Showing posts with label Postcolonialism. Show all posts
Showing posts with label Postcolonialism. Show all posts

Wednesday, November 20, 2019

হাংরি জেনারেশন - বাংলা সাহিত্যে প্রথম আভাঁ গার্দ আন্দোলন : অভিজিৎ পাল

 
হাংরি জেনারেশন : বাংলা সাহিত্যে প্রথম  আভাঁ গার্দ  আন্দোলন  
অভিজিৎ পাল      
          ১৯৩১ সালে লেখা পল ভালেরির এই বক্তব্য দিয়ে আরম্ভ করি, 
কেননা পশ্চিমবাংলার হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের আভাঁ গার্দ 
কাজগুলোর ক্ষেত্রে বক্তব্যটা খাটে : “আমাদের কারুশিল্পগুলো উন্নত 
হয়েছিল, তাদের প্রকার ও প্রয়োগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে সময়ে, 
তা বর্তমান সময় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, এবং বস্তুসমূহের ওপরে 
তখনকার লোকেদের প্রভাবক্ষমতা আমাদের সময়কার লোকেদের তুলনায়
 তুচ্ছ ছিল । আমাদের টেকনিকের বিস্ময়কর ক্রমবিকাশ, তারা যে 
অভিযোজ্যতা এবং যথাযথতা  অর্জন করেছে, তারা যে ধারণাগুলো
 আর অভ্যাসগুলো তৈরি করেছে তা নিশ্চিত করে যে সৌন্দয্যের 
প্রাচীন সংজ্ঞায় গভীর পরিবর্তন আসন্ন। সমস্ত কারুকলাতে একটি 
বস্তুগত উপাদান রয়েছে যা আর আগের মতো বিবেচনা বা অনুশীলন 
করা যায় না, যা আমাদের আধুনিক জ্ঞান এবং শক্তি দ্বারা প্রভাবিত নয় । 
গত বিশ বছরে পাত্র বা স্থান বা কাল প্রাচীনকালে যা ছিল তা থেকে 
একেবারে আলাদা । কারুকৃতির পুরো কৌশলে রূপান্তর ঘটাতে আমাদের
 অবশ্যই অন্যরকম উদ্ভাবন আশা করতে হবে, যার ফলে  শৈল্পিক আবিষ্কার
 নিজেই প্রভাবিত হবে, এমনকি আমাদের কারুকৃতির ধারণায় বিপুল 
ও আশ্চর্যজনক পরিবর্তন আনবে। "
          পশ্চিমবঙ্গে ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোণের সময় থেকে আভাঁ গার্দ কাজগুলো নিজেদের মুক্ত মঞ্চ পেয়ে গিয়েছিল । লক্ষনীয় যে এই বিস্ফোরণ সম্ভব হয়েছিল হাংরি জেনারেশনের সাহসী কার্যক্রমের কারণে । তাঁরাই পথপ্রদর্শক । হাংরি জেনারেশন দেখিয়ে দিতে পেরেছিল যে কেবল একফালি কাগজ বা একফর্মার পত্রিকা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে উথালপাথাল ঘটিয়ে দিতে পারে ; কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকার বা সংবাদপত্রের দয়াদাক্ষিণ্যের প্রয়োজন নেই । এটি তাঁদের এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান যা ডাডা এবং সুররিয়ালিস্টদের তোলপাড়ের সঙ্গে তুলনীয় । মনে রাখা প্রয়োজন যে হাংরি জেনারেশনের এই ফালিকাগজ ও এক ফর্মার পত্রিকা তাঁদের রচনাবলীকে আমেরিকা ও ইউরোপে বিভিন্ন ভাষায় পৌঁছে দিয়েছিল । 
        এই প্রসঙ্গে অলোক গোস্বামী লিখেছেন: “এই সম্মীলিত পদক্ষেপের ফলেই লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুল পদক্ষেপগুলোও পারেনি গতিরোধ করতে। আর তাই লিটল ম্যাগাজিনকে কে বা কাহারা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই তথ্য আজ আর প্রাধান্য পায় না। তার পরিবর্তে উঠে আসে সোমেন চন্দ, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার,শৈলেশ্বর ঘোষ,সুভাষ ঘোষ,বাসুদেব দাশগুপ্ত, মলয় রায়চৌধুরী,উদয়ন ঘোষ,অরূপরতন বসু,কৃষ্ণগোপাল মল্লিক,সুবিমল মিশ্র,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,দেবেশ রায় এবং এরকম আরও অসংখ্য নাম। এদের ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনাকে পাঠকের সামনে প্রথম তুলে ধরেছে লিটল ম্যাগাজিনই। গড়পড়তা সাহিত্যের পরিবর্তে পাঠককে আগ্রহী করেছে নতুন রচনারীতির স্বাদ গ্রহণ করতে। সেই প্রচেষ্টা যে বিফল হয়নি তার প্রমাণ,পরবর্তিতে বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলো বাধ্য হয়েছে নিজেদের ছাঁচ থেকে বেরিয়ে ওদের কারো কারো লেখা ছাপতে। সবার ক্ষেত্রে অবশ্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়নি। সেসব লেখকেরা জনপ্রিয়তার তোয়াক্কা না রেখে শুধু মাত্র লিটল ম্যাগাজিনকেই তাদের রচনা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। লিটল ম্যাগাজিন শুধু তাদের লেখাই প্রকাশ করেনি, সীমিত সামর্থ সত্বেও সেসব লেখকেদের বইপত্রও প্রকাশ করেছে। করে চলেছে। সুতরাং থোড় বড়ি খাড়া সাহিত্যের চর্চা করার পরিবর্তে ব্যতিক্রমী এবং নিরীক্ষা মূলক সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে বাংলা সাহিত্যের সৃজনীধারাটাকে সজীব রেখেছে যে একমাত্র লিটল ম্যাগাজিনই সেটা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। লিটল ম্যাগাজিন যদি এই দায়িত্ব পালন না করতো তাহলে বাংলা সাহিত্যের দশা কী হোত তার প্রমাণও হাতের কাছে মজুত আছে। বাণিজ্যিক সাহিত্য পত্রিকাগুলো পাঠক মনোরঞ্জনের ফাঁদে আটকা পড়ে রীতিমত ধুঁকতে শুরু করেছে। একদা হুড়মুড়িয়ে বিক্রি হওয়া দুর্গাপুজো সংখ্যাগুলো এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বকর্মা পুজো সংখ্যায়। তাতেও যেহেতু সামাল দেয়া যাচ্ছে না তাই এখন সাহিত্য সম্ভারগুলোর সঙ্গে বিনামূল্যে চামচ, শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো, শ্যাম্পুর স্যাসে বিতরণ করেও লোক টানতে হচ্ছে। এরপর আগামীতে যদি পুজো সংখ্যাগুলো জন্মাষ্টমী সংখ্যায় পরিণত হয় এবং বাই ওয়ান গেট ওয়ান ব্যবস্থা চালু হয় তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যেহেতু প্রসাদ কবির সুরে স্বখাত সলিল সংক্রান্ত গানটা গাইতে পারছে না তাই নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকতে অজুহাত দিচ্ছে বাঙালি পাঠকের উদাসীনতাকে। সেই অজুহাত যে কতটা মিথ্যে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ, লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যার প্রতি পাঠকের আগ্রহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি। আমার বক্তব্যকে কারো যদি অতিশয়োক্তি মনে হয় তাহলে তাকে অনুরোধ করব বইমেলায় কিংবা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় গিয়ে বিক্রির পরিসংখ্যানটা জেনে নিতে। এই জনপ্রিয়তাও শুধু নতুন রীতির গল্প কবিতা প্রকাশের কারণে বৃদ্ধি পায়নি, সাহিত্য সংস্কৃতি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে যে ধরণের চর্চা লিটল ম্যাগাজিন করে চলেছে সেসব বাণিজ্যিক পত্রিকার কাছে কল্পনাতীত।”   এখন “আভাঁ গার্দ” বিষয়টির তাত্বিক দিকটি দেখা যাক । পিটার বার্জার তো বলেইছেন যে “আভাঁ গার্দ কী ? প্রশ্নটা শুনলেই মনে তা উস্কানিমূলক ।” তিনি সত্য কথা বলেছেন । পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের উল্লেখ করলে তা উস্কানিমূলক প্রস্তাব হয়ে দাঁড়ায় ।
          সাহিত্য, ছবি আঁকা, সঙ্গীত ইত্যাদির ক্ষেত্রে “আভাঁ গার্দ” শব্দটা এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে ; সৈন্যবাহিনীর একেবারে সামনের সারিতে যে দলটা শত্রুপক্ষের ক্ষমতা আঁচ করার জন্য এগিয়ে যায়, ইংরেজিতে  ভ্যাঙ্গার্ড বা ফ্রণ্টলাইন, বাংলায় বলা যেতে পারে ‘অগ্রদূত’ বা ‘অগ্রগামী-দল’, তাদের । ফরাসি সৈন্যবাহিনীতে ১৭৯৪ সালে সামনের ঝটিকাবাহিনীর নাম দেয়া হয়েছিল আভাঁ গার্দ যাদের বার্তার ওপর নির্ভর করে সেনাবিহিনী এগোতো ; বলা বাহুল্য যে পরের দলটাকে বলা হতো ‘রিয়ার গার্ড’ । ১৮২৫ সালে অভিধাটি প্রথম প্রয়োগ করেন সাঁ সিমনিয়াঁ  ওলিন্দে রডরিগেস তাঁর “শিল্পী, বিজ্ঞানী এবং শিল্পপতি” ( “L’artiste, le savant et l’industriel” ) প্রবন্ধে। রডরিগস লিখেছিলেন যে শিল্পীদের উচিত “জনগণের অগ্রণী হিসাবে কাজ করা" কেননা , সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য "শিল্পকলার শক্তি প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং দ্রুততম”; তিনি বলেছিলেন যে তাঁরা ভিশনারি এবং সমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন । উনিশ শতকের ফ্রান্সে যে বামপন্হী বিপ্লবীরা রাজনৈতিক সংশোধনের জন্য আন্দোলন করেছিলেন, তাঁদের চিহ্ণিত করার জন্যও ব্যবহৃত হয়েছিল অভিধাটি । বামপন্হী ভাবধারা থেকে বিযুক্ত হয়ে ইউরোপে অভিধাটা প্রয়োগ করা আরম্ভ হয় নিরীক্ষামূলক, অরক্ষণশীল, প্রথাবিরোধী, ক্যাননমুক্ত, বৈপ্লবিক, অনৈতিহ্যগত নান্দনিক বা কান্তিবিদ্যা-সম্বন্ধিয় উদ্ভাবন বা নবপ্রবর্তনকে বোঝাতে, যা প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না এবং যা সৃজনকারী ও ভোক্তার মাঝে সমালোচনা হিসাবে উদ্ভূত হয়েছিল । সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আভাঁ গার্দ মূলত স্হিতাবস্হাকে আক্রমণ করে এবং     প্রথাসিদ্ধ প্রচলনের পাঁচিল ভেঙে ফেলে পরিধিকে অবিরাম বাড়াতে থাকে ; হাংরি জেনারেশন তাইই করেছিল এবং সেকারণে সদস্যরা জেলহাজতে গিয়েছিল । ডাডাবাদী বা আধুনিকতাবাদী সাহিত্য  থেকে অবিরাম ঘটে চলেছে এই প্রক্রিয়া এবং সেই কারণেই সৃজন-সেনাদের আচমকা বাঁকবদলকে বলা হয়েছে আন্দোলন । 
         বর্তমান কালখণ্ডে আভাঁ গার্দ বলতে বোঝায় কোনও বুদ্ধিজীবি, লেখক এবং শিল্পী গোষ্ঠীর কাজকে,  যাঁরা সেই কাজগুলোকে তাঁদের বিশেষ বার্তার মাধ্যমে প্রচলিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে উপস্হাপন করেন । অবিরাম হবার দরুন এককালের বৈপ্লবিক ধারাকে সমাজের মূলদলটি বা ‘রিয়ার গার্ড’ নিজের দলে মিশিয়ে নেয়, যার ফলে আবার নতুন আভাঁ গার্দ গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। গ্যাব্রিয়েল ডিজায়ারে লাভেরদান্ত তাঁর “ফ্রম দি মিশন অফ আর্ট অ্যাণ্ড রোল অফ অর্টিস্টস” বইতে লিখেছেন, “শিল্প, যা সমাজের অভিব্যক্তি, নিজেকে স্পষ্ট করে তোলে তার সর্বোচ্চ উড়ালে, সবচেয়ে উন্নত সামাজিক প্রবণতায় : তা হল প্রকাশকর্তার পূর্বগামী । সুতরাং জানবার জন্য যে শিল্প প্রবর্তকের উদ্দেশ্য পূরণ করছে কিনা,  সত্যিই আভাঁ গার্দ দলের মানুষ কিনা, একজনকে জানতে হবে যে মানবিকতা কোন দিকে যাচ্ছে, মানবজাতির নিয়তি কী, খুলে স্পষ্ট দেখিয়ে দিতে হবে যাবতীয় কলুষ, কল্মশ, হিংস্রতা, নোংরামি ইত্যাদি যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের বুনিয়াদ । 
          ফ্রান্সেই আভাঁ গার্দের বা ভ্যাঙ্গার্ডের সূত্রপাতের কারণ ছিল, যেমন পশ্চিমবাংলায় হাংরি জেনারেশনের উদ্ভব । প্রথমত সেই সময়ের ফ্রান্সে প্রতীকি স্তরে ফরাসি সংস্কৃতিতে লাঠি ঘোরাতেন সমাজের গণ্যমান্য অভিজাতরা এবং তাঁদের নান্দনিক মূল্যবোধকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি ছিল । অর্থাৎ সমান্তরাল সমাজটিতে এগিয়েছিল অভিজাত মূল্যবোধ আর পেছিয়েছিল সংস্কৃতি সৃষ্টিকারীদের মূল্যবোধ । আভাঁ গার্দের আগমন জরুরি হয়ে উঠেছিল সেই মূল্যায়ণ ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সেখানে নিজেদের মূল্যায়ণ পদ্ধতি স্হাপন করা । ইংরেজিভাষী অঞ্চলে তা ছিল উল্লম্ব, অর্থাৎ কেউ ওপরে এবং বাদবাকি ক্রমশ তলার দিকে ধাপেধাপে । উপনিবেশগুলোতেও ইংরেজরা এই মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে গিয়ে চারিয়ে দিতে পেরেছিল : গ্রেটেস্ট, গ্রেট, মেজর, মাইনর ইত্যাদি । বোদলেয়ারকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও, র‌্যাঁবো-ভেরলেনের চরিত্র নিয়ে গুজব ছড়ালেও, কেউই তাঁদের, তাঁরা যখন লিখছিলেন, মাইনর হিসাবে তকমা দেগে দ্যায়নি । ফ্রান্সে লাতিন কোয়ার্টারের মতন তখনকার অ-ভদ্রলোক অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকাশক অধ্যুষিত এলাকায় মাতামাতি হলেই তারা ছিল এগিয়ে । ওপরে নয় ।
          ফরাসি সাহিত্যে ষোড়শ শতক থেকেই মিলিটারি মেটাফর প্রয়োগ করা হয়েছে । একদল লেখককে বলা হতো “La Brigade” অর্থাৎ ‘বৃহৎ সৈন্যদল’ ; ব্রিগেড বলা হতো, তাতে সেনাবাহিনীর বহু ব্যাটালিয়ান ও কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত । শিল্পী-সাহিত্যিকদের সমাজের ভ্যাঙ্গার্ড হতে হবে, এই আওয়াজ প্রথমে ফ্রান্সে তুলেছিলেন ক্লদ অঁরি দ্য সাঁ-সিমঁ, ১৮২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর  Opinions Litteraires, philosophiques et industrielles bhite : "আমরা, শিল্পীরা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের ভ্যানগার্ড হয়ে উঠব। শিল্পের শক্তি আসলে সবচেয়ে কার্যকর এবং দ্রুততম। আমাদের কাছে সব ধরণের অস্ত্র রয়েছে: যখন আমরা নতুন ধারণা প্রস্তাব করতে চাই, তখন আমরা সেগুলো শ্বেতপাথরে খোদাই করি বা আমরা সেগুলো একটি ক্যানভাসে আঁকি । " বৌদ্ধিক বিপ্লবের একেবারে সামনে দিকে শিল্পসাহিত্য থাকে, এই  ধারণা উনিশ শতকের মধ্যভাগে আবার দেখা দিয়েছিল, আবারও একটা বিপ্লবের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল আর সমস্ত ফরাসী বিপ্লব প্যারিসেই শুরু হয়। ফ্রান্সে উনিশ শতকের শেষে এই অভিধাটির মান পরিবর্তিত হয়েছিল । তারপর থেকে নির্দিষ্ট শিল্প-সাহিত্যিক গোষ্ঠীকে চিহ্ণিত করার জন্য প্রয়োগ করা আরম্ভ হয়েছিল এবং নতুন গোষ্ঠীটিকে নান্দনিক অন্বেষণের অগ্রভাগ হিসাবে গণ্য করা হতে লাগলো কেননা নতুন গোষ্ঠী আগের  শৈল্পিক মানদণ্ডকে ভেঙে ফেলতে সফল হল । বিপ্লবী আলোকপ্রাপ্তির সম্মিলিত প্রত্যয়টি বিলিন হয়ে গিয়ে "আভাঁ গার্দ" অভিধাটি সাধারণত শিল্পী-সাহিত্যিক গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হওয়া আরম্ভ হয় । অনেক গোষ্ঠী থাকলেও, যে গোষ্ঠী একটি নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব করে, আর তখনকার থিম্যাটিক মোটিফগুলির সাথে জড়িত নয় এবং নতুন অন্বেষণ চালাচ্ছে, আর অন্বেষণের প্রক্রিয়াতে পরীক্ষামূলক, তারা “আভাঁ গার্দ” হিসাবে চিহ্ণিত হতে লাগলো।
        পরিবর্তনের মূল অভিগমন হল যে এটি একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের বিপ্লবের পরিণতি, ঘটনার বৈপরীত্য,  যা সমস্ত কিছু উল্টে পাল্টে দিতে চায়, যা হাংরি জেনারেশন করতে পেরেছে । এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিশেষ ধারণার প্রতিপাদন করে এবং তাহল এই যে মানবজাতির অগ্রগতি বা শিল্পসাহিত্যের বাঁকবদল একটি "বিদার" ( Rupture ) এর পরিণতি, যা হঠাৎ করে অভিনবতাকে আবিষ্কার করে এবং যা আগে থেকে চলছে এমন  সমস্ত কিছুকে পাল্টে দ্যায় এবং প্রাক্তন চিন্তাধারার পদ্ধতিতে রূপান্তরণ ঘটায়। ততোদিনে যা প্রাক্তন তা পুঁজিবাদের চাপে বাজারের খোরাক হয়ে ওঠে । ১৯৫০ সালে ইসিদোরে ইজু, যিনি ত্রিস্তঁ জারার মতন রোমানিয় ছিলেন, প্যারিসে আরম্ভ করেন ‘লেট্রিজম’ আন্দোলন, যাকে পরাবাস্তবের পরের আভাঁ গার্দ আন্দোলনের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল ; ‘লেট্রিস্ট’ আন্দোলনকারীরা অক্ষর, বাক্য ও ছবির মিশ্রণ ঘটিয়ে কাজ করতেন । ইজু বলেছিলেন যে বিশ্ব সাহিত্য ক্রমশ “Le ciselant” বা স্তব্ধতা থেকে ক্রমশ “l’amplique” দিকে এগিয়ে যায়, অর্থাৎ একটা সময় আসে যখন সমসাময়িক সমাজ নতুন মাত্রাটিকে গ্রহণ করে নেয় এবং তা হয়ে ওঠে doxa বা গৃহীত কল্পমূর্তি, যার পুনরাবৃত্তি ততোদিন চলতে থাকে যতোদিন না আবার নতুন ‘ভ্যাঙ্গার্ড’ এসে তাকে সরিয়ে দিচ্ছে । ইজু এই নবীনতাকে বলেছিলেন Novatique, যাকে ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকের Tel quel বা “যেমন আছে” পত্রিকাগোষ্ঠীর ভাবুকরা, বিশেষ করে রলাঁ বার্থ ও মিশেল ফুকো,  বলা আরম্ভ করলেন Rupture বা “বিদার” । 
          Tel quel গোষ্ঠীর সদস্যরা আধুনিক চিন্তাধারার সূত্রপাতকে ইতিহাসে ১৮৮৬ নাগাদ একটি “জ্ঞানতাত্বিক ভাঙন” বা “epistemological break” হিসাবে চিহ্ণিত করলেন কেননা সেই বছর মালার্মে তাঁর টেক্সটগুলো প্রকাশ করেছিলেন যা Album de Vers et de Prose নামে গ্রন্হাকারে ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত হয়, কিন্তু এই বছরেই ফরাসি কবি মোরেয়ার “আধুনিক” সাহিত্যিক ইশতাহার Manifesto of Symbolism প্রকাশিত হয় Le Figaro সংবাদপত্রে যা প্রকৃতপক্ষে ছিল ১৮৫৬ সালে Le Salon de-তে বোদলেয়ারের লেখা “আধুনিকতা” সম্পর্কিত বক্তব্য । বোদলেয়ারের বক্তব্যটি পৃথিবী জুড়ে আধুনিকতার সংজ্ঞার স্বীকৃতি পায় । বোদলেয়ার বলেছিলেন যে “বিশুদ্ধ শিল্প”  [Ktema es aei অর্থাৎ অনন্তকালের সম্পদ] নামে পাশ্চাত্য চিন্তায় প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে তার জায়গায় আনতে হবে আধুনিক শিল্পবোধ কে, যা “আপেক্ষিক” ; শিল্প হল আংশিক শাশ্বত ও আংশিক সমসাময়িক বললেন বোদলেয়ার, এবং সমসাময়িকতা থাকার দরুণ তা আধুনিক । তিনি শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে নিজস্ব সমকালীনতার এই ব্যাখ্যার জয়কে কোনো দুর্বোধ্য শাশ্বতের বিপক্ষে তুলে ধরলেন । 
      মোরেয়া তাঁর ইশতাহারে বলেছিলেন, "সমস্ত চারুকলার মতো, সাহিত্যেরও অবিরাম বিকাশ হয়: একটি আবর্তের সঙ্গে তার প্রত্যাবর্তন কঠোরভাবে নির্ধারিত  [...]। শৈল্পিক বিবর্তনের প্রতিটি নতুন পর্ব তার আগের বৌদ্ধিক গোষ্ঠীর অবসানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হয়, তার ঠিক আগের গোষ্ঠী অনিবার্যভাবে ফুরিয়ে যায় ।” তিনি বলেছেন  সাহিত্য এবং শিল্প ক্রমাগত নৃশংস এবং বিরোধী ভাবনাচিন্তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। এটাই মৌলিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাস যা আভাঁ গার্দের সৃষ্টিবাদী ধারণাটিকে, নানা আন্দোলন সত্ত্বেও, টিকে থাকতে দিয়েছে। উপরোক্ত তিনটি মৌলিক ফরাসি সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করে যে কেন আভাঁ গার্দ ধারণাটি ফরাসি সমালোচনামূলক শব্দভাণ্ডারে আবিষ্কার হয়েছিল এবং এত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফরাসি সমালোচনামূলক ইতিহাসে সিম্বলিজম, ডাডা, ফিউচারিজম, পরাবাস্তববাদ এবং লেট্রিজমের মতো  ভ্যানগার্ডগুলির বর্ণনা করার সময়ে আভাঁ গার্দ অভিধাটি প্রয়োগ করে হয় । বস্তুত ১৮৮৬ থেকে ১৯৬০র দশক পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বাঁকবদলগুলোকে চিহ্ণিত করার জন্যই আভাঁ গার্দ অভিধাটি প্রয়োগ করা হয় ।                                                 
          ইতালিয় ভাবুক রেনাতো পোজিওলি ১৯৬২ সালে তাঁর  ‘আভাঁগার্দের তত্ব’ রচনায় ( Teoria dell’arte d’avanguardia ) অভিধাটির অন্তর্গত সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চের ধ্রুবকগুলো ঐতিহাসিক, সামাজিক, মনস্তাত্বিক এবং দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে পরিমাপের প্রয়াস করেছিলেন । তিনি চিত্রকলা, কবিতা, সঙ্গীত ইত্যাদির  ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তগুলো ছাপিয়ে বলতে চেয়েছেন যে অগ্রদূত বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ আদর্শ বা মানদণ্ডের শরিক হবার দরুণ তা প্রতিফলিত হয় তাঁদের প্রচলবিরোধী বা সমাজরীতিঅনীহ জীবনশৈলীতে । জার্মান সমালোচক পিটার বার্গার ১৯৭৪ সালে তাঁর ‘থিয়রি অফ দি আভাঁ গার্দ’ বইতে বলেছেন যে সমাজের রাজনৈতিক সমালোচনা করে আবির্ভূত হলেও, পুঁজিবাদের সহযোগীতায় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির কাজে যে রাজনৈতিক বিষয়বস্তু থাকে তাদের অসাড় করে দেয় বা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে চলে যায় । আভাঁ গার্দের ধারণা মূলত শিল্পী, লেখক, সুরকার এবং চিন্তাবিদদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও এবং তাঁদের কাজগুলো মূলধারার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং  সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রান্তসীমায় তাঁদের অবস্হান থাকলেও পাশ্চাত্যদেশগুলোর বেলায় যে বক্তব্য খাটে তা বঙ্গসমাজের মতন গরিবদেশগুলোর বেলায় খাটে বলে মনে হয় না ।
        পশ্চিমবঙ্গে আভাঁ গার্দ কবে থেকে আরম্ভ হল তা চিহ্ণিত করা সহজ । আভাঁ গার্দ অভিধাটি যুদ্ধসংক্রান্ত হবার দরুন এসট্যাবলিশমেন্টের সঙ্গে কবিলেখকদের যুদ্ধের সময়কাল দিয়ে তা দেগে দেয়া যায়, অর্থাৎ ষাটের দশকে যখন সাহিত্যশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড আক্রান্ত হল হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারী সাহিত্যগোষ্ঠির দ্বারা ।  পশ্চিমবঙ্গে যেমন, প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করার পাশাপাশি শিল্পায়নের দ্বারা উৎপাদিত কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত গণ সংস্কৃতিকেও বাঙালি আভাঁ গার্দ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রিন্ট ও বৈদ্যুতিন মিডিয়াগুলির প্রতিটি হল পুঁজিবাদের প্রত্যক্ষ পণ্য — এগুলি এখন মোটামুটি কারুশিল্পের প্ল্যাটফর্মের কাজ করে — অথচ এগুলো সত্যিকারের কারুশিল্পের আদর্শ নয়, উৎপাদন সম্পর্কিত  লাভ-ক্ষতির উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত। বাজার তাই নকল বা যান্ত্রিক এবং প্রায়শই আভাঁ গার্দ সংস্কৃতি থেকে চুরি করে আনুষ্ঠানিক নকশা বা আবিষ্কার ব্যবহার করে তারা আভাঁ গার্দ কারুশিল্পের চেয়ে উন্নত হওয়ার ভান করে। যেমন বিজ্ঞাপন যাঁরা তৈরি করেন সেই দোকানদাররা পরাবাস্তবতা থেকে চাক্ষুষ পদ্ধতি চুরি করে চলেছে, যদিও বিজ্ঞাপনের কাজগুলো সত্যই পরাবাস্তব প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে না । বিজ্ঞাপন যেটা তৈরি করে তা হল ( kitsch ) ‘কিৎশ’-- আভাঁ গার্দের বিপরীত এবং তা রিয়ার গার্ডও নয় ।
          রেনাতো পোজিওলি যে তর্কবিন্দুগুলো দিয়ে আভাঁ গার্দকে চিহ্ণিত করেছিলেন সেগুলো পশ্চিমবাংলায় ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলন এবং পরবর্তী বাঁকবদলকারী পত্রিকাগোষ্ঠির  ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । ১ ) আভাঁ গার্দ বলতে বোঝায় পুরোনো পথ ছেড়ে নতুন পথে যাত্রা ; ২ ) মার্কসবাদীরা আভাঁ গার্দ বিরোধী ; ৩ ) মার্কসবাদীরা আভাঁ গার্দকে ‘বুর্জোয়া শিল্প, নামে অভিহিত করতে ভালোবাসেন, কেননা তাঁরা আঙ্গিকের চেয়ে বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দেন ; ৪ ) আমেরিকা -ইংল্যাণ্ডে আভাঁ গার্দ শব্দটা ব্যবহার করা হয় না, কেননা তা ফ্রান্সে উদ্ভুত, তাঁরা পোস্টমডার্ন বলা পছন্দ করেন । ; ৫ ) রাজনৈতিক এবং নান্দনিক আভাঁ গার্দ পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বামপন্হীদের কারণে ; ৬ ) উৎসাহের ঝরণা থেকে আভাঁ গার্দ শিল্প-সাহিত্যের জন্ম ; ৭ ) আভাঁ গার্দ শিল্পী-সাহিত্যিকরা কাজের তুলনায় প্রকাশভঙ্গীতে বেশী আগ্রহী ; ৮ ) পুরাতনপন্হীরা নিজেরাই নতুনের আবির্ভাব চান কিন্তু দেরিতে স্বীকার করেন ; ৯ ) আঁভা গার্দ জনপ্রিয় নয় তার কারণ জনগণের কাছে পৌঁছোতে দেয়া হয় না ; ১০ ) রোমান্টিসিজম আভাঁ গার্দের চেয়ে জনপ্রিয় ছিল কারণ তখন অভিজাত সমাজ অবলুপ্ত হয়ে নতুন কর্মীশ্রেনি ও মধ্যবিত্তের উদ্ভব হচ্ছিল ; ১১ ) বহু আভাঁ গার্দ শিল্পী-সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা পছন্দ করেন না ; ১১ ) একটি আভাঁ গার্দ আন্দোলন দেখে পরের প্রজন্ম দ্রুত নিজেদের আভাঁ গার্দ আন্দোলনের সূত্রপাত করতে চায় ; ১২ ) আভাঁ গার্দ আন্দোলনের লেজ দীর্ঘ হয় কেননা অংশগ্রহণকারীরা পরস্পরের অচেনা এবং পরস্পরের পৃষ্ঠভূমি ভিন্ন হওয়া সত্বেও দল গড়ে তোলেন ; ১৩ ) সব দেশের আভাঁ গার্দকে বিশ্বায়ন নিজের অন্তর্গত করে ফেলতে চায় ;  ১৪ ) পুঁজিবাদের চাপে অনেকে আভাঁ গার্দ ত্যাগ করে বৈষয়িক সাফল্য চান, যেমন আগেকার কবি-শিল্পীরা রাজ দরবারের সাহায্য পেতেন ।
          পিটার বার্জার ১৯৮৪ সালে লেখা তাঁর  ‘থিয়োরি অফ দি আভাঁ গার্দ’ বইতে রেনাতো পোজিওলির চেয়ে বেশ ভিন্ন তর্কবিন্দু দিয়েছিলেন, যেমন ১) জনারগুলোর পার্থক্য  [ genres ] ছলনাময়, যদিও কবিতা, চিত্রকলা ইত্যাদি নাম দিয়ে তাদের আলোচনা হয় ; ২) শ্রোতা-পাঠক-দর্শকরা কখনও কৌতুহলশূন্য নয় বরং একদেশদর্শী ; ৩ ) ব্যাখ্যাকারী নিজের পক্ষপাত আরোপ করে ; ৪ ) এটা অবশম্ভাবী যে ব্যাখ্যাকারী নিজের কালখণ্ডের প্রেক্ষিতে অতীতকে যাচাই করবে ; ৫ ) ধর্ম অনেকসময়ে বাগড়া দ্যায় কেননা ধর্ম দুর্দশা কাটাবার প্রয়াস করলেও আনন্দ লাঘব করে ; ৬ ) মানুষ যখন বুঝতে পারল যে ধর্ম ব্যাপারটা ছলনাময় তখন সে এর নাম দিল দর্শন [ বিশ্বাস নয় ] ; ৭ ) আদোর্নো যদিও বলেছেন যে আভাঁ গার্দের কোনো অভীষ্ট নেই, পিটার বার্জার বলেছেন যে আভাঁ গার্দের অভিষ্ট হল আলোচনার সূত্রপাত ঘটানো ; ৮ ) আভাঁ গার্দ যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, পুঁজিবাদের কারণে তাকেই প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে ; ৯ ) আভাঁ গার্দ শিল্প-সাহিত্য ব্যক্তির প্রয়োজনকে অন্তত কাল্পনিক তৃপ্তি দ্যায় যেগুলো প্রতিদিনকার জীবনযাপনে অবদমিত থাকে ; ১০ ) একটি আন্দোলনের সঙ্গে আরেকটি আন্দোলনকে মিশিয়ে আলোচনা করা উচিত নয়, তা করলে তাদের উদ্দেশ্যকে গুলিয়ে ফেলা হবে ; ১১ ) ডাডা আন্দোলনের কোনো শৈলী ছিল না, তার ছিল উদ্দীপনা ও তত্ত্ব, এবং আঁভা গার্দ অভিধার তারাই জন্মদাতা, তারা প্রতিটি সংস্হার বাইরে নিজেদের রাখতে চেয়েছিল ; ১২ ) ওয়াল্টার বেনিয়ামিন বলেছেন যে যান্ত্রিক যুগে শিল্প-সাহিত্যকে গ্রাহ্য করায় প্রভূত পার্থক্য ঘটে গেছে, কেননা তা এখন যতো ইচ্ছে উৎপাদন হয় ; ১৩ ) শিল্প-সাহিত্য এখন মুনাফার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে কবিতা খাপ খায় না ; ১৪ ) রাজনৈতিক না হলে আভাঁ গার্দ হয় না ; ১৫ ) শিল্প-সাহিত্য প্রতিদিনের জীবন থেকে আলাদা, তা ম্যাজিকাল, তার প্রতিটি কারুকাজকে একসঙ্গে গ্রথিত করা হয়, জঘন্য ধারণার মতো কবিদের একসঙ্গে থাকা উচিত ; ১৬ ) শিল্পসাহিত্য তার কার্যকরী মূল্য খুইয়ে ফ্যালে তখন তা শিক্ষণীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ; ১৭ ) নাগরিক তার প্রতিদিনের জীবনে ‘কর্মচারী’ হিসাবে ক্ষুদ্র হয়ে গেছে ; শিল্প-সাহিত্যে তাকে ‘মানুষ’ হিসাবে খুঁজে পাওয়া যায় ; ১৮ ) সংস্হাগুলো তাদের অন্তর্ভুক্ত কাজকেই কেবল শিল্প-সাহিত্য বলে মনে করে -- এটা নান্দনিক কারণে ঘটে না, সামাজিক কারণে ঘটে ; ১৯ ) সত্যকার আঁভা গার্দ শিল্পী-সাহিত্যিক সিস্টেমকে ভেঙে ফেলতে চান, অবশ্য আজকের দিনে আধুনিক শিল্পী দুশঁর পক্ষে তা কঠিন হতো কেননা তিনি সিস্টেমকে ভাঙলেন অথচ তার অন্তর্গত হয়ে গেলেন [ হাংরি জেনারেশনের শৈলেশ্বর ঘোষ শেষ বয়সে সিস্টেমকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন ] ; ২০ ) সংস্কৃতি এখন ইনডাস্ট্রি যার দরুন শিল্প-সাহিত্যকে খেয়ে ফেলতে চেষ্টা করে যাচ্ছে বাজার ; ২১ ) রেডিমেড জিনিসকে শিল্প-সাহিত্যে বদলে ফেললে তা শিল্প-সাহিত্য থেকে মুক্ত হয়ে যায় ভাবা ভুল, কেননা রেডিমেড ব্যাপারে শিল্পের অভিব্যক্তি খুঁজে পায় ব্যক্তি ।
          আভাঁ গার্দ সম্পর্কিত আলোচনা পুনরুজ্জীবিত হল থিয়োদোর আদোরনোর সমর্থনের দরুণ । সমসাময়িক শিল্প-সাহিত্যের একটা বড়ো অংশ তখনও এবং এখনও যেহেতু বুর্জোয়াজিকে কুন্ঠিত ও হতবুদ্ধি করে, আদোরনো যুক্তি দিয়ে প্রথাগত নান্দনিক মূল্যবোধ ও আঙ্গিকের পক্ষে বৌদ্ধিক বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছিলেন । কিন্তু যাঁরা শিল্প-সাহিত্যের ঐতিহ্যে কেবল নতুনত্বের জন্যই নতুনত্ব আনতে চান, এবং যাঁদের কাজের প্রধান উদ্দেশ্য হল শক দেয়া আর স্ক্যাণ্ডালাস হওয়া, তাঁদের উচিত নয় আদোরনোকে আশ্রয় করে নিজেদের সমর্থন আদায় করা । যেমন, স্ত্রাভিনস্কির ‘রাইট অব স্প্রিঙ’ এর প্রথম অনুষ্ঠানকে আদোরনো আভাঁ গার্দের স্বীকৃতি দেননি, কেননা তা ছিল ‘লোকতাত্বিক’ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মতৃপ্ত । স্ত্রাভিনস্কির সেই অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবিরোধিতা ছিল না এবং তা আঙ্গিকের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি ।   
          বিশ শতকের যে কাজগুলোকে আদোরনো আভাঁ গার্দের স্বীকৃতি দিয়েছেন তাতে ছিল আমাদের নিজেদের মধ্যেকার এবং জগতসংসারে অবস্হিত যা কিছু  প্রিমিটিভ বা আদিম । এই আদিমতার কারণেই আফ্রিকার ভাস্কর্যের প্রতি পিকাসোর আকর্ষণ কিংবা মনদ্রিয়ানের ছবি আঁকায় কেবল রেখার প্রয়োগ । সেই সময়ে পাশ্চাত্য জগত জড়িয়ে পড়েছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের হত্যালীলায়, ঔপনিবেশিক  একীকরণ আর দ্রুত পণ্যায়নে, ফলে ডুবে যাচ্ছিল সেই একই বুনো সভ্যতায় যা কাটিয়ে ওঠা নিয়ে তারা এককালে গর্ব করত । আদোরনোর মতে, সমাজের আত্মসংরক্ষণ সমাজ-অনুমোদিত আত্মত্যাগ থেকে    পার্থক্যহীন হয়ে গিয়েছিল : যা আদিম মানবের মধ্যে, অহং-এর আদিম দিকগুলোয় পাওয়া যায় । আদোরনোর আভাঁ গার্দ তত্ত্ব বাস্তবের এই আদিম বৈশিষ্ট্য থেকে উৎসারিত হয় ; প্রিমিটিভ বৈশিষ্ট্যকে যা দাবিয়ে রাখে তার বিরোধিতা করে আভাঁ গার্দ ।  এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতি, দর্শন, সঙ্গীত ও সাহিত্য নিয়ে আদোরনো জীবনভর বলেগেছেন যে “আত্মসংরক্ষণের লড়াইয়ের চেয়েও জীবনের কাজ অনেক বেশি।” আদোরনো তাঁর ‘নেগেটিভ ডায়ালেকটিকস’ ( ১৯৬৬ ) বইতে লিখেছেন যে এই তর্কে আত্মসংরক্ষণ “ইতিহাসের এতাবৎ মান্যতার বাইরে সর্বনাশের নিয়ম ছাড়া আর কিছুই নয়।”    
          আভাঁ গার্দকে সমর্থনে আদোরনো ‘আগে থেকে পাওয়া’ ব্যাপারকে গুরুত্ব দেননি । আভাঁ গার্দকে ‘নতুন’ হতে হবে । উনি বলেছেন যে সিরিয়াস সঙ্গীতকে, সিরিয়াস শিল্পের মতনই, একই সঙ্গে নতুন আর  স্বীকৃত উভয়ই হতে হবে ।    প্রকৃত আভাঁ গার্দের গুণগ্রাহীতা আসে ঐতিহ্যকে বুঝতে পারার মাধ্যমে কেননা তা একই সঙ্গে তার থেকে দূরে সরে যায় আবার তার  ধারাবাহিকতাও । ফালতু অথচ অভিনব কিছু সৃষ্টি করা যেমন সহজ তেমনই সহজ অসার ও গতানুগতিক কিছু সৃষ্টি করা । অভিনবতার খাতিরেই অভিনবতা সৃষ্টি করা আর জনগণের বাজারকে খাওয়ার জন্য সৃষ্টি করায় সে ক্ষেত্রে তেমন পার্থক্য থাকে না । নতুন কাজ যতোই শকিঙ হোক, সেই শক কিসের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে তার বোধ না থাকে তাহলে তা হবে বেশ্যাসুলভ । আদোরনোর বক্তব্য থেকে আমরা যা পাই তা হল যে নতুনের জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে এবং অমনভাবে তৈরি থাকা তখনই সম্ভব যখন একজন গ্রাহী তার শিক্ষিত প্রবৃত্তির দ্বারা স্বীকার করতে পারবে যে প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিকাজটি ঠিক কী । আদোরনোর মতে প্রকৃত সৃষ্টির মানসপ্রতিমার অভিজ্ঞতার অভাব, যার জায়গা নিয়েছে চিত্তবিনোদন বাজারের লালিকা আর রেডিমেড বাঁধাধরা জিনিসপত্র, সেগুলোই প্রাথমিক স্তরে জার্মানদের মধ্যে গড়ে দিয়েছিল সিনিসিজম যা শেষ পর্যন্ত বিটোফেনের মানুষদের বদলে ফেললো হিটলারের মানুষে ।
       বোদলেয়ারের “আধুনিকতাবাদ”-এর প্রেক্ষিতে তাঁর বৌদ্ধিক উত্তরসূরীর কথা বলার জন্য আজকে "অতিরিক্ত-আধুনিকতাবাদ"-এর বক্তব্য রাখতে গেলে একজনকে নিজেকে "উত্তরসমসাময়িক-পরবর্তী" কাঠামোর মধ্যে উপস্হাপিত করতে হবে। জাঁ পল সার্ত্রে যেমন তাঁর জার্নাল Les Temps Modernes-এ বলেছেন,  কবিতাকে সমসাময়িকতার সহজ অত্যাচার ("চরম" বা তার “অভাব”) থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে হবে এবং ভবিষ্যতের বিষয়ে প্রত্যাশা দেওয়ার কথা ভাবতে হবে; কবিতাকে অবিরাম  ভবিষ্যত আবিষ্কার করতে হবে। কবিকে কেবল তাঁর নিজস্ব সমসাময়িকের চেয়ে বেশি হতে হবে, এবং সংক্ষিপ্ত শর্তাবলী, বলা যেতে পারে যে কবিকে ভবিষ্যতের উদ্ভাবন করতে হবে। তাঁর কবিতাকে ভাবতে হবে যে কবিতা কী হতে পারে, তাত্ত্বিকভাবে এবং উপায়ের দিক থেকে তো বটেই,  ভাবের নতুন রূপের দিক থেকেও। সম্ভবত এতে কোনও সমসাময়িকতা নেই, তবে কমপক্ষে এটি কল্পনাশক্তিকে আরও সক্রিয় করবে, আরও বেশি ভালভাবে বেঁচে থাকার নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করার ক্ষমতা এবং আগত বিশ্বের তাৎপর্যের ভিত্তিগুলির কল্পনা করবে। আমরা যদি কবিতার "আধুনিক সমসাময়িক" যুগে প্রবেশ করতে চাই, তবে আমাদের বোদলেয়ারের "আপেক্ষিকবাদী" দৃষ্টিভঙ্গিতে আরও কিছু যুক্ত করতে হবে । র‌্যাঁবো তাঁর সবচেয়ে অসাধারণ মুহুর্তগুলিতে  "Le voyant" ["ভাবাবেশ"] বলেছিলেন। কবি কেবল তাঁর নিজস্ব "সময়"-এ সীমাবদ্ধ হতে পারেন না । তাঁর দূরদর্শিতার ক্ষমতা থাকতে হবে। কবিতায় স্থায়ী, বাস্তব এবং ভবিষ্যত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
          প্রশ্ন উঠতে পারে যে "আভাঁ গার্দ" সাহিত্য-অভিধার জন্ম কেন বোদলেয়ারের  "আধুনিকতা" সম্পর্কিত বক্তব্যের পৃষ্ঠভূমিতে "সমসাময়িক"কে যুক্ত করেছে । আভাঁ গার্দ-এর  সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল জনগণের কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করা এবং তার উন্নতি করা। এটি কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, ইউরোপে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পথও ছিল,  যা সংস্কৃতিবিশেষকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে। সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি এবং কিছু সামাজিক উথালপাথালের মাঝেও আভাঁ গার্দ ধারণাটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিল যা জনগণকে এগিয়ে যেতে প্ররোচনা দিয়েছিল। ফ্রান্সে বিপ্লবের পরে আভাঁ গার্দ একটি সফল পরিবর্তন এনেছিল ।  সেই সময় যে লোকেরা রাস্তায় নেমে লড়াই করছিল তারা শিল্প এবং কবিতা সম্পর্কে খুব বেশি জানত না (ক্লিমেন্ট গ্রিনবার্গ, ২০০৫ ) আভাঁ গার্দ কবি বা শিল্পীর কাছে প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল তাদের মতামত এবং চিন্তাভাবনা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করার দক্ষতা। ধারণাটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি শিল্পের সমস্ত দ্বন্দ্ব এবং সমস্যাগুলি সমাধান করতে এগিয়ে গিয়েছিল কারণ কারুকৃতিগুলো শিল্পীকে তার  দক্ষতা প্রদর্শনের অনুমতি দেয়। আভাঁ গার্দ ছিল “আধুনিক” ব্যাপার ।  
        ফ্রান্সে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, বিপ্লব ঘটার পরে ১৮৪০ সালে সর্বহারা শ্রেণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকায়  গণতান্ত্রিক চেতনা লগ্নী ও শ্রমের প্রতি বিদ্বেষের ফলে নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রের প্রতি মোহিত হয়ে ওঠে। শিল্প সমালোচক ক্লিমেন্ট গ্রিনবার্গ তাঁর  "আভাঁ গার্দ ও কিৎশ" প্রবন্ধে যেমন উল্লেখ করেছিলেন: একই সমাজে একই সাথে টি.এস. এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যাণ্ড’ কবিতার মতো কাজ হয় আবার টিন প্যান অ্যালির গান হয় কিংবা ব্রাকের একটি চিত্রকর্ম এবং একটি স্যাটারডে ইভনিঙ পোস্টের কভার হয়; চারটিই একই সংস্কৃতির অংশ এবং একই সমাজের পণ্য। কলকাতায় যেমন দেখি ‘কোয়ার্টজ পাবলিশারের আভাঁ গার্দ বইয়ের পাশাপাশি স্টার জলসা আর জি টিভির কিৎশিয় সিরিয়ালগুলো । যেমন সাহিত্যের ক্ষেত্রে হাংরি, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, নিমসাহিত্য আন্দোলনের মাধ্যমে তেমনই ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গে চিত্রকলার ক্ষেত্রে একট আভাঁ গার্দ চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, এরকম বললে অত্যুক্তি হয় না।এবং পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীদের হাতে তা ক্রমশই আরাে বিকশিত হয়েছে, আরাে সংহতি অর্জন করেছে। এই বিকাশ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চিত্রচর্চার সঙ্গে সমান্তরাল হলেও, তা থেকে স্বতন্ত্র। অথাৎ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের কাজে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা, শিল্পী ভেদে প্রত্যেকের নিজস্বতা সত্ত্বেও, এক সামগ্রিক ঐক্যের ইঙ্গিতবাহী; আর সেই ঐক্যের যে বিশেষ ধরণ, সেটা অন্যান্য অঞ্চলের শিল্পীদের প্রকাশভঙ্গি থেকে একটু আলাদা।  গণেশ পাইন, রবিন মণ্ডল, যোগেন চৌধুরী, বিকাশ ভট্টাচার্য, প্রকাশ কর্মকারের আঁকা ছবিগুলোর পাশাপাশি বাংলা আর হিন্দি সিনেমার পোস্টার । অবনী ধর, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল মিশ্র, সুভাষ ঘোষ-এর ন্যারেটিভের পাশাপাশি পণ্যসাহিত্যের ন্যারেটিভ । প্রথম দিকে আভাঁ গার্দ একটি বিমূর্ত বা অযৌক্তিক শিল্পের মতো বিকাশ করা হয়েছিল যা মানুষের চিন্তাভাবনা বা অনুভূতি প্রকাশ করবে। আভাঁ গার্দ ধারণাটি শক্তিশালী হবার কারণ এটি মানুষকে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে বা এমনকি “সৃষ্টিকর্তাকে” ছাপিয়ে যাবার সদিচ্ছা প্রদান করে ।
         সাহিত্য-শিল্পকে পণ্যায়নের প্রেক্ষিতে স্লাহভয় ঝিঝেক সম্প্রতি এই সম্ভাবনার বিষয়ে চিন্তা করে বেলেছেন যে বর্তমান পুঁজিবাদকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা সম্ভবত দূরদর্শীতার অভাব; তাঁর মতে আমাদের একথা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয় যে পশ্চিমা পুঁজিবাদও আমাদের গণতন্ত্র এবং সুখের ধারণা এনে দিয়েছে এবং সম্ভবত এগুলি  অন্তর্নিহিত মূল্যবোধগুলোর সাথে সংযুক্ত ; সুতরাং আমরা যদি গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দিই তবে যা জরুরি তা সাম্যবাদ বা একটি ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থা দ্বারা পুঁজিবাদের প্রতিস্থাপনের আহ্বান জানানো নয় কেননা ওদুটো প্রমাণিত হয়নি যে তারা উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এখনও পর্যন্ত প্রমাণ হয়নি যে আধুনিকতাবাদী কবিরা বোদলেয়ারের প্রস্তাবিত মডেলের তুলনায় "আরও ভাল" হতে পারে এমন সৃষ্টিধারা প্রতিস্থাপন করতে পেরেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, বোদলেয়ারের পাঠবস্তুগুলো প্রতিষ্ঠানের ভাষার সমসাময়িক, এবং সমস্ত আধুনিক গণতন্ত্রের বিশ্বজুড়ে সেটাই ঘটে গেছে । আমাদের কেবল মনে রাখতে হবে যে হিটলরিয়ান ফ্যাসিবাদ "অবক্ষয়ের শিল্প" নামের কাজকে সেন্সরযোগ্য মনে  করেছিল এবং কমিউনিস্ট সরকারগুলো "পাতি বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের" ধারণাটি আবিষ্কার করেছিল। আর ধর্মের ধ্বজাধারীদের কথা বাদ দিন কেননা আমরা জানি ধর্মীয় উৎসাহ সাহিত্য-শিল্পকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টায় আগেও মেতেছিল আর এখনও তাই করে চলেছে, কারণ তাদের ধর্মভিত্তিক নৈতিক শৃঙ্খলার সাথে মানায় না বলে মনে করেন ধ্বজাধারীরা। পশ্চিমবঙ্গে অনিল বিশ্বাস এককালে এইরকম ছড়ি ঘুরিয়েছিলেন । হিন্দুত্ববাদীরা বহু শিল্পীর কাজের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছে, হুসেনকে তো দেশছাড়া করেছিল ।
      আরেকটি জিজ্ঞাসা হল  যে "আভাঁ গার্দ" সাহিত্যে-অভিধার জন্ম কেন বোদলেয়ারের এই উপলব্ধি থেকে উৎসারিত হয়েছিল যে "আধুনিকতা"র নতুন নান্দনিক বক্তব্যের সাথে "সমসাময়িক"-এর  সম্পর্ক ছিল। নতুন নান্দনিক বোধকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য "আধুনিক" শব্দটি আকস্মিকভাবে বোদলেয়ারের কাছে হাজির হয়নি । ফ্রান্সের সাহিত্যে এর দীর্ঘকালীন সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে । ১৬৮৮ সালে ফরাসি লেখক শার্ল পেরা ( Charles Perrault ) তাঁর চার খন্ডের বইয়ের প্রথম খণ্ড “প্রাচীনতা ও আধুনিকতার সমান্তর” প্রকাশ করেছিলেন ( Parallele des anciens et des modernes )। এই বইটি ফরাসি সাহিত্যের ইতিহাসে "La querrelle des Anciens et des Moderns" বা “প্রাচীন ও আধুনিকতার বিতর্ক” নামে পরিচিত।  শার্ল পেরা "আধুনিক" দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক ছিলেন এবং বলেছিলেন সমসাময়িক সাহিত্য ক্লাসিকাল সাহিত্যের মতোই ভালো হতে পারে । বিতর্কটি শুরু হয়েছিল যখন শার্ল পেরা তাঁর “লুই দ্য গ্রেটের শতক” ( "Le siecle de Louis le Grand") কবিতাটি তৎকালীন ফরাসি রাজা লুই চতুর্দশকে একজন প্রবুদ্ধ শাসক হিসাবে প্রশংসা করে লিখেছিলেন এবং তাতে বলেছিলেন যে রাজা চারুকলার উন্নতির জন্য এত কিছু করেছেন যে সমসাময়িক কাজগুলো ধ্রুপদী কারুকৃতির তুলনায় উন্নত হয়ে গিয়েছে । প্রতিবাদে বোলেউ-ডেসপ্রা ( Boileau-Despreaux )ও রাসিনে তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন এবং  "প্রাচীন যুগের" সমর্থকদের নেতা হিসেবে, ক্লাসিকাল কারুকৃতির তুলনায় সমসাময়িক শিল্পের আধিপত্যকে অস্বীকার করেছিলেন, আর জাগতিক বিষয়-আশয়ের প্রতি লোভের নিন্দা করেছিলেন, যা  ঘটেছিল শার্ল পেরার ক্ষেত্রে , যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার স্পষ্ট বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। দুই দলের মধ্যে ঐতিহাসিক কলহের অবশেষে সমাধান হয়েছিল যখন দুই দলের প্রতিনিধি ফরাসি অ্যাকাদেমির সামনে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে মিটমাট করে নেন । তা সত্ত্বেও, অষ্টাদশ এবং উনিশ শতক পর্যন্ত ফ্রান্সে তার প্রভাব থেকে গিয়েছিল ।
        বোদলেয়ার সেই সময়ে অনুধাবন করেছিলেন যে আধুনিকতা সম্পর্কিত তাঁর ১৮৫৬ সালের পাঠবস্তুটিতে "আধুনিক কবিতা" ও আধুনিকতাবাদের ধারণাকে পুনরুদ্ধার করার অর্থ কী। অনেকে মনে করেন যে বোদলেয়ারের সমকালীনতার এই বক্তব্যটি আর্তুর র‌্যাঁবোর কাব্যদর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে,  যেমনটি তাঁর কবিতা “নরকে এক ঋতু”র উপসংহারে তিনি লিখেছিলেন: Il faut etre absolument moderne - “আপনাকে একেবারে আধুনিক হতে হবে।” প্রকৃতপক্ষে যদি কেউ র‌্যাঁবোর উদ্ধৃতিটি গভীরভাবে পাঠ করে, তবে তা ( anti-phrase ) "বিরোধী বাক্যাংশ" হিসাবে দেখা যেতে পারে: র‌্যাঁবো তাঁর সমসাময়িকতাকে অপছন্দ করতেন, এটা তাঁর কাছে পাতিবুর্জোয়া, মামুলি, মানুষদের বস্তুবাদী সমাজের প্রতি কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণ বলে মনে হয়েছিল।
          যদি প্রকাশ্যে পুরস্কৃত কবিতা ( যেমনটি র‌্যাঁবো তাঁর নিজের সমসাময়িক কবিদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেছিলেন : সালি প্রুধোম, ফ্রাঁসোয়া কোপি,, বাঁভিল, প্রমুখ  কবিরা "সমাজের কাছে "ঋণী" হন, তাহলে তাঁরা তো ফালতু বুর্জোয়া মহাবিশ্বের অংশ ছিলেন, যাকে র‌্যাঁবো তুচ্ছ-তাচ্ছ্যল্য করেছেন , তারপরে র‌্যাঁবো "কবিতা" নিয়ে আরকিছু করতে চাননি। "নিজেই নিজের সমসাময়িক" হওয়ার জন্য তিনি  তাঁর সময়ের অংশ হতে পারেন, তাঁর নিজস্ব বিশ্বে থাকবেন, এর প্রসঙ্গগুলো এবং সমস্যাবলীতে মগ্ন হয়ে উঠবেন। যদি, সমস্ত কাব্যিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে, বস্তুবাদী কদর্যতার সমসাময়িকতাকে উপেক্ষা করা না যায় , তবে তিনি কবিতাকে ত্যাগ করে  চলে যাবেন ভাগ্যান্বেষণে, তারপরে বাণিজ্যিক ব্যবসায়ী এবং শেষ অবধি রাজা মেনেলিককে তাঁর স্বাধীনতায় সহায়তা করার জন্য বন্দুক চোরাচালানের কাজ করবেন যাতে রাজা ইংরেজ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন । এটিই ছিল র‌্যাঁবোর প্রতি সমসাময়িকতার আহ্বান। র‌্যাঁবোর কাছে “আপনাকে একেবারে আধুনিক হতে হবে” ছিল  নেতিবাচক, তাঁর কাব্যিক "দৃষ্টিপ্রতিভা," অর্থাৎ ভিশন পরিত্যাগ, তাঁর স্বপ্ন এবং কাব্যিক সৃষ্টির জীবনকে ত্যাগ করার বার্তা। 
    "সমসাময়িকতা" ( contemporaneity ) এবং "আধুনিকতা" ( modernity )-র মধ্যেকার  অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র একটি নির্দিষ্ট সময়কালে শিল্প বলতে কী বোঝায় তা নির্ধারণের জন্য বিশেষ সময়ে ঐতিহাসিকভাবে একটি মূল গুণক প্রবর্তন করেছিল। ইতিহাসকরণ ( historization ) একটি পর্যায়কালীনতার ( periodization ) জন্য পথ ছেড়ে দিয়েছিল এবং অবশ্যই "আভাঁ গার্দ" ধারণাটি যুগচেতনার অংশরূপে সাহিত্য-শিল্পের ফলাফল হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এর অতিমাত্রার বৈকল্পিকতার কথা যা সার্ত্রে বলেছেন তা ওপরে আলোচনা করেছি ;  লেখকেরা তাঁর সময়ের রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক, আদর্শগত বিতর্কে অংশ নেন এবং গড়ে তোলেন "বাস্তববাদী", "হস্তক্ষেপবাদী" শিল্প-সাহিত্য যেমন আজকের সমসাময়িক কাব্য রচনায় ল্যাঙ্গোয়েজ পোয়েট্রি আন্দোলনের লুই জুকোস্কি, বব পেরেলম্যান ও চার্লস বার্নস্টেইন এবং ফ্রান্সের জাঁ মারি গ্লাইজ-এর বিশৃঙ্খলার রচনাগুলো বর্তমান কালখণ্ডের আভাঁ গার্দ। সুতরাং অবাক হওয়ার কিছু নেই যে আজ যে কবিতাকে সর্বাধিক উদ্ভাবনী বলে বিবেচনা করা হয় তা হল "আপনার সমসাময়িকতা প্রকাশ করুন" ।  "চরম সমসাময়িক" লেখার একটি প্রশংসনীয় অংশ হ'ল দৈনন্দিন জীবনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ এবং উপস্থাপন। এই সময়ের ফরাসি কবি ও তাত্বিক অঁরি মেশোনিক স্লোগান দিয়েছেন - “কবিতায় আপনাকে নিজের সমসাময়িক হতে হবে"।
          ইউরোপীয় ঐতিহ্য এবং মার্কিন সংস্কৃতির বর্তমানবাদের স্বাভাবিক দার্শনিকতায় "রাজনৈতিক" দায়বদ্ধতা সমসাময়িকতার কবিতা হিসাবে সমালোচকদের  স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে "আধুনিকতাবাদ"কে ছাড়িয়ে বা অতিক্রম করে, একটি অনৈতিহাসিক "উত্তর-আধুনিকতাবাদ" ( post-modernism ) ওই প্রবণতার সাথে খাপ খায় এবং এটি প্রত্নতত্ত্ব,  সময়ের ধারাবাহিকতা এবং ঐতিহাসিক সংশ্লেষ ইত্যাদিকে বাতিল করার মাধ্যমে নাটকীয় উপায়ে কার্যকর করে: প্রতিটি উপাদান (কবিতার মাত্রা ও ছন্দ , থিম, চিত্র, শব্দ, গদ্যযুক্তি ইত্যাদি) যে উত্তর-আধুনিক কবিতা বা গদ্যে উপস্হাপন করা হয় তা তাৎক্ষণিকভাবে "সমসাময়িক" হিসাবে স্বীকৃতি পায় । রক্ষণশীল আলোচকরা সেহেতু উত্তর-আধুনিকতা কে মান্যতা দিতে চান না, যেমন তাঁরা আভাঁ গার্দকেও স্বীকৃতি দিতে চান না । হাংরি জেনারেশন আজ বাংলা সাহিত্যপাঠের বিষয় । ছাত্রদের সেকারণে ‘আভাঁ গার্দ’ ধারণাটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি ।

Saturday, December 8, 2018

সারা হুসেন : বাংলার ষাটের দশকের বিদ্রোহী হাংরি কবিরা


           আজকের সংঘর্ষরত লেখকরা অতীতের সাহিত্যিকদের প্রতি এক রকমের চুম্বক আকর্ষণ বোধ করেন। আমরা প্রায়ই তাঁদের কাজের, জীবনযাপনের এবং জীবনশৈলীর দিকে তাকিয়ে অনুপ্রেরণা সঞ্চার করি, আমাদের নিজেদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁদের উদ্যোগ এবং কার্যপ্রণালীকে গ্রহণ করার প্রয়াস করি এবং নিজের লেখক সত্তার কন্ঠস্বর খুঁজে পাই । আজকের যে সাহিত্যিক পৃষ্ঠভূমি তা যে সমস্ত আন্দোলন ও বিপ্লব থেকে গড়ে উঠেছে তার পানে তাকাই । ১৯৫০ দশকের বিট জেনারেশন যেভাবে লেখকদের আকর্ষণ করেছিল তার সমকক্ষ আর কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা দেখা যায়নি । যুবক, অগোছালো, প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখকরা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী জীবনযাপন করছেন, সমাজের নিয়মনির্দেশ অমান্য করেছেন, সেসব গালগল্প জ্যাক কেরুয়াক ও অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে শহরের পর শহর ঘুরে বেড়াবার কল্পনা করতে ভালো লাগে -- সূর্যের আলো আপনার মুখের ওপর এসে পড়েছে --- কেউ একজন হারমোনিকা বাজাচ্ছে -- হিপি জীবনযাপনের আদর্শ, যা বিটদের সম্পর্কে রোমান্টিক ধারনা আপনার মনে তৈরি করে দিয়েছে ।
         কিন্তু একবার আপনি বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে বাস্তবজীবনের কাজ-কারবারে প্রবেশ করলে, সেই ছবিগুলো ক্রমশ পালটে যেতে থাকে । যে ধরনেরই লেখক আপনি হতে চান, আপনি প্রয়াস করেন শব্দের মাধ্যমে পৃথিবীকে যতোটা বদলে দেয়া যায়, বিস্ময়কর ঐন্দ্রজালিক খেয়ালি জগতসংসার গড়া যায়, এমনকি বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটিয়ে ফেলা যায় । নিজেদের মস্তিষ্কে গড়ে তোলা  এরকম কল্পনার মানুষ আমরা সবাই হয়ে উঠতে হয়তো পারব না, ভারতবর্ষে এরকমই এক সাহিত্যিক আন্দোলন ঘটেছিল, আমাদের নিজস্ব বিট জেনারেশন, যদি তাকে বলা যায়, যা বাংলা সাহিত্যকে গ্রহণ করার, পাঠ করার ও লেখার প্রথাকে সম্পূর্ণ পালটে দিয়েছিল ১৯৬০র দশকে।
         ডক্টর উত্তম দাশ তাঁর ‘হাংরি শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন’ গ্রন্হে জানিয়েছেন যে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন যে চারজন তাঁদের বলা হয় ‘হাংরিয়ালিস্ট কোয়ার্টেট’, তাঁরা হলেন মলয় রায়চৌধুরী এবং তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া । আভাঁগার্দের এই ঘরছাড়ারা অচঞ্চল কলকাতার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জগতকে খুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিয়েছিল ( তখন কলকাতাকে বলা হতো ক্যালকাটা ) এবং প্রকৃতপক্ষে স্বীকৃতি দেবার মতো যৌবতেজ । সদস্য সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগল এবং কবি ও লেখকেরা এই আন্দোলনে যোগ দিতে লাগলেন যার দরুন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভারতের জমিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে তারা উঠে এসেছিল ।
         হাংরি আন্দোলনকারীরা জিওফ্রে চসারের “ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ পঙক্তি থেকে হাংরি শব্দটি নিয়েছিলেন । নয়নিমা বসুকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মলয় রায়চৌধুরী বলেছিলেন, “একটি সংস্কৃতির অবসানের পর্ব আরম্ভ হলে তা বাইরে থেকে যা পায় তাকে আত্মসাৎ করতে থাকে । আজকে পশ্চিমবাংলার দিকে তাকালে হাংরি আন্দোলনকারীদের পূর্বাশঙ্কাকে সত্য বলে মনে হয়।”
         ষাটের দশক ছিল বাংলার দেশভাগোত্তর যুবসমাজের বিরক্ত প্রজন্ম । তাঁরা তাঁদের ক্রোধ এবং উৎখাত হবার বোধ যে লেখনকর্মের দ্বারা প্রকাশ করা আরম্ভ করলেন তা সেই সময়ের ঔপনিবেশিক দর্শানুপাত এবং প্রথানুগত বাংলা পঠনপাঠনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পাঠকদের ভেবে দেখতে বাধ্য করলেন যে ভারতীয় সাহিত্য কেমন দৃষ্টিতে দেখা হয় ও পাঠ করা হয় । অধ্যাপক এস. মুদগাল যেমন বলেছেন, “হাংরি আন্দোলনের মূল থিম ছিল ইতিহাস-বিশ্লেষণ সম্পর্কে অসওয়াল্ড স্পেংলারের ব্যাখ্যা, যিনি বলেছিলেন যে যখন একটি সংস্কৃতি অবসানের মুখে পড়ে যায় তখন সেই সংস্কৃতি বাইরের যাবতীয় উপাদান আত্মসাৎ করতে থাকে । হাংরি আন্দোলনের সদস্যরা মনে করেছিলেন যে বঙ্গসংস্কৃতি তেমনই এক জলবিভাজকে আক্রান্ত হয়েছে এবং বহিরাগত খাদ্যের ওপর নির্ভর করছে ।”
          হাংরি জেনারেশন কেবল একদল ক্রুদ্ধ যুবকের গোষ্ঠী ছিল না । সেই সময়ে বাংলা সাহিত্য, উচিত শব্দাবলীর অভাবে বলা যায়, সীমিত হয়ে গিয়েছিল এবং অত্যন্ত কম সংখ্যক পাঠকের জন্য রচিত হতো। হাংরি আন্দোলনকারীরা এর থেকে বেশি কিছু চাইছিলেন -- তাঁরা এক নতুন ভাষা চাইছিলেন, এক নতুন সাহিত্য পরিসর যা সাধারণ বাঙালিদের  প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারে, কেবলমাত্র কয়েকজন এলিটের বোধগম্যতায় সীমিত না থাকে । যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ঈপ্সিতা চন্দ বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “হাংরি আন্দোলনকারীদের অবস্হান ছিল চরম আইকনোক্লাসটিক ; তখনও পর্যন্ত যা কিছু অলঙ্ঘনীয় ছিল তাকে ভেঙে ফেলার জন্য , এমনকি যেভাবে কবিতা লেখা হতো, তাও, এবং যেভাবে তাঁরা জীবনযাপন করতেন, তাতে প্রতিফলিত হতো । অধ্যাপক চন্দ বলেছেন, তাঁদের হতাশা কেবল কবিদের মধ্যেই সীমিত ছিল না, একটি সমগ্র উচ্চশিক্ষিত যুবকবর্গ অনুভব করত যা তাদের কোনো ভবিষ্যত নেই ।”
        চারজন হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিলেন আরও অনেক খ্যাতনামা কবি-লেখক, যেমন সুবিমল বসাক, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ত্রিদিব মিত্র, সুভাষ ঘোষ, ফালগুনী রায়, অরুণেশ ঘোষ এবং আরও অনেকে । এই সমস্ত লেখকরা এসেছিলেন দরিদ্র পরিবার থেকে, এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আবহ তাঁদের কন্ঠস্বরকে আরও উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল ।
         স্হানীয় ভূখণ্ডের ইতিহাসে সেই সময়টি ছিল ভীষণ কঢিন । দেশভাগের ফলে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, কোথাও মাথা গোঁজার মতো কপর্দক ছিল না তাঁদের -- নিজের বলার মতো জায়গা ছিল না । দারিদ্র্য ছিল চরম, খাদ্যের ও মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের অভাব, অথচ তা তখনকার সাহিত্য ও ভাষায় প্রতিফলিত হচ্ছিল না --- প্রবেশ করতে পারছিল না এলিটদের বৈঠকখানায়, যাঁরা নিজেরা বেশ আরামের জীবন যাপন করছিলেন । হাংরি আন্দোলনকারীরা এই বাস্তব অবস্হার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন, এবং সেই সমস্ত ঘটনা ও গল্প তুলে ধরছিলেন তাঁদের প্রকাশিত বুলেটিন ও প্যামফ্লেটে ।
         হাংরি আন্দোলন সমস্ত রকমের চলিত রীতি ও ভাষাকে ভেঙে ফেলতে লাগলেন -- তা প্রথানুগ আঙ্গিকের, বিষয়বস্তুর, ছন্দের দিক থেকে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তখনকার ‘এলিট’ সাহিত্য যা বাজার দখল করে রেখেছিল তা থেকে একেবারে পৃথক । ‘এলিট’ সাহিত্য রচিত হত নম্র, সংস্কৃতিবান, সভ্য, শোভন ভাষায়, এবং তার ভেতরে হাংরি আন্দোলন বিশুদ্ধ নৈরাজ্য নিয়ে প্রবেশ করল । রবীন্দ্রনাথের ভাষাকে তাদের মনে হয়েছিল ভেজিটারিয়ান, যখন কিনা তাঁদের নিজেদের ভাষা ছিল পথচলতি মানুষের এবং আটপৌরে কথাবার্তার, জনগণের জন্য গড়া ভাষা, সদ্যপ্রসূত আবং যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় -- “জীবনের ভাষা”, যাকে অন্যেরা অশোভন ও অশ্লীল বলে দেগে দিচ্ছিলেন ।
         নয়নিমা বসুকে দেয়া সাক্ষাৎকার মলয় রায়চৌধুরী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তাঁরা ঔপনিবেশিক সাহিত্যিক মানদণ্ডকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদের একাত্ম করেছেন উত্তরঔপনিবেশিক সময়-পরিসরের সঙ্গে। তাঁরা নিজেদের লেখাপত্র প্রকাশ করতেন এক পাতার লিফলেটে এবং সেগুলো বিলি করতেন কফিহাউসে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদপত্র দপতরে । তাঁদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী কার্যকলাপ অ্যালেন গিন্সবার্গকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল, যিনি ষাটের দশকে ভারতে বসবাসের সময়ে মলয় ও সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন । কিন্তু প্রভাবশালী বঙ্গসমাজ তাঁদের সেভাবে গ্রহণ করতে পেরেনি । সমাজের সমালোচনার অর্থ রাজনীতির ও ক্ষমতানশীনদের আক্রমণ । নয়নিমা বসু লিখেছেন, হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ক্রোধ শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল যখন হাংরি কবিরা ক্ষমতাবানদের, বাঙালি রাজনীতিকদের, আমলাদের, সংবাদপত্রের সম্পাদকদের জোকার, রাক্ষস, দেবী-দেবতা, জীবজন্তু ও কার্টুন চরিত্রের কাগজের মুখোশ পাঠালেন । মুখোশের ওপর লেখা ছিল “দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন।”
         এগারোজন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হল, এবং মলয় রায়চৌধুরীকে, যাঁকে মনে করা হতো হাংরি আন্দোলনের মুখপত্র ও নেতা, তাঁকে সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার করা হল । তাঁর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা ( ইংরেজিতে Stark Electric Jesus রূপে অনুদিত ) সভ্য বাঙালি ভদ্রলোকেদের রুচিবিরোধী মনে হল, এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও কবিতায় অশ্লীলতার অভিযো্গ আনা হল । তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পঁয়ত্রিশ মাস চলেছিল, তাঁকে হাজতে পোরা হয়েছিল, এবং দুই মাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছিল । বহু সদস্য এই সময়ে হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করে চলে গেলেন, কয়েকজন চাকরি হারালেন, কেউ কেউ জীবনের অন্য ক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন । মলয় রায়চৌধুরী কিন্তু নিজের পরিবার ও অন্যান্য বন্ধুদের কাছ থেকে সমর্থন পেলেন, এমনকি টাইম ম্যাগাজিনে তাঁর মামলার খবর পেয়ে ওক্তাভিও পাজ ও আরনেস্তো কার্দেনাল তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন । তাঁর সমর্থনে অ্যালেন গিন্সবার্গ এই  চিঠি লিখেছিলেন ভারতীয় কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামের যুগ্মসম্পাদক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে :-

৭০৪ ইস্ট ফিফ্থ স্ট্রিট, নিউ ইয়র্ক, অ্যাপট ৫ এ
প্রিয় আবু সয়ীদ
         জঘন্য ! আপনার বাগাড়ম্বর আমায় বিভ্রান্ত করে তুলেছে, মাথা গরম করে দিচ্ছে আমার । আপনি প্রতিষ্ঠিত লেখক নন, "আমার কোনও পদমর্যাদা নেই", এসব কথার মানে কী ? ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের উদ্যোগে চলা চতুর্মাসিক পত্রিকার সম্পাদক আপনি । আপনার নিজস্ব লেটারহেড রয়েছে । কমিটির ভারতীয় এক্জিকিউটিভদের তালিকা আপনার হাতের কাছেই আছে, ভারতে কমিটির ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কেও আপনি ওয়াকিবহাল । চিনের ভারত আক্রমণের সময়ে আমি কলকাতায় একটি বড়সড় সমাবেশে উপস্হিত ছিলাম, যেখানে আপনার সহসম্পাদক শ্রীঅম্লান দত্ত সাংস্কৃতিক বর্বরতা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছিলেন । যা হোক, শ্রীবি ভি কার্নিককে আমি চিঠি লিখেছিলাম. যদিও আমার মনে হচ্ছিল যে, কলকাতা কমিটির কোনও সদস্য বা কমিটির সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিরই কাজটি করা দরকার ছিল । আর বাগাড়ম্বর বলতে আমি বোঝাতে চাইছি "আপত্তিকর উপাদান"-এর কথা । মশায়, আপনি ও পুলিশই একমাত্র সেগুলিকে আপত্তিকর বলছেন । সেগুলি নিছক আপত্তিকর তকমা পাওয়া উপাদান মাত্র, প্রকৃত আপত্তিকর নয় । পরের দিকে যে বলেছেন, "প্রশ্নাতীত আপত্তিকর", তা-ও নয় । আমি আপনাদের আপত্তি তোলা নিয়েই প্রশ্ন করছি, তাই তা এতোটুকুও "প্রশ্নাতীত" নয় । আসলে পুরোটাই হল রুচি, মতামত ইত্যাদির ব্যাপার । পুলিশ তাদের নিজেদের ও অন্যদের রক্ষণশীল সাহিত্যরুচি চাপিয়ে দিচ্ছে জোর করে । আমার মতে এটি কালচারাল ফ্রিডাম বা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতারই বিষয় । আশা করছি, এ-বিষয়ে ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম, বিশেষ করে সেটির কলকাতা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা-ও একমত হবেন । আমার আরও অদ্ভুত লাগে জেনে যে, এক্ষেত্রে কারওকে সাহায্য করা মানে নবীন লেখকদের বলা, তাদের মতাদর্শ থেকে পিছু হটতে, নিজেদের অবস্হান পালটাতে, ইত্যাদি । ব্রডস্কি, ইয়েভতুশেঙ্কো প্রমুখের ক্ষেত্রে যেরকম করা হয়েছিল সেরকমই একেবারে । এমনকী তাঁরা যে "ফালতু" লেখক, সেটাও । আমি আপনাকে ফের রাগাতে চাই না । আপনি ক্ষুব্ধ হন যাতেভ তেমন কিছু বলছি না । কিন্তু একটি কথা বলতেই হবে যে, বর্তমান ইশ্যু নিয়ে আমার-আপনার পত্রালাপ আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছে ওই নবীন রুশ কবিরা কেন আপত্তিকর বা ফালতু, সেই নিয়ে রুশ আমলাদের সঙ্গে আমার কথোপকথন । "দায়িত্বহীন, নিম্ন মানের লেখা, নিম্ন রুচি।" ব্রডস্কির মামলার সময়ে, আপনার মনে থাকতে পারে, বিচারক প্রায় সারাক্ষণ ব্রডস্কিকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, "কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক কবে আপনার মর্ম স্বীকার করেছে।" বেচারা মলয়, -- যদি ও একজন নিম্ন মানের লেখকও হয় -- তা হলেও ওর জায়গায় আমি থাকলে আপনার সন্মুখীন হতে আমি ঘৃণা বোধ করতাম ।
         ওরা সকলেই সম্পূর্ণ বুদ্ধিহীন, জ্যোতির্ময় দত্ত যদি একথায় আপনার সহমত হয়, তাহলে ও আপনার আত্মগরিমা তুষ্ট করার জন্য সাধুতার ভান করেছে । দলের সবাই, ছাব্বিশজন যাদের জেরা করা হয়, সুনীল, উৎপল বসু, সন্দীপন, তারাপদ তো আছেই, এরা ছাড়াও অন্য যারা গ্রেপ্তার হয় সেই সব মধ্যমানের লেখকরা -- যদিও মলয়ের নির্যাতনের প্রতি প্রতিষ্ঠানের ক্রুদ্ধ মনোভাব দেখে মলয়ের নির্বুদ্ধিতার প্রতি আমার মমত্ব জাগছে -- এরা সবাই ফালতু এমন দাবি করা আপনার পক্ষে বা জ্যোতির পক্ষে অসম্ভব। কৃত্তিবাস-হাংরি গোষ্ঠীকে -- এই মামলায় যারা সকলেই পুলিশের দ্বারা হেনস্হা হয়েছে -- সমর্থন করেন এমন কোনো বাঙালি লেখক বা সমালোচককে যদি আপনি না চেনেন, তাহলে আপনার মতামত সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে । নিজেকে একদম আলাদা রেখে বুদ্ধদেব বসু তাদের গুণের স্বীকৃতি দিয়েছেন, যেমন দিয়েছেন বিষ্ণু দে ও সমর সেন । আমি শুধু মলয় নয়, গোটা দলটার কথা বলছি ।
         এর পাশাপাশাই আপনার আরও একটা স্টেটমেন্ট আমায় অবাক করেছে। আপনি বলছেন, পাশ্চাত্য দমননীতির বিরুদ্ধেও কংগ্রেসকে একইরকম ভূমিকা নিতে হবে, "আমি পর্তুগাল, স্পেন ও পাকিস্তানের কথা বলছিলাম"। এখনও পর্যন্ত আমার শোনা আপনার বক্তব্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিরক্তিকর ( আমার কাছে ) এটি । লরেন্স, ফ্যানি হিল, জেনে, বারোজ, মিলার, আপনাদের কামসূত্র, কোনারকের আলোকচিত্র -- এসব ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে, বহুল প্রচারিত আইনি মামলা চলেছে, শায়েস্তা করার চেষ্টা চলেছে । এছাড়াও ফ্রান্সে একাধিক সংবাদপত্র ও আলজেরিয় যুদ্ধ বিষয়ক বই দমননীতির কোপে পড়েছে, পড়ছে । রাজনৈতিক কারণেই এই দমন । এমনকী কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামও এর কয়েকটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যদিও তা নিতান্ত অনিচ্ছুকভাবেই । কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম সম্ভবত আয়রন কার্টেন দমননীতির বিরুদ্ধেই সরব হতে পছন্দ করে, পাশ্চাত্য দমননীতির বিরুদ্ধে নয় -- আমার এ ধারণা আরও বেশি করে দৃঢ় হচ্ছে, বিশেষ করে আপনার প্রতিক্রিয়ার ধরন-ধারন দেখে । এই বিগত এক বছরেই নিউ ইয়র্ক শহরে চলচ্চিত্র, বই সংক্রান্ত পুলিশি ধরপাকড় তো হয়েইছে, এমনকী কমেডিয়ানরাও ( লেনি ব্রুস-এর ঘটনা ) বাদ যাননি । আমার মনে হয়, আপনার এ সম্পর্কে যতোটা জানা প্রয়োজন ততোটা আপনি জানেন না । ভদ্র ভাষায় বলতে তাই দাঁড়ায় আর কী । যেমন, আপনি কি জানেন যে, ইংরেজি ভাষায় যে প্রকাশক ডুরেল, মিলার, বারোজ, জেনে, নবোকভ, টেরি সাদার্ন, দ্য সাদে ও প্রাচ্য প্রণয়গাথা প্রকাশ করেছিল, সেই অলিম্পিয়া প্রেস ফরাসি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ? এ ব্যাপারে ফরাসি কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম কিছু করতে তেমন উৎসাহী ছিল তা নয় । অলিম্পয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া এক আন্তর্জাতিক কেচ্ছায় পরিণত হওয়ায় একটু নড়েচড়ে বসে তারা এখন একটা পিটিশন দিয়েছে । নিশ্চয়ই এটা জানেন যে, ভারতে লেডি চ্যাটার্লিজ নিষিদ্ধ ? ভারতীয় কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম কি এ বিষয়ে মাথা ঘামিয়েছে ? হাংরি আন্দোলনকারীরা তো হাল আমলের ।
         যা হোক, এসবই তত্ত্বকথা, আমার ক্ষোভ উগরে দেয়া -- মতের বিনিময় -- ঈশ্বরের দোহাই, মাথা গরম করবেন না -- মলয় রায়চৌধুরী ও তার বন্ধুদের বিরুদ্ধে আনা পুলিশের অভিযোগ মনে হয় এখনও রুজুই আছে -- মলয় লিখেছে যে এই ২৮ ডিসেম্বরই বিচার শুরু হবে -- এই অদ্ভুত পরিস্হিতি থেকে মুক্ত হবার মতো প্রবীণ লেখকদের কাছ থেকে কোনো সহায়তাই পাওয়া যায়নি এখনও পর্যন্ত --- ও বলেছে, বোধহয় ওর কথাগুলো সত্যিই, যে "আমাদের গ্রেপ্তার হওয়ার ফলে কবি ও লেখকরা এতোটাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে এখানে যে, তারা প্রায় সকলেই তাদের লেখার ধরণটাই পালটে ফেলেছে।" অবশ্যই যে লেখক দলকে ও চেনে, তাদের কথাই বলছে, "প্রতিষ্ঠিত" বয়স্কদের কথা নয় । ও লিখেছে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামকে চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পায়নি ও । আপনিও এড়িয়ে গেছেন । আর "আমাদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমাদের কোনো বুলেটিন বা ম্যাগাজিন আমরা ছাপাতেই পারছি না।"পুলিশের ভীতি । উৎপল বসু আজ একটি চিঠিতে লিখেছে, "ভীষণ বাজে খবর। আজ আমার কলেজ কর্তৃপক্ষ ( যেখানে আমি জিওলজি পড়াই ) আমায় পদত্যাগ করতে বলল । আমার কোনো যুক্তিই ওরা শুনতে নারাজ । আমার তো একরকম সর্বনাশ হয়ে গেল । ওরা "টাইম" পত্রিকা খুলে দেখিয়ে বলল : এই তো আপনার ছবি ও বক্তব্য । আপনার মতো কোনো লোক আমাদের এখানে থাকুন, এ আমরা চাই না । আমার চিঠিপত্র পুলিশ ইনটারসেপ্ট করছে । আপনি আমার শেষ চিঠিটি পেয়েছেন, ইত্যাদি।" এ একদম অসুস্হকর এক পরিস্হিতি । এরকমভাবেই সব চলতে থাকবে, এই ভেবে চিন্তিত হয়ে আমি আসলে প্রাথমিকভাবে আপনাকে তড়িঘড়ি, অতি দ্রুত চিঠি লিখেছিলাম । কারণ পুলিশি শাসনতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমার ভারতে থাকতেই হয়েছে । এখন কিন্তু পরিস্হিতি যথেষ্ট সংকটপূর্ণ । প্রবীণ দায়িত্ববান কোনো সদাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হস্তক্ষেপ না করলে এর থেকে নিষ্পত্তি সম্ভব নয় । বোধহয় ক্যালকাটা কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডাম-এর প্রতি চিঠি আপনাকে উদ্দেশ করে লেখা আমার উচিত হচ্ছে না । যদি তাই হয়, তাহলে কলকাতা কংগ্রেসের দপ্তরে এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্তের হাতে দয়া করে চিঠিটি পৌঁছে দেবেন । আপনাকে রুষ্ট করে থাকলে মার্জনা করবেন । তবে চিঠিতে অন্তত আপনাকে সোজাসুজি কথাগুলো বলছি । এই মুহূর্তে আপনার-আমার মতানৈক্যের থেকেও পুলিশ পরিস্হিতিই প্রকৃত চিন্তার বিষয় ।
         অনুগত -- অ্যালেন গিন্সবার্গ
পুনশ্চ : আমার বিলম্বিত উত্তরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী । পিটার অরলভস্কি ও আমি গত এক মাস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাদানে ব্যস্ত ছিলাম । আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই কেমব্রিজ থেকে ফিরেছি ।

         কলকাতা উচ্চ আদালতে মলয় রায়চৌধুরী জিতে যান, কিন্তু ততদিনে হাংরি আন্দোলনকারীদের সংখ্যা মাত্র কয়েকজন । মলয় রায়চৌধুরী বলেছেন যে ইতিমধ্যে বিদেশিরা তাঁর কবিতা ইউরোপ আমেরিকায় ্রৌঁছে দিয়েছিলেন এবং তাঁর রচনা সেখানকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোয় অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছিল ।” মামলার খরচের চাঁদা তোলার জন্য আমার কবিতা নিউ ইয়র্কের সেইন্ট মার্কস চার্চে পঠিত হয়েছিল, নয়তো আমার যা আর্থিক অবস্হা ছিল, উচ্চ আদালতে মামলার খরচ যোগানো অসম্ভব হতো ; বন্ধুরা যারা হাংরি আন্দোলনে ছিল রাজসাক্ষী হয়ে আমাকে ছেড়ে পালিয়েছিল, চাকরি থেকে নিলম্বিত হয়ে গিয়েছিলুম, গ্রেপ্তারির সংবাদ সহ্য করতে না পেরে ঠাকুমা মারা গেলেন , লেখালিখিও  আমাকে ছেড়ে চলে গেল ।”
          কিন্তু হাংরি আন্দোলনের সন্মোহন ও উদ্দীপনা এখনও তরুণ কবি-লেখকদের মধ্যে জাগ্রত এবং মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যান্য হাংরিদের রচনাবলী, তাঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও, আন্দোলন জীবন্ত থেকে গেছে। হাংরি আন্দোলনকারীরা কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, সারা ভারতের বিভিন্ন ভাষায় যে ছাপ ছেড়ে গেছেন তা মুছে ফেলা যাবে না । হাংরি আন্দোলনকারীদের মনে করা হয় সাহিত্যজগতের নায়ক, তা সে ধারনা যতোই রোমান্টিক হোক না কেন । এই সেই লেখক-কবির দল যারা নতুন কন্ঠস্বরের জন্য ছিল ক্ষুধার্ত এবং নিজেদের আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছিল, তাদের সাহসী ও বেপরোয়া লেখার মাধ্যমে ঝড় তুলতে পেরেছিল রাজনৈতিক এলাকায়, তাঁদের আরম্ভ করা সেই ঝড় যেন ছিল ঘোষণা, আসন্ন পরিবর্তনের ঘোষণা ।

ঋণস্বীকার : হোমগ্রোন.কম.ইন
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে প্রকাশিত

Thursday, December 6, 2018

মধুবন্তী চন্দ : "আমিই ক্ষুধা - তোমাদের জিভের মতান্তর" -- হাংরি আন্দোলনকারীদের কাব্যবিপ্লব


         গত শতকের অবক্ষয় এবং অধঃপতনকে আর. কে. লক্ষণ-এর মারাত্মক কলমে সৃষ্ট ‘কমন ম্যান’-এর মতন আর কোনো কিছুই ভালো ভাবে তুলে ধরতে পারেনি ।  নোংরামিতে ভুগতে থাকা একটি প্রজন্মের অন্তরজগতের সত্তাকে তাঁর ক্যারিকেচারগুলো, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষয়ে পচে যাওয়া অবস্হাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে স্পষ্ট করে তুলেছিল । সামাজিক অস্হিরতায় তা পাওয়া গেছে, বলিউড ফিল্মে তা দেখা গেছে । সত্যিই, যদি ভেবে দেখা যায়, ষাটের, সত্তরের আর আশির দশকের, মুখ বন্ধ করে দেয়া স্মৃতির তলদেশ থেকে উঁকি দিতে দেখা যায় দাঁতে দাঁত চেপা উথালপাথাল, ভুল পথে চলে যাওয়া রাজনৈতিক ধারণা, ভেঙে-পড়া অর্থব্যবস্হা এবং ক্ষুধার্ত জোয়ারের  উত্তাল ।

         এই বিধ্বস্ত সময়েই জন্মেছিলেন হাংরি আন্দোলনের আভাঁগার্দ কবির দল, পশ্চিমবাংলাকে কেন্দ্র করে, তারপর ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে, এমনকি ইটালি, ফ্রান্স এবং জার্মানি ইত্যাদি দেশে । যদিও তাদের আভাঁগার্দ তকমা দেয়া হয়েছে, তাঁদের রচনাবলী পড়ে আমার মনে হয়েছে তাঁরা নিরীক্ষারত বিতর্কিত কবিদের চেয়েও অনেক বেশি কিছু । তাঁরা ছিলেন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ, ভূমি থেকে উৎপাটিত, জখমে আঘাতপ্রাপ্ত, শহরের পথে ছোটানো রাগি টাঙাওয়ালার মতন, কম পয়সায় কাজ করিয়ে নেয়া শ্রমিকের মতন, যারা শহরের ঘিঞ্জি বস্তিতে গালমন্দ করে জীবন কাটায়, উদ্বাস্তু শিবিরে কোনঠাশা শ্বাসরুদ্ধ দেশত্যাগী মানুষেরা, বঞ্চিত মানুষের যে ছবি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, সবই । হিন্দিতে নামকরণ করা হয়েছিল ‘ভুখি পিঢ়ি, বাংলায় ‘ক্ষুধিত প্রজন্ম’, যে নামে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ।

         তাঁর বিখ্যাত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায়, যে কবিতার জন্য তাঁকে জেলে পোরা হয়েছিল, হাংরি আন্দোলনের কবি মলয় রায়চৌধুরী লিখেছিলেন :

“সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাবো
শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দেবো
কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই”

         হাংরি আন্দোলনকারীদের কার্যসূচি ছিল সুস্পষ্ট : তাঁরা ছিলেন ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ । যা কিছুই আইন, রাজ্য, রাষ্ট্র, সমঝোতা, সীমাবদ্ধতার শৃঙ্খলায় বেঁধে-ফেলা, আনুগত্যের দাবিদার, মধ্যবিত্ত, মূল্যবোধকাঠামো, বুর্জোয়াপনার সামান্যতম রেশ যাতে ছিল, তাকে উল্টে দিয়েছিলেন তাঁরা । কিন্তু তাঁরা মার্কসবাদের আইডিওলগ হবার ভান করেননি, বরং ছিলেন  মার্কসবাদবিরোধী । মজার ব্যাপার হল, সেই সময়েই মার্কসবাদীরা ছিলেন শাসন-ক্ষমতার অধিকারী আর রাজ্যের প্রশাসক, যাকে তাঁরা বিধ্বস্ত করতে চাইছিলেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের ইশতাহারগুলোয় ছিল ঝোড়ো লক্ষ্য, যা থেকে বুঝতে পারা যায় যে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে প্রতিবাদী এবং আটপৌরে মানুষের সংস্কৃতির বাইরে যার দরুন তাঁদের কবিতাগুলো সরাসরি অশ্লীলতার পর্যায়ে গিয়ে পড়েছে, কলার-তোলা এলিট সম্প্রদায়কে আক্রমণ করেছে যে এলিটরা তখনও পর্যন্ত উনিশ শতকের মাইকেল মধুসূদনের আলোয় নিজেদের আলোকিত করছেন, এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যোতিতে।

         তাঁরা ঢাকার কুট্টি-টাঙাওয়ালার বুলিতে লিখেছেন ( সুবিমল বসাক-এর ছাতামাথা উপন্যাস ) এবং মৃত ভ্রুণ ও সঙ্গমের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়েছেন ( শৈলেশ্বর ঘোষের জন্মনিয়ন্ত্রণ ) । মধ্যবিত্ত বাবু সমাজের কাছে তাঁদের লেখাকে ভাষা বলে মনে করা হয়নি, বরং মনে করা হয়েছে বাড়ির-চাকর-বাকররা যে বুলিতে কথা বলে সেই বুলিতে হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের কবিতাকে নিমজ্জিত করতেন । কোনো কোনো আলোচকের দৃষ্টিতে তা ছিল বন্য-মতবিরোধিতা, আবার কারোর কাছে সাঙ্ঘাতিকভাবে আপত্তিকর, কিন্তু ক্ষমতার শোষণ ও শাসনে ক্রুদ্ধ জনগণের কাছে হাংরিদের কবিতা ছিল তাঁদের কন্ঠস্বর । ত্রিদিব মিত্র হত্যাকাণ্ড কবিতায় লিখেছিলেন :

“ফালতু মগজের জ্যামিতিক অঙ্ক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি বিশৃঙ্খলায়
সভ্যকে ঘৃণা করেও লুকিয়ে রইলে সভ্যতার কলকব্জায়”

তাঁর কন্ঠস্বর, সামাজিক পেষণের তলায় চাপা দেয়া হয়েছে, শহরের ট্রাম আর ট্র্যাফিকের গর্জনের আড়ালে, তা ছিল হাংরি আন্দোলনকারীদের অস্ত্র, যার ফলে বহু নিম্নবর্গের কবি-লেখক, যাঁদের কখনও সাহিত্যের মঞ্চে জায়গা দেয়া হতো না, তাঁরা নিজের স্হান গড়ে নিতে পারলেন । তাঁরা পেলেন লেখকের সন্মান, তা সে বিশৃঙ্খলা ও মৃত্যুর চাকরি হলেও পরোয়া করা হয়নি । পথচারীদের মতো ঝড় তোলার মহা-আয়োজন ছিল হাংরি আন্দোলনকারীদের । সাহিত্য জগতে উথালপাথাল ঘটাবার পর তাঁরা জোকার, ভাঁড়, পুরাণের চরিত্রদের ক্যারিকেচারের মুখোশ পাঠিয়েছিলেন রাজনীতিকদের, বিদ্যায়তনিক কর্মকর্তাদের, আমলাদের এবং সেই সমস্ত লোকেদের যাঁরা শোষণকারী ক্ষমতাবিন্যাসের খেলুড়ে ছিলেন । সেই উপহারগুলোর ওপরে লেখা থাকতো ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন’।

          তাঁদের দুঃসাহস বুর্জোয়া সংবেদনকে আঘাত হানলো, বেশ তছনছ করে, অতিশয় ক্রুদ্ধ করে । বিট জেনারেশনের কবিরা হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহযোগীতা করলেন । ‘এল কর্নো এমপ্লুমাদো’ পত্রিকার সম্পাদিকা মার্গারেট র‌্যাণ্ডালকে মলয় রায়চৌধুরী লিখেছিলেন, “তোমাদের লেখাপত্র যদি ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠাও তাহলে আমরা সেগুলো আমাদের ভাষায় অনুবাদ করে এখানকার পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে পারব ।”

        ইয়েটস লিখেছিলেন….
“থিংস ফল অ্যাপার্ট ; দি সেন্টার ক্যাননট হোল্ড ;
মেয়ার অ্যানার্কি ইজ লুজড আপঅন দিস ওয়র্লড”

         ষাটের দশকের কথা ভাবলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অস্হিরতা এবং আরও অস্হিরতার ছবি। এই সময়ের পরেই নকশাল আন্দোলন  তাত্বিক আদর্শ নিয়ে ভীষণভাবে দেখা দিলো । অস্হিরতার তরঙ্গ বইতে লাগলো সারাটা দেশের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত, যা বাস্তবায়িত হতে দেখা গেল নানা ধরনের দাঙ্গা আর রাষ্ট্র-আয়োজিত হত্যাকাণ্ডে । সেগুলো ছিল স্বাধীনতার সময়ে দেয়া কথার খেলাপি । কিন্তু অশান্তি ছিল সর্বত্র। সমীর রায়চৌধুরী হাংরি পত্রিকার একটি নেপালি সংস্করণও এই সময়ে প্রকাশ করেছিলেন ( প্রচ্ছদ হাংরি শিল্পী অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা ) ।

        ষাটের দশক ছিল সমাজ বিপ্লবের মহাকাল । ব্রিটিশদের চাপানো রক্ষণশীলতা পালটি খেয়ে গেল যৌনবিপ্লবের হাতে, যে বিপ্লবে ফাটল ধরে গেল পুরোনো পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রাচীরে । শহুরে পথপার্শ্বে গজিয়ে উঠতে লাগল হিপিদের কমিউনিটি এবং লাইসারজিক অ্যাসিডে নিমজ্জিত একটি প্রজন্ম । এ-কথা সত্য যে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি বহু দেশের এবং আইডেনটিটির মানুষদের তার সঙ্গে একাত্ম করতে পেরেছিল, যার দরুন কবিতাটি স্প্যানিশ, ইটালিয়ান, ফরাসি এবং আরও বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছিল । ক্ষুধা ছিল একটি বুনিয়াদি সমস্যা । যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল তা হলো শ্বাসবদ্ধকর সামাজিক অবস্হা । অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তার সমুদ্রের আছাড় খেয়ে ভেঙে পড়ছিল তাবৎ কাঠামো । 

         হিপি কমিউনগুলো স্বপ্ন দেখছিল ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন করে গড়ে তোলার, যখন কিনা অসহায়তায় আক্রান্ত হাংরি আন্দোলনকারীরা হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের জন্য দায়ি ক্ষমতাচক্রের ওপর নিজেদের যৌথ শোক থেকে সংগ্রহ করা বিষ ঝরাচ্ছিল ।

         মলয় রায়চৌধুরী এখনও শব্দের যুদ্ধাস্ত্র সংবরণ করেননি । কবিতা লেখার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল । তা সত্বেও হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের শান দেওয়া কবিতার পত্র-পত্রিকা বিলি করে গেছেন কলেজের করিডরে এবং রাজপথে । যেমন-যেমন তাঁদের প্রভাবের প্রসার পশ্চিমবাংলা ছাড়িয়ে অন্যত্র ঘটতে লাগল, রাজ্য সরকার, তখন মার্কসবাদীরা সরকারে এসেছে, হাংরিদের কন্ঠরুদ্ধ করার প্রয়াস করল । বেশ কিছু লেখককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল । কেউ কেউ আন্দোলন ছেড়ে পালিয়ে গেল এবং নিজেদের হাংরি সহলেখকদের বিরুদ্ধে কথা বলা আরম্ভ করল । যাঁরা এই আন্দোলন আবেগের সঙ্গে আরম্ভ করেছিলেন তাঁদের বেশ ক্ষতি হয়ে গেল । শেষ পর্যন্ত স্তিমিত হয়ে গেল আন্দোলন । তবু অনেকের কলম এখনও লিখে চলেছে, সাহিত্যজগত মলয় রায়চৌধুরী এবং তাঁর মতো বিপ্লবীদের সম্পর্কে গর্বান্বিত, যাঁরা তাঁদের কলম এখনও থামাননি এবং ঈথারে উথালপাথাল ঘটিয়ে চলেছেন ।
আইসিটেলস. কম
৮ই মে, ২০১৬

Wednesday, December 5, 2018

অঙ্কন কাজী : রক্তাক্ত জখম - হাংরি আন্দোলনের বিতর্কিত উত্তরাধিকার




         এই বছর ( ২০১৮ ) কলকাতার এক্সপেরিমেন্টার গ্যালারিতেশিল্পী সঞ্চয়ন ঘোষ ‘শ্রমের আপোষ’ নামে কার্মিক শ্রমের বিভিন্ন উপাদানকে একটি বৌদ্ধিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উপস্‌আপন করে সম্ভাব্য ইউটোপিয়ার দৃষ্টিকল্পনা করেছিলেন । 

         প্রদর্শনীর কেন্দ্রস্হলে ছিল চুন-বালি-জল দিয়ে গড়া একটি বিশাল চাতাল, ঠিক যেমন বীরভূমের ছাদ পেটাইকারীরা তৈরি করেন । তার চারিপাশে ছিল ছাদ পিটিয়েদের ছবি, একটি বাংলা সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যা এবং শ্রম আইন জার্নালের দুটি সংস্করণ । দেয়াল থেকে যে হেডফোনগুলো ঝুলে ছিল, সেগুলো কানে লাগিয়ে সেই দলিত রমণীদের গান শোনার ব্যবস্হা করা হয়েছিল । যাঁরা এই কাজে নিযুক্ত ছিলেন তাঁদের শ্রম -- যা মোটামুটি আশির দশকে শেষ হয়ে গেছে -- সেই গানগুলো পুরুষ কবিদের কবিতার ঐতিহ্যে প্রবেশ করেছে । চুন-বালির চাতালের ওপরে রাখা ছিল একটি ঝলমলে বোর্ড, যেন ‘২০০১: একটি মহাশূন্যের যাত্রা’, যার ওপর আলো দিয়ে লেখা ছিল মলয় রায়চৌধুরীর কবিতার এই লাইনগুলো :

চাঁদোয়ায় আগুন লাগিয়ে
তার নীচে শুয়ে আকাশের উড়ন্ত নীল দেখছি এখন
দুঃখ কষ্টের শুনানী মুলতুবি রেখে
আমি আমার সমস্ত সন্দেহকে জেরা করে নিচ্ছি

         এই নগ্ন দৃষ্টিকল্পনা, এমনই এক সম্ভাব্য ভবিষ্যতের, যা অবিরাম পিছু হটে চলেছে, এবং একটি অবরোধী আধুনিক বিষয়বস্তুর সৃষ্টিশীল বিনির্মাণের ওপর নির্ভর করে আছে, যা হাংরি আন্দোলনের ক্রুদ্ধ আকাঙ্খাপূর্তিকে বুঝতে পারার জন্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জরুরি । হাংরি আন্দোলন ছিল  সাহিত্যের আন্দোলন, যা ষাটের দশকের পশ্চিমবাংলার সাংস্কৃতিক কল্পনায় ছেয়ে গিয়েছিল ।

         সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের সঙ্গে মলয় রায়চৌধুরী ছিলেন  “হাংরি আন্দোলনের” প্রতিষ্ঠাতা, যাঁরা হামেশাই পশ্চিমবাংলার সাহিত্যিক এবং আইনি প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্হানকে স্পষ্ট করে তুলেছিল, এবং সেই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা শেষাবধি জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং অভিযুক্ত করেছে, ফলে শেষ পর্যন্ত দলটিকে ভেঙে ফেলতে সফল হয়েছে । তা সত্বেও এদের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে, এমনকি হিন্দি সাহিত্যেও ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল । হাংরি সাহিত্য আন্দোলনকে প্রায়ই আণ্ডারগ্রাউণ্ড সাহিত্যিক সংস্কৃতির উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা হয় -- মূলত ‘লিটল ম্যাগাজিনের’ সমর্পিত বিকল্প পাঠকদের কাছে -- দেশজ ভাষায় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্য-ভাণ্ডাররূপে ।

          হাংরি আন্দোলনকারীরা তাঁদের রচনাবলীকে একাধিক ইশতাহার ও সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌছে দিতেন । আত্মসন্দেহ এবং আশা একযোগে উপস্হিত আছে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনায়, যখন কিনা তাঁরা কোনোরকম সমঝোতা সহ্য করতেন না । আধুনিকতাবাদী জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর সাফাইকরা প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতার পরিবর্তে, তাঁরা এনেছিলেন সমাজের সীমালঙ্ঘন -- অস্বাভাবিক যৌনতাচর্চা, অতিরিক্ত মদ্যপান, এবং মাদকসেবন, মেলাবার প্রয়াস করেছিলেন হিন্দু ধর্মের আচার-আচরণের সঙ্গে  যৌনতার নিষিদ্ধতাকে --- যা প্রায়শই সাহিত্যিক অভিব্যক্তি হিসাবে তুলে ধরতেন তাঁরা। ক্রোধের যাথার্থকে বাগ্মীতার মাধ্যমে প্রকাশ করে তাঁরা বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ।

       , ‘কবিতা হল মানুষের নার্সিসিস্টিক চালিকাশক্তির কর্মক্রিয়া’, নভেম্বর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত প্রথম ইশতাহারে বলেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীরা । ‘স্বাভাবিকভাবে, আমরা আধুনিকতার  ফাঁকাফোকর হিসাবে কবিতাকে, যা কিনা কমার্শিয়াল পত্রিকার ডারলিঙ, যেখানে কবিতা অরগ্যাজমের স্বতঃস্ফূর্তিতে পুনর্জাগরিত হয় না, এবং প্রকৃতপক্ষে যা হয় তা হল নকল কাদাঘুর্ণিতে পাক-খাওয়া, অর্ধশিক্ষিত বুড়ো-খোকাদের ছন্দের গদ্য, তাতে কেউই সেই আর্তচিৎকার খুঁজে পাবে না, যেমনভাবে একটি অপ্রাণ থেকে প্রাণের সৃষ্টি হয়, মানুষ প্রয়াস করে কর্মতেজ হয়ে ওঠার।’

          যে পাঁচ বছর হাংরিদের সাহিত্য আন্দোলন সক্রিয় ছিল, তাঁরা শতাধিক বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন। 
 চল্লিশজনের বেশি কবি-লেখক ও শিল্পীদের সদস্য হিসাবে পেয়েছিল হাংরি আন্দোলন, যাঁরা নতুন নতুন পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করতেন । কিন্তু ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এগারোজনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রুজু করে । বহু পুরোনো সদস্য, শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ, হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধতা করার জন্য এগিয়ে যান, এবং মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার মামলায় সাক্ষ্য দিলেন । ফলে আন্দোলন ক্রমশ প্রাণশক্তি হারিয়ে ফ্যালে ।

         পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার বহু প্রয়াস করা হয়েছে । সেই সমস্ত আয়োজন মূলত মলয় রায়চৌধুরী এবং শিল্পী অনিল করঞ্জাই-এর অবদানকে ঘিরে বিভিন্ন সভাসমিতিতে এবং বিদ্যায়তনিক চর্চায় সীমাবদ্ধ থেকেছে । অনিল করঞ্জাইয়ের স্বপ্নের মতন যৌনতার ল্যাণ্ডস্কেপ ছিল হাংরি আন্দোলনের ঐতিহ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ।

         বাংলা পপুলার সংস্কৃতিতে, হাংরি-চরিত্র হিসাবে সৃজিৎ মুখার্জির ২০১১ সালের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্মে সিনেমার আর্টহাউস পরিচালক গৌতম ঘোষকে অভিনয় করতে দেখা গেছে, কলকাতার প্রান্তবাসী একজন অসন্তুষ্ট, সীমালঙ্ঘনকারী হাংরি কবি হিসাবে ।  ২০১৫ সালে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হাংরি সাহিত্য আন্দোলন : তত্ব, তথ্য, ইতিহাস’ -- আন্দোলনকারী ও তাঁদের সমালোচকদের বক্তব্য একত্রিত করে -- গ্রন্হটির দ্বারা হাংরি আন্দোলনকে বিদ্যায়তনিক স্তরে প্রাণশক্তি দেবার প্রয়াস করা হয়েছে । বইটি হাংরি সাহিত্যের মূল্যবোধের মানদণ্ড ও ইতিহাসের প্রেক্ষিতে আন্দোলনের অবস্হান নির্ণয় করার চেষ্টা করেছে ।

         সঞ্চয়ন ঘোষের শিল্পকর্মের মতনই, উপরোক্ত দুটি কর্ম-পরিকল্পনাই হাংরি আন্দোলনের প্রতি সহৃদয়, কিন্তু তাঁদের পুনরায় জাগিয়ে তোলার  কর্ম-পরিকল্পনায় হাংরি আন্দোলনের অন্তর্গত বহুবিধ টেনশনের সহজ-সমাধা হয়নি। এই কর্ম-পরিকল্পনাগুলোকে বিশ্লেষণ করলে আমরা আন্দোলনটিকে জাগিয়ে তোলার উদ্দেশে তাঁদের রাজনীতিকে বুঝতে পারব ।

         বীরভূমের দলিত নারীদের সঙ্গীতকে সঞ্চয়ন ঘোষ যেভাবে প্রয়োগ করেছেন, তা তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে সমস্যা ও সমাধান দুইই তুলে ধরেছে : টেক্সট ও আইডিয়ার গভীর লিঙ্গবাদী দৃষ্টিভঙ্গী, যা হাংরি আন্দোলনের মুক্তিপ্রসঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অথচ  যা প্রায়ই বাধাবন্ধনহীন নারীদ্বেষেকে প্রকট করে তুলতো । হাংরি আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিতে পৌরুষ ছিল যেন একটি বিপন্ন বৌদ্ধিক ও বস্তুগত আহরণসূত্র । ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্মে খলনায়কের পৌরুষ দ্বিধা-খণ্ডিত -- সে একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসার, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি --- এবং নিবারণ নামে উচ্চাকাঙ্খী হাংরি আন্দোলনকারী কবির ভূমিকায় পুলিশ-অফিসারটির গড়ে তোলা ছায়ামানুষ হিসাবে গৌতম ঘোষ, যে কিনা সিরিয়াল কিলারও হতে পারে । এই দুই চরিত্রের মাঝে ফেঁসে গেছে একজন যুবক, যাকে সমীহ করা যায়, পরমব্রত চ্যাটার্জি, পাকড়াশী নামে একজন পুলিশ অফিসারের ভূমিকায়, যে নৃশংস খুনগুলোর সমাধান করতে অসফল, সেই সব খুনের শিকার হল ভিখারি আর যৌনকর্মীদের মতন সমাজের প্রান্তবাসীরা ।

         পাকড়াশীকে একদল পুলিশ অফিসারের হুমকির সামনে পড়তে হয়, যারা বিশ্বাস করতে পারেনি যে তার মতন সাদাসিধা একজন যুবক পুলিশ অফিসারের কাজ করতে পারবে । সে ক্রুদ্ধ হয়ে  অ্যাকশান-হিরো ধাঁচের পুলিশ অফিসারের ধরাবাঁধা চরিত্রকে চ্যালেঞ্জ করে, আর মনে মনে ভাবে যে তাহলে কি মাংসের দোকানের কসাইয়ের মতন হলে লোকে তাকে সিরিয়াসলি নিতো ! পাকড়াশীর মতন এক সুবোধ ভদ্রলোকের বিপরীতে পুলিশ বিভাগে প্রবীরের  উপস্হিতি অনেকটা ভতুড়ে । থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করার আধিক্যের কারণে প্রবীরকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছিল, পরে তাকে ফিরিয়ে আনা হয় যাতে পাকড়াশীর বইপড়া বিদ্যার সহায়ক হবার জন্য সে তার নিয়মনীতি বর্জিত, অনেক সময়ে বেআইনি, ট্যাকটিকস প্রয়োগ করতে পারে ।

         একজন বয়স্ক এবং আরেকজন উদীয়মান যুবকের দুরকম আঙ্গিকের অস্বচ্ছন্দ পৌরুষের যৌথতার বিরুদ্ধে নিবারণ নামের কবিকে উপস্হাপন করা হয়েছে, যাঁর রচনা প্রকাশিত হয়নি, যিনি বিকৃতকাম চিত্রকল্পে মেতে ওঠেন এবং প্রায়ই হাংরি আন্দোনকারীদের মামলার উল্লেখ করেন । প্রবীর থাকে একটি পুরোনো ভাঙাচোরা প্রাসাদে, যখন কিনা নিবারণ অত্যন্ত গরিব এবং অর্ধোন্মাদ, কেননা তাকে রবীন্দ্রনাথ নামের একজন ছায়াবৎ লোক কবি হিসাবে স্বীকৃতি ও খ্যাতির নিষ্ঠুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । রহস্যকাহিনি যেমন যেমন তার বিষণ্ণ বাঁকবদল দিয়ে এগোয়, পৌরুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব অধিকতর গুরুত্ব পেতে থাকে । প্রবীরের যুক্তিহীন সহিংস পৌরুষকে উপস্হাপন করা হয়েছে বাঙালি পুরুষমানুষের উথাল-পাথাল মনঃস্হিতিকে বোঝার জন্য । প্রথম বাঁকবদলে দেখানো হয় প্রবীরের ক্ষমতার দেখনদারি । সমাজের শরীরে সীমাভঙ্গকারী কবিতার বিপদ সম্পর্কিত বাঁধাধরা ধারণাকে সে স্রেফ নিজের কাজে ব্যবহার করে । ফিল্মের শেষ দিকে তার মৃত্যুকে ট্র্যাজিক ঘটনা হিসাবে দেখানো হয়েছে -- যা পলিটিকালি ইনকারেক্ট, বলতে চেয়েছে ফিল্মটি, সে বেঁচে থাকুক আর নিজেকে বিজয়ী মনে করুক, কেননা বেঁচে থাকলে মনে হতো যে সে জিতে গেছে, কিন্তু তার সন্দেহজনক আত্মবলিদান আসলে স্ট্যাটাস কুয়োকে জিইয়ে রাখার জন্য শোক করার ব্যাপার নয় ।

         ইত্যবসরে হাংরি আন্দোলনকে নিজের ব্যবস্হা নিজে করে নিতে বলা হয়েছে, তার উত্তরাধিকারকে এমনই এক ইনোসেন্ট প্রজন্মের ভুল ব্যাখ্যার জন্য মাঝপথে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যারা তাদের সামাজিক সীমালঙ্ঘনের রাজনৈতিক দৃষ্টিপ্রতিভা দ্বারা বদল আনতে অপারগ, অথবা দায় নেবার দায় তাদের নেই।

সৃজিৎ মুখার্জির ফিল্মের তুলনায় প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংকলনগ্রন্হটি হাংরি আন্দোলনের ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে । হাংরি আন্দোলনকারীদের স্বয়ম্ভু বিপ্লবী হিসাবে তুলে ধরার পরিবর্তে, বইটির ঐতিহাসিক প্রবন্ধগুলো হাংরিদের অবস্হানকে তুলনা করতে চেয়েছে পুরোনো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক প্রাতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে । সমীর রায়চৌধুরী -- মলয়ের দাদা-- তাঁর প্রবন্ধ আরম্ভ করেছেন জওহরলাল নেহেরুর দুই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের মাধ্যমে । দ্বিতীয় পরিকল্পনা, যেটি শিল্পোদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়েছিল, তার ফলে মফসসলের আঞ্চলিক প্রান্তে গড়ে উঠেছিল ইস্পাতের কারখানাগুলো । তা ছিল সংস্কৃতি ও সামাজিক দিক থেকে জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা শ্রমিকরা বেশ বড়ো আকারে স্হানান্তরিত হয়েছিল ।

          পাটনা, যে শহরে রায়চৌধুরী ভাইরা বড়ো হয়েছিলেন এবং হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন সেই ধরনের জায়গাগুলোর প্রধান গুরুত্ব --- মুঙ্গের, ডালটনগঞ্জ, ধানবাদ, পুর্নিয়া, চাইবাসা, এমনকি বহু দূরের বেনারস ও ত্রিপুরাকে আলোয় আনা হয়েছে । হাংরি আন্দোলনকারীরা অনায়াসে স্হানীয় বুলি, সাহিত্যিক প্রতিনিধিত্ব, স্হানীয় কৌম এবং সেই পরিসরগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাসকে এনেছেন তাঁদের টেক্সটে, আর পাশাপাশি এই ঘিঞ্জি অঞ্চলগুলোর কাঙালি বাঙালি জীবনের একক অভিজ্ঞতাকে লেখায় নিয়ে আসার প্রয়াস করেছেন । সমীর বলেছেন শ্রমিকশ্রেণির পাড়ায় শৈশবের কথা, শ্রেণিভেদের শিকার হবার কথা, প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের দ্বারা এবং বিদ্যায়তনিক সংস্হাগুলোর দ্বারা পরিত্যক্ত হবার কথা ।

         ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক, যে, তিনি ওই অবদমনকে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজন অনুভব করছেন এবং দাবি করছেন যে ওই নাকউঁচু বর্গের চেয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও রামচরিতমানস সম্পর্কে অধিক জ্ঞান রাখেন । তাঁর দাবিটা  মনে হবে হাস্যকর যদি সতীনাথ ভাদুড়ীর বিখ্যাত উপন্যাস ঢোঁড়াই চরিত মানস-এর সঙ্গে তুলনা করে হয়, যে উপন্যাসটি তুলসীদাসের মহাকাব্যটির অন্তর্ঘাতী পুনর্লিখন, যার পৃষ্ঠভূমি ছিল বিহারের অবদমিত তাঁতি জাতের মানুষেরা । একই ধরণের স্হানিক প্রভাব পাওয়া যাবে হিন্দি লেখক ফণীশ্বরনাথ রেণু এবং রামধারী সিহ দিনকর-এ । হাংরি আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে, যাঁরা প্রায় সকলেই এসেছিলেন প্রভাবশালী বর্ণ থেকে, নিম্নবর্গকে নিয়ে নিরীক্ষা অথবা পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সমাধানহীন রয়ে গেছে ।

         সমীর যখন বিদ্যায়তনিক স্তরে স্বীকৃতির কথা বলেন, তখন একটি নামই উল্লেখ করতে পারেন, এবং তা হল দীপ্তি ত্রিপাঠীর, যিনি হাংরি আন্দোলনকারীদের লেখায় যুক্তিকাঠামোর অভাব এবং শব্দবাহুল্যের প্রতি ঝোঁকের কথা বলেছিলেন । সমীর এই সমালোচনাকে, যদিও বেশ আশ্চর্যের, তাঁর লেখায় যৌনতার প্রতি ঔচিত্যবাদী প্রতিক্রিয়া হিসাবে মনে করেছিলেন । সমীর আনন্দের সঙ্গে স্বীকার করেছিলেন যে ন্যারেটিভের একরৈখিকতাকে পরোয়া করেন না এবং প্লটের মারপ্যাঁচকে মনে করেন কৃত্রিম ।

          হাংরি আন্দোলনের আদর্শগত উদ্দেশ্যের সংক্ষিপ্ত সজ্ঞা নিরুপণে সমীর রায়চৌধুরী এবং প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় উভয়েই তাঁদের বক্তব্যে অস্পষ্ট রয়ে গেছেন । তার মানে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনাবলীকে  তাঁদের আধুনিকতাবাদী আচরণ থেকে পৃথক করতে তাঁরা অসমর্থ, যেমন জুতোর বাক্স রিভিউ করার জন্য পাঠানো, কাগজের মুখোশ পাঠিয়ে মুখোশ খুলে ফেলতে বলা ইত্যাদি । তাঁরা প্রতিষ্ঠানবিরোধী কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের প্রবাহকেও গুরুত্ব দিয়েছেন । কৃত্তিবাস ছিল মহানগরীয় এবং আধুনিকতাবাদী নান্দনিকতার সাহিত্য পত্রিকা । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত কৃত্তিবাস পত্রিকাটি ষাটের দশকে নড়বড়ে হয়ে গেলেও পরবর্তীকালে বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে তা হয়ে ওঠে সমীহ করার মতো একটি সাংস্কৃতিক বস্তু ।

         র‌্যাডিকাল আধুনিকতার হস্তক্ষেপের বিপ্রতীপে সাহিত্যিক অবস্হানের বিপদহীন আশ্রয়ে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংকলন আলো ফেলেছে প্রান্তিক এলাকার গুরুত্বে, যা আমরা দেখতে পাই স্হানিক ক্ষমতা সংঘর্ষের দ্বারা সজ্ঞায়িত একরূপতার দাবিতে --- বাঙালিদের জন্য পশ্চিমবাংলা, ওড়িয়াদের জন্য ওড়িষা, বিহারিদের জন্য হিন্দি বা মৈথিলি --- যখন কিনা বিশাল একটা শ্রমিক জনসমূদায়কে উপেক্ষা করা হয়েছে যারা রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে জীবনযাপনের জন্য  অন্যত্র চলে গেছে । হাংরি আন্দোলনকারীরা পাঠকদের পাঠাভ্যাস পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ জানালেন তাঁদের নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে ।

         ব্যাপারটা সঞ্চয়ন ঘোষের ইনস্টলেশনে স্বরলিপির মিশ্রণ ঘটিয়ে যে গান শোনানো হচ্ছে তার ক্ষেত্রেও সত্য । বাউড়ি গায়িকারা যে বুলিতে গান গাইতেন তা শুদ্ধ সাহিত্যিক বাংলা ভাষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল । এমন এক ঐতিহ্য যেখানে প্রভাবশালী জাতের পুরুষদের রুচি প্রতিষ্ঠিত ভাষা এবং গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানবিরোধী ডিসকোর্স নির্ণয় করে, তাতে যদি না খাপ খায় তাহলে আচরণ-অভ্যাসগুলো লোপাট হয়ে যায় । সঞ্চয়ন ঘোষের ইন্সটলেশান লিঙ্গবাদী রাজনীতির সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চেয়েছে, বুঝতে চেষ্টা করেছে যে বাঙালির সংস্কৃতিতে শ্রমসাহিত্য গভীরভাবে কেন লিঙ্গবাদী ।

         এই ধরনের মিশ্রণ, সাহিত্যিক সংঘর্ষ থেকে অশুদ্ধতা গড়ে তোলা, মলয় রায়চৌধুরীর বিখ্যাত কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর  তুচ্ছ যৌনচিত্রময় লাইনগুলোর চেয়ে বেশি সামাজিক ও সাহিত্যিক আঘাত করতে পারে :

তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমাত গর্ভে আমারি শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা অন্য হলেই কি আমি এরকম হতুম ?

ঋণস্বীকার : দি ক্যারাভান পত্রিকা, ১ অক্টোবর, ২০১৮

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...