎ আনন্দ চট্টোপাধ্যায়, মলয় দাশগুপ্ত, শংকর দে ও অন্যান্য অনেকে সাহিত্যের সম্পর্কে  হাংরি জেনারেশনের মতাদর্শ অনুমোদন করিনি ।
আমার মতে তাদের রচনাবলী মানসিক বিকৃতির প্রকাশ এবং ভাষা অত্যন্ত নোংরা । বিদেশি বিট কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই আন্দোলন শক্তি চট্টোপাধ্যায় আরম্ভ করেছিলেন কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী এই আন্দোলনের নেতা নন । আমাকেও হাংরি জেনারেশনে লিখতে বলা হয়েছিল কিন্তু আমি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলাম ।
ওরা কফিহাউসে যে ম্যানিফেস্টোগুলো বিতরণ করত তার কয়েকটা আমি পেয়েছিলাম । এই বিশেষ পুস্তিকাটি মলয় রায়চৌধুরীর উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল । আমি তাকে দেখেছি কফিহাইসে লেখকদের কাছ থেকে লেখা চাইতে । এই পুস্তিকাটি আমি দেখেছি এবং মলয়ের লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি তৎক্ষণাৎ নিন্দা করেছি ।
আমি মনে করি যে সাহিত্যের নামে এই ধরণের অশ্লীলতা এখনই বন্ধ করে দেয়া উচিত ।
( ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৪, স্বাক্ষর সমীর বসু ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাজানো সাক্ষী ।
সুভাষ ঘোষ: ( বয়স ২৭ বছর ) । পিতা শরৎচন্দ্র ঘোষ । ঠিকানা ১৬বি শ্যামাচরণ মুখার্জি স্টিট, কলকাতা ২ এবং গ্রাম শেখেরপোলা, পুলিশ স্টেশান বগুড়া, পোস্ট ভবানীগঞ্জ, জেলা বগুড়া, পূর্ব পাকিস্তান ।
আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ, পিতা শরৎচন্দ্র ঘোষ। আমি ১৬বি শ্যামাচরণ স্ট্রিট, কলকাতা-২-এর একতলার একটি ঘরে শৈলেশ্বর ঘোষের সঙ্গে থাকি, যে আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় । বাড়ির মালিক অমূল্য দে ঐ বাড়িতেই থাকেন এবং আমাদের কাছ থেকে ৪৫ টাকা মাসিক ভাড়া আর ইলেকট্রিক খরচের জন্য দুই টাকা নেন।আমি এবং শৈলেশ্বর ঐ ঘরে গত দুই বছর থেকে রয়েছি । ১৯৪৯ বা ১৯৬০ সালে আমি বগুড়া থেকে বালুরঘাটে মাইগ্রেট করি এবং আমার খুড়তুতো ভাই মৃণালকান্তি ঘোষ, যিনি একজন ব্যবসায়ী তাঁর  বাড়িতে আশ্রয় নিই । বালুরঘাটে আমাকে বালুরঘাট হাই স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি করা হয় এবং ১৯৫৩ সালে আমি সেখান থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করি । ১৯৫৫ সালে বালুরঘাট কলেজ থেকে আইএস সি পাশ করি । সাধারণত আমি আমার খরচ আমার পিতা এবং বিশেষ করে আমার বড়ো ভাই অতুলচন্দ্র ঘোষ, যিনি দ্বারভাঙ্গা শুগার মিলে কাজ করেন তাঁর কাছ থেকে পেতাম ।
১৯৫৫ সালে আমি কলকাতায় আসি ও বিদ্যাসাগর কলেজে বিএসসি পড়ার জন্য ভর্তি হই এবং কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতায় বিদ্যাসাগর লজে থাকা আরম্ভ করি ।
১৯৫৭ সালে আমি বিএসসি পাশ করি। তারপর, অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে সিটি কলেজে বিএ কোর্সে ভর্তি হয়ে এক বছরের জন্য পড়ি । ব্যক্তিগত কারণের জন্য আমি ঐ কলেজে ছাত্র হিসাবে উইথড্র করে নিয়ে ১৯৬০ সালে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিই । সেই বছরই আমি হজুরি মল লেনের ( মুচিপাড়া  পুলিশ স্টেশান ) বেঙ্গল লাইব্রেরি অ্যাসোশিয়েশান থেকে লাইব্রেরিয়ানশিপের সার্টিফিকেট কোর্স পাশ করি । ১৯৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমার জন্য ভর্তি হই এবং ১৯৬২ সালে সাফল্যের সঙ্গে পাশ করি । ১৯৬২ সালে আমি হুগলি ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে মাসিক ১৮৯ টাকায় গ্রন্হাগারিকের চাকরি পাই এবং এক বছর কাজ করার পর পদত্যাগ করে বালুরঘাটে আমার অসুস্হ পিতাকে দেখতে যাই ; তিনি মারা যান । ১৯৬৩ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে  আমি কলকাতায় ফিরে এসে ইনটারভিউ দিই এবং জুলাই ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেলেঘাটাস্হিত ডিগ্রি কলেজ অফ সেরামিক টেকনোলজিতে গ্রন্হাগারিকের চাকরি পাই ।
গত এক বৎসর যাবত আমি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে যাতায়াত করছি । সেখানে একদিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয় ; সে জানায় যে সে একজন লেখক । সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায় । হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের প্রকাশের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি আন্দোলনের যে ঠিক কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি না । আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । আমি তা আমার রুম মেট শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে পাই । সে হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, বাসুদেব দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে ১৯৬৪ সালে দেখা করি ।
আমি এই ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে কখনও নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ । আমি ভাবতে পারি না যে এরকম একটা পত্রিকায় আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত হবে । আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করিনা, আর এই লেখাটা প্রকাশ হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । অশ্লীল রচনা লেখা আমার উদ্দেশ্য নয় এবং পূর্বেও ছিল না । ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর সুভাষ ঘোষ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের রাজসাক্ষী ।
                                          
                                   Subhas Ghose with wife Kanak Ghose
উৎপলকুমার বসু : ( বয়স ২৮ বছর ) । পিতা : পি.কে. বসু । ঠিকানা : ২৫ রয়েড স্ট্রিট, কলকাতা ২৬
আমি অবিবাহিত এবং আমার বয়স ২৮ বছর । বর্তমানে আমি ২৫ রয়েড স্ট্রিটে থাকি । আমি জিওলজিতে স্নাতকোত্তর এবং আশুতোষ কলেজে লেকচারার হিসাবে যুক্ত ।
১৯৬২ সালে বা তার কাছাকাছি সময়ে হাংরি জেনারেশন প্রকাশনা সর্বপ্রথম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । আমি সাহিত্য আন্দোলনে আগ্রহী ছিলাম । পরে আমি মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হই এবং তার দাদা সমীর রায়চৌধুরী আমার পূর্বপরিচিত । এই গোষ্ঠীর একত্রিত হবার জায়গা ছিল কলেজ স্ট্রিট কফিহাউস এবং ক্রমে-ক্রমে আমি অন্য সদস্যদের সঙ্গেও পরিচিত হই, যথা শৈলেশ্বর, সুভাষ এবং দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া এবং তাদের অনুরোধে আমি বিভিন্ন সময়ে হাংরি জেনারেশন পুস্তিকায় প্রকাশের জন্য লেখা ও কবিতা দিয়েছি । প্রকাশনাটি কোথা থেকে ছাপানো হতো এবং কে এর ছাপাবার খরচ দিতেন তা আমি জানি না ।
১৯৬৪ সালে গ্রীষ্মের সময়ে মলয় পাটনা থেকে কলকাতায় এসে আমাকে জানান তিনি পুস্তিকা প্রকাশের ব্যবস্হা করছেন এবং আমাকে একটি লেখা দিতে অনুরোধ করেন । আমি ‘কুসংস্কার’ নামে একটি লেখা দিই । আমি ব্যক্তিগতভাবে পাণ্ডুলিপি মলয়কে দিয়েছিলাম ও তারপরে কলকাতা ছেড়ে ডালহাউসি রওনা দিই, যেখানে আমি প্রায় দু’মাস ছিলাম । কলকাতায় ফিরে আমি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে পুস্তিকাটির একটি কপি দেখতে পাই । পরে আমি ডাকেও একটি কপি পাই ।
আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর রচনাবলী নিদারুণ বিরক্তি ও ননসেন্সের বোধ বহন করে । আমি মনে করি ওদের সাহিত্য আন্দোলন দুশ্চরিত্রতায় অধঃপতিত হয়েছে এবং সেকারণে আমি হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । মলয়ের হাতের লেখা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে ।
( ৫ এপ্রিল ১৯৬৫ , স্বাক্ষর উৎপলকুমার বসু )। মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী ।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় : ( বয়স ৩০ বছর ) । পিতা : ইউ এন চ্যাটার্জি । ঠিকানা : ১৮ সারদা চ্যাটার্জি লেন, হাওড়া ।
আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং কলকাতা কর্পোরেশনে অ্যাসিসট্যান্ট ইন্সপেক্টরের চাকরি করি । সেই সঙ্গে আমি একজন লেখক এবং কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে যেতাম যেখানে সন্ধ্যাবেলায় কলকাতার তরুণ সাহিত্যিকরা একত্রিত হন । সমীর রায়চৌধুরী আমার ব্যক্তিগত বন্ধু । হাংরি জেনারেশনের উদ্যোক্তা অর্থাৎ শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যান্যদের সঙ্গে আমি পরিচিত হই । যদিও আমি হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নই, সাহিত্য আন্দোলনে আমার আগ্রহ ছিল । হাংরি জেনারেশনের কয়েকটি ম্যানিফেস্টোতে আমার রচনার বিজ্ঞাপন আছে । একটি প্রকাশনায় আমার নাম প্রকাশক হিসাবে ছাপা হয়েছে । তা করা হয়েছে লেখক হিসাবে আমার খ্যাতি ব্যবহার করার জন্য কিন্তু যেহেতু আগে থাকতে আমার অনুমতি নেয়া হয়নি, আমি প্রতিবাদ করি । বর্তমান প্রকাশনাটিও আমার চোখে পড়েছে । একজন কবি হিসাবে আমি মলয় রায়চৌধুরীর  ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির বিষয়বস্তু কিংবা ভাষাকে অনুমোদন করি না । মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে চিঠিপত্রে আমার যোগাযোগ ছিল, সে সাহিত্যিক বিষয়ে আমার মতামত চাইতো । ( ১৫ মার্চ ১৯৬৫, স্বাক্ষর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী ।

Monday, June 25, 2018

হাংরি আন্দোলন

হাংরি আন্দোলন


বাংলা সাহিত্যে স্থিতাবস্থা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি আন্দোলন, যাকে অনেকে বলেন হাংরিয়ালিস্ট, ক্ষুধিত, ক্ষুৎকাতর, ক্ষুধার্ত আন্দোলন । আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদর্শটিকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না বলে, আন্দোলনকারীরা শেষাবধি হাংরি শব্দটি গ্রহণ করেন । হাংরি আন্দোলন, এই শব্দবন্ধটি বাংলাভাষায় ঠিক সেভাবে প্রবেশ করেছে যে ভাবে মুসলিম লিগ, কম্ম্যুনিস্ট পার্টি বা কংগ্রেস দল ইত্যাদি সংকরায়িত শব্দবন্ধগুলো । উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ডিসকোর্সের সংকরায়ণকে স্বীকৃতি দেয়া তাঁদের কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল । ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায় ।কবিতা সম্পর্কিত ইশতাহারটি ছিল ইংরেজিতে, কেন না পাটনায় মলয় রায়চৌধুরী বাংলা প্রেস পাননি । আন্দোলনের প্রভাবটি ব্যাপক ও গভীর হলেও, ১৯৬৫ সালে প্রকৃত অর্থে হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যায় । নকশাল আন্দোলনের পর উত্তরবঙ্গ এবং ত্রিপুরার তরুণ কবিরা আন্দোলনটিকে আবার জীবনদান করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তাত্ত্বিক ভিত্তিটি জানা না থাকায় তাঁরা আন্দোলনটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি ।

আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি

হাংরি আন্দোলনকারীরা হাংরি শব্দটি আহরণ করেছিলেন ইংরেজি ভাষার কবি জিওফ্রে চসারের ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম বাক্যটি থেকে , অর্থাৎ দেশভাগোত্তর বাঙালির কালখণ্ডটিকে তাঁরা হাংরিরূপে চিহ্ণিত করতে চাইলেন । তাত্তিক ভিত্তি সংগ্রহ করা হয়েছিল সমাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট গ্রন্হটির দর্শন থেকে । স্পেংলার বলেছিলেন, একটি সংস্কৃতি কেবল সরলরেখা বরাবর যায় না; তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় । তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোনদিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না । যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয় । তার সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে, তা বাইরে থেকে যা পায় ত-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তখন তৃপ্তিহীন । হাংরি আন্দোলনকারীদের মনে হয়েছিল দেশভাগের ফলে ও পরে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মণীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় । সেকারণে হাংরি আন্দোলনকে তঁরা বললেন কাউন্টার কালচারাল আন্দোলন, এবং নিজেদের সাহিত্যকৃতিকে কাউন্টার ডিসকোর্স।তাঁরা বললেন, "ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের ধারণার বনেদের ওপর; কল্লোল বা কৃত্তিবাস গোষ্ঠী যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলো ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেন না সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্হনা-নির্ভর, এবং তাঁদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত ।" তঁরা বললেন, "এই ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদেরকে পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, এবং স্হানিকতেকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে । ওই ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে-মননর্স্তাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্হানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায় । গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ । ঠিক এই কারণেই, ইউরেপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো । কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে পঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন । এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠিও সীমিত হয়ে গেছে মাত্র কয়েকজন মেধাসত্তবাধিকারীর নামে । পক্ষান্তরে, ঔপনিবেশিক ননগদনতন্ত্রের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবা হয়, তাহলে দেখা যায় যে পদাবলী সাহিত্য নামক ম্যাক্রো পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ, মঙ্গলকাব্য নামক পরিসরে সংকুলান ঘটেছে মনসা, চণ্ডী, শিব, কালিকা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর । লক্ষ্মণিয় যে প্রাকৌপনিবেশিক কালখণ্ডে সন্দর্ভ গুরুত্ত্বপূর্ণ ছিল, তার রচয়িতা নয় ।

আন্দোলনের প্রসার

১৯৬২-৬৩ সালে হাংরি আন্দোলনে যোগদান করেন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, অনিল করঞ্জাই, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, রবীন্দ্র গুহ, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ । অনিল করঞ্জাই এবং করুণনিধান মুখোপাধ্যায় ছিলেন চিত্রকর । সত্তর দশকের শেষে যাঁরা পুনরায় আন্দোলনটিকে জিইয়ে তোলার চেষ্টা করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অরুণেশ ঘোষ, অরণি বসু, অরুণ বণিক, অলোক গোস্বামী, আপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিত্য মালাকার, কিশোর সাহা, জামালউদ্দিন, জীবতোষ দাশ, দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্মল হালদার, দেবজ্যোতি রায়, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, প্রিতম মুখোপাধ্যায়, বিজন রায়, রবিউল, সমীরণ ঘোষ, রতন নন্দী, রাজা সরকার, সত্যেন চক্রবর্তী, সৈকত রক্ষিত, সুব্রত রায়, সুব্রত চক্রবর্তী, রসরাজ নাথ, সেলিম মোস্তফা, শঙ্খপল্লব আদিত্য, সুভাষ কুন্ডু , স্বপন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ।

মুখপত্র

হাংরি আন্দোলনকারিরা প্রধানত একপৃষ্ঠার বুলেটিন প্রকাশ করতেন । যেগুলো পাটনা থেকে প্রকাশিত, সেগুলো ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল । কখনও বা পোস্টকার্ড, পোস্টার এবং এক ফর্মার পুস্তিকা প্রকাশ করতেন । এক পাতার বুলেটিনে তঁরা কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, অশ্লীলতা, জীবন, ছোটগল্প, নাটক, উদ্দেশ্য, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে ইশতাহার লেখা ছাড়াও, কবিতা, গদ্য, অনুগল্প, স্কেচ ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন । বুলেটিনগুলো হ্যান্ডবিলের মতন কলকাতার কলেজ স্টিট কফি হাউস, পত্রিকা দপতর, কলেজগুলোর বাংলা বিভাগ ও লাইব্রেরি ইত্যাদিতে তাঁরা বিতরন করতেন । হাংরি আন্দোলনের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এইটি-ই প্রধান কারণ বলে মনে করেন গবেষকরা । কিন্তু হ্যান্ডবিলের মতন প্রকাশ করায় তাঁরা এতি হাসিক ক্ষতি করেছেন নিজেদের, কেন না অধিকাংশ বুলেটিন সংরক্ষণ করা সংগ্রাহকদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি । কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র বহু চেষ্টায় গোটা দশেক সংগ্রহ করতে পেরেছেন । ঢাকা বাংলা একাডেমিও কয়েকটি সঙগ্রহ করতে পেরেছেন । ১৯৬৩-৬৫ সালের মাঝে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন । সেগুলো হল, সুবিমল বসাক সম্পাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত উন্মার্গ, মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা, দেবী রায় সম্পাদিত চিহ্ণ, প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ফুঃ সতীন্দ্র ভৌমিক সম্পাদিত এষণা, এবং আলো মিত্র সম্পাদিত ইংরেজি দি ওয়েস্ট পেপার । পত্রিকাগুলোর প্রতিটি সংখ্যা সংরক্ষণের প্রয়াস করার প্রয়োকন, মনে হয়, তাঁরা করেননি । কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি মাত্র কয়েকটি সংখ্যা সংগ্রহ করতে পেরেছে । বিট আন্দোলনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতায় থাকাকালীন ইংরেজি বুলেটিনগুলো সংগ্রহ করে স্ট্যনফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করে গেছেন বলে বিদেশী গবেষকদের সৌজন্যে এগুলোর অবস্হান জানা যায় । সত্তর দশকের শেষাশেষি আন্দোলনটিকে পুনরায় জীবিত করার যখন অসফল প্রবাস করা হয়েছিল, তখন অরুণেষ ঘোষ প্রকাশ করেন জিরাফ, অলোক গোস্বামী প্রকাশ করেন কনসেনত্রশান ক্যাম্প, সুভাষ ঘোষ সম্পাদনা করেন আর্তনাদ, এবং অন্যান্যরা ক্ষুধার্ত, ক্ষুধার্ত খবর, ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ, রোবট, ধৃতরাষ্ত্র ইত্যাদি ।

প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা]

সুবিমল বসাক, দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীর কিছু-কিছু কার্যকলাপের কারণে ১৯৬৩ সালের শেষার্ধে হাংরি আন্দোলন বাঙালির সংস্কৃতিতে প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত হয় । বহু আলোচক হাংরি আন্দোলনকারীদের সে সময়ের কার্যকলাপে ডাডাবাদের প্রভাব লক্ষ করেছেন । এই কারণে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যাব, সতীন্দ্র ভৌমিক প্রমুখ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন । শ্মশান, গোরস্তান,ভাটিখানা,আওড়া ও শেয়ালদা স্টেশনে তাঁরা কবিতা পাঠের আয়োজন করতেন;'মুখোশ খুলে ফেলুন লেখা জীব-জন্তু, দেবতা, দানবের মুখোশ পাঠাতেন মন্ত্রী, সমালোচক, প্রশাসকদের; কবিদের সমালোচনা করতেন বিবাহের কার্ডে; তৎকালীন মানদণ্ডে অশ্লীল স্কেচ ও পোস্টার আঁকতেন ও বিলি করতেন; একটি গ্রন্হের দাম রাখতেন লক্ষ টাকা বা কয়েকটি টি.বি. সিল ।বাণিজ্যিক পত্রিকায় গ্রন্হ রিভিউ করার জন্য জুতোর বাক্স পাঠাতেন কিংবা শাদা কাগজ পাঠাতেন ছোটগল্প নামে । তাঁদের রচনায় প্রশাসন ও মিডিয়াকে আক্রমণ করতেন ।বেনারস এবং কাঠমান্ডু গিয়ে সাহিত্য সম্পর্কহীন হিপিনীদের সঙ্গে মাদকসেবন এবং যৌন যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হয়ে সেখানকার সংবাদপত্রে শিরোনাম হতেন । পেইনটিং প্রদর্শনী করে শেষ দিন প্রতিটি ছবিতে আগুন ধরিয়ে দিতেন । এই সমস্ত অসাহিত্যিক কার্যকলাপের মাধ্যমে তাঁরা দাবী করতেন যে অচলায়তনকে ভাঙা যাবে । অবশ্য তাঁদের অনুকরণে পরবর্তীকালে বহু প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক এসেছেন বাংলা সাহিত্যে, যদিও সাহিত্যের বাইরে তাঁরা অন্য কাজ করেননি। কিন্তু হাংরি আন্দোলনকারীদের কার্যকলাপে প্রশাসন অচিরে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হল ।

হাংরি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ]

১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইনডিয়ান পিনাল কোডের ১২০বি, ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় ১১ জন হাংরি আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবেছিল । তাঁরা হলেন: সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, দেবী রায় , সুভাষ ঘোষ , শৈলেশ্বর ঘোষ , প্রদীপ চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং সুবিমল বসাক । এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জনকে গ্রেপতার করা হয় এবং কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে তোলা হয় । মলয় রায়চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া এবং কোমরে দড়ি বঁধে রাস্তায় হঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হব চোর-ডাকাতদের সঙ্গে । মকদ্দমার ফলে উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, প্রদীপ চৌধুরী রাসটিকেট হন বিশ্বভারতী থেকে, সমীর রায়চৌধুরী সরকারি চাকরি থেকে সাসপেন্ড হন, সুবিমল বসাক ও দেবী রায়কে কলকাতার বাইরে বদলি করে দেয়া হয়, সুবো আচার্য ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ফেরার হয়ে যান । অনেকে হাংরি আন্দোলন ভয়ে ত্যাগ করেন । লালবাজারের কনফারেন্স রুমে মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরীকে জেরা করেন একটি ইনভেসটিগেটিং বোর্ড যার সদস্যরা ছিলেন স্বরাষ্ট্র দপতর, পুলিশ প্রশাসন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ, ভারতীয় সেনার প্রতিনিধিরা এবং পশ্চিমবঙ্গের আ্যাডভোকেট জেনারাল । ১২০বি ধারাটি ছিল ষড়যন্ত্রের, এবং সেকারনে প্রত্যেক হাংরি আন্দোলনকারী সম্পর্কে ডোসিয়ার খুলে ফেলেছিলেন কলকাতা গোয়েন্দা বি্ভাগ । গ্রেপতারের সময়ে প্রত্যেকের বাড়ি লণ্ড-ভণ্ড করা হয়েছিল । বইপত্র, ডায়েরি, টাইপরাইটার, ফাইল, পান্ডুলিপি, কবিদের চিঠির সংগ্রহ ইত্যাদি যেগুলো পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল তা আর তাঁরা ফেরত পাননি ।

হাংরি মোকদ্দমা

হারি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা দায়ের হয় ১৯৬৪ সালে এবং তা চলে ৩৫ মাস, অর্থাৎ ১৯৬৭ পর্যন্ত । ১২০বি এবং ২৯৪ ধারা তুলে নিয়ে কেবল ২৯২ ধারায় চার্যশীট দেয়া হয় মলয় রায়চৌধুরীরবিরুদ্ধে তাঁর প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতাটির জন্য ; বাদবাকি সবাইকে রেহাই দেয়া হয় । নিম্ন আদালতে সাজা হলেও, তিনি উচ্চ আদালতে মামলা জিতে যান । কিন্তু মোকদ্দমাটির কারণে তাঁদের খ্যাতি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। সুবিমল বসাকের হিন্দি ভাষায় দখল থাকায় ভারতের অন্যান্য ভাষার সংবাদপত্র ও পত্রিকায় তাঁদের রচনা ও কাজকর্ম নিয়ে প্রচুর বিতর্ক তাঁদের প্রচারের আলোয় নিয়ে আসে। হাংরি আন্দোলনকারীরা তা-ই চাইছিলেন। পশ্চিম বাংলার ট্যাবলয়েডগুলোতে তাঁদের নিয়ে রসালো সংবাদ, এমনকি জনতা (৯.১০.৬৪), দৈনিক যুগান্তর(৭.৮.১৯৬৪ সুফী), আনন্দবাজার( ৮.৯.৬৪ চন্ডী লাহিড়ী) ও স্টেতসম্যান (২০.১২.৬৪ রবি) পত্রিকায় দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীর কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল । দৈনিক যুগান্তর-ই তিন দিন প্রধান সম্পাদকীয় (১৯.৭.৬৪, ৭.৯.৬৪, ১৫.৪.৬৫) লিখেছিলেন কবি কৃষ্ণ ধর। আমেরিকার টাইম পত্রিকায় ( নভেমবর ১৯৬৪) তাঁদের ফোটো এবং সংবাদ প্রকাশিত হবার ফলে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার পত্রপত্রিকা তাঁদের সংবাদ ও রচনা প্রকাশ করার জন্য কলকাতায় প্রতিনিধি পাঠায় । ভারতবর্ষে তাঁরা সমর্থন পেয়ে যান প্রতিষ্ঠিত লেখকদের। সাময়িক দুর্ভোগ হলেও হাংরি মকদ্দমা তাঁদের সাপে বর হয় । অনিল করনজাই ললিতকলা একাডেমীর পুরস্কার পান। অমেরিকা ও ইউরোপে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন বিশেষ হাংরি আন্দোলন সংখ্যা প্রকাশ করেছিল যা ওই বয়সের কবিলেখকদের জন্য নিঃসন্দেহে আকল্পনীয়। কলকাতায় এই ধরণের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল: "ইহা কি বেহুদা পাগলামি?" (দর্পণ, ১.৫.৬৪), "দেবদূতেরা কি ভয়ংকর" চতুষ্পর্ণা (পৌষ, ১৩৭০), "সাহিত্যে বিটলেমি কী এবং কেন?" (অমৃত, শ্রাবণ ৮, ১৩৭১), "হা-ঘরে সম্প্রদায়" (১.১০.৬৪), "কাব্যচর্চার নামে বিকৃত যৌনলালসা" (জনতা, ৪.৯.৬৪), "পুলিশি বেটন কি শিল্প বিচার করবে?" (দর্পণ, ২৭.১১.৬৪), "Erotic Lives & Loves of Hungry Generation" (Blitz, 19.9.64), "Middlebrows Thrive on New Kind of Writing" (The Statesman, 30.12.64), " Not By Poetry Alone" (NOW, 20.11.64)।

হাংরি আন্দোলনের অবদান

হাংরি আন্দোলনের অবদান সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচক বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন । হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে এম ফিল এবং পি আইচ ডি গবেষণা হয়েছে । অতএব যে কয়েকটি ক্ষেত্রে গবেষকরা একমত সেগুলি গ্রহণ করা যেতে পারে ।
(১). পত্রিকার নামকরণ : হাংরি আন্দোলনের পূর্বে পত্রিকার নাম হতো কবিতা, পূর্বাশা, অরণি কৃত্তিবাস, অগ্রণি, শতভিষা,উত্তরসূরী, ধ্রুপদী, সংবেদ, ক্রান্তি, চতুরঙ্গ ইত্যাদি । হাংরি আন্দোলনকারীরা যে-ধরণের নাম রাখার চল করলেন তা বৈপ্লবিক । ফলে তার পর থেকে পত্রিকার নামকরণে বিপুল পরিবর্তন ঘটল । যেমন, কৌরব, আবার এসেছি ফিরে, মানুষের বাচ্চা, ঢ়পের কাগজ, আমি আর লীনা হঁটে চলেছি, ক্ষেপচুরিয়াস, দিল্লী হাটার্স ইত্যাদি । (২) সাবঅলটার্ন বা নিম্নবর্গ থেকে সাহিত্যক্ষেত্রে আগমন, যা কবিতা, কৃত্তিবাস, শতভিষা, ধ্রুপদী ইত্যাদি পত্রিকায় দৃষ্টিকটুভাবে অনুপস্হিত থাকতো । হাংরি আন্দোলন প্রথম যৌথভাবে প্রন্তিকের ডিসকোর্সকে স্হান করে দিল । (৩). পাঠবস্তুতে মুক্তসূচনা ও মুক্তসমাপ্তির প্রচলন ,বিশেষ করে প্রদীপ চৌধুরী, ফালগুনী রায়, মলয় রায়চৌধুরী, ত্রিদিব মিত্র ও শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা-বিশেষ যেখান থেকে ইচ্ছা পড়া যায়, স্তবক ও পঙক্তি উপর-নিচ রদবদল করে পড়া যায় । একই প্রক্রিয়া গদ্যে এনেছেন সুভাষ ঘোষ, সমীর রায়চৌধুরী, ফালগুনী রায় ও সুবিমল বসাক । (৪). মনস্হিতি প্রকাশকালীন অব্যয় শব্দ কবিতায় প্রয়োগ; যেমন ওঃ, আঃ, আহ, আআআআআআআহ‌,, উঃ, শ্যাঃ, ফুঃ, হাহ ইত্যাদি, বিশেষ করে মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী ও ফালগুনী রায়- এর কবিতায় । (৫). পাঠবস্তুতে অনুক্রমহীনতা প্রয়োগ : বাক্যবুননে লজিকাল ক্র্যাক বা যুক্তিফাটল প্রয়োগ যা দেবী রায়, মলয় রায়চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ প্রমুখের কবিতার বৈশিষ্ট্য । সত্তর দশকের পর পশ্চিম বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে । (৬). গুরুচণ্ডালী শব্দগঠন ও বাক্য প্রয়োগ যা হাংরি আন্দোলনকারীদের পূর্বে নিষিদ্ধ ছিল বর্তমানে আকছার হয়ে গেছে । (৭). ভঙ্গুর বাকপ্রতিমা প্রয়োগ । হাংরি আন্দোলনকারীদের কবিতায় একটি ছবি সম্পূর্ণ গড়ে ওঠার আগেই তা মিলিয়ে গিয়ে আরেকটি ছবি ভেসে ওঠে । বাংলা কবিতায় এটি এখন প্রতিষ্ঠিত শৈলী । (৮). যৌন চিত্রকল্প, অশ্লীল শব্দ, গালমন্দ, নিচুতলার অভিব্যক্তি যা পাঁচের দশক পর্যন্ত পাঠবস্তুতে নিষিদ্ধ ছিল তার যথেচ্ছ প্রয়োগের সূত্রপাত করে গেছেন হাংরি আন্দোলনকারীরা । (৯). তাঁদের পাঠবস্তুর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গৌহাটি বিস্ববিদ্যালয়ের রিডার ড, শঙ্কর ভট্টাচার্য লিখেছেন যে সেগুলো "সাধারণত প্রতিবাদ-মুখর, আনুষ্ঠানিকতা-বর্জিত, প্রাতিস্বিকতায় ভঙ্গুর, অস্হির, আস্বস্তিকারক, ছকহিন, ঐক্যহীন, খাপছাড়া, এলোপাতাড়ি ও আয়রনিমূলক" । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীব প্রধান ড. তরুণ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, "ভাষায়, ছন্দে, অলংকার, স্তবকে তুমুল ভাংচুর" করেছেন তাঁরা, এবং "যৌনতার সঙ্গে এসেছে ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও অসহায় মানুষের নিস্ফলতার যন্ত্রণা; আত্মপ্রক্ষেপ ঘটিয়ে তঁরা নিরপেক্ষ হয়ে যান" । আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি. দে মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন বিষয়ে ৩৫০ পৃষ্ঠার গবেষণার জন্য পিএচ.ডি. সন্মান দ্বারা ভূষিত হয়েছেন ।

সিনেমায় হাংরি আন্দোলন

বাইশে শ্রাবণ ফিল্মটির পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় । এই ছবিতে গৌতম ঘোষ (সনামধন্য চিত্রপরিচালক) একজন হাংরি আন্দোলনকারী কবির অনবদ্য আভিনয় করেছেন। মেইন স্ট্রিম বাংলা ফিল্মে ইতোপূর্বে হাংরি আন্দোলন নিয়ে কোনও কাজ হয়নি। ২০১১ বর্ষে হাংরি আন্দোলনের ৫০ বছর উপলক্ষে এই ফিল্মটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

কয়েকটি বহুচর্চিত ইশতাহার[সম্পাদনা]

  • 'কবিতা সম্পর্কিত প্রথম ইংরেজি ইশতাহার (নভেমবর ১৯৬১)' ।
Poetry is no more a civilizing manoeuvre, a replanting of the bamboozled gardens; it is a holocaust, a violent and somnambulistic jazzing of the hymning five, a sowing of the tempestual hunger.
Poetry is an activity of the narcissistic spirit. Naturally, we have discarded the blankety-blank school of modern poetry, the darling of the press, where poetry does not resurrect itself in an orgasmic flow, but words come up bubbling in an artificial muddle. In the prosed-rhyme of those born-old half-literates, you must fail to find that scream of desperation of a thing wanting to be man, the man wanting to be spirit.
Poetry of the younger generation too has died in the dressing room, as most of the younger prosed-rhyme writers, afraid of the satanism, the vomitous horror, the self-elected crucifixion of the artist that makes a man a poet, fled away to hide in the hairs.
Poetry from Achintya to Ananda and from Alokeranjan to Indraneel, has been cryptic, short-hand, cautiously glamourous, flattered by own sensitivity like a public school prodigy. Saturated with self-consciousness, poems have begun to appear from the tomb of logic or the bier of unsexed rhetoric.
  • ' কবিতা বিষয়ক প্রথম বাংলা ইশতাহার (নভেমবর ১৯৬১)' ।
কবিতা এখন জীবনের বৈপরীত্যে আত্মস্হ । সে আর জীবনের সামঞ্জস্যকারক নয় , অতিপ্রজ অন্ধবল্মীক নয়, নিরলস যুক্তিগ্রন্হন নয় । এখন, এই সময়ে, অনিবার্য গভীরতার সন্ত্রস্তদৃক ক্ষুধায় মানবিক প্রয়োজন এমনভাবে আবির্ভূত যে, জীবনের কোনো অর্থ বের প্রয়োজন শেষ । এখন প্রয়োজন অনর্থ বের করা, প্রয়োজন মেরুবিপর্যয়, প্রয়োজন নৈরাত্মসিদ্ধি । প্রগুক্ত ক্ষুধা কেবল পৃথিবী বিরোধিতার নয়, তা মানবিক, দৈহিক এবং শারীরিক । এ ক্ষুধার একমাত্র লালনকর্তা কবিতা, কারণ কবিতা ব্যতীত কী আছে আর জীবনে । মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে । কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয় ।
কবিতা থাকা সত্ত্বেও, অসহ্য মানবজীবনের সমস্তপ্রকার অসম্বদ্ধতা । অন্তর জগতের নিষ্ঠুর বিদ্রোহে, অন্তরাত্মার নিদারুণ বিরক্তিতে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রচিত হয় কবিতা । উঃ, তবধ মানবজীবন কেনএমন নিষ্প্রভ । হয়তো, কবিতা এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে যাঁরা অভ্যস্ত তাঁদের অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব এই সঙ্কটের নিয়ন্ত্রক ।
কবিতা বলে যাকে আমরা মনে করি, জীবনের থেকে মৌহমুক্তির প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণের ফলাফল তা কেবল নয় । ফর্মের খঙাচায় বিশ্বপ্রকৃতির ফাঁদ পেতে রাখাকে আর কবিতা বলা হয় না । এমনকি প্রত্যাখ্যাত পৃথিবী থেকে পরিত্রাণের পথরূপেও কবিতার ব্যবহার এখন হাস্যকর । ইচ্ছে করে, সচেতনতায়, সম্পুর্ণরূপে আরণ্যকতারবর্বরতার মথ্যে মুক্ত কাব্যিক প্রজ্ঞার নিষ্ঠুরতার দাবির কাছে আত্মসমর্পণই কবিতা । সমস্ত প্রকার নিষিদ্ধতার মথ্যে তাই পাওয়া যাবে অন্তরজগতের গুপ্তধন । কেবল, কেবল কবিতা থাকবে আত্মায় ।
ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন । টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে, কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে । এখন কবিতা রচিত হয় অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে । সেহেতু ত্রশ্নূ বলাৎকারের পরমুহূর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে 'সচেতনভাবে বিহ্বল' হলেই, এখন কবিতা সৃষ্টি সম্ভব । শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত । শখ করে, ভেবে-ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তূ কবিতা রচনা তেমন করে কোনো দিনই সম্ভব নয় । অর্থব্যঞ্জনাঘন হোক অথবা ধ্বনিপারম্পর্ষে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তিরশক্তি না থাকলে, কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতৌ অনুন্মেষিণী হয়ে যেতে পারে ।
  • মুক্তি বিষয়ক ১৪-বিন্দু ইশতাহার (১৯৬২)
১.আমার সম্পুর্ণ অহং-এর খাঁটি আবিষ্কার । ২. কবিতা চলাকালীন আমাকে এবং আমার সমস্ত কিছুকে যতরকমভাবে পারা যায় উপস্হিত করা । ৩. কবিতায় আমাকেঠিক সেই মুহূর্তে আটক করে ফাঁস করা যখন আমি কোনো না কোনো কারণে ফেটে পড়েছি, আর আমার ভেতর দিকতা বেরিয়ে পড়েছে । ৪. নিজস্ব অহং দিয়ে প্রতিটি মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ, তারপর স্বিকার আধবা প্রত্যাখ্যান । ৫. সমস্তকিছুকে বস্তু মনে করে আরম্ভ, এবং প্রত্যেকটিকে নাড়িয়ে দেখে নেওয়া যে তা প্রাণবন্ত কি না । ৬. সামনে এসে পড়া ব্যাপারকে হুবহু গ্রহণ না করে তার প্রত্যেকটি দীক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা । ৭. পদ্যছন্দ ও গদ্যছন্দ উভয়েরই অবলুপ্তি ঘটিয়ে একটা সহজসরল নিজস্ব শৈলীর ব্যবহার যা ধাঁ করে ঢুকে যাবে যাকে জানানো হচ্ছে তার মেজাজে । ৮. কথা বলার সময়ে যে ধরণ, মাপ আর ওজনের শব্দ ব্যবহার করা হয়, কবিতাতেও অবিকল তাই । ৯. কথা বলার সময়ে শব্দের ভেতরে যে ধ্রণের ধ্বনি পুরে দেয়া হয়, কবিতাকে সেই ধ্বনিতে আরও চাঁচাছোলা করে উদঘাটন করা । ১০. পাশাপাশি দুটি শব্দের এতাবতকালের আঁতাত ধাক্কা দিয়ে ভেঙে দেয়া এবং তদ্বারা অসবর্ণ ও অবৈধ শব্দ এবং বাক্য তৈরি । ১১. কবিতায় আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত সমস্ত সাহায্য প্রত্যাখ্যান, আর বাইরের কোনো রকম ঘুষ না নিয়ে কবিতাকে নিজেই মৌলিক হতে দেয়া । ১২. কবিতাই মানুষের সর্বশেষ ধর্ম, সে ব্যপারটা খোলাখুলি স্বীকার করা । ১৩. তীরের মতো বয়ানে অতিষ্ঠ অস্তিত্ব, বিবমিষা, বিরাগ আগাগোড়া তীব্রভাবে জানানো । ১৪. অন্তিম প্রাতিস্বিকতা ।
  • 'রাজনীতি বিষয়ক ইশতাহার (১৯৬৩)'
১.প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষের আত্মাকে রাজনীতিমুক্ত করা হবে । ২. প্রাতিস্বিক মানুষকে বোঝানো হবে যে অস্তিত্ব প্রাক-রাজনৈতিক । ৩. ইতিহাস দিয়ে বোঝানো হবে যে, রাজনীতি আহ্বান করে আঁস্তাকুড়ের মানুষকে, তার সেবার জন্যে টানে নান্দনিক ফালতুদের । ৪. এটা খোলসা করে দেয়া হবে যে গান্ধীর মৃত্যুর পর এলিট ও রাজনীতিকের মধ্যে তুলনা অসম্ভব । ৫. এই মতামত ঘোষণা করা হবে যে রাজনৈতিক তত্ব নামের সমস্ত বিদগ্ধ বলাৎকর্ম আসলে জঘন্য দায়িত্বহিনতা থেকে চাগিয়ে ওঠা মারাত্মক এবং মোহিনী জোচ্চুরি । ৬. বেশভার মৃতদেহ এবং গর্দভের লেজের মাঝামাঝি কোথাও সেই স্হানটা দেখিয়ে দেয়া হবে যেটা বর্তমান সমাজে একজন রাজনীতিকের । ৭. কখনও একজন রাজনীতিককে শ্রদ্ধা করা হবে না তা সে যেকোনো প্রজাতি বা অবয়বী হোক না কেন । ৮. কখনো রাজনীতি ধেকে পালানো হবে না এবং সেই সঙ্গে আমাদের কান্তি-অস্তিত্ব থেকে পালাতে দেয়া হবে না রাজনীতিকে । ৯. রাজনৈতিক বিশ্বাশের চেহারা পালটে দেয়া হবে ।

বিখ্যাত কয়েকটি হাংরিয়ালিস্ট কবিতা (১৯৬১-১৯৬৫)[সম্পাদনা]

কয়েকটি বিখ্যাত হাংরিয়ালিস্ট গদ্য (১৯৬১-১৯৬৫)[সম্পাদনা]

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...