Showing posts with label Subimal Basak. Show all posts
Showing posts with label Subimal Basak. Show all posts
Thursday, January 16, 2020
Tuesday, August 28, 2018
সুবিমল বসাকের "প্রত্নবীজ" আলোচনা : করেছেন অলোক রায় : বলেছেন 'পাথব্রেকিং' ন্যারেটিভ
প্রত্নবীজের সন্ধানে
অধ্যাপক অলোক রায় লিখিত
প্রত্যেক বছর পুজোসংখ্যায় কতগুলি উপন্যাস ছাপা হয় তার হিসেব জানা নেই। দশ-বারোটি বাজারি পত্রিকায় সম্ভবত শ'খানেক উপন্যাস বের হয়। এ ছাড়া তথাকথিত ছোট পত্রিকাতেও আজকাল উপন্যাস থাকে বা উপন্যাসোপম গল্প। এত যে লেখা হয়, তার মধ্যে মনে দাগ কাটে এমন উপন্যাস সংখ্যায় নগণ্য। অ্যাকাডেমিক বিচার এখন শিকেয় তোলা থাক, সাধারণ পাঠকের প্রতিক্রিয়ার কথাই বলছি। উপন্যাসের শিল্পরূপ নিত্য পরিবর্তমান। নিটোল পরিপুষ্ট ইচ্ছাপূরণের কাহিনী আজও লেখা হয়। ভোগ্য পণ্যের মত বিজ্ঞাপনের কল্যাণে এ ধরণের গল্প হয়তো জনপ্রিয়ও বটে। তা না হলে বাজারি পত্রিকা এমন উপন্যাস ছাপে কেন ? কিন্তু বাজার দখল করার প্রত্যক্ষ অভিপ্রায় ছাড়াও উপন্যাস লেখা হয় ।তাকে যথার্থ উপন্যাস বলা যাবে কি না তা নিয়েও সংশয় থাকতে পারে। তবু এর দরকার আছে । এমন কিছু কথা বলতে হয়, যা এতদিন কবিতাতেই বলা হয়েছে। কিংবা প্রবন্ধে। এমন উপন্যাসের আধারে পরিবেশ করা হলে আপত্তির কিছু নেঈ। উপন্যাস মিশ্রশিল্প। উপন্যাস খুবই নমনীয় সহজবশ্য শিল্পরূপ। তবে উপন্যাসের অনেক পরিবর্তন সত্বেও তার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার একটা যোগ অস্বীকার করা যায় না। সমস্যা যদি কিছু থাকে তা হলো বাস্তবের স্বরূপ-সত্য নিয়ে।
অধ্যাপক অলোক রায় লিখিত
প্রত্যেক বছর পুজোসংখ্যায় কতগুলি উপন্যাস ছাপা হয় তার হিসেব জানা নেই। দশ-বারোটি বাজারি পত্রিকায় সম্ভবত শ'খানেক উপন্যাস বের হয়। এ ছাড়া তথাকথিত ছোট পত্রিকাতেও আজকাল উপন্যাস থাকে বা উপন্যাসোপম গল্প। এত যে লেখা হয়, তার মধ্যে মনে দাগ কাটে এমন উপন্যাস সংখ্যায় নগণ্য। অ্যাকাডেমিক বিচার এখন শিকেয় তোলা থাক, সাধারণ পাঠকের প্রতিক্রিয়ার কথাই বলছি। উপন্যাসের শিল্পরূপ নিত্য পরিবর্তমান। নিটোল পরিপুষ্ট ইচ্ছাপূরণের কাহিনী আজও লেখা হয়। ভোগ্য পণ্যের মত বিজ্ঞাপনের কল্যাণে এ ধরণের গল্প হয়তো জনপ্রিয়ও বটে। তা না হলে বাজারি পত্রিকা এমন উপন্যাস ছাপে কেন ? কিন্তু বাজার দখল করার প্রত্যক্ষ অভিপ্রায় ছাড়াও উপন্যাস লেখা হয় ।তাকে যথার্থ উপন্যাস বলা যাবে কি না তা নিয়েও সংশয় থাকতে পারে। তবু এর দরকার আছে । এমন কিছু কথা বলতে হয়, যা এতদিন কবিতাতেই বলা হয়েছে। কিংবা প্রবন্ধে। এমন উপন্যাসের আধারে পরিবেশ করা হলে আপত্তির কিছু নেঈ। উপন্যাস মিশ্রশিল্প। উপন্যাস খুবই নমনীয় সহজবশ্য শিল্পরূপ। তবে উপন্যাসের অনেক পরিবর্তন সত্বেও তার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার একটা যোগ অস্বীকার করা যায় না। সমস্যা যদি কিছু থাকে তা হলো বাস্তবের স্বরূপ-সত্য নিয়ে।
সুবিমল বসাকের প্রথম উপন্যাস বা গদ্যন্যাস ছাতামাথা (১৯৬৫) আমি পড়িনি । দ্বিতীয় উপন্যাস প্রত্নবীজ (১৯৯৬) কয়েক বছর আগে ছাপা হলেও সদ্য আমি পড়বার সুযোগ পেয়েছি। উপন্যাস, কিন্তু আদৌ অবসর-বিনোদনের সামগ্রী নয় । পড়ে চমকে উঠতে হয় । কারও ভালো লাগবে, কারও লাগবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। একটা প্রবল আলোড়ন তোলা সম্ভব। অথচ সেভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। এটাই বিস্ময়কর। অথবা বিস্ময়ের কিছু নেই। প্রত্যেক বছর বাংলায় যে একশো-দেড়শো উপন্যাস বেরোচ্ছে, তার নিশ্চয় বিশেষ একজাতের ভোক্তা আছে। তাঁরা প্রত্নবীজ পড়তে উৎসাহ বোধ নাও করতে পারেন।
ঠিক কার্যকারণ জানি না। তবে একটা আশঙ্কার কথা জানিয়ে রাখি। ছয়ের দশকের গোড়ায় হাংরি জেনারেশন নামে যে বুলেটিন বেরিয়েছিল, এবং তারপর এই নামে ক্ষুধার্ত প্রজন্ম নামে যে-সাহিত্যান্দোন প্রসার লাভ করেছিল, তার স্রষ্টা ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী। এই পত্রিকার যে-সংখ্যায় (অষ্টম সংখ্যায়) সুবিমল বসাকের লেখা ছাপাহয়, সেই সংখ্যাটি অশ্লীলতার দায়ে আদালতে অভিযুক্ত হয় (অবশ্য তাঁর লেখার জন্যই এমনটা ঘটেছিল তা নয়)। মলয় রায়চৌধুরীর জেব্রা (১, ২) পত্রিকায় (১৯৬৫, ১৯৬৭) সুবিমল বসাকের গেরিলা আক্রোশ আর জাবড়া ছাপা হয়। সুবিমল বসাক ''নিয়ন্ত্রিত" আর একটি পত্রিকার কথা জানা যাচ্ছে-- প্রতিদ্বন্দ্বী, তাতে ছাপা হয় সুবিমল বসাকের বেশ কয়েকটি গদ্যরচনা-- যেমন, প্রতিবিম্ব, আগ্রাসী অপকর্ম, মেরামতহীন ফাটল। প্রত্নবীজ বইটির শেষে মলয় রায়চৌধুরীর সংযোজন সেই পুরনো যোগসূত্রের কথা মনে করিয়ে দিল। 'ব্রিটিশ রাজত্বের কুষ্ঠে বাঙালির পচনশীলতা ও অবক্ষয়' বা বাঙালির মধ্যে লভ্য 'ব্রিটিশ রাজত্যের ফেলে যাওয়া মূল্যবোধ' ইত্যাদি প্রসঙ্গ উপন্যাসব্যাখ্যায় কতটা সাহায্য করে, সে বিষয়ে সংশয় আছে।মলয় রায়চৌধুরী দাবি করেছেন প্রত্নবীজ হলো 'সাবঅলটার্ন উপন্যাস'। হয়তো তাই। নিম্নবর্গের মানুষের ইতিহাসের ধারণা পেয়েছি গ্রামশির রচনায়। ভারতবর্ষেও অধুনা সাবঅলটার্ন ইতিহাস লেখা হচ্ছে, লিখছেন রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র ও অনেকে। কিন্তু সাবঅলটার্ন উপন্যাস? ফরাসি ঐতিহাসিক ইমানুয়েল ল্য রোয়া লাদুরীর 'মঁতাইউ'কে নিয়ে লেখা বইটি উপন্যাস নয়, উপন্যাসের আকর-গ্রন্থ বলা যেতে পারে। একালে আমরা যাকে 'আনাল' (Annales) বলছি, তার মধ্যে ইতিহাসের বড় সময় থেকে ছোট সময়ে নেমে আসার প্রয়াস মেলে। এইখানে ঐতিহাসিকের সঙ্গে সাংবাদিকের মিল ও অমিল।অশীন দাশগুপ্তের ভাষায় "ঐতিহাসিক অতীতকালের সাংবাদিক এবং সাংবাদিক বর্তমানের ঐতিহাসিক"। সুবিমল বর্তমানের ঐতিহাসিক । তাঁর লেখার বিষয় অচিরকালের মধ্যে ইতিহাসে পরিণত হবে, হয়তো ইতিমধ্যেই হয়েছে। এদিক থেকে তাঁর রচনা 'আনাল-ধর্মী' হতে পারে, কিন্তু হাংরি জেনারেশন বা সাবঅলটার্ন সাহিত্যের প্রসঙ্গ প্রত্নবীজের আলোচনায় না আনাই ভালো। মলয় রায়চৌধুরীর সংযোজন ( "সুবিমল বসাক অমন অঢেল যুক্তিহীনতাকে পাঠকের সোপর্দ করেছেন"), এবং প্রচ্ছদের লেখক পরিচয় এদিক থেকে কিছুটা বিভ্রান্তিকর ("সাবঅলটার্ন এই উপন্যাস বস্তুত শ্রেণী-সংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত")।
কাহিনীর সূচনায় লেখক স্হান-কাল-পাত্রের নির্দেশ দিয়েছেন -- "বাংলার বাইরে গড়ে ওঠে বাঙালিদের নিজস্ব ঘরানার এলাকা। এই সব বাঙালিরা মিশে গেছেন বিভিন্ন রাজ্যের ভূমিপুত্রের সাথা। ভাষা, সংস্কৃতি সব গ্রাস করে মিলিয়ে গেছেন তাদের মাঝে। সে জীবন, যে বাংলাভাষা, সে সংস্কৃতি বাঙালির, তবু তা অন্যরকম।... তাদের যে কী ইতিহাস তা কেউ জানে না। এই রচনাটি সেই সব মিথের গল্প।" কাহিনী তাই ইতিহাসও বটে। অবশ্য এখানে ভুল বোঝার একটু সম্ভাবনা আছে। বিহারের রাজধানির কোনো এক মহল্লায় বসবাসকারী বাঙালিকে নিয়ে উপন্যাস লেখা সুবিমল বসাকের উদ্দেশ্য ছিল না। প্রবাসী বাঙালি মধুবাবুর আট-ন' বছরের ছেলে, বাঙালি মাইজি 'খোকা কে মাই', আর খোকার ঠাইনি কেন্দ্রে আছে বটে, তাদের চোখ দিয়েই হয়তো লেখক দেখেছেন প্রতিবেশী ভগযোগিনী আর তার স্বামী হালওয়াইয়ের দোকানদার রামখেলাওনকে। সেই সঙ্গে এসেছে দুলহানিয়া বাতাসিয়া, কচরি-ফুলৌরি দোকানের তেতরি, মোদির দোকানের নগীনা, কাজের মেয়ে সুগিয়ার মা, বিপৎ গোপ, ফেকন চামার, খোটন আর বুলকন, বুধনি ডাইনি। "চারোওর মহল্লার গোয়ালা, কাহার, কুর্মি, কুমহার, ধানুক, দোসাদ জাতের ভিড়।" এর মধ্যে মুনেশ্বরবাবু, নাগেশ্বর পরসাদ, বিন্ধেশ্বরী সিং, রামাধারীর মতো অর্থবান মানুষ দুচারজন আছেন, কিন্তু প্রত্নবীজ যেমন প্রবাসী বাঙালীর কাহিনী নয়, তেমনি লালা-কায়েতদেরও কাহিনী নয়।
মলয় রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, "পাটনা শহরের কয়েকটি পাড়াকে এই সাবঅলটার্ন শ্রেণী দিয়েছেন তাঁদের বহুল প্রচারিত খ্যাতি। ঐ পাড়াগুলির মধ্যে থেকে সুবিমল বসাক বেছে নিয়েছেন লোদিপুর নামের কুখ্যাত লুমপেন প্রলেতারিয়েত পাড়াটি।" এই পাড়ায় ভূমির সঙ্গে সম্পর্কহীন কাহার কোয়রি ডোম চামার দুসাধ মুসাহার হাজাম ধোবি বড়হি ক্রমশ একাকার । কিন্তু যেসব মানুষগুলির দেখা মিলল উপন্যাসে, তারা কেউ কুখ্যাত লুমপেন প্রলেতারিয়েত বলে মনে হয় না। বিপৎ গোপ ও তার চ্যালাচামুণ্ডাদের চোর-ডাকাতেরা ভয় পেতে পারে, কিন্তু দাঙ্গা হাঙ্গামা করে বেড়ানো তাদের পেশা নয়। অন্যদিকে এরা প্রায় কেউই নির্বিত্ত সহায়সম্বলহীন নয় । এদের নিজেদের একটা সমাজ আছে ( মুসহর শুধু অস্পৃশ্য নয়, তার জলের ছিটে লাগলে এদের 'জাত' যাবে)।সেখানে বহুল প্রচারিত প্রথানুগত্যের সামাজিক ও পারিবারিক রীতিনীতির কেউ বিরোধিতা করে বলে মনে হয় না। কাজেই ঠিক বোঝা গেল না কীভাবে "একটি পাড়ার সকলেই আধুনিকতার একাধিক রোগে ভুগছে এবং তার মধ্যেই গড়ে উঠছে বহুমুখী ঐক্যের প্রবণতাগুলি, যেগুলি আধুনিকতাকে ছাপিয়ে বা ডিঙিয়ে একটি নবতর নৈতিকতা ও বৈধতার জন্যে উন্মুখ।"
কেউ-কেউ আজ এমনকথা বলছেন, উপন্যাস মাত্রই ঐতিহাসিক, উপন্যাস মাত্রই আঞ্চলিক।সুবিমল বসাক সচেতনভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেবেন বলে উপন্যাস লেখেননি ( তবে 'ইতিহাসের' কথা তাঁর মনে ছিল ) । পরিবর্তমান সমাজে বিশেষ একটি অংশের অনুপুঙ্খ বর্ণনা ইতিহাসের সামগ্রী -- বর্তমানের কাহিনী হলেও তা ইতিহাস। বিশেষত ভাষা ব্যবহারে আঞ্চলিকতাকে যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, তা বিস্ময়কর। ঢোঁড়াইচরিতমানস-এ সতীনাথকে টীকা-টিপ্পনীর আশ্রয় নিতে হয়েছিল। আলাউদ্দিন আল আজাদের কর্ণফুলি উপন্যাসে চট্টগ্রামের ভাষাব্যবহার চমকপ্রদ লেগেছিল একসময়। কিন্তু সশেষ পর্যন্ত চরিত্রকে ফোটাবার প্রয়োজনেই বিশেষ ভাষা ব্যবহার । তা না হলে অপরিচিত মহল্লা, ততোধিক অপরিচিত মানুষজন, আর তাদের ভাষাকাঠামোতে পাটনাইয়া বুলি প্রয়োগ -- অপরিচয়জনিত বিস্ময়রস সৃষ্টিতে সক্ষম, কিন্তু উপন্যাস হিসেবে স্বতন্ত্র মর্যাদা দাবি করতে অক্ষম। প্রত্নবীজ নানা কারণে অসামান্যতা দাবি করে, কিন্তু ভুল জায়গায় জোর দিলে উপন্যাসের ভ্রান্তপাঠের সম্ভাবনা বাড়ে।
অবশ্য সাহিত্যের পাঠ-পাঠান্তর থাকতেই পারে। কাকে বলে যথার্থপাঠ আর কাকে বলে ভ্রান্তপাঠ -- নিঃসংশয়ে কখনই বলা সম্ভব নয়। আমি আমার নিজের মত করে প্রত্নবীজ পড়েছি। আমার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে আর একজন পাঠকের অমিল হতেই পারে। তবে সুবিমল বসাকের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণশক্তি ও ভাষা ব্যবহারে নৈপুণ্য নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। কাহিনীর প্রেক্ষিতের সঙ্গে ভূচরিত্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে---
ওদিকে নালা রোড, করবিঘাইয়া, এদিকে মন্দিরি রাজাপুর, মানপুরা, চিৎকোহরা-- এলাকা জুড়ে সার-সার মাথা, তালগাছের। ফাঁকা মাঠে দাঁড়ালে তাড়বন্না যেন মেঘের মতো আকাশে লেপ্টে।
লোদিপুর গয়া রোড দোকানে দোকানে ঢিবরি আর পঞ্চলাইটের রোশনী। ফেরার পথে--- পটনা-গয়া রোডে গঙগা আস্নান যাত্রিদের পায়ের ্অহত আওয়াজ শোনা যায়। এদিকে মিশনারি স্কুলের উল্টোদিকের বস্তি থেকে লোদিপুর, এ.আর.পি., ব্যাঙ্ক রোড, তিমোহানি, বাঁশঘাট, মন্দিরি -- যত সব ছেলে-জওয়ান লোক আছে, রাম নামে ছড়াছড়ি।
চারোওর লোকজন, পহেলবান, মুসাফির। দুদিকে রিক্সা, বৈলগাড়ি, সাইকেল, টমটম, ফিটন। আনা-জানা বন্ধ।
পাক্কি সড়কের কিনারে, মিশনারি ইস্কুলের পাশেই, বিপৎ গোপের ভাড়ি খাটাল। রাস্তার ধারে ইঁটের দিওয়ার, ভেতরে খাটাল। বাঁশের বাল্লায় খাড়া করা ছাউনি -- পুয়াল-খড়ের ওপরে খপরৈল --- অনেকখানি এলাকা জুড়ে। বিপৎ গোপের অখাড়া পটনাভর মশহুর।
আবার ভৌগলিক অবস্হানের সঙ্গে মিলিয়ে রচিত হয় চরিত্রের মুখের ভাষা। ভগযোগিনী বা রামখেলাওন, সুগিয়ার মা বা বিপৎ গোপ যে-ভাষায় কথা বলে, তাকে হিন্দি ভাষার নিদর্শন বললে ভুল হবে।'বাংলা ভাষাকাঠামোতে পাটনাইয়া বুলি প্রয়োগে' বাংলা কথাসাহিত্যে অভিনব সামগ্রী। আসলে হিন্দিভাষী মহল্লার মানুষজন ঠিক যে-ভাষায় কথা বলে, আগাগোড়া তার ব্যবহার কাহিনীর পক্ষে গুরুভার হয়ে উঠত। 'খোকা-কে-মাই' হিন্দি বাংলা মিশ্র ভাষায় কথা বলবে সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ভগযোগিনীও অনেক সময়ে সেই ভাষা ব্যবহার করে --
হ্যাঁ রে, কাল রাতে কান্না করছিলি কাহে?
আমাকে বহুত পিটেছিল--
পিটেছিল ? কাহে ? নিশা-ভাঙ করেছিল নাকি?
নেহি খোকা-কে মাই। ওকরে আদত এহি। ঐসে ঐসে পিটেছিল--
সে কি ? তোর লাগেনি ? খুব চেল্লামিল্লি করছিলি যে --
উ তো ঐ সেহি রোনা করেছিলাম।
মাঝে-মাঝে মিশ্র ভাষার বাংলা রূপান্তর [মৌগিঅনকে সামনে সরম কৌচিকা -- (মেয়েদের সামনে আবার লজ্জা কিসের!) কা বাত হ্যায় ? ব্যাপার কি ? ববন্ডর হো গয়া -- (সাংঘাতিক ব্যাপার), কখনও বন্ধনীর মধ্যে অর্থনির্দেশ (দিবালি -- দেউলিয়া)] বর্ণনা অংশে সাধারণত বাঙালির মুখের ভাষাই ব্যবহৃত হয়েছে, হয়তো মাঝে-মাঝে উদ্ধৃতিচিহ্ণের মধ্যে হিন্দি দুচারটি কথা--
যেই যায়, পণ্ডিতজি তার মাথায় লাগিয়ে দেয় ফাগের টিকা। তারপর গোটা মুখমণ্ডলে, ক্রমশ হাতে-পায়ে, পেটে। আবির মাখালে নাকি 'মাতামৈয়া' ( মানে মা শেতলা, অর্থাৎ বসন্ত)হয় না।
ঘাস-নেওয়ারির তৈরি হোলিকা, চারিদিক ঘিরে জড়ো করা তুম্বাকার গোইঠা, কাঠ-বাঁশ, টায়ার, কাগজ, শুকনো পাতা -- সব কিছুতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বাচ্চা-জোয়ানরা বসে থাকে দূরে। আগুনের লকলকে আলো, ফটাফট আওয়াজ আর সেই সঙ্গে কালো ধোঁয়া মিশে যায় আকাশে বাতাসে। পোড়া গন্ধে ভরে যায় পরিবেশ। বাচ্চা-জোয়ানরা শিকে কাঁচা আলু একটা-তিনটে-পাঁচটা-সাতটা গেঁথে ছুঁড়ে ফেলে আগুনে । দহন শেষে ছাই উড়িয়ে শিক খুঁজে-বেছে বার করে আনো পোড়া আলু, হাতে-হাতে বিলি হয় পরসাদি।
প্রত্নবীজ-এ প্রচলিত উপন্যাসের নিটোল কাহিনীবৃত্ত প্রত্যাশা করে লাভ নেই। সুবিমল বর্তমানের ঐতিহাসিক, তাই তাঁর রচনায় কিছুটা সাংবাদিকতার ধরন এসেছে। পনেরোটি পরিচ্ছেদে মহল্লের নানা ধরনের মানুষ এসেছে। কারও জীবনের আদ্যন্ত কাহিনী বর্ণন লেখকের উদ্দেশ্য নয়। হয়তো ন'বছরের খোকার চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে বলে তাকে কাহিনীর যোগসূত্র বলা যেতে পারে। কিন্তু সব জায়গায় সেও নেই, বা তার চোখ দিয়ে সব কিছু দেখাও হয়নি। বুধনি কিংবা ফেকন কিংবা বুলকনকে নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোটগল্প রচনা সম্ভব ছিল। কিন্তু সুবিমল বসাকের ঝোঁক ব্যক্তিচরিত্র নয়। অশীন দাশগুপ্ত যাকে বলেন ব্যক্তিসময়, তার ব্যবহার সেভাবে ঘটে না। বড়সময়ের উল্লেখ দুএক জায়গায় আছে, কিন্তু কালনির্দেশ কাহিনীকারের উদ্দেশ্য নয় -- "এক জমানা ছিল, যখন অংগ্রেজ সরকারের খুফিয়াসিআইডিরা তার ওপর নজরদারি করত। কত লাখো-লাখো নওজয়ান তাঁর গানা শুনে সুরাজি দলে ভিড়ে্ছে, ভারি রকম চাঁদা দিত সুরাজি দলে।" ছোটসময় নিয়েই প্রত্নবীজ-এর কথাকারের কারবার । তাই 'তাড়ি নয় বৈশাখি', বাতাসিয়ার শাদির প্রস্তুতি থেকে গৌনা, মাঝে-মাঝে রঙিন ফেরিওয়ালা, হালওয়াইয়ের নজারা, তেল মালিশ, অখাড়াবাজি, মাদারিঅলার করিশমা -- এই সব নিয়ে মহল্লার বিচ্ছিন্ন চিত্রের মধ্য দিয়েই পূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। উৎসব-অনুষ্ঠান বর্ণনার মধ্যে কাহিনীর ভাবৈক্য সন্ধান করলে একেবারে ভুল হবে না।
বছরভর কত তোহার-পরব-- ছট, কার্তিক পূর্ণমাসি, দশহরা, দিওয়ালি, পুষ-সংক্রান্তি, হোলি, তীজ, কর্মা, বৈশাখি, গোবর্ধনপুজা, চিত্রগুপ্তপুজা -- এছাড়েও সৎনারানজীর কথা, অখণ্ড সংকীর্তন । কিন্তু হোলি আর দিওয়ালির মতো এমন জমকালো পরব নেই। দশহরাও তেমন করে মানায় না। হোলি হচ্ছে বসন্ত ঋতুর পরব-- জওয়ানি ও মিলনের উৎসব; দিওয়ালি হলো রোশনাইয়ের, লছমি-পুজন। গোবর্ধনপুজা -- গোয়ালা আহিররা করে, বিপৎ গোপের অখাড়ায় খুব ধুমধাম করে উৎসব মানায়, পুজাপাঠ, গানা-ঢোলক, কুস্তি-দাঁও-পেঁচের নুমাইশ চলে। চিত্রগুপ্তপুজা -- দিওয়ালির পর স্রেফ লালা-কায়েতরা। এই দিনে লালারা কোনো লিখা-পঢ়ির কাম করে না, কলম ছোঁয় না। লাখ জরুরত থাকলেও এক অক্ষরও লিখবে না-- মানিঅর্ডার, কর্জ-পর্চা, ডাক্তারি নুস্খা--- কোথাও না। ছট পরব চলে মাহিনা ভর; সুরজ দেওতার পূজা, গঙ্গার কিনারে অস্হায়ী ঝোড়ি। খুব নিয়ম আচার।
হোলি আর দিওয়ালির কাহিনীরূপ সুসম্পূর্ণ। বিহারিদের জীবনচিত্র অবলম্বনে সাংবাদিক অসামান্য সংবাদ-বিচিত্রা রচনা করতে পারেন। কিন্তু সুবিমল বসাক সাহিত্যিক --- তাই নিরুদ্দেশ সংবাদ বা চমক সৃষ্টির প্রয়োজন খাসখবর রচনা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। তিনি অঞ্চলকে অবলম্বন করে অঞ্চলের মানুষ, অঞ্চলের মানুষকে অবলম্বন করে হাশাআকাঙ্খাময় জীবনের গভীর সত্যকে ধরতে চান।
ভূমিপুত্রদের সঙ্গে বহিরাগত বাঙালিদের মিলে-মিশে থাকারই কথা। মহল্লায় কয়েকঘর বাঙালির কথা বলা হয়েছে --- খোকা, খোকা-কে-মাই, 'পঢ়ালিখা আদমি খোকার বাবা, ঠাইনি, মিউনিসিপালিটির ট্যাক্স কালেক্টর চিন্তাহরণবাবু, বাঙালি মাস্টারিনিজি আর তার মর্দ। এরা পরিপার্শ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে নিজেদের। অবশ্য দূরত্ব থেকেই যায়। আর এই দূরদৃষ্টি থেকে প্রত্নবীজ লেখা। মাস্টারিনিজির মর্দের কয়েকদিন তবিয়েত আচ্ছানেই, ঘরেই বসে আছে, "মাথা টনটনায়, পায়ের তলহটি গরম।" কতক্ষণ আর কিতাব পড়া যায়। তাই "মাঝে-মাঝে খিড়কি দিয়ে আসমান দেখে, পঞ্ছি দেখে, বাদল দেখে, দুরে মকান, মাটির বাড়ি, খাপরার ছাদ, আঙ্গন-ওসারা দেখে।" দু-মঞ্জিলার ওপর থেকে দেখে রামখেলাওণকে তেলমালিশ করে ভগযোগিনী ।--- "মাস্টারিনিজির মর্দের নজর ধুঁধলে যায়, কপালে জোর দরদ মহসুস হয়। চুপচাপ কুর্সিতে শরীর এলিয়ে শুয়ে থাকে। হাত থেকে কখন যে কিভাবে পড়ে যায়, পতা তক চলে না তার।" প্রত্নবীজ পড়ার প্রতিক্রিয়া আমারও অনেকটা এই রকমই --- পিছনে ফেলে আসা এক জীবন, তার দিকে সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, সেখানে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। খোকা তো চিরকাল ন'বছর বয়সেই থাকবে না!
(কালিমাটি পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি, ২০০১)
সুবিমল বসাকের হাবিজাবি--- ২১শে ফেব্রুয়ারি ও পাপের চেহারা
ফালগুনী রায় লিখিত
২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা আন্দোলনে শহিদেরা সুবিমল বসাকের মতই প্যান্ট-শার্ট বা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ছিলেন, বাংলা ভাষার জন্যে নিহত না হলেও সুবিমল শহিদ হয়েছিলেন বাঙাল ভাষার জন্যে -- অর্থাৎ মসী, অসি অপেক্ষাও শক্তিশালী এই প্রবচনের সূত্র ধরে বলা যায় কলকাতার অ্যাকাডেমিক অধ্যাপক বা আধুনিক কবি কেউ-কেউ বাড়িতে যারা মা'র সঙ্গে বাঙাল ভাষায় এবং কলেজে কফিহাউসে খালাসিটোলায় বা বেশ্যার সঙ্গে ক্যালকেশিয়ান ডায়ালেক্টে কথা বলেন --- তাঁরা সুবিমলের ভাষারীতিকে প্রচণ্ড আক্রমণ করেন--- কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারির শহিদরা যেমন একই সঙ্গে শ্রদ্ধেয় সেইমত সুবিমল বসাকও শিক্ষিত কবি-সাহিত্যিকদের উপহাস-গালাগালের গ্লোরিকে ম্লান করে দিয়ে একই ভাষারীতিতে লিখে চলেছেন (১৯৬৪ থেকে)--- লিখে চলবেন।
সুবিমল গদ্য লেখেন এবং কবিতাও --- সুবিমল রবীন্দ্রনাথের মত দাড়ি রাখেন না কিন্তু টাইপমেশিনের সাহায্যে অই ভদ্রলোকের একটা প্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন ছাত্রাবস্হায়--- দেখেছিলুম। সুবিমল রবিঠাকুরের মত গান বা নাটক লেখেননি কোনোদিন, সো হোয়াট ? রবীন্দ্রনাথ না থাকলে সুবিমল লিখতেন কি ? বিশেষত বাঙাল ভাষায়, উপরন্তু যখন দু'বাংলাকে কেন্দ্র করে পাবলিশাররা তাদের পড়ে যাওয়া মার্কেটকে পুনরায় তোলবার চেষ্টা করছে, তখন লক্ষ্য করে দেখুন, সুবিমলের 'বাংলাদেশ' নামে বাঙাল ভাষায় লেখা লিফলেটটিতে কত কম বঙ্গবন্ধু বা বাংলা-দেশ-এর রেফারেন্স।
আরশির ওই পারে ফুটছে শয়তানের চ্যারা
ফিরে-ফিরে প্রতিশোধ লিতে তেইড়্যা আহে
আমার উল্টাহান'ই আমি নিত্যি দেহি আরশিতে
---মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যিনি বাঙালি খ্রিষ্টান ছিলেন, তিনি রাবণের ভেতর দেখতে পেয়েছিলেন --- আপন আত্মার ছায়া --- অনুরূপভাবেই সুবিমল ভগবান-বন্দনা করেননি--- শয়তানের ভেতর দেখেছেন নিজস্ব প্রতিবিম্ব--- কিন্তু এর ফলে যদি কেউ বলে, আর দেখতে হবে না --- ও শালা নিশ্চয় মধুসূদন দ্বারা প্রভাবিত, তখন ত্রাহি মধুসূদন ডাক ছাড়া গত্যন্তর আছে কি ? উপনিষদেও বলা হয়েছিল তিনি আছেন --- রবীন্দ্রনাথও বুঝে ছিলেন ব্যাপারটা--- রবীন্দ্রনাথও কি উপনিষদের চর্বিতচর্বণ ? ব্যাপারটা বলতে হল এই কারণে যে আধুনিক গদ্য-পদ্য'র আন্দোলন-এ (সত্য গুহ লিখিত) পট করে লিখে দেয়া হয়--- অমুক-অমুক কবিরা তমুক-তমুক কবিদের চর্বিত চর্বণ করে কবিতা লিখে চলেছেন। কবিতা লেখা ব্যাপারটা নোট মুখস্হ করে এম.এ. ডিগ্রি পাওয়ার মত সহজ নাকি, যে আশুবাবু গোপালবাবু সুকুমারবাবু ইত্যাদির থিওরি-থিসিসের চর্বিত চর্বণ করলেই বভিষ্যতে অধ্যাপক হওয়া বা হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুলে বাংলা পড়ানো যাবে।
সুকুমার টের পেয়েছেন--- ব্যর্থতা নিয়া থাকায়ও কারু-কারু সার্থকতা... হেজেহুইতে ট্যার পাই --- কতো-কতো ব্যাপারে ম্যায়ালোকেরে কাৎ কইরা ফেলে বাজারের মাগি। সুবিমল দেখেছেন---
এই শহরের মাগিদের কোঠায় দেহি সরকারি 'নিরোধ'এর বিজ্ঞাপন
কালোবাজারের খয়রাতি দানে না-জানি কতো মন্দির তৈয়ার হইতাসে
এই কিনারে বোমা পরীক্ষা --- আরেক কিনারায় হাসপাতাল
সুবিমল লিখেছেন---
সুখি মানুষেরা একতলা দুইতলা কইরা উইঠ্যা যায় উপরে
হাতের লাগল থাকে ম্যায়ামানুষ চেনবান্ধা কুত্তা, আদালতের আইন-কানুন
এভাবে সুবিমল যা-কিছু টের পেয়েছেন দেখেছেন সবকিছু লিখে রেখে গ্যাছেন, এমন কি শেষ কবিতার প্রথম দুই লাইন---
ভিয়েৎনামের উপর আমারিকার যুদ্ধনীতি সবরাষ্ট্রের অসমর্থন
অহনই শোওনের তোড়জোড় করতাসো, রাত্র হপায় পড়লো--
এভাবেই বাংলাদেশ আন্দোলনের জোয়ার আসার আগে থেকেই পদ্মাপারের ছেলে সুবিমল দ্যাশের ভাষায় গদ্য লিখে বিদেশে পরিচিত হয়ে গেছে, এখন আমরা যারা খুব বাংলাদেশ নিয়ে লেখালিখি মাতামাতি সভাসমিতি করি, তারা যদি সুবিমল-এর ভাষারীতিকে আক্রমণ করি বা এ-সম্পর্কে উদাসীন থাকি তবে সেটা একটা পাপের পর্যায়ে গিয়ে পড়বে...
( কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত, ১৯৭১)
অজয় সেন লিখিত 'হাবিজাবি, বকবকানি ও খোলা জানলা'
সুবিমল বসাকের সাথে প্রথম আলাপ কলেজ স্ট্রীটের 'বিভূতি কেবিনে'। সেখানে শৈলেশ্বর, বাসুদেব, সুভাষ অনেকেই আসত, কাছাকাছি কফিহাউস থাকা সত্তেও 'বিভূতি কেবিন' তাদের অনায়াসে সাঁতরানোর জায়গা ছিল।১৯৬৩-৬৪-এর ওই আড্ডাখানায় শুনতাম বেশি, লক্ষ্য করতাম বেশি হাংরির নব্যযুবকদের, এদের মধ্যে আমার কাছে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিল বাসুদেব দাশগুপ্ত ও সুবিমল বসাক। পরে সুবিমলের সঙ্গে অন্তরঙ্গতার কারণে এক ধরণের ভালোলাগা জন্ম নিয়েছিল, বলা বাহুল্য, আজও যা চিড় খায়নি এতটুকু। ওর অফিসে গিয়ে অনেক দিন অনেক সময় কাটিয়েছি, ডিপার্টমেন্টের প্রত্যেকটি কর্মচারীর নাম. কে কি রকম, কার কি দুর্বলতা, কি কি গুণ খুঁটিনাটি আমাকে সে বলত নিচুস্বরে, চা খেতে-খেতে এই সব গল্প হত আমাদের। আর যে আলোচনার মধ্যে এসব কিছুই থাকত না, তা হল লেখালিখি। সে নিজেরই হোক বা অপরেরই হোক। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত তরুণদের লেখালিখি সুবিমল বেশ মনোযোগ দিয়েই পড়ত, যেটা আমার তাকে ভালো লাগার কারণ। কে কোথায় একটা ভালো লেখা লিখেছেন, সেই লেখার সমালোচনা করে ভালো কি মন্দ অনায়াসে জানিয়ে দিত। আমার লেখা যে সে পছন্দ করে তা প্রথম দিন আলাপের পরই জানিয়েছিল, অবাক হয়েছিলাম বেশ খানিকটা। মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম এই কারণে সদ্য লিখতে আসা নব্য যুবককে উৎসাহ ও প্রচ্ছন্ন সাহস যোগানোর জন্য।
সুবিমল বসাক প্রকৃত অর্থে ছাই-চাপা আগুন। সে সময় হাংরি আন্দোলন ঝড় তুলেছিল দেশে তো বটেই, বিদেশেও তার ঝাপটা লেগেছিল, সে সময় পুতু পুতু রক্ষণশীলরা চেঁচামেচি শুরু করেন, ফলতঃ শ্লীল-অশ্লীল সাহিত্য রচনা করেছেন, সমাজের ভেজানো দরোজা একের পর এক খুলে দিচ্ছেন, তাদের এসব উদ্যম চিন্তাভাবনা ভালো লাগেনি প্রশাসন এবং এক শ্রেণীর ব্যাঙদের কাছে, ফলতঃ ধরপাকড়, হাজতবাস, কোর্টকাছারি অমোঘ হয়ে নেমে আসে হাংরি আন্দোলনের কবি-সাহিত্যিকদের ওপর। এদের মধ্যে অনেকে,( যেমন শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ ) মুচলেকা দিয়ে দেন, ভাবটা এমনই যে ওপাড়ায় আমি নেজে যাইনি, আমাকে ওরা নিয়ে গেছিলো। সুবিমল ও অন্য কয়েকজন নিজেদের মতই লেখালিখি করে গেছেন। কাউকে, কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করেই। সুবিমলের লেখার মধ্যে একটা প্রাদেশিক সাযুজ্য লক্ষ করি। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ যেমন লিখেছেন, পাশাপাশি প্রাদেশিক কবিতা অনুবাদ এবং জীবনীগ্রন্হ রচনাতেও মাহিরিআনা দেখিয়েছেন। দুটো উপন্যাস, ছয়টি গল্প-গদ্য সংগ্রহ, দুটি কবিতার নিজস্ব চটি বই।প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন অনেক। অনুবাদ সাহিত্যে ২০০৭ সালে যশপাল রচিত অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত সুবিমল। যদিও তা অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল।
সুবিমল বসাকের লেখালিখি --- প্রথম কবিতার বই 'হাবিজাবি' যখন প্রকাশিত, তখন হাংরি আন্দোলন তুঙ্গে। অধিকাংশ কবিতা ওই সময়ের লেখা, মনে হয় নিজের সম্পর্কে ভাবনা, সমাজের উঠোনে নিজেকে নগ্ন করে খতিয়ে দেখা, নিজের পরিবেশকে খুঁড়তে-খুঁড়তে নিজের সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ, ভাবনা আবিষ্কার করা। ফলতঃ কবিতাগুলোয় প্রেম-অপ্রেম, ভালোবাসা-ভালোবাসাহীনতা, চোরাস্রোতের মত চিন্তা, ঈর্ষা, স্নেহ, জীবন-পারাপার-ভাবনা, দুঃখকষ্ট, অবজ্ঞা-উপহাস, হতাশা, চিল-চিৎকার যাবতীয় ব্যাপার উঠে এসেছে ওই কবিতাগুলির মধ্যে।
আমি কবিতা পড়তে ভালোবাসি। কবিতার প্রতি আমার যথেষ্ট দুর্বলতা আছে, তো যেটা লক্ষ করি, 'হাবিজাবি' কবিতার বইয়ের মধ্যে, তা হলো ভাষা। সুবিমলের কথায় --- আমার মায়ের ভাষা। পূর্ববাংলার ভাষা তো মাটির ভাষা। এখন লক্ষনীয় 'মা' কোন অর্থে? দেশ-মা না গর্ভধারিণি-মা ? এক অদ্ভুত দেশজ কধ্য ভাষায় এরকম লেখা আমি কখনও পড়িনি। বাংলা সাহিত্যে কবিতার জগতে সুবিমল পাথ-ব্রেকিং।
১৯৭০ থেকে ২০০০ সালে প্রায় তিরিশ বছর বাদে দ্বিতীয় কবিতার বই 'বকবকানি' । মোট চব্বিশটি কবিতার চটি বই। রাজনীতি, ব্যাঙ্গ, যৌনতা, দার্শনিক স্ট্রিট রিয়্যালিটির পাশ কাটিয়ে এক মানভাষার আকুতি। 'বকবকানি' সে-অর্থে এক সার্থক দলিল। অবশ্য হাংরি আন্দোলনের বাঁকবদল ছিল উত্তরঔপনিবেশিক এপার-বাংলার ফসল। সমাজ তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় যে জীবনবোধ গড়ে দেয়, তা থেকে এই মোড়বদল আলাদা করা যায়। কবিতা ছাড়াও সুবিমল বসাক অত্যন্ত নিপুণভাবে গদ্য রচনা করেছেন; গদ্য সংগ্রহ যে কয়টি হাতে পেয়েছি, ইতস্তত পত্র-পত্রিকায় পড়েছি, মনে হয়েছে সুবিমল আরও গদ্য লিখতে পারতেন। তবে তিনি যে একজন সফল গদ্যকার এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি হিন্দি কবিতার সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেন 'প্রতিবেশি জানালায়'। অনুবাদ সাহিত্যেও সুবিমল যে মাহির তা বলাই বাহুল্য।
অনুবাদ সাহিত্যে গল্পের মধ্যে ফণীশ্বরনাথ রেণুর 'তিসরি কসম', শ্রেষ্ঠ গল্প প্রেমচন্দের 'পঞ্চ পরমেশ্বর', 'দুই সখী'। প্রবন্ধ অনুবাদের ক্ষেত্রে 'জীবনসার', হিন্দি কবিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংকলন 'প্রতিবেশিন জানালা'। শ্রীকান্ত বর্মার 'উজ্জয়িনীর রাস্তা', জগদীশ চতুর্বেদীর 'বোবাদের পল্লীতে' যথেষ্ট দাগ কাটে পাঠকদের মনে, কারণ প্রত্যেকটি অনুবাদ-কবিতায় হাংরি কবিতার ঝলক উঁকি মারে। কবিতার জীবনকে সামলাতে না পারলে পড়ে যাবার সম্ভাবনা থেকেই যায় --- পাঠককুলকে তাই খবরদারি, সাবধানবাণী প্রকৃতই চেতাবনি। সুবিমল বসাক ঢাকায় গেছিলেন তাঁদের পৈত্রিক বাড়ির আশে-পাশে যে-সব বুজুর্গরা থাকতেন, তাঁদেরই সান্ধ্য আসরে তাঁদের অনুরোধে লুপ্তপ্রায় এক প্রাচীন শিল্পকলাকে তুলে ধরেছেন। ঢাকার হিন্দু বাঙালিদের 'বিয়ার গীত' ও 'ঢাকাই ছড়া' সংকলনে। খাস কলকাতায় বছর তিরিশ পূর্বেও বিবাহ উৎসবে এসব গানের প্রচলন ছিল, ক্রমশ হ্রাস পেতে-পেতে এসব গান আজ আর কোনো বিবাহ অনুষ্ঠানে শোনা যায় না, হয়তো আর্থ সামাজিক, শহুরে মানসিকতার সঙ্গে খাপ খায়নি, দ্বিতীয়ত এসব গানের উত্তরসূরী তাঁরা রেখে যাননি, তবু এখনও গ্রামাঞ্চলে কোনো প্রাচীনা, বিবাহ উৎসবে আনন্দে উত্তেজনায় গুনগুন করে গেয়ে উঠছেন এই সব গান।তা সুবিমল বসাকের অবদান।
হাংরি আন্দোলনের পুরোধা সুবিমল বসাক প্রকৃত অর্থে বহু বিচিত্র শিল্পগামী। এখনও তাঁকে লিখে যেতে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করি। তার কারণ তিনি জানেন এমন গদ্য অথবা কবিতা নেই--- যা পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ঠাণ্ডাযুদ্ধও থামিয়ে দিতে পারে --- তাই সুবিমলকে অনুরোধ--- লিখুন, আরও লিখুন। থামিয়ে দিন পৃথিবীর ঙাণ্ডাযুদ্ধ ও উলঙ্গ বিবাদ।
ছিটেফোঁটা পত্রিকার বইমেলা ২০০০ সুবিমল বসাক সম্বর্ধনা সংখ্যা থেকে পুনঃপ্রকাশিত
লেবেলসমূহ: Antiestablishment Discourse, Hungry Generation, Subaltern Literature
কলিম খান লিখিত : সুবিমল বসাক, এক সুন্দর মানুষের কথা
"তোমার সঙ্গে যারা থাকে, তোমার বাবা মা জেঠা জেঠিমা কাকিমা মাসি পিসি ঠাকুরদা ঠাকুরমা ধাইমা দাদা দিদি বৌদি....এদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি সুন্দর ?" --- এ প্রশ্ন যৌথ পরিবারে বাস করে এমন বাংলাভাষী শিশু-কিশোরীকে ( যাদের বয়স সাত-আট বছরের কম ) জিজ্ঞেস করলে বেশ অদ্ভুত উত্তর পাওয়া যায়। দেখা যায়, যাকে সে সবচেয়ে বেশি সুন্দর বা সুন্দরী বলে ঘোষণা করছে, অনেক ক্ষেত্রেই তার রূপলাবণ্য দৃষ্টিনন্দন বা বিউটিফুল নয়; অথচ তাকেই সে সুন্দর বা সুন্দরী বলছে ! তার মানে সুন্দর বলতে তারা রূপবান-রূপবতী বা বিউটিফুল বোঝে না, অন্য কিছু বোঝে।
বিষয়টি নিয়ে একটু এগোলে দেখা যায়, শিশু-কিশোরটি যাকে সুন্দর বা সুন্দরী বলছে, তার রূপ দৃষ্টিনন্দন বা দৃষ্টিকটু যাই হোক, সে আসলে শিশুটিকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে। তার মানে, বাংলাভাষী শিশুদের ভাষাজ্ঞান অনুসারে যে ব্যক্তি তাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে, সে-ই সুন্দর বা সুন্দরী! এই লেখকও তার শৈশবে তার ঠাকুমাকেই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মহিলা বলে জানত। এমনও দেখা গেছে, পরিবারের সকলের অবহেলার মাঝে এক অতি কুরূপা দাসীর নিত্য পরিচর্যায় বড় হয়ে ওঠা শিশু তার সেই কুরূপা দাসীকেই 'সুন্দরী' বলে ঘোষণা করছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় অনেকেই এই প্রকার সত্যের সন্মুখীন হয়ে থাকবেন। তার মানে, যাদের প্রতি শিশু-কিশোরদের ভালবাসা উৎসারিত হয়, তাদেরই তারা বিউটিফুল দেখে। সেক্ষেত্রে মানতেই হবে যে, মানুষের মনের রঙেই পান্না সবুজ হয় -- এই রবি-বাক্য এক্ষেত্রেও সক্রিয় রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে আরও একটু এগোলে আর-এক সত্যের সন্ধান মেলে দেখা যায়, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে, পুরাণাদি গ্রন্থে, গ্রামবাংলার মানুষের মুখের ভাষায় সুন্দর শব্দটি সাধারণভাবে বিউটিফুল অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, হয় না। হয় না যে, তার অজস্র প্রমাণ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। 'সুন্দর কথা', সুন্দর গান'... এসব তো আমরা বলি, এমনকি বঙ্গীয় শব্দকোষ রচয়িতা শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ও জানাচ্ছেন যে--- কর্পূরমঞ্জরী গ্রন্থে একটি পদে রয়েছে 'সুন্দর শব্দাবলী': বিদ্যাসুন্দর গ্রন্হে রয়েছে 'সুন্দর নাম': বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্হাবলীতে রয়েছে 'সুন্দর স্পর্শ', 'পরিতে সুন্দর', ঘ্রাণে সুন্দর'... ইত্যাদি। ইংরেজি ভাষাজ্ঞানীরা জানেন, ইংরেজিতে Beautiful words, beautiful name, beautiful to wear, beautiful to smell... এরকম শব্দবন্ধ রীতিসম্মত নয়। কিন্তু বাংলায় দেখা যাচ্ছে সেরকম শব্দবন্ধ কেবল তৈরিই করা যায় না, হয়ে থাকে, হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। তার মানে বাংলা ভাষায় সুন্দর বা সুন্দরী শব্দের মানে শুধুমাত্র বিউটিফুল নয়, আরও অনেক কিছু। প্রশ্ন হল কী সেই মানে ?
বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ-এর কাজ করতে গিয়ে 'সুন্দর শব্দের সেই অর্থটি আমার চোখে পড়ে যায়। দেখি, 'সমুদ্র'এর মতো 'সুন্দর' শব্দটিরও জন্ম হয়েছে 'উন্দ' ক্রিয়ামূলের শব্দপরিবারে। [সু+/উন্দ+অর--কতৃবাচ্যে। উন্দএর মানে হল 'নিজের উচ্চতাকে কমিয়ে অন্যের সমান বা সমান্তরাল করা' বা 'সামঞ্জস্য বিধান করা' ( উ=উদগতি; ন= না-করণ; দ= পারিপার্শ্বিককে দান )। এই ক্রিয়া থেকে জাত ইঁদুর, ওল, সমুদ্র, সুন্দর, সুন্দরী, সৌন্দয্য প্রভৃতি কুড়িটি শব্দ নিয়ে গড়ে উঠেছে উন্দ-এর নিজস্ব শব্দপরিবার। সমস্ত প্রাচীন বাংলা অভিধান এই সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। ইংরেজি wound শব্দটি এই পরিবারেরই সন্তান।] সেই সুবাদে সুন্দর শব্দটির ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ হল -- 'সু-উন-দানের অস্তিত্ব রহে যাহাতে' । অর্থাৎ আপন শক্তির জোরে উপরে ওঠা গেলেও, উপরে ওঠাকে কমিয়ে পারিপার্শ্বিক সত্তাদের সেই শক্তি খুব ভালভাবে দান করে যে, সেই হল সুন্দর। তার মানে সুন্দর সে-ই, যে সর্বদা পারিপার্শ্বিকের সমান হওয়ার চেষ্টা চালায়, আপন উন্নয়ন থামিয়ে পরিপার্শ্বের উন্নয়নে যত্নবান হয়; যে যথার্থে সামঞ্জস্যমূলক সমানতায় বিশ্বাসী যথার্থ সাম্যবাদী; যে সক্রিয়ভাবে সমোচ্চশীলতার নীতি অনুসরণ করে থাকে। জল সমোচ্চশীল বলেই তার মহা আধারটি 'সমুদ্র' পদবাচ্য, যে 'সমুদ্র' শব্দটি একই উন্দ ক্রিয়া থেকে জাত হয়েছে। এই সেই কারণ, যেকারণে পুরাণাদি গ্রন্থে জনসাধারণ বোঝাতে 'জল' শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। মোট কথা, 'সুন্দর' শব্দের প্রকৃত অর্থ হল ( পরিপার্শ্বের সঙ্গে ) সুসামঞ্জস্য সাধন করে যে ।
বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ ছেড়ে সামাজিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, সুন্দরী (সু-উন্দ-র-ঈ) সেই নারী, যিনি তাঁর চারপাশের মানুষের মনকে আর্দ্র করে আপন সমানতার বোধ দান করেন। তার মানর আমার মা/মাসিমা/জ্যাঠাইমা/
Thursday, August 9, 2018
যখন সুবিমল বসাকের সঙ্গে চামউকুন বাছতুম : মলয় রায়চৌধুরী
মলয় রায়চৌধুরী
ষাটের এলিট বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুবিমল বসাক আবির্ভূত হয়েছিলেন কাউন্টারকালচারাল একজন সাবঅলটার্ন লেখক হিসাবে । নবারুণ ভট্টাচার্যের মতন তিনি অন্য মানুষদের জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেননি, করেছেন নিজের নিম্নবর্ণ-নিম্নবর্গ জীবনের লাৎ খাবার অভিজ্ঞতা থেকে । সুবিমলের বর্গে শৈশবে গায়ে চামউকুন হয়, চুলে জট পড়ে, নখে ময়লা জমে, ময়লা নখ নিয়েই ভাত-ডাল মাখতে হয়, রাস্তার কলে স্নান করতে হয়, দেনার দায়ে বাপ আত্মহত্যা করলে কৈশোর থেকে সংসার চালাতে হয় । তাই মধ্যবিত্ত জীবনে পৌঁছেও এলিটদের সংস্কৃতিতে ঢোকার অনুমতি পান না সুবিমল বসাক । আসলে, যে বিদ্যায়তনিক আলোচক এলিট সংস্কৃতির প্রডাক্ট, তিনি তাঁর দোসরদের খোঁজ করেন পাল্প ফিকশানে, কেননা প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়া ছাড়া পাল্প ফিকশান শেকড় পায় না ।
উকুন জানতুম, চুলে হয়, বলতে গেলে দেখা যায় না, মাথার চুলে খুঁজে-খুঁজে বের করে টিপে মারতে হয়, বাঁদরদের মতন । ব্যাংকশাল কোর্টে মামলার সময়ে, রাতের বেলায় সুবিমল বসাকের জ্যাঠামশায়ের বইঠকখানার স্যাকরার প্রায়ান্ধকার দোকানঘরে মাদুরে শুয়েছিলুম, সুবিমল বলল, শালা, তোমার গায়ে চামউকুন হয়ে গেছে । সুবিমল আমার গা থেকে ছোটো ছারপোকার মাপের একটা চামউকুন তুলে বলল, পনেরোদিন স্নান করোনি, আদালতের পাবলিকদের সঙ্গে ওঠাবসা করছ, গায়ে চামউকুন হয়ে গেছে, বিহারিদের মতন । সত্যিই, ফৌজদারি আদালতে এতো রকমের ক্রিমিনাল জড়ো হতো যে সাবধানে না থাকলে খোস-পাঁচড়া, আর নানা ছোঁয়াচে রোগও হয়ে যেতে পারতো । কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় দিনের পর দিন স্নান হতো না ; ততোদিনে চামউকুনরা নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে ফেলতো আমার গায়ে ।
হাংরি আন্দোলন মামলার সময়ে কলকাতায় রাতের বেলায় যেখানে হোক মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে হতো ; সুবিমল বসাকের জ্যাঠামশায়ের স্যাকরার দোকান ছিল লাস্ট রিসর্ট । রিসর্ট !! চামউকুন বাছার রিসর্ট । ওর এক আত্মীয়ের বাড়ির দালানে মাদুরে শুয়ে রাত কাটিয়েছি । ওই পাড়ায় কোথাও ওর ব্যর্থ প্রেমের নায়িকা থাকতেন ।
চামউকুন যে কেমনতরো উকুন, তা অন্য হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলুম, কখনও দেখেনি । একটা চামউকুন মেরে কাগজে মুড়ে সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্তকে দেখিয়েছিলুম । বাসুদেব তখন বেবি-দীপ্তি-মীরার রেগুলার খদ্দের । সেই পাড়াতেও কারোর গায়ে চামউকুন দেখেনি ।
সুবিমল বসাক পাটনাতেই থাকতো, গান্ধি ময়দানের ওই পারে, পশ্চিম দিকে, গোলঘর নামে ব্রিটিশদের তৈরি একশো চুয়াল্লিশ পাকানো সিঁড়ির ঢাউস খামারবাড়ির কাছে ; গিন্সবার্গকে নিয়ে উঠেছিলুম ওই খামারবাড়ির টঙে, নেমে ভেতরে ঢুকে গিন্সবার্গ ওর ‘সানফ্লাওয়ার সূত্র’ কবিতা চেঁচিয়ে আবৃত্তি করার পর আফশোষ করেছিল যে একটা রেকর্ডার আনা উচিত ছিল ।
পাটনায় থাকলেও সুবিমল বসাকের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল না ; ও পড়তো পশ্চিমের কোনো স্কুলে আর আমি পূর্বদিকের রামমোহন রায় সেমিনারিতে । তবে ওদের পরিবারের কথা বাবা জানতেন ; বলেছিলেন যে ওর বাবা নাইট্রিক অ্যাসিড খেয়ে দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছিলেন । কারোর বাবা আত্মহত্যা করলে তাঁর ছেলের মনে কেমন প্রতিক্রিয়া হয় ? কে জানে, আমার পক্ষে ভেবে ওঠা কঠিন । আমার খুড়তুতো বোন পুটি কড়িকাঠ থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল বাছুরের গলা থেকে দড়ি খুলে ।
‘দুরুক্ষী গলি’ নামে একটা উপন্যাস লিখেছে সুবিমল, ওর আত্মজীবনী, তাতে সোনার গয়না যে কতো ধরণের হতো আর তাদের বিস্ময়কর নাম ছিল, তা ওর ‘দুরুক্ষী গলি’ পড়ে জানা যায় । আমার মনে হয় এটা ওর সেরা উপন্যস, ধরা পড়ে আর্থসাংস্কৃতিক আর ঐতিহাসিক যুগলক্ষণ, আর সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হতে-থাকা আত্মনির্ভর স্যাকরাদের ইতিহাসও বটে । পুঁজিবাদী স্বার্থের নিরিখে যখন সাহিত্যিকদের খ্যাতি বিবেচিত হচ্ছে, তখন বঙ্গসংস্কৃতিতে হঠাৎ ঢুকে পড়া ব্যাণ্টামওয়েট মুষ্ঠিযোদ্ধার আদলে ময়লা এক যুবক নিজের লেখালিখিকে নিয়ে গিয়েছে কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটির বাইরে ।
সুবিমল পাটনা থেকে কলকাতায় চাকরি করতে গিয়েছিল বলে জানতো যে এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকলে রাতে কতো বিপদে পড়তে হয় । অন্য হাংরি আন্দোলনকারীরাও অনেকে কলকাতার বাইরে থেকে পৌঁছেছিল, কিন্তু কেউই রাতের বেলায় থাকতে দিতে রাজি হয়নি, নানা অজুহাত দেখিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে ।
কলকাতায় হাংরি আন্দোলনের খবর পেয়ে সুবিমল বসাক জানতে পেরেছিল যে বুলেটিন ছাপাবার ইংরেজি ম্যাটার আর টাকাকড়ি আমিই দিই, তাই ১৯৬৩ সালের কোনো এক সময়ে আমার সঙ্গে পাটনায় দেখা করতে এসেছিল, আন্দোলনে যোগ দেবার উদ্দেশে । একদিক থেকে ভালোই হলো, ভেবেছিলুম, ঠিকই ভেবেছিলুম, কেননা চাষি পরিবারের হারাধন ধাড়া তখন নিজের পিতৃদত্ত নাম নিয়ে হিমশিম, এফিডেভিট করে দেবী রায় হবার নির্ণয় নিয়ে ফেলেছে ।
ঢাকার তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাকের নিম্নবর্গ নিয়ে তেমন মনোভাব ছিল না, যখন কিনা ওর বাবা স্যাকরা ছিলেন । দেবী রায় যেমন থাকতো হাওড়ার বস্তিতে, সুবিমল বসাকের বাড়ি গিয়ে দেখলুম, ওদের বাড়িও নিম্নবর্গ বিহারি এলাকায়, আর বাবা না থাকায়, একটা আধখেঁচড়া বাড়িতে বসবাস করে ওকেই ভাইদের বড়ো করে তুলতে হচ্ছে । কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে চলে গিয়েছিল সাহিত্যের আকর্ষণে । কিছুকাল আগে নিম্নবর্গের জন্য নির্ধারিত একটা পুরস্কারও পেয়েছে সুবিমল । অনুবাদের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমির পুরস্কার পেয়েছে ।
সুবিমল কাজ করতো ইনকামট্যাক্স দপতরে, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে । ও স্কেচ আঁকতে পারতো, উড-কাট করতে পারতো । তখন এসট্যাবলিশমেন্টের কর্তাদের ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন’ ছাপানো রাক্ষস জীবজন্তু ইত্যাদির মুখোশ, হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিলি করা সারা হয়ে গেছে, বিয়ের কার্ডে ‘Fuck the bastards of Gangshalik school of poetry’ ছাপিয়ে বিদ্যায়তনিক কবিদের পাঠানো হয়ে গেছে, কলকাতার মালিকরা ব্লাস্ট ফারনেসে টগবগ করে ফুটছে, সুবিমল বলল যে, ও এবার নানারকম স্কেচ এঁকে স্টেনসিলে একশো কপি ছাপিয়ে বিলি করবে, হাংরি আন্দোলনের নতুন ধরনের বুলেটিন । আমি একটা চার্ট তৈরি করেছিলুম, উনিশ নম্বর হাংরি বুলেটিন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল, তার স্টেনসিলও সুবিমল তৈরি করে দিয়েছিল । চার্টে দেখানো হয়েছিল যে বাঙালি কবিদের পূর্বপুরুষরা কবিয়াল ছিলেন ; পূর্বপুরুষরা সকলেই নিম্নবর্ণের ছিলেন বলে আধুনিক কবিরা বেশ চটে ছিলেন ।
মজার ছিল বুলেটিনগুলো, মধ্যবিত্ত কবি-লেখকদের ওয়াটারশেডের ওপর থেকে ঠেলে ফেলার জন্য যুৎসই । কয়েকটা মনে আছে : একজন তরুণীর সারা শরীর জুড়ে স্তন, একজোড়া পায়ের স্কেচ যা দেখলেই টের পাওয়া যায় যে মানুষ-মানুষী মিশনারি আঙ্গিকে ছিল, সামনা-সামনি যুবক-যুবতী যা দেখে মনে হবে ফুলদানি, এরকম বহু বুলেটিন, সপ্তাহে একটা করে। নিজের বইয়ের আর ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকার প্রচ্ছদও নিজেই আঁকতো সুবিমল । কেবল ওর ‘ছাতামাথা’ বইয়ের প্রচ্ছদ আমি পেপার কাটিং দিয়ে তৈরি করে দিয়েছিলুম । ‘ছাতামাথা’ বইয়ের উৎসর্গপত্রের আইডিয়াটাও দিয়েছিলুম ।
সংবাদপত্র দপতরে গিয়ে ব্ল্যাংক কাগজকে ছোটোগল্প হিসাবে জমা দেয়া আর রিভিউ করার জন্য বাচ্চাদের চটির বাক্স ব্রাউন কাগজে মুড়ে জমা দেবার ব্যাপারে সুবিমলও গিয়েছিল আমার সঙ্গে । এর জন্য শক্তি চট্টোপাধ্যায় খচে কাঁইবিচি, সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে আমাকে আর সুবিমলকে প্যাঁদাবার জন্য কফিহাউসের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন । কফিহাউসের সিঁড়ির কাছে ইসমাইলের পান-সিগারেটের দোকানে লোহার রড লুকিয়ে রাখা হয়েছিল মার দেবার জন্য । নিচে নামতেই প্যাঁদাবার জন্য ঘিরে ধরা হয় । সুবিমল সেসময়ে ব্যাণ্টাম ওয়েট বক্সার, হুমকি দিয়ে তেড়ে ভোজপুরি গালমন্দ করতেই সব দেদ্দৌড়, যারা ঘিরে ধরেছিল তারা তো বটেই, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষরাও । পরে জানা গিয়েছিল যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যেমন আয়ওয়া থেকে হুমকিচিঠি পেয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা, তেমনই পেয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় - উনি তখন সবে সহসম্পাদকের চাকরির অফার পেয়েছেন ।
পশ্চিমবাংলায় সেই সময়ে রিফিউজিরা সোভিয়েত দেশে বাংলায় অনুবাদ করা মার্কস-এঙ্গেলস পড়ে-পড়ে বামপন্হী হবার দৌড়ে শামিল । বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ আর অরুণেশ ঘোষও বই পড়ে ঢুকেছিল জমায়েতে, সবায়ের দেখাদেখি । পরে ওদের বক্তব্য ছিল যে মফসসলে বেঁচে থাকতে হলে এছাড়া উপায় ছিল না । ওদের বক্তব্যে যুক্তি ছিল, কেননা প্রমোদ দাশগুপ্ত ক্যাডার পাঠিয়ে স্কুলগুলো আর ক্লাবগুলো স্ট্যালিনি কায়দায় দখল করছিলেন । পরে তারা ইংরেজির এমন পেছন মেরে দিল যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ইউপিএসসির পরীক্ষাগুলোয় কেউই প্রতিযোগীতা করতে পারে না, দলে-দলে পালিয়েছে-পালাচ্ছে বাইরের রাজ্যে বা বিদেশে ।
বই পড়ে যা হয়, বামপন্হীরা জোটবেঁধে নিজেদের আখের গুছিয়ে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগীতায় মাতলো আর বামপন্হাকে ডোবালো । সুবিমল বসাক ওই সব বই পড়াপড়ির দিকে যায়নি, ওর আগ্রহ হয়নি, নিজের জীবনে যতো লাৎ খেয়েছিল, ওর দরকার ছিল না বই পড়ে সেসব জানা-বোঝার । লাৎগুলো ও প্রয়োগ করেছে ওর লেখায়, কবিতা-গল্প-উপন্যাসে । মনে রাখা দরকার যে সুবিমল যখন লেখালিখি আরম্ভ করে, তখন কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সাহিত্যিকরা দল বেঁধে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের অনুগামী করে তুলেছিলেন ।
সুবিমল বসাক ‘ছাতামাথা’ নামে একটা ফিকশানে হাত দিলো, হাংরি আন্দোলনের ডামাডোলের মাঝেই, যেখানে সুযোগ পেতো লিখতে বসে যেতো । আমি আইডিয়া দিয়েছিলুম যে আমরা যেহেতু এসট্যাবলিশমেন্টের লিটেরারি ভ্যালুজকে রিভার্স করে দিচ্ছি, ‘ছাতামাথা’ ফিকশানের সংলাপ লেখো কলকাতার বুলিতে আর ন্যারেটিভ লেখো ঢাকার কুট্টিদের বুলিতে । কুট্টিদের বুলি নিয়ে সুবিমল প্রায়ই রগড় করতো । ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ এর ধরতাইকে ছিৎরে লাট করে দিয়েছিল ‘ছাতামাথা’, প্রধানত ট্রান্সকালচারালাইজেশনের বিরুদ্ধে স্হানিকতাকে প্রয়োগ করে ।
এখন বাংলাদেশে একটা বিদ্যায়তনিক ধুয়ো উঠেছে যে কলকাতার ভাষা বর্জন করে বাংলাদেশের কথ্যবুলিকে ভাষার পর্যায়ে উন্নীত করা হোক, তাইতে সাহিত্য রচিত হোক, অথচ যখন আমি ওনাদের বলি যে সুবিমল বসাক অলরেডি এই কাজ পাঁচ দশক আগে করে ফেলেছেন, তখন ব্রাত্য রাইসু আর সলিমুল্লা খানরা কানে তুলো দিয়ে থাকেন । সুবিমল বসাকের গদ্য আর পদ্য কাল্পনিক নিম্নবর্গীয় নয় । প্রতীকি নয়, তা রিয়্যাল ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড । খোলনলচে পালটে ফেলার জন্য যতো ধরণের টেকনিক সম্ভব, ব্যবহার করেছে সুবিমল । তাকে যদি কোনো আলোচক অ্যানার্কিক বলে তকমা দেন, তাহলে তাই সই ।
নকশাল আন্দোলনের ঠিক আগে বেলঘরিয়ায় জমি কিনে সুবিমল নিজের আস্তানা গড়ে ফেলল, চারিদিকে সুনসান, তখনও বাড়িঘর তেমন হয়নি, সেখানে হাংরি আন্দোলনকারীরা জমায়েত হবার নিরিবিলি খুঁজে পেলো । ফালগুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র আর ওর প্রেমিকা আলো মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই, কাঞ্চন মুখোপাধ্যায় আর বিদেশ থেকে যারা আসতো, যেমন ট্রেশম গ্রেগ, ডেভিড গারসিয়া, জর্জ ডাউডেন, নেপালি কবি পারিজাত যিনি আমার প্রেমে পড়েছিলেন এবং যাঁকে নিয়ে আমি বেশ কিছু প্রেমের কবিতা লিখেছিলুম ।
নকশাল আন্দোলনের সময়ে সুবিমল বসাকের বাড়ির সামনে প্রায়ই গোষ্ঠী-খুনোখুনি হতো, পুলিশও লাশ হাপিশ করার অন্ধকার খুঁজে পেতো । সুভাষ ঘোষ কিছুদিন ওর আস্তানায় ছিল আর সুবিমলের কাছে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত যে কাটিঙের ফাইল ছিল তা নিয়ে শৈলেশ্বর ঘোষের শালা সুভাষ কুণ্ডুকে দিয়েছিল । অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ছিল সেটা, হাংরি আন্দোলনের সমস্ত কাটিঙ সংগ্রহ করে হাইকোর্টের ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়কে দিয়েছিলুম । বহু সংবাদপত্রে আমার আর অনেক সময়ে আমার আর দেবী রায়ের কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল, হাংরি আন্দোলনের গবেষকদের কাজে লাগতো । সুভাষ ঘোষের আত্মীয় ছিল সুভাষ কুণ্ডু, শৈলেশ্বর ঘোষের শালা হবার সূত্রে।
সুবিমল বসাক ওর রিভার্স ন্যারেটিভ টেকনিক বজায় রেখে কবিতা লিখল পূর্ববঙ্গের বুলিতে, অথচ সেগুলো কেন নজর কাড়লো না বলা কঠিন, কেননা আইরিশ ভাষায় সিমাস হিনির লেখা কবিতা ইংরেজি পত্রিকায় নিয়মিত আলোচিত হয়েছে । সুবিমল ছোটোগল্প লেখা আরম্ভ করল কলকাতাবাসী অবাঙালি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, তাদের কথাবার্তায় যে বদল ঘটে গেছে তা প্রতিফলিত হলো ওর গদ্যে । বহুকাল অবহেলিত ছিল ওর বইগুলো । এখন তন্ময় ভট্টাচার্যের উদ্যোগে সৃষ্টিসুখ থেকে সেগুলো খণ্ডে-খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছে । সুবিমল বসাক ওর মায়ের কাছ থেকে আর বৃদ্ধা আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে ‘ঢাকাই বিয়ার গীত’ সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছিল । একটা ‘কুসংস্কার সংকলন’ও প্রকাশ করেছিল ।
হাংরি আন্দোলন মামলার সময়ে সুবিমল বসাকই শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে ছিল । ওর অফিস থেকে চলে আসতো ব্যাংকশাল কোর্টে, আমার মামলার ডেট পড়লে । সুবো আচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত সব হাওয়া হয়ে গিয়েছিল । আমি পাটনায় গেলে সুবিমল আমার উকিলদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো । হাইকোর্টের জুনিয়ার ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো । হাইকোর্টে আমি মামলা জিতে গেলে সুবিমলই কোর্ট থেকে রায়ের কপি নিয়ে আমাকে পাঠিয়েছিল পাটনায় ।
তবে সুবিমলের একটা ধারণা ভুল । নব্বুই দশকে আমি আমার কলকাতা অফিসে বিভাগীয় প্রধান হয়ে ফেরার পর শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপের সঙ্গে দেখা করেছিলুম । সুবিমলের সঙ্গেও । তাকে সুবিমল ভেবেছিল আমি হাংরি আন্দোলন রিভাইভ করতে চাইছি । আসলে আমি যে ইতিমধ্যে প্রচুর পড়াশুনা করে ফেলেছি, ভারতের বহু গ্রামে ঘোরাঘুরি করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, তার হদিশ পায়নি সুবিমল । যাই হোক, আমার নতুন লেখালিখি নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সুবিমল নিজেই বলেছে যে আমার লেখার ধরন আর ভাবনাচিন্তা পুরো পালটে গেছে ।
‘ছিটেফোঁটা’ পত্রিকার বইমেলা ২০১০ সুবিমল বসাক সম্বর্ধনা সংখ্যায় কলিম খান এই কথাগুলো সুবিমল বসাক সম্পর্কে লিখেছিলেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ :
“আধুনিকতাবাদী, অ্যাকাডেমিশিয়ান, প্রগতিপন্হি, কমিউনিস্ট-সাম্যবাদী, মৌলবাদী, হাংরি, উগ্রপন্হী... বহু রকম মানুষই আমরা চারিদিকে দেখতে পাই; এবং তাঁদের নেতৃস্হানীয়রা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত স্বাতন্ত্র্যাভিমানী।স্বাতন্ত্র্যের অভিমানের মধ্যে সকলের থাকে বিশেষ হওয়ার, পৃথক হওয়ার প্রবণতা থাকে। তথাকথিত সাম্যবাদীদের মধ্যে তো স্বাতন্ত্র্যের অভিমান সবচেয়ে বেশি, যদিও স্বাতন্ত্র্য সাধারণভাবে বিশেষবাদী বা অসাম্যবাদী। বিপরীতে দেখা যায়, গ্রামবাংলার মানুষের মধ্যে, তথাকথিত ধর্মভিরু সাধারণ মানুষদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অভিমান সবচেয়ে কম। তাঁদের ভিতরে সকলের থেকে পৃথক বা আলাদা হয়ে থাকার কোনো প্রবণতা দেখা যায় না, বিপরীতে মিলে-জুলে থাকার প্রবণতা দেখা যায়। বাংলা ভাষার শব্দার্থতত্বের বিচারে এরকম মানুষদেরই 'সুন্দর' মানুষ বলতে হয়। সেই হিসেবে শ্রী সুবিমল বসাকও সুন্দর মানুষ।
১৯৯৬ সালে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। বিগতকালের হাংরি আন্দোলনের এক বিদগ্ধ আত্মারূপেই আমি তাঁকে চিনেছিলাম। একালের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যাবাদী সমাজে সকল সামাজিক সত্তার ও প্রতিষ্ঠানাদির যেমন কেন্দ্র ও প্রান্ত হয়ে থাকে, হাংরি আন্দোলনেও সেইরূপ কেন্দ্র-প্রান্ত ব্যাপার ছিল। কেন্দ্রে যখন মলয় রায়চৌধুরী সগৌরবে বিরাজিত ছিলেন, তখন প্রান্তে ছিলেন সুবিমল বসাক। কালধর্ম তাঁকে যে-কলঙ্ক বা গৌরব দিয়েছিল, তা সবই তখন মলিন হয়ে এসেছিল। তাঁর স্বভাবের মধ্যে সেসবের রং-রূপ, তেজ-ছটা আমার চোখে খুব একটা পড়েনি। যেটি পড়েছিল, তা হল তাঁর নিষ্কলুষ আত্মার দীপ্তি। প্রথম আলাপেই বুঝেছিলাম, এই মানুষটির সঙ্গে নির্বিবাদে ঘর করা চলে।
কলকাতার বাংলা সাহিত্যের জগতে আমার অনুপ্রবেশ ঘটে ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৭-৯৮ সালের মধ্যেই আমি টের পেয়ে যাই, এই জগৎ অত্যন্ত কলুষিত হয়ে গেছে। ভাল সাহিত্যিক তো পরের ব্যাপার, আগে তো ভাল মানুষের সাক্ষাৎ পেতে হবে। এখানে যে ভাল মানুষের দেখা মেলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে! কার্যত আজকের কলকাতায় বঙ্গসাহিত্যের সারস্বত ব্রহ্মলোকে ভালমানুষের দেখা পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে। যাঁরা মানিষ হিসেবেই কলুষিত, তাঁরা ভাল সাহিত্যিক হবেন, এমন আশা করা খুবই ত্রুটিপূর্ণ এবং দুরাশা মাত্র। তারই মাঝে যে আমি দু'চারজনকে ভালো মানুষ রূপে পাই, তাঁদেরই একজন শ্রী সুবিমল বসাক। ২০০০ সাল থেকে আমি সেমিনার, সাহিত্যসভা ইত্যাদিতে যাতায়াত বন্ধ করে দিই এবং অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়ে একান্তে নিজের কাজ করতে থাকি। সেই একান্ত সময়েও যাঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কমবেশি অক্ষুণ্ণ থাকে, শ্রী সুবিমল বসাক তাঁদের একজন। তাঁর সান্নিধ্য আমার খুবই ভাল লাগত। তাঁর ভালমানিষির গন্ধ মনেপ্রাণে মাখামাখি হয়ে যেত। মনে পড়ত সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই অমোঘ বাণী --- 'কয়লাওলার সাথে দোস্তি, ময়লা হতে রেহাই নাই/ আতরওলার বাক্স বন্ধ, দিল খুশ তবু পাই খুশবাই।' শ্রী সুবিমল বসাকের সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কেননা, তাঁর সাহিত্য আমার মস্তিষ্কের স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায়নি বলে তা আমার উপভোগ্য হয়নি। অতএব, যা আমি ভাল করে উপভোগ করিনি, তা রসাল ও সুস্বাদু কি না, বলদায়ক কি না, উপাদেয় কি না, তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে আমি পারব না। কিন্তু মানুষটি যে আমার খুবই আপনজন রূপে গৃহীত হয়েছিলেন, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাঁকে আমি 'সুন্দর মানুষ' বলেই চিনেছিলাম, চিনেছি, ভালবেসেছি।”
সুবিমলের ‘’হাবিজাবি’ কবিতা দিয়ে চামউকুন পর্ব শেষ করছি :-
আমারে মাইরা ফেলনের এউগা ষড়যন্ত্র হইসে
চারো কোনা দিয়া ফুসফুস আওয়াজ কানে আহে
ছাওয়াগুলান সইরা যায় হুমকে থিক্যা
অরা আমারে এক্কেরে শ্যায করতে সায়
আমি নিজের ডাকাইতে্ যা হাতেরে লইয়া সচেত্তন আসি
কেউ আইয়া চ্যারায় দিশায় চ্যাবা কথা কয় না
আমি সুপসাপ থাকি
ভালাসির গুছাইয়া আমি কথা কইতে পারি না
২ কইতে গিয়া সাত হইয়া পড়ে
১৫ সাইলে ৯ আইয়া হাজির হয়
ছ্যাব ফেলনের লাইগ্যা বিচড়াইতাসি অহন
আহ, আমার দাঁত মাজনের বুরুশ পাইতাসি না
বিশ্বাস করেন, কেউ একজনা আমার মুহের সকরা খাবার খাইসে ।
(হাংরি বুলেটিন নং ১৮ থেকে)
Subscribe to:
Posts (Atom)
হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে
হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...
-
ছোটোলোকের শেষবেলা : মলয় রায়চৌধুরী এক ছোটোবেলা আর যুববেলার সবকিছু পালটে গেছে ; ইমলিতলা পাড়ার গোলটালির চালাবাড়িগুলো হয়ে গেছে ইঁটের দ...
-
হাংরি আন্দোলন -- সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগ মলয় রায়চৌধুরী ============= ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও স...







