Monday, January 7, 2019

মলয় রায়চৌধুরীর ভাবনা-দিগন্ত : পার্থ মুখোপাধ্যায়




কোনো কোনো লেখক থাকেন সব দেশে সব কালেই, সময়ের চাপ যাঁকে/যাঁদের সইতে হয় সবথেকে বেশি --- হয়তো বা সময়ের থেকে তাঁরা বেশ খানিকটা এগিয়ে থাকেন, এগিয়ে ভাবেন বলেই। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, কালে তো অবস্থাটা আরো একটু বেশিই ঘোরালো, কারণ এখানে তাঁদের সামাল দিতে হয় সময়ের চাপকে এটা যেমন ঘটনা, তেমনি, সেইসঙ্গে নিজস্ব নির্মাণের প্রক্রিয়ার চাপটাও এক্ষেত্রে, বলা বাহুল্য , সমান  কার্যকরী রয়ে যায়। এ দুইয়ের সমান চাপ ব্যক্তি মানুষটিকে, অর্থাৎ যিনি নিজের মতো করে ভাবতে চেষ্টা করবেন, স্রোতের সামান্য বিপরীতে হলেও দাঁড়িয়ে , তাঁকে /তাঁদের সর্বদা যে সিধে থাকতে দেয় না, অনবরত চেষ্টা করে নুইয়ে দিতে, এ আমরা প্রায়শ দেখেছি তো বটেই, দেখি ও দেখবও। দেখব কারণ, এই দেখাটাকেই বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে ঔপনিবেশিক ও তথাকথিত উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবনার ইতিহাস তার নিজস্ব নির্বিকার নিয়মে নির্মাণ করে থাকে এই  ভয়াবহ বিভিন্নমুখী চাপ স্ব-অভিমুখী একজন ব্যক্তি মানুষকে তুবড়ে দুমড়ে কীভাবে মাপমতন করে নিতে চায় তার নিদর্শন আমাদের চারপাশে আমরা প্রতিনিয়ত যেমন দেখি , তেমনি কাউকে কাউকে এমনো আবার দেখা যায় যিনি বা যাঁরা এই চাপকে হয়তো সর্বতোভাবে ঠেকাতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু সেই না পারাটাকেও যে কীভাবে নিজের হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়ার অন্তর্গত করে নেওয়া যায় তার জন্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা , হ্যাঁ, প্রচেষ্টাই বলা যাক, চালান। তবে কিনা আমাদের এই কর্তাভজা কালে, যখন শাসকের সংস্কৃতিহীনতার সাংস্কৃতিক বারফট্টাইকেও আমাদের মানতে বাধ্য করা হয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতির মূলধারা বলে, তখন, এঁদের দেখা মেলে বটে তবে কিনা হরদম মোটেই নয়।

 গত শতকের শেষ-সত্তর থেকে আশির দশকের গোড়ায় আমরা যখন সদ্য হাংরি প্রজন্ম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠছি তখন একটি নাম আমাদের চারপাশে সসম্ভ্রম কিছু বা ভীতির সঙ্গে উচ্চারিত হত, সে নাম মলয় রায়চৌধুরীর। তাঁর মাত্রই দু-একটি লেখার সঙ্গে (বই নয়) পরিচয় তার আগে আমাদের একেবারে যে হয়নি তা নিশ্চয় নয়, কিন্তু মূলত যেটা হয়েছিল তা হল উক্ত আন্দোলন-জনিত হইচই সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল হওয়া। এবং যা হবার হয়, আমাদের চোখ এবং মন দুই-ই ধাঁধিয়ে যায়।
  তখনো ক্ষুধার্ত প্রজন্মের নামবাহী কিছু পুরনো পত্র-পত্রিকা মিলত এখানে-ওখানে। চোখ ও মন দুইয়েরই সচকিত হবার যথেষ্ট কারণ , বলা বাহুল্য, নিহিত ছিল তাইতেই। তবে যেটা ভেবে তখন সত্যিই অবাক লাগত সেটা হল, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বলে খ্যাত অন্যান্যদের লেখা ও বইপত্র যদি বা মেলে, এমনকী কিছু পুরনো পত্র-পত্রিকাও, তাহলে এই একজনের কিছু লেখা বা বইপত্র একেবারেই মেলে না কেন ! 

  যাই হোক, মোদ্দা বিষয়টা যেটা তা হল, মলয় রায়চৌধুরী নামে ব্যক্তি-সাহিত্যিক তথা চিন্তককে তখনো আমরা চিনি না বলাই ভালো ; চিনব আরো পরে, আটের একদম শেষ , না, নয়ের গোড়াতেই সম্ভবত, যখন শিবনারায়ণ রায় কলকাতায় ফিরে এসেছেন, শুরু হয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামে একটি যথেষ্টই গম্ভীর দর্শন কিন্তু আকর্ষণীয় পত্রিকা ; কেবল তা-ই নয়, তাঁর সঙ্গে আমাদের মতন নেহাৎই এলেবেলে আর  অপাংক্তেয়দেরও আড্ডা জমছে, মাঝেমধ্যে হলেও। এবং তখনো, আগেই বলেছি যে , আমাদের হাতে এসে পৌঁছয়নি ‘মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর’ ; সে বই ১৯৮৫ সালে বেরোলেও আমরা অন্তত পড়িনি তখনোজানতামও না ইকনমিকসে স্নাতকোত্তর মলয় ব্যাঙ্ক নোট পুড়িয়ে নষ্ট করার জীবিকা দিয়ে আরম্ভ করে ঢের দিন হল গ্রামোন্নয়ন বিশেষজ্ঞের চাকরিতে কেবল যোগই দেননি, সেইসূত্রে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে গাঁয়ে–গঞ্জে চাষি-জেলে-তাঁতি-হস্তশিল্পীদের সঙ্গ করেছেন শুধু  নয়, সবথেকে বড় কথা, ভারত বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ নামে ভূখণ্ডটিকে হাতের তালুর মতো চেনবার সুযোগ পেয়েছেন --- যা যতদিন যাবে ছায়া তো ফেলবেই , সেই সঙ্গে তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেবে (ও নিয়েছে) ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’, ‘জলাঞ্জলি’, ‘নামগন্ধ’, ‘রাহুকেতু’-র মতো উপন্যাসের পাশাপাশি এমনকী ‘নখদন্ত’ বা ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’-র মতো স্তরে স্তরে, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে-চিনিয়ে দেওয়া যায় এমনভাবে বিন্যস্ত অথচ আপাত-এলোমেলো গ্রন্থরাজিও --- যা আমাদের সযত্ন-লালিত সাহিত্য-সংস্কৃতি তো বটেই, এমনকী আমাদের রক্তের অভ্যন্তরে প্রোথিত থাকা  গোটা হয়ে-ওঠার ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক জীবনধারণারও শিকড় অবধি আমূল নড়বড়ে করে ফেলার স্পর্ধা দেখাবে। 

 এবং কথা হচ্ছে, এইটা করতে গিয়ে তিনি, মলয়, আদ্যন্ত যেটা করেন/করেছেন তা হল, নিজের সময় ও সমকালকে তো বটেই, এমনকী নিজের সামাজিক অবস্থানকেও সেই সঙ্গে,  কতকগুলো মূল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যা একই সঙ্গে আমাদের, পাঠকদের মনোসামাজিক ভিতকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। যেমন ধরা যাক , মলয় কেবল নিজেকে কালচারাল বাস্টার্ডই  বলেননি, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেও আত্মজীবনীর পাতায় নিজের পরিবারের এমন কিছু বাঁক তুলে দিয়েছেন যা অবশ্যম্ভাবীভাবে সঙ্গেসঙ্গেই ঔপনিবেশিক মনোসামাজিক ভূমিতে  আজন্ম লালিত পারিবারিক ধারণার কেন্দ্রে গিয়ে আঘাত করে (যেমন , ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’-য় সটান বলে দেওয়া, যে, তাঁর জ্যাঠতুতো ভাই তাঁর জ্যাঠামশাইয়ের নিজের ছেলে নয়, তাকে এক বেশ্যার কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। কুলসম আপার ঘটনাটাও অবশ্যই এই পর্যায়েই পড়বে।) ; এবং করে যেহেতু, ফলে সব মিলিয়ে তাঁকে বাংলা সাহিত্যের মূল ধারায়  আজও ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয় না। কেবল তা-ই নয়, এর অভিঘাতেই ২০১৫-তে এসেও মলয়কে জানাতে হয়, ‘এতকাল পাঠকরা আমার বইপত্র খুঁজেও পেতেন না। তাঁদের দৃষ্টিতে আমার মামলাটাই জীবন্ত ছিল।’ বা আশির দশকের শেষের পর্বেও তাঁর অভিজ্ঞতা বলে , ‘কলকাতার সম্পাদকরা ভয়ে সিটিয়ে থাকত, ওই অশ্লীল কবিতার ভয়ে...’ একদিকে অবস্থা ছিল এই, আবার  অন্য দিকে ক্ষুধার্ত প্রজন্মের এমন একটা বাজার তৈরি করে তোলে যেখানে মলয় কী বলেন বা ভাবেন নয়, বরং আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের একদা কর্মকাণ্ড বা ওইসব তথাকথিত-যৌন অনুষঙ্গগুলি, যেগুলি মলয়রা সেদিন তাঁদের কবিতায়/লেখায় ব্যবহার করছিলেন। এই দিকটিকেই ফণিশ্বরনাথ রেণু হাংরি মামলা চলার সময় মলয়ের কাছে চিহ্নিত করেছিলেন এইভাবে যে, ‘এই যে তোমার ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নিয়ে অবসিনিটি আর সাবভারশানের মামলা আরম্ভ হল তো , তুমি দেখবে তুমি ক্রমশ ওই অশ্লীলতার জন্যই পাঠকদের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড হয়ে যাচ্ছো ; শুঁটকি মাছের গন্ধ আমাদের ভালো লাগে, টাটকার থেকেও বেশি টানে।’ বা গিন্সবার্গ বলেছিলেন, ‘এত কবিতা লিখছি, তবু সবাই কবিতার চেয়ে আমি কী করে বেড়িয়েছি তাতে ইন্টারেস্টেড।’ স্বাভাবিক। স্বাভাবিক যে-মানসিকতা উপরিউক্ত এই বাজারটা নির্মাণ করে তিলে তিলে, করে এবং শৈশব থেকেই আমাকে-আপনাকে ঝুঁটি ধরে তার অধীনে  নিয়ে গিয়ে ফেলে প্রশ্নাতীত ক্ষমতার আঙুলে, তার দৃষ্টিকোণ থেকে। 

  কেউ কেউ বলবেন হয়ত এখন অবস্থা বদলেছে  , অন্তত উপরের দিক থেকে হলেও খানিকটা, কিন্তু বাংলা কবিতা বলুন বা গদ্যের মূল যে ভাবনাধারা, তার ক্ষেত্রে সে বদল, পাঠক জানেন, তা-ও ওই ওপর ওপর, এবং ওই খানিকটাই। হ্যাঁ, আর তাই এখন আর মলয়ের লেখাকে  সেই অর্থে অশ্লীল হয়ত বলা হয় না ঠিক কথা, কিন্তু মলয় কি সেই অর্থে আবার যাকে বলে বহুলপঠিতও বটে ? এখনও ? না হলে, কেন নন ? 

 নন কারণ, মলয় কিন্তু সেই অর্থে যাকে বলে সাহিত্য/লেখালেখিকে দেখার যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ  করে দেওয়া অ্যাটিট্যুড, যাকে আমাদের দেশে আমাদের তদবধি প্রচলিত দেখার চোখকে ধ্বংস করে সেই উপনিবেশ পর্বের গোড়াতেই তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল, এবং যত দিন গেছে  সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা কিছু সামান্য বিবর্তিত হয়েছে মাত্র, এবং একই সঙ্গে বিশেষ করে দাঁতে-নখে আরো আক্রমণাত্মক ও সার্বিক হয়ে উঠেছে, তাকে মান্য করে নিজের রচনার ভাবনা কাঠামোকে নির্মাণ করেননি/ করেন না। বরং আমরা যে প্রশ্নের কথা বলছিলাম, তাকে সেই প্রশ্নেরই সম্মুখীন করে দেনযে ভূমি থেকে ২০১৭-তে এসেও তিনি এরকম বলেন যে, ‘আমি মূলত সমাজের পর্যবেক্ষক এবং নিজের মতামত উপস্থাপন করি।’ কেবল তা-ই নয়, এই জায়গা থেকেই আরো বলার যে, মলয়ের উপন্যাস, গল্প , প্রবন্ধ , কবিতা সমূহ বিপজ্জনক ; কারণ, মলয় যা লেখেন তার অনেকটাই বিস্ফোরক রকম ইন্সটিঙ্কটিভতাঁর লেখা, তা সে যে গোত্রেরই হোক,  স্পষ্ট একটা রক্তান্তর্গত রাজনৈতিক মতামত বহন করে। এবং এই বহন করাটাকে মলয়, আরো অনেকের মতো , ভাষার আচ্ছাদনে আড়াল তো করেনই না, বরং, সেই ভাষার অস্ত্রেই, তাকে হা-হা রকম হাটখোলা করে মেলে ধরেন। আর এটা তিনি করেন যেহেতু নিজের ইন্সটিঙ্কটে নিহিত রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই, নিজস্ব নির্মাণের পাথেয়, কিম্বা বলা যাক উপাদান তিনি যেহেতু সংগ্রহ করে নেন এর অভ্যন্তর থেকেই, ফলে, ১৯৯৫-এ কলকাতায় এই নিবন্ধকারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর সটান ছোবল তুলতে বাধে না, যে, ‘কে প্রলেতারিয়েত ? তুমি, না যারা এটা পড়বে--- কারা ? যাদের বাড়ির ভেতরেই পায়খানা থাকে, তাদের প্রলেতারিয়েত বলা যায় না।’ কেবল তা-ই নয়, নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁকে ভুরু কুঁচকে  বলতে হয়, ‘বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলো , যিনি বা যাঁরা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তা একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন যোগাবার জন্যে নেওয়া... প্রায় সবই মোটিভেটেড। সকলেই মোটামুটি একটা হাংরি ইমেজ নির্মাণ বা অবিনির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেছেন। ...অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা, নিজেদের ডিসকোর্সকে জায়গা করে দিতে চেয়েছেন।’ 

  অর্থাৎ মলয় চিহ্নিত করেছেন কীভাবে তাঁর পরের প্রজন্ম , তৎকালীন সময় থেকে দূরে/পরিবর্তিত কালে বসেও, অন্তর্গত সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণের চাপের সৃষ্টি হিসাবে সেই সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের স্বার্থকেই বজায় রাখবার দায় থেকে গৃহীত হাংরি ইমেজকে খাড়া রাখবার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন করছে যেমন একদিকে, তেমনি অন্যদিকে হাংরি আন্দোলন নামে এক বিস্ফোরণের চরিত্রকেও এই ক্ষমতার চোখ এবং মন দিয়েই দেখতে ও পড়তে মগ্ন থাকছে। এই অবস্থা ও অবস্থানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারাকে মলয় বলছেন পীড়া, যে পীড়াকে, মলয়ের স্পষ্ট বক্তব্য , ‘শেয়ার করা যায় না।’ এবং শুধু তা-ই নয় , এই পীড়াই তাঁকে যে এম আর চোওধারি নামে আরেক অস্তিত্বকেও খাড়া করতে বাধ্য করেছে  তা-ও মলয়ের বয়ানেই আমরা জানতে পারছি। 

 এটা একটা দিক, আর অন্য দিকে এই এখান থেকেই জাত হয় সেই পরিস্থিতি যেখানে মলয় বলেছেন, ‘গ্রহণ-বর্জনের বৈভিন্ন্যের নিরন্তর টানাপোড়েনে পাঠকৃতি-বিশেষ তার নিজের পরিসর অহরহ গড়ে নিতে থাকে। তার কিনারায় গালে হাত রেখে বসে থাকা ছাড়া আমার কিছু করার নেই।’ এবং এইখানেই মলয় নিজের জন্যে ‘ফালচার’-শীর্ষক এক বর্গ নির্মাণ করে নেন --- যার গভীরে নিহিত থাকে একটা ‘ইরর‍্যাশন্যালিটি’, যাকে আবার নির্মাণ করছে , মলয় বলছেন, ‘পাশাপাশি মিশনারি স্কুল আর ব্রাহ্ম স্কুল’-এর যাদু-বাস্তবতা --- যে বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে মলয় লিখছেন, ‘আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ ছিলেন, ব্রাহ্ম বলে। পিরিলি বাউনদের বজরা উত্তরপাড়ার গঙ্গায় ভাসলে স্নান অর্ধসমাপ্ত রেখে ঠাকুমার পালকি ফিরে আসত। সিনেমা দেখা নিষিদ্ধ ছিল কেননা তা লোচ্চাদের তামাসবিনি।’ এবং এইখানেই ‘প্রাক-ঔপনিবেশিক সাবটেরানিয়ান এথনিক বাঙালিয়ানা’ আর মিশনারি স্কুলের মূল্যবোধের মধ্যে সংঘাতটা বাধে, এবং মলয়ের রক্তান্তর্গত রাজনীতির ভাবনা-বিশ্ব তথা দেখার-চোখ গড়ে ওঠে। এই দেখার চোখটাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর মতো লেখা, ‘শয়তানের মুখ’ বা ‘জখম’-এর মতো হাড় অব্দি চমকে দেওয়া কাব্যগ্রন্থ, ‘নপুংপুং’,’ইল্লত’,’হিবাকুষা’-র মতো নাটক বা রাজনীতি ও ধর্ম নিয়ে ম্যানিফেস্টোগুলি, যা মলয় রায়চৌধুরী নামক ব্যক্তিটিকে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্ণধারদের বিপরীতে গলিয়াথের বিরুদ্ধে ডেভিডের মতো বিপজ্জনক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে অশ্লীলতার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার পর প্রথম একজন কবির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্রের মামলা/তকমা ঝুলিয়ে দেয় (সে অভিযোগ অবিশ্যি পরে তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবু)। এবং সম্ভবত এইখান থেকেই অদ্যাবধি মলয়ের বই যত না, বেশি আলোচিত হয়েছেন মলয় নিজে—হয়েছেন কারণ, মলয় যে নিজেকেই লেখার বিষয় করেছেন। করেছেন নিজের সামান্য-টিল্টেড দেখার চোখকেই, যে চোখ দ্যাখে ‘কোরা মার্কিন কাপড়ের পুঁটুলিতে রাজপথ থেকে ছেঁকে তোলা মানবলাবণ্য’ (মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর ) বা যে চোখের দৃষ্টিশক্তির অভ্যন্তরে নিহিত থাকে ‘গহ্বরতীর্থের কুশীলব’ কিম্বা ‘ঘোগ’-এর ভাষা-বাস্তবতার শিকড়। বিষয়কেন্দ্রহীন  মুক্ত সূচনা ও মুক্ত সমাপ্তির মধ্যবর্তী পর্বে লজিক্যাল সিকোয়েন্স-বর্জিত ছেঁড়া ছেঁড়া চিত্রকল্পে গেঁথে তোলা এই যে সব পাঠবস্তু , যাদের হাঁ-মুখে নির্বিচারে ঢুকে যায় দলা পাকিয়ে ওঠা রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতি মথিত আমাদের গোটা সমসময় , যার সম্মুখবর্তী না হলে বোঝাই যায় না কেন, কোন জায়গা থেকে বাজার নামক প্রধান ডিসকোর্সের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মলয় বলেন তিনি কবিতাকে, লেখালেখিকে জীবনে ফিরিয়ে দিতে চান ( অনেকটা ক্ষেত্রে দিয়েওছেন। অন্তত ‘যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের’, ‘ভালোবাসার উৎসব’-এর মতো লেখা বা ধরা যাক ‘রাহুকেতু’-র মতো উপন্যাসটি পড়ে উঠলে বেশ টের পাওয়া যায়), এবং কেন আজও মলয়ের লেখালেখি নিয়ে যে কোনো আলোচনার কেন্দ্রে ঘুরেফিরে এসে যায়ই হাংরি প্রসঙ্গ এবং তৎসংক্রান্ত ডিবেটগুলি, যা , নিহিত উত্তেজনার কারণেই অনেকটা , মুহূর্তে পাঠকের নজরের লক্ষ্যবিন্দুকে গ্রাস করে এমনকী যখন স্বয়ং মলয় বলেই দিচ্ছেন যে তিনি মলয় রায়চৌধুরী হিসেবেই পরিচিত হতে চান, হাংরি বা অ-হাংরি হিসেবে নয় , তখনো গোটা আলোচনাটিরই ভরকেন্দ্রকে, ক্ষমতার ইচ্ছে/স্ট্রাটেজি-মতো , বাধ্যতামূলক ভিন্নমুখী করে দিয়ে।

  মলয় রায়চৌধুরীর লেখালেখি সম্পর্কে তা-ই আপাতত কথা রয়ে যায় একটাই , যে, তিনি আমাদের মানসিকতার গভীরে বাজারি আঙুলে আমূল প্রোথিত করে দিতে চাওয়া মানসিকতাটাকেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তার প্রেক্ষিতেই নিজেকে যাচিয়ে দেখতে চান। এই চাওয়াটাই মলয়কে প্রতি মুহূর্তে যেমন সমকালীন রাখে, বিপজ্জনক হিসাবে প্রতিভাত করে, তেমনি আদ্যন্ত সচেতন নিজস্বতায় জারিতও করে নিঃসন্দেহে। তাঁর গল্প-উপন্যাস বলুন বা কবিতা, নাটক কিম্বা কাব্যনাট্যগুলি, সাক্ষাৎকার ও প্রবন্ধ অথবা আত্মজীবনী --- সবের মধ্যেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে থাকেন সেই মানুষটি, উত্তর-ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বিষ-আঙুল যাঁর ভাবনা-কেন্দ্রে কোনো রদ-বদলই ঘটাতে পারেনি, বরং নিজেই সামান্য হলেও বদলে গেছে --- এই যা !        

 

Sunday, January 6, 2019

মলয় রায়চৌধুরীর 'অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা' : অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ



অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা - নগ্ন ভোজ ও  হলাহলঃ বারুদ চিহ্ন ও অনৈতিক লাথের দিনলিপি  
অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

অনেকান্ত কথকতা

মলয় রায়চৌধুরীর ৪৬ পাতার নভেলা- অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা উপন্যাসের চারটি কথক। লেখক মলয় রায়চৌধুরী, বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের এক সদস্য চিত্রকর নির্মল এর পিতা, সরকারী চাকুরে ও অতলান্ত প্রেম-বিলাসী শিশির ও বেনারসে মন্দির-ব্যবসা-সফল সাহসিনী কেকা। শুরুতে লেখক কথকতাটা নিজেই করেন, কাহিনীর চরিত্রগুলি ও সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। এরপর বাকী তিন কথক তিনটি ভিন্ন সময়ে এই আখ্যান লিখে যাবেন। তিনজনই ডায়েরী লেখক। বলা ভালো একটিই ডায়েরী । মানে একই  খাতা। আর তার কাগজে তিনটি ভিন্ন সময়ে তিন কথক আঁচড় কেটে রাখেন। তাই নিয়েই এগোয় আখ্যান। ডায়েরীটির প্রাথমিক এবং আসল মালিকানা বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের সদস্য নির্মল এর পিতার। এঁর কথকতাটি মূলত প্রাবন্ধিক ধাঁচার দিনলিপি । রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের র‍্যান্ডম নোট্স্‌। ডায়েরীটি হাতবদল হয় কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র শিশির মারফৎ। মানে শিশির ডায়েরীটি হাতসাফাই করে। নির্মলের বাবার নোট্স্‌ের খাঁজে খাঁজে ফাঁকা পাতা । সেই ফাঁকা স্পেইস- আর তা ভরে ওঠে শিশিরের  বারানসী বসবাসের প্রায়-প্রাত্যহিক দিনলিপিতে । যা মুখ্যত দুই নারী- ভাইকিং বংশজাতা আমেরিকান তরুণী ম্যাডেলিন ও কেকা নাম্নী অন্ত্য-ত্রিশের বাঙ্গালিনীর সাথে তার শৃঙ্গার ও সঙ্গমের এরোটিক কলমদিহি।

এই ডায়েরী-পাতায় মলয়ের কথকরা পাঠকের সাথে কথা বলে চলেন। মনোলগের ঢং তাতে। সেই কথা তাদের নিজেদের সাথেও। নির্মলের বাবার চরিত্রটি গড়ে তোলেন না লেখক। তিনি নেহাতই ইতিহাসের কথক। এর বেশী তার  সম্পর্কে কোন তথ্য লেখক আমাদের দেননা। যাত্রা-ফর্মের বিবেকের মত এই কথকের সংযোজনে এক ব্রেশটীয় বিচ্ছিন্নতা তাই আমদানী সম্ভব হয়েছে। শৃঙ্গার, রতিক্রিয়ায় ভরপুর পাল্প-ফিকশনের ধাঁচায় যে 'কজালিটির' খেলা চলতে  থাকতে পারত, তাকে প্রথমেই ভাঙ্গার কাজটি করছে এই বিচ্ছিন্নতার উপপাদ্য। যাকে পরে আরও ভাঙছে উপন্যাসটির উদ্দেশ্যমূলক 'এরোটিকা' । যা নির্মাণের উদ্দেশ্য- 'মধ্যবিত্তের নীতিমুলে' শৈল্পিক লাথ। কামসূত্রের দেশে, পোস্ট-কলোনিয়াল গো-মল আর গোমূতের ছানবিন, আর কলোনি-পুর্ব মোজা পরা  ভিক্টোরীয় সমাজ-পুলিশীর লিগাসিকে মলয় প্রশ্ন করেছেন ষাটের দশক থেকেই।হাংরিদের এটি মুখ্য এজেন্ডাও বটে । কিন্তু বাংলাবাজারে সেক্সকে ট্যাবু-মুক্ত করতে লেখালিখিতে সেক্সিস্টও আখরও কেটে রেখেছেন। দুর্দান্ত প্রাবন্ধিক মলয়ের গদ্য-পদ্যের এটিই সর্বাপেক্ষা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এই উপন্যাসেও তা চোখে পড়েছে, তবে তা ছাপিয়ে ওঠার মত শান্‌-দার অধুনান্তিক মেহ্‌ফিলটিও  তিনি রচনা করে দিয়েছেন।
এবং উপন্যাসের ধাঁচাটি ক্রমে বিশ্ব-স্থানিক, বহু-কথক, এক্সটিক  লোকেল, এরোটিকা ও তার বিনির্মান এসবের আন্তর্জাল থেকে বহুস্বরিক হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে এইভাবে বহুস্বরিক হয়ে ওঠার বা তার অবসর নির্মান করার ক্র্যাফটটি তেমন জনপ্রিয় নয়।

"আমার কোন স্থির কেন্দ্র ছিলনা।"

স্থির কেন্দ্র, ঘুর্ননের আপাত স্থির বিন্দু- যাকে জন অ্যাশবেরী  'আ হিম টু পসিবিলিটি' বলে থাকেন, তা এই নভেলাতে ঘেপ্‌টে আছে জটিল এক কেমোফ্ল্যাজে।   

তিনটি ভিন্ন ডেমোগ্রাফির তিন কথককে উপস্থিত করে যে আখ্যানের বুনন তার স্থির কেন্দ্র দুটিঃ এক-  পোস্ট কোলোনিয়াল ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত। ভারতবর্ষ, তরুণতর মেধাবী বাঙ্গালীর রাজনৈতিক সচেতনতা আর তার  উত্তাল অভিমুখ; দুইঃ গ্লোবাল কানেকশন- আমেরিকার হিপ্সটার আন্দোলনের তরঙ্গ। সেই তরঙ্গ মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছিল, ষাট থেকে সত্তরের  প্রথম ভাগে- নেপাল থেকে বারানসী। গুরু থেকে গাঞ্জা। বেলাগম সেক্স। তুলকালাম মাদক। অব্যর্থ শূন্যের ভেতর অনিশ্চিত জীবনের মানে খোঁজা। ভারত তখন  হয়ে উঠেছে ঘরছাড়া হিপিদের হতাশ-নিরঞ্জন অভয়াক্ষেত্র- ইহমুক্তি খুঁজতে আসা শয়ে শয়ে মার্কিনি তরুন-তরুণী বারানসীর গলিতে গলিতে। এই বেনারসকেই বেছে নিয়েছেন মলয় তার নভেলার স্থানিক পট হিসেবে। কলকাতা থেকে বিকেন্দ্রীকরণ । আবার কলকাতা ও প্রবাস, বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র ও প্রান্তিক, এই দুই বাইনারি ছাপিয়ে তা মলয়ের আত্মজৈবনিক প্রয়াসও। ষাটের দশক। সত্তরের প্রথম ভাগ।  সারা আমেরিকা উদ্বেল, অসংযত । যৌন-মুক্তি, ভালবাসায় বিভোল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পোর্টল্যান্ড, কলোরাডো থেকে নিউ ইয়র্ক। মাথায় ফুল লাগানো তরুণীরা, যুদ্ধবাজ মার্কিনি নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। ভিয়েতনামের নামে প্রতিবাদে উচাটন হচ্ছে বার্কলি থেকে প্রগতিশীল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। মানবিক হত্যার কাছে আস্থা হারিয়ে ভালবাসা খুঁজতে জড় হয়েছেন হেইট অ্যাশবেরিতে। 'ভালবাসার একটি গ্রীষ্ম' তাদের আত্মপ্রত্যয়ী  করে তুলেছে, তারা ঘর ছাড়তে শিখেছেন বহর্বিশ্বের ডাকে ।যেমন বীটরা। আমেরিকা জুড়ে তখন তেমনই চূড়ান্ত চলছে বীট আন্দোলন।
বীটরা এসে যাবেন, কারণ- মলয় ও হাংরিদের  বিট-কানেকশন ও মিথ পর্যায়ের। মলয় আমাকে এক  সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন- হাংরিরা নয়, বরং বীটরাই অনেকভাবে  হাংরিদের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন।

আমি ডেনমার্কে বিট সাহিত্য সেমিনারে সেই সাক্ষাৎকার দেখাই।  সন্ধ্যের পানশালায় মারিহুয়ানা ফুঁকতে ফুঁকতে নস্টালজিক হয়ে যেতে বসা অ্যালবয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরেনসন  আমাকে রামকৃষ্ণের মত হাতের ভঙ্গিমা করে বল্লেন- কে কার থেকে কি নিল, তাতে কিবা এসে যায়। ভারতে যাওয়ার আগেই বীটরা স্বমহিমায়। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি- মলয় সম্ভবত বলতে চান যে ভারত থেকে ফিরে গিন্সবার্গ  যেসব রচনা লিখছিলেন- কথ্য ভাষা সাহিত্যের আদলে, তাতে হাংরিদের প্রভাব আছে। তবে হাংরিদের ওপরও বিট-প্রভাবের আস্তরণ ছিল বা মলয়ের ওপর, তার একটি বড় লক্ষণ- তার হিপিবেলা, কারণ পুরো হিপি আন্দোলনের ওপরই বিটদের চূড়ান্ত প্রভাব ছিল। মলয় নিজেই তার মেময়ারকে 'হিপিবেলা' নাম দিয়েছেন। আর তা রাজনীতি হোক বা বীট বা বীটহীন হিপি- ঝড়টা আসলেই বহির্বিশ্বের।এরোটিকা লিখতে বসে, এই বহর্বিশ্বের ঝড়কে উপেক্ষা মলয়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ তা ফলিত হচ্ছে সমানুপাতিক ভাবে । একদিকে মাও এর রাজনীতি, অন্যদিকে হিপি সংস্কৃতি। ভারতে উত্তর উপনিবেশকালে, চীনের চেয়ারম্যানের নামে প্রলেতারিয়েত সমাজ গঠনের শপথ থেকে, মার্কিনি দাদাগিরিতে হতাশ, দেহ, নেশা, মুক্তি, ভালবাসার খোঁজে উত্তাল একাংশ মার্কিন সমাজের হাউই-বাতাস,  উভয়ই মলয়কে পুষ্টি দিচ্ছে।
সানফ্রানসিস্‌কো রেনেসান্স, ষাটের বৈপ্লবিক হিপি চরাচর  ও ভালবাসার গ্রীষ্ম, বীটদের সাইকেডেলিক আন্দোলন, হিপিদের ভারত-অনুসন্ধান পর্ব  ছাড়া এ উপন্যাসের প্রেক্ষিতই গড়ে উঠতনা।

এসব জড়িবুটি পেরিয়ে মলয়ের কাছে চ্যালেঞ্জ হল- তার এই কেন্দ্র থেকে সরে এসে তাকে লিখতে হবে এরোটিকা, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালির ভিক্টোরিয় নৈতিক পাছার  ফুটো দেখিয়ে- অ্যাস্‌হোল ঘোমটা-যৌনতার নিধন করা। আর শেষমেশ সেটি একটি প্রেমের আখ্যানই হবে- নয়তবা সিডাকশন, নিও-শৃঙ্গার-শাস্ত্র। আর ধুমাধার সেই দুয়েন্দেতে- অব্যর্থ ভাবে সফল এই পলিফনি। ভিন্ন ভিন্ন ডেমোগ্রাফির কোলাজ-কথন।

“Depart from the tune" - বিযুক্ত কর

পড়ছিলাম অ্যান লডেরবাক্‌। দেখছি তিনি  বলেন- “Depart from the tune" - বিযুক্ত কর,  ফর্মকে ভেঙ্গে যে ফর্ম, তার মধ্যে বিশ্বকে খোঁজো'। আবার বীটরা আসিয়া যাইতেছেন। বারোজে যেমন দেখি ন্যারেটিভ, ফ্যান্টাসি, স্বপ্ন, হ্যালুসিনেশন খেলা করে। এই উপন্যাসেও মারিহুয়ানা, কেমিক্যাল ড্রাগস ছাড়াও 'নেকেড লাঞ্চ' এর মতই  উপন্যাসের নামকরণে ফুড-মেটাফর এনেছেন মলয়। এঁটোকাঁটা আর ব্রাহ্মসাহিত্যের মত 'অরূপে'র ক্লাসিক সহাবস্থান, ভারতীয় যৌথ মনোনীতিতে গুরু আর চণ্ডালের অমসৃণ মিলনের মত। পৌষ্টিক ক্ষুধা, মাংস, রুটি, সুরা এবং শৃঙ্গার ও কাম-ক্ষুধার কেমোফ্ল্যাজ-

মেঝেয় নামিয়া দুইজনে, আদিম মানব মানবীর ন্যায় পোশাকহীন, রুটি-মদ্য-মাংস খাইলাম । লঙ্কা দেয় নাই বলিয়া, মাংস, যদিও নরম, ছিঁড়িয়া-ছিঁড়িয়া খাইল ম্যাডেলিন , ছাড়া কাপড় টানিয়া হাত-মুখ পুঁছিল । ওই একই পরিত্যক্ত পোশাকে আমিও হাত-মুখ পুঁছিলাম ।

বীটদের মত সাইকেডিলিক ফ্যান্টাসি ও নেশার অদেখা জগতও এসে পড়ছে- যদিও তেমন জোরালো নয় :  -

"গাঁজার ধোঁয়ায় মগজে কত যে খেলা তৈরি হয় ! আমি তাহলে অক্ষয়-অব্যয় অপ্সরা, মধুবালা আর মাধুরী দীক্ষিতের মতন সমুদ্র মন্হন থেকে উঠেছি , তপস্যা নষ্ট করতে এক্সপার্ট । " ---- কেকা উবাচ

আর শিশিরের  জবানীতে,

"শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি । মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে । ম্যাডিই প্রস্তাব দিয়াছিল, সজ্ঞানে তো বহুবার হইল ; মাদকের অপার্থিব জগতে প্রবেশ করিয়া অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা উচিত আমার । বালকসুলভ যৌনতার সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হইবে তদ্বারা ।
সে কি আলো বিচ্ছুরণ ! নিঃশব্দ ফুলকির বৃষ্টিফোঁটা রূপান্তরিত হইয়াছে নানা প্রকার ফুলে । ম্যাডিকে কখনও মনে হইয়াছে পালক, কখনও মাখন, কখনও অশরীরী অট্টালিকা, যাহার ভিতর প্রবেশ করিয়া পথ হারাইয়া সাঁতার কাটিতেছি ।"
সারা উপন্যাসে এটুকুই মাত্র সাইকিডেলিক আয়োজন। আর তার বিবরণও নেহাতই নগণ্য। সেই দিক থেকে এটি মুখ্যভাবে সাইকুডেলিক ন্যারেটিভের চরিত্র ও গঠন বজায় রাখছেনা। যদিও মাদক ও ড্রাগস ও তার সেবন প্রথম দৃশ্য থেকেই প্রায় পুরো বারানসী বৃত্তান্তে ছড়িয়ে আছে। হাংরীরা বারবারই জানিয়েছেন যে তারা কেমিক্যাল ড্রাগস এর নেশায় ছিলেননা, বীটদের মত। তাই বীট বা অন্যান্য সাইকিডেলিক রচনার সাথে এ উপন্যাসের মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। বর্ননা যেটুকু আছে তা গড় সাইকিডেলিক মোটিফ বা সিম্বলের সাথে বিশেষ মেলেনা। আলো ও ফুলের মোটিফটি ছাড়া। সেদিক থেকে পাঠককে নিয়ে এসেও মাদকের অপার্থিব স্তরে ভ্রমণ করাতে মলয় নিতান্তই কাঞ্জুশি করেছেন বলব।

ফিরে আসি ফর্মের আলোচনায়- তিনজন কথকের ডেমোগ্রাফি ভিন্ন। তাই বাক্যান্যাসের  ব্যাপারে লেখক যত্নবান হয়েছেন। বাখতিন তার The Dialogic Imagination এ একথা উল্লেখ করেছেন যে - 'পৃথ্বীটা পলিগ্লট অর্থাৎ বহুভাষক, হয়ে গেছে। আর উপন্যাস খুব সক্রিয়ভাবেই এই পলিগ্লট বিশ্ব  নির্মান করতে সক্ষম'। ভাষার ভিন্নতা বা বহু ভাষা বলতে এখানে আমি 'স্বর' বোঝাতে চাইছি। তা মূলত ডেমোগ্রাফির ভিন্নতার কারণে। এবং একই ঘটনার বা  প্রেক্ষিতের দুটি পৃথক উপস্থাপনার কারণে। কিউবিজমের ধাঁচায়- দুটি বয়ান- একটি শিশিরের অপরটি কেকার।
উত্তম বচনে লেখা এই দিনলিপি আখ্যানে কেকা ও শিশির একটিই  ন্যারেটিভের দুইটি পার্সপেক্টিভ দেওয়ার কাজ করে বা পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে। এখানে যেমন শিশিরের বয়ানে পাচ্ছি-

"প্রাতঃকালের নয়টা-দশটা হইবে । লাল তাঁতের শাড়ি-ব্লাউজ পরিহিত, সম্পূর্ণ সিক্ত, চুল হইতেও জল ঝরিতেছে, এক ভারতীয় রমণী ঘরে প্রবেশ করিয়াই খিল তুলিয়া দিল । গঙ্গায় ডুব দিয়া ভিজিয়া গিয়াছি , শুকাইতে হইবে, বলিয়া এক-এক করিয়া সবকিছু পরিত্যাগ করিল, এবং আমার তোয়ালে লইয়া গা-মাথা পুঁছিতে লাগিল ।...এতই বিস্ময়াহত হইলাম যে, উঠিয়া, স্হিতি বোধগম্য হইতে সময় লাগিল । আত্মস্হ হইলে কন্ঠ হইতে নির্গত হইল, কেকা বোউদি, করিতেছেন কী, করিতেছেন কী ! কেকা বলিল, বউদি শব্দটি বাদ দাও, এবং এগুলি ছাদে শুকাইয়া দিয়া আইস, তারপর বলিতেছি । শুকাইতে দিয়া ঘরে ফিরিয়া দেখিলাম , অতুলের স্ত্রী বিছানায় শুইয়া সিগারেট ফুঁকিতেছে । নারীর বহু পোশাক ঘরে মজুত । অথচ সে নগ্ন, কোনো লজ্জা-সংকোচ নাই । বুঝিতে পারিলাম আমার কন্ঠ শুকাইয়া গিয়াছে, মুখ দিয়া কথা ফুটিতে সময় লাগিবে ।"
এই  একই ঘটনা আবার লিপিবদ্ধ হতে দেখি কেকার জবানীতে, এক পুরুষত্বহীন স্বামী, আরেক লম্পট প্রেমিকের যৌন প্রত্যাখ্যানে অনশনক্লিষ্ট, যৌবনময়ী সে বেঁচে নিতে চায় জীবন-  
"প্রথম দিনের ব্যাপারটা লিখতে গিয়ে শিশির কিছুটা বাদ দিয়ে ফেলেছে , বোধহয় উত্তেজনার বশে কিংবা নেশার ঘোরে লিখেছে বলে । আমার মনে হয়, ও হুহু করে লিখে গেছে, তারপর আর পড়ে দেখেনি । তার ওপর মাস্টারি-মার্কা বাংলা ।ও যখন ঘরে ঢুকে খাটের পাশে এসে দাঁড়ালো, মুখচোখ দেখে বুঝলুম ভীষণ অপ্রস্তুত, কী করবে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না । একেবারে অস্হিরপঞ্চক । ওকে স্বাভাবিক করে তুলতে আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় পর-পর দুটো রিং ওর দিকে উড়িয়ে বললুম, এই নাও বরমাল্য, তোমায় স্বয়ম্বর-সভায় বরণ করে নিচ্ছি ।শিশির কিছুটা স্বাভাবিক হল , কিন্তু জিগ্যেস করে বসল, তুমি আর গান গাও না ? এরকম গাড়লপুরুষ যে হতে পারে জানতুম না । সামনে শুয়ে রয়েছে এক নগ্ন মহিলা , সেদিকে নজর দেবে, প্রশংসা করবে, তা নয়, গান !  তবে বুঝে নিতে অসুবিধা হল না যে বঙড়শিতে মাছ আটকে পড়েছে, এখন যদি আমি মুখ থেকে বঁড়শি খুলে নিই তবেই ছাড়া পাবে, নয়তো আটকে নিয়ে খেলাবো, খেলাতে থাকবো । পুরুষরা ভাবে যে তারাই বুঝি ছিপ ফেলে গিঁথে তুলতে পারে।"

এরপরই  ডায়েরী মালিকের ক্লাসিক-জবানীতে প্রায়  গোদারীয় জাম্পকাট। কেকার জবানী থেকে পাঠক এসে পড়ছে নির্মলের বাবার দিনলিপির পাতায়। তার বচনে-

"উৎপাদন ব্যাপারটা হয়ে উঠেছে সতত পরিবর্তনরত । আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের কারণে, প্রাযুক্তিক দ্রুতির কারণে, শ্রমের তুলনায় পুঁজি থেকে সর্বাধিক লাভের কারণে, এবং অবশ্যই ভোগ্যবস্তুর বিশ্বায়নের কারণে । আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের আদলটাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে  । বহুজাতিক সংস্হা ও তার মালিকদের স্বদেশ বলে কিছু থাকছে না । আবির্ভাব হয়েছে বিশ্বব্যাপী মাফিয়া-ভাতৃত্বের । বাজারের কতৃত্ব হয়ে চলেছে বিকেন্দ্রিত । অথচ বহুজাতিকগুলোর কর্মকাণ্ড কেবলমাত্র পুঁজি, মাল এবং উৎপাদনের আনাগোনায় সীমাবদ্ধ নয় । তারা বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক নকশাগুলোর হেরফেরকারীও বটে । ব্যক্তিমালিকের পক্ষে আর ঊৎপাদনের বিশাল কারবার চালানো সম্ভব নয় বলে, সমাজ-সম্প্রদায়-রাষ্ট্রের হাতে উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত । নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম, নীতি এক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়ায় টলমলে । সেহেতু সংস্কৃতির সনাতন ভৌগলিক বাঁধন আলগা হয়ে যায় । সংস্কৃতি হয়ে যায় ভাসা-ভাসা । সংস্কৃতি হয়ে গেছে ধাবমান ও যাযাবর । ক্লাব, সমিতি, গোষ্ঠী, যারা সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে নিজেদের মনে করে, আসলে তারা উত্তরদার্শনিকতার প্রতিভূ।
উৎপাদনের আন্তঃরাষ্ট্রিকতা একযোগে হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব বিশ্ব একতার সুত্র, আবার পুঁজিবাদের ইতিহাসে অচিন্ত্যনীয় ভঙ্গুরতার উৎস। পুঁজিবাদের এখনকার জায়মান গল্পটি আর ইউরোপীয় ইতিহাসের প্রসারিত গল্প নয় । এই গল্পের আর কেন্দ্র থাকছে না । অর্থনৈতক ভঙ্গুরতার শক্তিবিকিরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসেছে সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা বা বহুসাংস্কৃতিকতা । এর ফলে ঘটছে সাংস্কৃতিক দেশান্তরণ, সীমানাগুলোর ( ভাষা, দেশ, জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ ইত্যাদি ) অপলকাভাব, পার্থক্য ও অসাম্যের তৃণমূল পর্যন্ত প্রসার, সমাজের ভেতরে-বাইরে ওই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সমরূপী হবার চাপ, স্হানিক ও বিশ্বের পরস্পরের মধ্যে অনুপ্রবেশ । এগুলো উত্তরদার্শনিকতার লক্ষণ ।"

ক্লাসিক প্রবন্ধের কেত্‌দার, চোস্ত্‌, আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ। প্রাবন্ধিক মলয় যিনি  উপন্যাসের কলমে নির্মলের বাবা, এই বচনের কথক। এতে এসে গাড়ি জুতছেন কেকা ।

"একে তো কামুক ভোঁদাটা বিটকেল বাংলায় নিজের কাশীবাসের স্মৃতি লিখেছে, তাও আবার এমন ইজগুড়ি-বিজগুড়ি হাতের লেখায় যে তরতর করে পড়া যায় না ; তার ওপর মাঝে-মধ্যে ঢোকানো নির্মলের বাবার জ্ঞানবাক্যি ! হাতসাফাই যখন করলি, তখন ফাঁকা দেখে একটা খাতা নিতিস । নয়তো ছিঁড়ে ফেলে দিতিস নির্মলের বাবার লেখা জ্ঞানবাক্যির পাতাগুলো । ওনার দুয়েকটা পাতা পড়লুম । কী যা মাথামুন্ডু কিছুই তো বুঝলুম না । শিশির যেমন বাংলায় মাস্টারি ফলিয়ে কাব্যি করেছে, উনি তেমনি নিজেই নিজেকে জ্ঞান দিয়েছেন ।"

লেখকের সূত্র অনুযায়ী ইনিই ডায়েরী মালিক। এই মূল অথরের ডায়েরিতে ঢুঁসো মেরে ঢুকে পড়ছে শিশির। কিন্তু পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছেনা। প্রাথমিক অথরকে মারছেনা। রেখে দিচ্ছে ফাঁকা,  সাদা পাতা ইতস্তত। কোন পরিকল্পনা ছাড়া। সেখানে জমে উঠবে কেকা''আত্মনং বিদ্ধি'- তার নিজস্ব বাক্যশৈলীতে, যা জীবন-তরতরে- প্রচলিত অভিজ্ঞান মতে- চটুল ও অ-ক্লাসিক। স্বেদ,ঘাম ও হমজায়েদী। এভাবেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে- কোলাজ-কথন।

"ফাঁকে-ফাঁকে যেখানটায় লেখা হয়নি, শিশির আর নির্মলের বাবা যে পাতাগুলো ছেড়ে দিয়েছে; হয়ত আমার  জন্যেই । সেখানে আমার কথাগুলো ঢোকাবো ।"

মলয়ের পরীক্ষা-নিরিক্ষায়  বাংলা সাহিত্যে এই বহু কথকের, একে অপরকে নির্মান-বিনির্মানের  অধুনান্তিক ফর্মটি সাফল্যের সাথে থেকে গেল।

দেহ,মন, অপর
'আমি শিশিরের প্রেমিকা নই । শিশির আমার প্রেমিক ছিল না । তাহলে আমরা পরস্পরের কী ? আমি শিশিরের দেহটাকে ভালোবেসেছি । শিশির আমার দেহটাকে ভালোবেসেছে । সত্যি কথা বলতে কি, আমরা দুজনে যে-যার নিজেকে ভালবেসেছি । অথচ আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা নই । এরকম  কাণ্ড তো সিনেমাতেও সম্ভব নয় । দেখাতেই পারবে না । আমি সত্যিই অপ্সরা, ঝড় দিয়ে গড়া অপ্সরা । আর শিশির হল বরফের মতন ঠান্ডা অন্ধকার দিয়ে গড়া বিশ্বামিত্র ।'

ওপরের জবানীটি কেকার। কাহিনীতে বারানসীর দুইটি মুখ্য নারী চরিত্র- ম্যাডেলিন ও কেকা।  কিন্তু মলয়কাপল-ফর্মেশন ঘটাচ্ছেননা। এদের মধ্যে প্রেম বা বিবাহ সম্পর্ক হয়না। দেহ ও মনকে ব্যবচ্ছেদ করে, দেহ ও মনের এই কামরা-ভাগ, প্রেমিক ও যৌন সঙ্গীর আলাদায়ন, এই নবীনতা, পোস্ট-আধুনিক অগ্রসরতা,  বাংলা কেন তামাম সাউথ এশিয়ায় যথেষ্ট কষ্ট-মুমকিন, ভুলে যাবেননা উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে ষাটের শেষ গোড়ায়, সত্তরে।

আবারো কথা হোল -  মলয়, শিশিরের চরিত্রকে,  কামরাজ-কাম-সাধু (কেকার উক্তিতে, বিশ্বামিত্র) গোছের এক সমসত্ব শিশির ভেজা রস-মণ্ড তৈরি করতে চেয়েছেন। শিশির নামক এই কথক চরিত্রটির হাতে জাদু আছে। সে জানে কামকলার ছলা। সে নারী শরীরের প্রতিটি আহ্লাদ-বিন্দুকে জাগিয়ে তুলতে পারে। আগাগোড়া দুটি নারী চরিত্রের সাথেই তার সঙ্গমের যে কামশস্ত্র মূলক রচনা, তাতে কামের, শৃঙ্গারের কলা পারদর্শিতায় পুরুষের ভূমিকাই মুখ্য। ম্যাডেলীন ও কেকা উভয়ই শিশিরের কামকলায় তৃপ্ত হয়। কিন্তু তাদের যৌনমুক্তির বা অরগ্যাজম বা উদ্দীপনের সুতোটি শিশিরের হাতে বাঁধা থাকে। মানে দাঁড়াচ্ছে- শিশির বা তার মত কোন পুরুষই পারে নারী শরীরকে বাজিয়ে তুলতে, (প্রসঙ্গতঃ  নারীর সমসাময়িক যৌনচেতনা একথা স্বীকার করবেনা, এনিয়ে বিস্তরআলোচনার অবকাশ আছে, এই আলোচনায় তার বিস্তৃতি ঘটালাম না ) যেমন জিমি হেনড্রিক্সঃ

"ওঃ, জিমি হেনড্রিক্স ! ইনডিয়ায় আসিয়া এই প্রথম একজন ভারতীয়ের কন্ঠে জিমি হেনড্রিক্সের নাম শুনিলাম । গিটার তাঁহার হাতে যৌনতায় উত্তেজিত রমণীদিগের ন্যায় হইয়া উঠে ; যেনবা গিটারের অরগ্যাজম ঘটে ! শরীরে আনন্দের ঢেউ তুলিয়া ম্যাডেলিন কহিল। তদ্ব্যাতীত, অরগ্যাজম শব্দটি শুনিয়া প্রীত হইলাম । ইতোপূর্বে কোনো নারীর কন্ঠে এই শব্দটি শুনি নাই; বস্তুত, ভাষার ভিতরে যে আরাম প্রদানের ক্ষমতা হাছে তাহা মাঝে-মধ্যে অন্যের কন্ঠস্বর নিঃসৃত শব্দে অনেকসময়ে ফুটিয়া উঠে ।"
       (বিদেশিনী নারী চরিত্র ম্যাডেলিন )

মানে যৌনতায় উত্তেজিত হতে গেলে জিমিকে বা জিমির মত কাউকে বাজাতে হয়। লেখক নারীর চাহিদায় সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছেন, কেকাকে কথক হিসেবে খাড়া করে আখ্যান বুনেছেন। নারী শরীরকে পরম মমতায় যত্ন করতে চেয়েছেন। কিন্তু নারীর যৌনতাকে পুরুষের কেন্দ্র থেকে চালনা করার ইচ্ছাও  বার বার প্রকাশ করেছেন । এমনকি তা যখন নারী চরিত্রটির জবানীতেও বসানো হচ্ছে। উপন্যাসে নারীর যৌনতৃপ্তির পক্ষে সহমর্মীতা আছে। তবে দুটি নারীর ক্ষত্রেই সে প্যাসিভ গ্রহীতা। সবটুকু চালনা করে শিশির। আর অনাকাঙ্ক্ষিত হোল-

"তুমি নায়কের ভূমিকা পালন করিবে , খলনায়ক হহিতে পারিলে আরও ভালো, তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে ।তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। "

অথবা,

সিক্ত তোয়ালেতে কান্তা সুগন্ধী ছিটাইয়া ভালোভাবে পুঁছিলাম ম্যাডেলিনের দেহ । চোখ বুজিয়া শীতল স্পর্শের আরাম লইতে-লইতে বলিল, ব্রেকফাস্ট করিয়া, একটি অটুলস ফ্যাগ ফুঁকিয়া পরস্পরকে চতুষ্পদের মত রেপ করিবার লড়াই করিব, কী বল ?

রেপের ধারণায় মলয় রায়চৌধুরী এতো মশগুল কেন তা আমার বোঝাতীত।
'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' থেকেই এর ধারাবাহিকতা মলয় রেখে চলছেন। শৃঙ্গার, যৌনতার সাথে রেপের কি সম্বন্ধ একথা তার মত  বিদগ্ধ মানুষ কেবলই গুলিয়ে গেলেন বলে আশ্চর্য হতে হয়। দুঃখিতও। রেপ একটি জঘন্য ঘোরতর ক্রাইম। রেপ থেকে চূড়ান্ত শারীরিক জখম এমনকি মৃত্যু হয়। রেপের মূল রয়েছে পানিশমেন্টের মারমুখী, খুনী, ক্ষতি-ইচ্ছা। অ্যাগ্রেসিভ-সেক্স বা ডমিনেটেড  হওয়ার ফ্যান্টাসিকে 'রেপ' না বলে অন্য শব্দের কোন প্রতিস্থাপন তিনি খুঁজে পেলেননা না পেতে চাইলেননা, সেটি খোলসা করার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।

পুরুষ লেখক, কথক হিসবে তিনি নারী চরিত্রের সংলাপেও তা হাজির করছেন। নারী সত্যিই কি চান-  কোন নারী দুর্মর, বাধাহীন অরগ্যাজম্‌ পেতে চাইলে রেপড্‌ হতে চাইবেন কেন? হ্যাঁ, পরিসংখ্যান পাওয়া যায়- নারীরা সাবমিসিভ হতে চেয়ে বা পুরুষকে শরীরের বল প্রয়োগ করতে নির্দেশ দিয়ে  শৃঙ্গার করতে চাইছেন। তাকে 'রেপ-ফ্যান্টাসি' বলার এক অদ্ভুত কিমাশ্চর্জম চলও লক্ষ্য করা যায়। যারা এটা করেন তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে চান না - রেপটা কোন ফ্যান্টাসি নয়- সেটা ক্রাইম!

মৃগাঙ্ক গাঙ্গুলিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলাম- শুভা নিয়ে দুয়েক কথা বলতে পারি, আমার বিশ্লেষণ । আমি শুভা হলে মলয়দা কে এক হাত নিতাম অথবা শুভার হয়ে।
একই জিনিশ লক্ষ্য করেছি সাম্প্রতিক অবন্তিকার ক্ষেত্রেও। মেল-গেজিও বলেও না।  পুরোপুরি, এক ধরণের পাওয়ার-প্লে আছে। মলয়দাকে যেটুকু জানি, কথা বলেছি, মলয়দার মত  লিবেরাল মানুষ এটা কেন এনেছিলেন, আনেন, জানতে ইচ্ছে হয়।

যেমন সম্প্রতি ''অবন্তিকার শতনাম' কবিতাটি।

"ওষ্ঠের নাম আফ্রিকান সাফারি, পাছা দুটির নাম- গোলাপসুন্দরী..."

এ জিনিশ এর আগে নিম্ন- উচ্চ-মধ্য কোন মেধার বাঙ্গালী কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব হয়নি। মলয় চূড়ান্ত প্রেমিক, অবন্তিকাকে দুর্বার প্রেম ও অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিন্তু কথা হইল পাছা তো অবন্তিকার । স্তন ও তার । সে কি এইরূপ নাম পাইয়া খুশী হইয়াছে? সে কি নাম রাখার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছে? এই কথা  মলয় রায়চৌধুরী আমাদের কখনওই জানান না।
ফলে 'Sex is Shameful'- এই ধারনাকে ভাঙলেও কিন্তু মেয়েদের যৌনমুক্তি বা স্বাধীনতার  যে ক্ষেত্র তাতে পুরোপুরি কাজে আসছেনা হাংরিদের কলম। এনিয়ে অন্য পরিসরে বলাই ভালো। উপন্যাসে ফিরি। এই উপন্যাসে অবশ্য মলয়কে স্বীকারোক্তিতে যেতে দেখি। শিশির যে  চরিত্র, যার সাথে  মলয় রায়চৌধুরীর হিপিবেলার উপাদান অনুযায়ী আত্মজৈবনিক মিল আছে ধারনা করছি, তার জবানীতেই এই আত্ম-উন্মোচনঃ -

"রাজগীরের কুণ্ডের চারিধারে খালি গায়ে বসেছিল, আর আমরা, কলেজিয়ানরা, দুচোখ মেলে দেখছিলুম, যতক্ষণ ওরা স্নান করেছে ততক্ষণ  মেল-গেজদিয়ে গিলেছি ।"

যৌথ ডায়েরি-  স্পেস, মেটাফর, মুক্তাঞ্চল

প্রকাণ্ড শিবলিঙ্গ। তার নীচে কেকার আখড়া। মন্দির খুলে বসে কেকার আয় দুরন্ত। চিহ্নের পোস্টাপিস এই  পোস্ট উত্তর-আধুনিকতাকালে তামাদি হইয়া গেছে । কিন্তু তামাদি হয়ে গেলেও চলচ্চিত্রের মানুষ এই কলমচীর সিগ্নিফায়ার ও সিগ্নিফায়েডের সংগম মাথায় চলে ফেরে। আর কেবলই মানের জন্ম হইতে থাকে ।

শিবলিঙ্গ, মন্দিরের মেটাফরও এখানে আরেকটি ইস্যু-ভিত্তিক স্তর আমদানী করছে- ধর্ম ও তার ভণ্ডামির গার্বেজ । কেকা বৌদির  শিবের লিঙ্গ প্রতিস্থার মেটাফর, যা প্রজনন কাল্টের প্রতীক, যোনী ও লিঙ্গের সঙ্গমের প্রকাশ্য সনাতনী ইন্সটলেশন ( যা বারানসী  না হলেও একিভাবে বার্তাবহ হত, কিন্তু বারানসী শিবস্থান, লিঙ্গ পূজার মহাপীঠ, তাই মেটাফরের খেলা এখানে জমে ওঠে অব্যর্থ ) তাকে ঘিরে জমে উঠছে ব্যবসা। ধর্মের। যে ধর্মে যৌনতা ছিলাটান ট্যাবুসেখানেই  ট্যাবু ভাঙ্গার আখ্যানে শান দিয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা প্রাচীন চলমান সভ্যতা। সত্তরের বারানসীতে মলয় তাই এখানেই নিও-কামশাস্ত্র লিখতে পারেন উত্তাল বারুদ্গন্ধে। দেহ, যা ঘিরে মৌতাত পায় যৌন-উৎসব। দেহধারী স্বপ্নময় চোখ- যা চেয়েছিল সমাজবদল, সেই  দেহকেই ধ্বংস হতে হচ্ছে, খুন হয়ে যাচ্ছে তরুণ সমাজ। স্বপ্নময় সত্তরের বিপ্লব আয়োজন। আয়োজক সেই দেহ গুলিকে নিঃশেষ করা হচ্ছে। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হচ্ছে নকশাল উল্লাসের, ফেক এনকাউন্টারে।

দেহ, দেহজ আনন্দ, মৃত্যুর ভেতর দেহ বর্জন এই দেহদর্শন বার বার মীনের মত পাক খাচ্ছে ন্যারেটিভে। মলয় একে নাটকীয় করছেন। সম্পর্কের  এক জ্যামিতিক বিন্যাস ঘনিয়ে তুলছেন। তার মধ্যে দুটি নারী শরীরের সাথে তার শৃঙ্গার-লীলাকে মহিমান্বিত করে মলয় এরোটিকা নির্মান করেছেন। সেখানে যৌন মিলনের মধ্যে একের ফেলে যাওয়া অন্তর্বাস, অপরের কাম-জাগানিয়া প্রসাধনে সাহায্য করছে। আদার ও আত্ম'র বাইনারিকে গুলিয়ে দিতে গ্লোব্যাল-লোক্যাল, শ্বেত ও বাদামীর, উচ্চবিত্ত ও নিম্নের ইন্টারসেকশনালিটির উঠোনটি প্রশস্ত হচ্ছে।

উপন্যাসে যৌথ ডায়েরিটিই এক জাদু-স্পেস। এবং সেটিই এখানে হয়ে ওঠে সিক্রেট-গার্ডেন। গোপন উদ্যান। অন্তত এরোটিকার পার্টটি যেখানে লেখা হচ্ছে। চিলেকোঠার ছাদ। যার গা দিয়ে গঙ্গা বহতা । ভারতীয় যৌথ-মনস্তত্বে সে পাপমোচী। কলুষনাশী।  কাদাখানার সফেদ্‌দারী তার কর্ম। এই 'লোকেলে' মলয় খেলে দিয়েছেন পাল্টা ছক- উত্তর উপনিবেশে, বজরাঙ্গ-দল-পুর্ব্ব উত্তর প্রদেশে। তার সফেদ্দারী এখানে এক জোরালো লাথ- যেখানে গঙ্গা, তার বহতা বায়ু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভিক্টোরীয় শুচিবায়ুতা। আর তিনি শুখরিয়া  আদা করছেন- ট্যাবু ভাঙ্গানিয়া মাদকের।

'শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি । মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে ।'

একিভাবে বহুস্বর ও কথকের  বিষয়ে লেখক মলয় উদার। এবং  বায়াসহীনও। অন্যস্বর গুলিকে স্পেস করে দেন তিনি একই ন্যারেটিভে কথা বলার। ভিন্ন পার্সপেক্টিভ রাখার। তাতে কেকা চরিত্রটি নায়ক শিশিরকে খাটো করতে চাইলেও লেখক মলয়  কেকাকে এই সুযোগ দেন। বোঝা যায় যে এ লেখকের এক আত্মবিশ্লেষন, কারণ মলয় রায়চৌধুরীর আত্মজৈবনিক উপাদান খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- শিশির মলয়ের অল্টার ইগো।

কিন্তু এরোটিকা লিখতে বসেছে শিশির। সত্তরের দশকের নিও-কামশাস্ত্র। শৃঙ্গার মালা। মাঝে ধ্যানস্থ হাইফেনের মত  নির্মলের পিতার কাল-কথনের মহাকাল বাণী- এই হল কাঠামো। তার ভেতর অতি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত নারীর আত্মনং বিধি- 'জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই , যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো ' ( কেকা উবাচ)।  অথবা বিত্তশীল দেশের অস্থির সমাজের জীবনদর্শন- " যাহা ইচ্ছা করি, যে দেশে ইচ্ছা যাই, যাহাকে ভালো লাগে তাহার সহিত শুই, খাইতে ভালোবাসি বলিয়া প্রতিটি দেশের খাদ্য খাই " ( ম্যাডেলিন উবাচ)।  

চূড়ান্ত আধুনিক ভাঙ্গা ফর্ম-চিহ্ন ও ভদ্রাসন ভেঙ্গে ফেলবার মেটাফরে বারানসী তাই চরম নির্বাচন।
লেখক এখানে লোক্যাল-গ্লোব্যাল, প্রেম-প্রেমহীন শৃঙ্গার আত্ম ও অপর  মারহাব্বা খেলে দিয়েছেন। তা সত্য এরোটিকার নির্মানের চেষ্টায়ও। দেহ এরোটিক 'আদার'কে খোঁজে। ইন্টিমেসি সেই ''আদার" কে তার অবস্থানকে গলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কথকেরা রতিক্রিয়ায় অন্যের দেহগুলিকে যত্ন করতে শেখেন। একই সাথে চলে নারীর দেহের  ভিস্যুয়াল কনসাম্পশন, স্কোপোফিলিয়া, কেকার জবানীতে এই ভ্যয়ার-কে অতিক্রম করার সুযোগ ছিল। কিন্তু লেখক পুরুষ- তার ভয়ারিজম এখানে কেকার নারী-গেজকে ছাড়িয়ে যায়। এরোটিক ট্র্যাডিশনে সাধারণত এ খেলা সমানেই চলতে থাকে।

তার পাশাপাশি  ভাষাতত্বের লুডো-বোর্ডে সাপ-লুডোর মত স্ল্যাং ও ধ্রুপদী  নামা ওঠা করছে। ছড়িয়ে পড়ছে।
ডায়রি লেখক- ধ্যানস্থ, শিশির এর ভাষা ধ্রুপদী সাধু, কেকার- লোকজ ফিচেল।  কিন্তু তার চটুলতা ম্যানিকিওর্ড ফ্ল্যাট-বাড়ি বা বহুতলের বাজার-উপন্যাস মার্কা চরিত্রের মত ভুসো-চটকা নয়।

বহুদিন আগে  তার প্রেমিক লর্ড আলফ্রেড বোসি ডগ্‌লাসকে লেখা অস্কার ওয়াইল্ডের অমূল্য কিছু চিঠি-চাপাটি পড়েছিলাম। ঝিম লাগানো  সুন্দর সেসব প্রেমালাপ।

বারানসীর সাব্‌-আর্বান, অনাধুনিক শহুরে প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসটিও ঝিম লাগানো সুন্দর। রহস্যময়ী প্রাচীন নগরী। তাতে ঘটে চলে বিষাদ আর মিলনের আনন্দ বিলাপ, ফ্যান্টাসি, গেইম। বোমা ও পিস্তলের মাঝে কয়েক  মানবিক মুহুর্ত। চলন্ত, জাগ্রত এক উৎসব। যৌনতার উৎসব। তার আয়োজন আছে। সামান্যই। কিন্তু আন্তরিক।

ম্যাডেলিন এর নিঃস্পৃহ বিষাদ, ট্রান্সন্যাশানাল দৃষ্টিপথ, শঙ্খ লেগে যাওয়া পাকে পাক। আর কেকার স্বেদ মাখা, সস্তা দামের লিপস্টিক ওষ্ঠ, অধর, সস্তার অগুরু ও  কান্তা। নিম্ন মধ্যবিত্তের ছাপা আঁচল। অদম্য বাঁচার ইচ্ছা, বেঁচে নেওয়া। শরীরকে আবিষ্কারের আনন্দ, আর টাবুর পাছায় গরম কশাঘাত। বাঙ্গলা সাহিত্যে এই অ্যাডাল্টারির বন্দনায় মনে পড়ল অ্যাডাম বেইগলি''আপডাইক' কেও।  টাইম ম্যাগাজিন কাভার স্টোরি করে বলেছিল- 'He is also credited with making suburban sex sexy'বাঙ্গালীর ধর-তক্তা ফুল-ফুল সেক্স-কাব্যকে সত্যিই পরিণত সেক্সি করে ফেলা উপন্যাসটির চলন তরতরে, ঘোরলাগা। মায়াময়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এটি মলয় রায়চৌধুরীরও প্রিয় উপন্যাস। যদিও এ বিষয়ে তার মতামত আমার  জানা হয়নি।

সত্তর একটা হাওয়া। হাওয়াটা উপন্যাসে বইছে- হাওয়ায় বারুদ গন্ধ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহ, সমাজ পাল্টানোর তীব্র জেদ আর শরীরী ট্যাবু ভাঙ্গার ঘোরলাগা, অনুপম মাদকতা। এর মধ্যে উপন্যাসে শৃঙ্গার, এরোটিকের প্রাণটিই সর্বাপেক্ষা অরূপ, মায়াময়। জীবনকে বেঁচে নেয়া। যেমনি অরূপ এই সুসফল ফলন্ত জীবন, তেমনই অরূপ তার এঁটোকাঁটাও।

"জীবনটা যে মাংসের উৎসব তা কেন মেনে নেয় না লোকে । আমার শরীরের রক্তমাংসে আমি উৎসব ঘটাব তো তাতে কার কী করার আছে ! বেঁচে থাকা ব্যাপারটা হল এই উৎসবকে সারা জীবন ধরে পালন করে যাওয়া । অবিরাম, অবিরাম, অবিরাম । মনের শান্তি এছাড়া কেমন করেই বা পাবো, কেউ বোঝাক আমাকে । জীবন তো একবারই । তাহলে নিজের জন্যে বাঁচব না কেন ? পল থেকে পল, সবসময় নতুন ; শিশির দেখিয়ে গিয়েছিল সেই পথটা, যে পথটা আমি জানতেই পারিনি শিশিরকে পাবার আগে । ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা । উন্মাদিনীরা ছাড়া ভালোবাসার কথা আর কেউ বলতে পারে না । নিজেকে ভালবাস, হ্যাঁ, নিজেকে নিজেকে, আর অমন ভালবাসার জন্যে যা ইচ্ছা হয় করো ; ভালবাসার জন্যে বেপরোয়া হতে হবে ।" ---- কেকা উবাচ

খাজুরাহোর দেশে, বাৎস্যায়নকে পুঁথি লেখার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছিলো কিনা জানা যাচ্ছেনা। তবে তার সহস্রাধিক বছর পরে এই দেশে  চুমু আন্দোলন করার প্রয়োজন হয়েছে । নেতা বলিয়াছেন- উহা ইম্পোর্টেড !! সব মিলিয়ে গোদারের 'জে. এল. জি বাই জে. এল. জি'র কথা মনে পড়ল-

“First there was Greek civilization. Then there was the Renaissance. Now we are entering the age of the Ass.”

অতএব এই  কেকা-উবাচ-  "জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই, যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো" -- ইহা এক জীবনমুখী সহজিয়া দর্শনের উল্লাস। সারা উপন্যাসে তারই  আয়োজন।

ইতিহাস, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, ক্র্যাফট ও  কৌশলের নিরিখে এটি, হতে পারে, মলয় রায়চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ ফিকশন কাজ। আপনি থাকছেন স্যার।


_____________________________________

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...