Showing posts with label Basab Ray. Show all posts
Showing posts with label Basab Ray. Show all posts

Thursday, December 5, 2019

হাংরি জেনারেশন - মলয় রায়চৌধুরীর লিগ্যাসি : বাসব রায়



১. মলয় রায়চৌধুরী আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেন মাত্র দুটো কারণে। ফিফটিজ-এ লেখালিখি শুরু করলেও তাঁর ভাষায় একেবারে রাবীন্দ্রিক ছাপ নেই। তখন যাঁরা লিখছিলেন বাংলা ভাষায়, মলয় ঠিক তার উলটোদিক থেকে লিখেছেন এবং লিখতে লিখতে নিজস্ব একটি ভাষা তৈরি করেছেন। চলমান গদ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, তাকে অস্বীকার করে লেখা সত্যিই কঠিন বিষয় ছিল, এমনকি আজও তা সমান সত্য। এখানে অজিত রায়ের ভাষার কথা বলতে হয় যে তিনি সমকালকে অতিক্রম করেছেন, অন্তত ভাষার দিক থেকে।

এবং মলয়ের নিজেকে উপুড় করে দেওয়ার ক্ষমতাকে আমি সেলাম করি। মলয় নিজেকেই যেন ছুরি দিয়ে কোপাতে থাকেন, আর তখন যে রক্তপাত হয় সেটাই তাঁর লেখালিখি। ছোটলোকের ছেলেবেলা, ডুবজলে, মেধার বাতানুকূল, নামগন্ধ যাই পড়ি না কেন, মলয় সেখানে নিজের মাংসের টুকরোই সাজিয়ে রেখেছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার যে মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী লেখক হতে আসেননি, তিনি এসেছিলেন বাঁক বদলের জন্য, যেন সেটাই তাঁর কাজ। মলয়ের সেরা লেখা কোনটা? আমি জানি না, সম্ভবত মলয়ও জানেন না। কেননা তিনি সেরা লেখা লিখতে চাননি কখনো, চেয়েছিলেন চলমান সাহিত্যের ওপর হাতুড়ির ঘা মেরে নিজের ভাষাটাকে প্রতিষ্ঠা করতে। এবং কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি সফল।

আজ অজিত রায়, এর আগে নবারুণ, যে ভাষায় লিখছেন সেটা মলয় রায়চৌধুরীরই লিগ্যাসি।

২. শুধুই লিটল ম্যাগাজিনের লেখক বলে কিছু হয় না। যে কোনো লেখকই লেখেন পাঠকরা পড়বেন বলে। লিটল ম্যাগাজিনে সিরিয়াস লেখালিখি করা যায়, অধিকাংশ বাণিজ্যিক পত্রিকা যা ছাপায় না। কিন্তু শুধুই লিটল ম্যাগাজিনে লিখবেন বলে কোনো লেখক পণ করেন না। লেখকের লেখাটাই কাজ, কোথায় ছাপা হচ্ছে সেটা দ্বিতীয় বিষয়। লিটল ম্যাগাজিন শুরু হয়েছিল বা এখনও হয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে কোনো লিটল ম্যাগাজিন নিজেই প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়। এটা চমস্কির তত্ত্ব, যে একটা মত প্রবল হতে থাকলে তার বিরুদ্ধ মত উঠে আসে। এবার দ্বিতীয় মত শক্তিশালী হলে আসে তৃতীয় মত। খেলাটা চলতেই থাকে। এবং এভাবে লিটল ম্যাগাজিনে লিখেও কখন যে লেখক প্রতিষ্ঠান বা আপনার কথায় লিটল ম্যাগাজিনেই লিখে ফেলেন, এটা বোঝা যায় না।

মলয় রায়চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আমার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই, আমি প্রতিষ্ঠান বিরোধী নই। আমার লেখাটা যদি ঠিকঠাক প্রতিষ্ঠান ছাপায় তাহলে আমার লেখা দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু ওরা তা ছাপবে না, তাই বলা যায় আমি প্রতিষ্ঠান বিরোধী নই, প্রতিষ্ঠান আমার বিরোধী।

৩. আমরা যাঁদের লেখালিখি-জীবন দেখে কবিতার জগতে এসেছিলাম, কবিতা লিখেই সমাজের ঝুঁটি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন যিনি, আমার সম্পর্কিত দাদা, ওহঃ হো, মেজোকাকার কবিতা পড়ুন। আরেকটি তথ্য আমার জন্মের দুবছর আগে কবিতা লিখে জেলে গিয়েছিলেন ওই অসভ্য, বুনো, প্রথাবিরোধী বা নতুন প্রথার জন্মদাতা....
‘মলয়দাস বাউলের দেহতত্ব’

ডোমনি, তুইই দয়াল, যখন বিদেশে যাস কেন রে আনিস কিনে সেক্সটয় ?
ভাইব্রেটর, ডিলডো, বেন-ওয়া-বল, গুহ্যের মুক্তমালা ?
ডোমনি, তুইই দয়াল,জানি কেন বিডিএসএম কবিতার বই এনেছিস,
জি-বিন্দু হিটাচির ম্যাজিকের ছড়ি ? নিপল টিপে কাঁপাবার ক্লিপ ?
ডোমনি, তুইই দয়াল, হাত-পায়ে দড়ি চোখে ঠুলি আমাকে চেয়ারে
উলঙ্গ বেঁধে রেখে দিয়েছিস, নিজের ফাঁস খুলে তলাতল রক্তের স্বাদটুকু দিলি
ডোমনি, তুইই দয়াল, শুদ্ধ প্রেমে মজল যারা কাম-রতিকে রাখলে কোথায়
চাবুক মারিস তুই, চুলের মুঠি ধরে ক্ষিরোদধারাকে চুষে বের করে নিস
ডোমনি, তুইই দয়াল, চাতক স্বভাব নাহলে অমৃতের দুধ তুই দিবিনাকো
আমার খিদে নেই, মুখের ভেতরে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ খেয়ে মজে গেছি
ডোমনি, তুইই দয়াল, যতো ইচ্ছে আনন্দ কর, দেহ নিয়ে খেল
আমি একটুও নড়ব না, আহ উহ করব না, যতো চাই ধাতুবীজ নিস
( দহগ্রাস পত্রিকায় প্রকাশিত )

৪. সমীর রায়চৌধুরী মারা গেলেন। কে তিনি? না সুনীল-শক্তি-সন্দীপন-দীপকের বন্ধু, হাংরি খ্যাত মলয় রায়চেৌধুরীর দাদা। এমন নয় যে সমীর রায়চেৌধুরী অন্যদের পরিচয়েই পরিচিত। তাঁর নিজেরও কিছু উচ্চমানের লেখা আছে। হাওয়া ৪৯ নামে দুরন্ত একটা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনাও করেছেন বেশ কিছুদিন। আনন্দবাজারীয় সাহিত্যের পাঠকরা অবশ্য সমীরকে শুধু সুনীল-শক্তির চাইবাসার বন্ধু বলেই জানেন।
এর বাইরে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন আত্মজৈবনিক লেখালিখিতে সমীরকে আবিষ্কার করা যায়। অ্যালেন গিনসবার্গের কাশী যাত্রায় সমীর সম্ভবত সঙ্গী ছিলেন কিছুদিন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে ওঠাবসা ছিল সমীরের, পরে চাইবাসায় চলে যান। জনশ্রুতি তাঁর বোনের সঙ্গেই প্রথম প্রেম শক্তির। তবে সমীর রায়চৌধুরীকে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন হাংরির নকল গ্রুপ। হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত খুব মোটা একটা বই আছে বাজারে। যার সম্পাদনা করেছেন সমীর চেৌধুরী। মজার ব্যাপার ওই বইটিতে হাংরির শেষকথা মলয় রায়চেৌধুরীর কোনো লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ তাঁর দাদাই কি না সম্পাদক! সত্যটা হচ্ছে এই সম্পাদক সমীর চৌধুরী আজ মারা যাননি, অনেক আগেই হারিয়ে গেছেন বাংলা সাহিত্য থেকে। কেননা ওই বইয়ের সম্পাদক মলয়ের দাদা নন। এটাই মজা।

ইদানীং সমীর কিছুই লিখছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন গত ষাট বছরের বাংলা লেখালিখির এক আশ্চর্য দলিল। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সব খবর রাখতেন। তাঁর চেয়ে অনেক বেশি ধারালো হয়েও মলয় রায়চৌধুরী এই জায়গায় কিছুটা পিছিয়ে আছেন (যদি তুলনা করতেই হয়), মলয় বেশ কয়েক বছর লেখালিখির বাইরে ছিলেন। সমীর রায়চেৌধুরীর মৃত্যু মানে ইতিহাসের ইতিহাসে চলে যাওয়া।
তাঁকে শ্রদ্ধা…

৫. দায়িত্ব না নিয়ে একটু হাস্যচ্ছলে বলি, হাংরি লেখকদের মধ্যে কেউ আধুনিকতাবাদীদের মতো 'ডক্টরেট' ছিলেন না, ----- সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, মনোবিজ্ঞান কোন কিছুতেই একজনও 'উলেমা' ছিলেন না ... ঠিকই, কিন্তু এঁরা সকলেই প্রচুর পড়াশোনা করতেন, মলয়-সমীর সবচেয়ে বেশি পড়েছেন। শৈলেশ্বর কাছাকাছি থাকবেন। অরুণেশ একটু পেছনে।

৬.ইদানীং, না, ইদানীং নয়, যখন হাংরি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে, মানে সবাই যখন বলতে শুরু করেছেন হাংরিরা নতুন কিছু শুরু করেছিল, ভালোই করেছিল। লক্ষ করেছি, তখনই এই শৈলেশ্বর জাতীয়রা খোপ থেকে বেরিয়ে গলাবাজি করছেন যে আমিও ছিলাম... আমিই স্রষ্টা। এরকম আরো কেউ কেউ আছেন। শৈলেশ্বর অন্য এক সমীর চৌধুরীকে দিয়ে ঢাউস বই সম্পাদনা করিয়েছেন হাংরি আন্দোলন, প্রজন্ম নিয়ে। সেখানে মলয় রায়চৌধুরীর কোনো কবিতা নেই, লেখা নেই। হতে পারে ! মলয়কে ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে একটা বাক্য লেখা সম্ভব? কিন্তু সেটাই হয়েছে। শৈলেশ্বর কয়েকটা ভালো কবিতা লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু চরিত্রে গোলমাল আছে... কিংবা এটাই হয়তো অনেকের পছন্দের চরিত্র ।

৭. “আপনারা গত ৪৭ বছরে কোন বালডা ছিড়ছেন ; রাজনীতি মেধায় লাথি মারছে…; রাজা আছে, নীতি নাই
নেতা চোদার টাইম নাই ; লাঠির ভয় দেখাবে না। লাঠি একদম ভরে দিব।”
আমার কথা নয়, বাংলাদেশে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পোস্টারের ভাষা। এবং আমার কথাটা হল যে এটাই ভাষা। এটাই সভ্য ভাষা। সমাজ বদলে যাচ্ছে, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, সংস্কার বদলে যাচ্ছে, মানসিকতা বদলে যাচ্ছে আর তাই এটাই মান্য ভাষা।

বাংলাভাষায় হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট প্রথম এরকম ভাষা ব্যবহার করেছিল, তার অপ্রত্যাশিত সমালোচনা হয়েছে, যদিও এখন অনেকেই ওই আন্দোলনের ক্ষীর খেতে চাইছেন। তো সেটা অন্য কথা, যা বলার তা হল এই যে যাঁরা বৈষ্ণব সাহিত্যের পর, বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-বিভূতি-শরতের পর, আর পড়েননি, খুব বেশি হলে সুনীল-শঙ্খ, তাঁদের বলার, আপনারা একটু মলয়-অজিত-নবারুণ-সন্দীপন পড়ুন।
এখন আর প্রেম করছি বা ভালোবাসি নয়, বলুন প্রেম পাচ্ছে। সংস্কার বদলে যাচ্ছে, চরিত্র-চরিত্রহীনতার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে... আপনারা আর ভাষার শুদ্ধতা আশা করবেন না... সংস্কারের শুদ্ধতা আশা করবেন না... জীবনকে দেখুন.. শুধু বেঁচে না থেকে জীবনকে যাপন করুন... আনন্দে থাকুন... আত্মাকে কষ্ট দেবেন না... যা মন থেকে করতে ইচ্ছে যাচ্ছে সেটাই করুন... সবাইকে কষ্ট দিন, শুধু নিজেকে কষ্ট দেবেন না... গালি দিন...প্রেম করুন... মূল কথা আনন্দে থাকুন... নির্মল থাকুন...।

৮.”একাই লড়েছিলুম; কেউ বলেনি হোক কলরব । একাই নেমেছিলুম ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে। সেদিন একাই কলকাতার পথে ঘুরেছিলুম সকাল পর্যন্ত ।” বলেছেন মলয় রায়চৌধুরী । লড়াইটা শুরু একাই করতে হয়, পরে সহযাত্রী হয় অনেকে, যেমন এখন হয়েছি, আমরা

৯. ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে বলেছিলেন, "হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করার জন্য মলয় ইচ্ছে করেই আমার আমেরিকা-বাসের সময়টা বেছে নিয়েছিল"।

১০. সাইয়েদ জামিলের কবিতা  কারো ভালো লেগেছে, কারো ভালো লাগেনি, যা স্বাভাবিক। সেই প্রসঙ্গে একটা বা দুটো কথা যা আমার বলতে ইচ্ছে করছে, তা হল, আজ, এই ২০১৮ সালে, সাহিত্যে শুদ্ধতা আর আশা না-করাই ভালো। এখন আর কেউ বলছে না ‘কুৎসা রটাচ্ছে’, বরং ‘কুৎসা করছে’ চলছে। শব্দের ব্যবহার বদলে যাচ্ছে, ভাষা বদলে যাচ্ছে ; বদলে যাচ্ছে সংকেত, প্রতীক, চিত্রকল্প। ফেসবুক করছ, গুগল করুন... এসব বেশ চলছে। বিদেশে এটা অনেক আগেই প্রতীয়মান। দু-একটি উল্লেখ মনে হয় সংগত।
America when will we end the human war?
Go fuck yourself with your atom bomb.
I don’t feel good don’t bother me.
এই কবিতা ১৯৫৭ সালে লিখেছেন অ্যালেন গিনসবার্গ।
ষাটের দশকে ‘আমায় দিয়ে করিয়ে নিল তিন বিধবা’ লিখেছেন অরুণেশ ঘোষ। এই সেদিন ‘ভুলে যাবেন না, অনেক কিছুর উপরই পেচ্ছাপ করে যেতে হবে আমাদের’ লিখলেন বন্ধু-কবি প্রবুদ্ধসুন্দর কর। আর যে কবিতা দিয়ে এই পোস্ট শেষ করব সেটা হল আরেকটা কবিতা, অংশ নয়, গোটা...
ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোরবো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তরমুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুরমার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পারছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম
কিন্তু কিছুই ভলো লাগছে না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না
একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
কবিতার আদিত্যবর্ণা মূত্রাশয়ে
এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
দিতেই হবে শুভাকে
ওঃ মলয়
কোলকাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কী কোরবো বুঝতে পারছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্থতা
যোনিকেশরে কাচের টুকরোর মতন ঘামের সুস্থতা
আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
আমি বুঝতে পারছি না কী জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণচৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোরতে হবে
শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওরফে আমি হতে পারতুম ?
আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?
ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
শুভা, ওঃ শুভা
তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়
পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা
যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
মরে যাব কিনা বুঝতে পারছি না
তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
শুভা
আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোরতে দাও
দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?
কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি ?
কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায় ?
অথচ আমার নীচে চিত আধবোজা অবস্থায়
আরামগ্রহণকারিণী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
আমি মরে যাব
ওঃ এসমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপরচুলায়
ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মারমুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি।
এই কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে, কার কবিতা এবং কবিতার নাম কী বলার জন্য কোনো পুরস্কার নেই।

১১. এখনকার কলেজ পড়ুয়াদের তো আর মলয়ের মেধা নেই ।

১২. বহু আগে আর্থার মিলার বলেছিলেন, ‘ভাষাকে যে আক্রমণ সরে সেই ভাষাকে বাঁচায়।’ এখানে আমি অজিত রায়ের নামটি উল্লেখ করতে চাই, যিনি ভাষাকে আক্রমণ করে বাংলাভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই আক্রমণের বিষয়টি অবশ্য সবাই সাদরে আমন্ত্রণ জানাবেন না। কেননা তাঁর লেখায় উল্লেখ না করলেও একটা শ্রেণির প্রতি তাচ্ছিল্য, শ্লেষ ধরা পড়ে। এবং এখান থেকেই তিনি হয়ে যান ব্রাত্য, যেভাবে একদিন মলয় রায়চৌধুরীকে কলকাতা রেখেছিল একটু দূরে। আজ তিনিই কি না বাংলাভাষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জীবিত ব্যক্তিত্ব।

.
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আত্মীয়-পরিজনের বাইরে আমি যাঁর নাম প্রথম শুনেছি, তিনি, 
মলয় রায়চৌধুরী। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ নন, মলয় রায়চৌধুরী। আমি যখন বড় হচ্ছি, ওই ১৯৬৬ 
থেকে, চারপাশে শুধু একজনের কথাই চর্চিত, তিনি, মলয় রায়চৌধুরী। ১৯৬৪ সালে মলয় 
নেমে আসছেন ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সিঁড়ি দিয়ে, একা। আর ধীরে ধীরে তিনি চর্চায় চলে আসছেন 
কলকাতা সন্নিহিত অঞ্চলের। তখন বেহালা, যেখানে আমার ছোটবেলা কেটেছে, 
কলকাতার মধ্যে ছিল না। বেহালার সাবর্ণপাড়ার দ্বাদশ মন্দিরের চাতালে কিংবা 
শখেরবাজার মোড়ের আড্ডায় শুধুই মলয়। 
তো আমি মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে বড় হয়েছি বললে সম্ভবত অত্যুক্তি হয় না। 
ইস্কুলে যাই, সেখানে শিক্ষকরা আলোচনা করেন মলয়কে নিয়ে ; ঘরে ফিরি, দাদা-কাকারা 
আলোচনা করেন মলয়কে নিয়ে ; একটু সন্ধ্যায় পাড়ার কালভার্টেও 
আলোচনার একটাই বিষয় - মলয়। 
মলয়-বাসুদেব-ফাল্গুনী-শৈলেশ্বর-সুবো-সুবিমল-দেবী-অবনী-প্রদীপ প্রমুখ তখন 
আমাদের ঘরের ছেলে। তাঁদের লেখা যেখান থেকে হোক সংগ্রহ করে পড়ছেন বয়োজ্যেষ্ঠরা। 
এই আবহে আমি বড় হয়েছি। আর তাই মূলধারার সাহিত্যের প্রতি কখনো আগ্রহ বোধ করিনি। 
১৪-১৫ বছরের মধ্যেই আমি পড়ে নিয়েছি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ বা ‘চর্মরোগ’। 
এবং সেখান থেকেই এই প্রতীতী সম্ভবত জন্মে যায় যে সাহিত্য বলতে এসবই, 
বাস্তবতা-জীবন-অন্ত্যজ-প্রান্তিক স্বর ছাড়া সাহিত্য হয় না। 
এর বেশ কিছু পড়ে যখন আনন্দবাজারীয় লেখালিখি পড়তে গেছি, হাসি পেয়েছে। 
বাজারি আনন্দের প্রকাশিত সাহিত্য ওই সুখী মধ্যবিত্তের জন্য। সেখানে একটা কৃত্রিম ভাষা,
 নাটকীয় কিছু শব্দের সমাহার। সেখানে জীবন, অন্তত আমি, কখনো খুঁজে পাইনি। 
অথচ শিক্ষিত বাঙালি ওইসব পড়েই নিজেকে এলেমদার, পণ্ডিত মনে করেছে, করে। 
আর ঠিক এখানেই মলয় ধাক্কা মারেন। বাংলা গদ্যের রীতি ঠিক কী হবে তা সম্ভবত 
ঠিক হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, যে লিখলে ওই জোব্বা পরা বুড়োর 
মতোই লিখতে হবে। এবং এরপর যাঁরা লিখতে এসেছেন, যেমন 
শরৎ-তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-শরদিন্দু থেকে হালের সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশরা, 
কেউ ওই গদ্যের বাইরে যেতে পারেননি। বিষয় যাঁর যেমনই হোক, গদ্যের রীতি 
বা ভাষার আঙ্গিক ও প্রকরণ সেই রাবিন্দ্রিক। এবং বাজার বা বাংলা সাহিত্যের 
কলকাত্তাইয়া প্রতিষ্ঠান এই গদ্যকেই প্রমোট করেছে। পাঠকও খুশি থেকেছেন এই গদ্য পড়ে। 
এর বাইরে না লেখক না পাঠক কেউই ভাবতে পারেননি। 
মলয় রায়চৌধুরী ঠিক এই জায়গাটাকেই ধাক্কা দিয়েছিলেন। তাঁর বহুচর্চিত কবিতা 
‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ থেকে হালের ‘ছোটলোকের ছেলেবেলা’ লেখাতেও ওই ধাক্কা স্পষ্ট। 
লেখালিখিতে বাস্তবতা-জীবন যেমন মলয় রায়চৌধুরী প্রথম বাংলা সাহিত্যে এনেছেন, 
ঠিক তেমনই গদ্যের ভাঙচুর তাঁর লেখাতেই আমরা প্রথম দেখতে পেয়েছি। আর এজন্যই 
প্রতিষ্ঠান তাঁকে ব্রাত্য করে রেখেছিল, হয়তো-বা এখনও করেই রেখেছে। 
মলয়ের প্রথম প্রকাশিত বই সম্ভবত ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’। সেখানে মলয় কী লিখেছেন 
তা এখানে আলোচ্য নয়। বলার কথা হল, মলয় হাফ লিটারেট সাহিত্যিক নন, পড়াশোনা 
করেই লিখতে এসেছিলেন। আর সেজন্য মলয়ের লেখালিখি যতটা না আবেগের তার চেয়ে 
অনেক বেশি মেধাজারিত। কোনো এক সাক্ষাৎকারে মলয় জানিয়েছেন যে বৈদ্যুতিক ছুতার 
লিখতে লেগেছিল তিন মাস। কেন? না, প্রতিটি শব্দ অনেক চিন্তা করে বসাতে হয়েছে। 
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম
এই লাইন মলয়কে লিখতে হয়েছে, বাংলাভাষাকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য। 
আর কে না জানে ‘ভাষাকে যে আক্রমণ করে সে-ই ভাষাকে বাঁচায়।’ 
মিথ্যে না বলতে কী, রক্তরস কমে যাওয়া বাংলাভাষাকে ওই মলয় রায়চৌধুরীই 
প্রথম আক্রমণ করেন। তাঁর সেই শক্তি ছিল বলেই প্রতিষ্ঠান তাঁকে উঠোনে প্রবেশের 
অনুমতি দেয়নি। বরং মলয়দের শক্তি পাঠক-সহ-প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে নিতে পারে 
ভেবেই তাঁরা সম্মিলিত আক্রমণের সামনে পড়েন। যার ফলশ্রুতি কিছু বই নিষিদ্ধ, 
মামলা, মলয় দোষী সাব্যস্ত এবং তারপর ১৯৬৭ সালে মামলায় জয়। 
এর ফলে মলয়ের কী হয়েছে সে বিচার অন্যরা করবেন, বাংলাভাষার যে বিপুল 
ক্ষতি হয়ে গেল তা অনস্বীকার্য। কেননা মলয় তো বটেই, ইদানীং 
অজিত রায়-রবীন্দ্র গুহ-রণবীর পুরকায়স্থরা তুলে আনছেন যে নিচুতলার সংস্কৃতি, 
জীবনযাপনের শৈলী, আচার-আচরণ, ক্রোধ-আনন্দ, প্রেম-ভালোবাসা... 
অসম্ভব দরকারি ছিল বাংলা সাহিত্যে। এগুলো বাদ দিয়ে সাহিত্য যেন একেবারে ম্যাড়ম্যাড়ে। 
মলয় রায়চৌধুরী প্রথম এই ভাবনা এনেছিলেন বাংলা সাহিত্যে। কী? না, নিজেকে সাংস্কৃতিক 
জারজ ঘোষণা করে সরাসরি বলেছিলেন, অন্ত্যজ-প্রান্তিক স্বর উঠে আসা উচিত সাহিত্যে। 
এবং তা হবে সরাসরি। সেখানে কোনো ফাঁকি থাকবে না। আর তাই, মলয় রায়চৌধুরীর, 
ঠিক এই জায়গায় কাল্ট ফিগারের সম্মান প্রাপ্য।
মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, ভবিষ্যতেও লিখবেন, মলয় হলেন বাংলা 
সাহিত্যের জায়মান কিংবদন্তি, যাঁকে আনগ্ন শুষে নিলেও শেষ হয় না। 
কবি-প্রাবন্ধিক-উপন্যাসকার যেভাবেই তাঁকে অভিহিত করা হোক না কেন, 
কোনোটাই মলয় সম্পর্কে শেষ কথা নয়। 
আর তাই একটা লেখায় সমগ্র মলয় রায়চৌধুরীকে ধরা আমি তো আমি, 
শিবের বাপেরও অসাধ্য কাজ! আর তাই আমি অন্য দু-একটি কথা বলি। 
মলয়ের উদ্যোগে হাংরি আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সকলে 
একে অচ্ছু্ৎ ঘোষণা করেছিলেন। আজ হাংরি আন্দোলনকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম
 প্রভাবশালী আন্দোলনের মর্যাদা পাচ্ছে। আর তাই বিখ্যাতরা যেভাবেই হোক হাংরির 
ঝোল নিজের কোলে টানতে ব্যস্ত। 
শৈলেশ্বর ঘোষ হাংরি-মামলার পর মুচলেকা দিয়েছিলেন, সবাই জানেন। 
পরে তিনিই হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে কলার তুলে হাঁটতে শুরু করেন, আমি দেখেছি। 
আপাত-ঋষি শঙ্খ ঘোষ এমনভাবে এতদিন লেখালিখি করেছেন যে হাংরি শব্দটাই 
শোনেননি বা শুনলে তাঁর হার্টফেল হবে। তো তিনি সম্প্রতি একটি হাংরি সংকলনে
 নিজের কবিতা রেখে যার-পর-নেই আহ্লাদিত। সৌজন্য শৈলেশ্বর ঘোষ। 
সাহিত্যিক-সততায় মলয় রায়চৌধুরীর পক্ষে আদালতে কথা বলে অনেকটা আলো 
পেয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তো তিনিই আমাকে রেকর্ডেড ইন্টারভিউতে বললেন 
২০০৬ সালে যে
 ‘হাংরি আন্দোলনের জন্য মলয় ঠিক আমার আমেরিকা-বাসের সময়টাই বেছে নিয়েছিল।’ 
তো তাতে কী হল? সুনীল, ‘আমি থাকলে ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই 
আমার হাতে থাকত।’ এখান থেকে বোঝা যায়, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যেভাবেই 
হোক নাম জড়ানোর কী আকুল প্রচেষ্টা সুনীলের! ছো...
আর এই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ই কৃত্তিবাস-এ মলয়ের কবিতা ছাপাননি। 
সাহিত্যিক সততা আর কাকে বলে!
যে কোনো আন্দোলনের একটা প্রকরণ আছে। আছে একটা স্ফুলিঙ্গ। 
আন্দোলনকে যত দমিয়ে রাখা হয় ততই আন্দোলনের অন্তঃশক্তি বাড়ে। 
আর সেটা হাংরি মুভমেন্টের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। আজও যখন কেউ 
‘ছোটলোক’-এর সংস্কৃতি তুলে আনেন কবিতায়-গদ্যে, আমরা বলি বাঃ 
তুই তো হাংরিদের মতো লিখছিস। 
এবং সত্তরের অরুণেশ, আটের অজিত রায়, নয়ের রাজা সরকার, 
শূন্য দশকের বিকাশ সরকার, প্রথম দশকের তিস্তা রায়, কিংবা বেশ 
আগের রবীন্দ্র গুহ, নবারুণ ভট্টাচার্য (যদিও কৃত্রিম ভাষা), দেবীপ্রসাদ সিংহ, 
সমরজিৎ সিংহ (গদ্য), আফসার আহমেদ, দুলাল ঘোষ, অলোক গোস্বামী, এমনকি 
স্বপ্নময় চক্রবর্তীও ; হালের কান্তারভূষণ নন্দী, মৃণাল দেবনাথ, ধীরাজ চক্রবর্তীরাও 
জেনে বা না-জেনে সেই হাংরিদের লিগ্যাসি হয়ে উঠেছেন। এঁরা ভেঙে ফেলেছেন 
মূলধারার বাংলা সাহিত্যের যাবতীয় ফর্ম, তাঁদের লেখায় উঠে আসছে অন্ত্যজ জীবনযাপন, 
প্রেম-ক্রোধ-দুঃখ-আনন্দের কথা। এখানেই মলয় রায়চৌধুরী অমর হয়ে যান।

Saturday, November 10, 2018

উত্তম দাশ : মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন


         প্রচণ্ড অবিশ্বাস, ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান এই ত্রিবিধ নৈরাজ্যে ষাট দশকের শুরুতে আত্মার একটা ছটফটানি মলয় রায়চৌধুরী যখন সবে টের পাচ্ছেন তখন তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র । জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াবার বয়েস । নিজেকে চিনে নেবার, অস্তিত্বের স্বরূপ আবিষ্কারের সময় । ততদিনে চিনে নেবার অবকাশ হয়েছে স্বদেশকে, সমাজ তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো খুলে ধরেছে সামনে । স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে চোদ্দ বছর আগে । দেশবিভাগ, শেকড়হীন মানুষের বিলিব্যবস্হা, দেশপপেম ততদিনে মুনাফা তুলছে । পরিবারের গঠন পালটাচ্ছে ; শহর গ্রাম ব্যবধান বাড়ছে, নীতিবোধ ভাঙছে, বিশ্বাসের তলানি এ পপজন্ম চেখে দেখার ফুরসৎ পায়নি । বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধ রাজনৈতিক মুনাফার জন্য মাত্র প্রয়োজন, ত্রিশ-চল্লিশের কবিতা গতানুগতিক হচ্ছে নির্জীব কবিদের হাতে । পঞ্চাশ সবে জাগছে । নিজস্ব ভূমি আবিষ্কার হয়নি ।
        বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে মলয়ের পরিচয় তখনও নিবিড় নয় । এই সময়ে হঠাৎ ইংরেজ কবি চসারের In the sowre hungry tyme পঙক্তিটি গিরে ধরল তাঁকে । একান থেকে তুলে নিলেন হাংরি শব্দটি । অসওয়াল্ড স্পেংলারের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বিষয়ক কনসেপ্টে খুঁজে পেলেন হাংরি শব্দের দার্শনিক ভিত্তি । এই সময়ের প্রতিক্রিয়া দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জানালেন তিনি । শক্তিও তখন পাটনায় । উৎসাহ দিলেন । [ মলয় ইংরেজিতে কবিতার একটি ইশতাহার প্রকাশ করলেন ১৯৬১ সালের নভেম্বরে Hungry Generation নামে ; সেই ইশতাহার ১৯৬২ সালে আরও দুবার পরিমার্জিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল । বাংলা ইশতাহার প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ইশতাহারের পরে । ] ১৯৬২ সালের এপ্রিলে বাংলা ইশতাহারটি প্রকাশ করলেন মলয় ‘হাংগরি জেনারেশন’ । স্রষ্টা : মলয় রায়চৌধুরী, ; নেতৃত্ব : শক্তি চট্টোপাধ্যায় ; সম্পাদনা : দেবী রায় । ততদিনে অবশ্য দলবল বেড়েছে । কিন্তু হাংরি জেনারেশনের প্রথম বাংলা বুলেটিনটি গুরুত্বপূর্ণ । পরবর্তী সময়ে যাঁরা হাংরি আন্দোলনের সরিক হয়েছিলেন, ধরে নিতে হবে এই বুলেটিনের বয়ানে তাঁদের সায় ছিল । অন্তত তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন এই আন্দোলনকে । মলয়ের লেখা বুলেটিনের সঙ্গে মৌল কোনো বিরোধ তাঁদের আদর্শগত কারণে ছিল না ; থাকলে একদল তরুণ নিশ্চয় এভাবে সংগঠিত হতে পারতেন না । আমি ভুলি না যে একটা আন্দোলন যৌথ চিন্তার ফসল । পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনে এই যৌথ চিন্তার রূপ দেখবো । কিন্তু প্রাথমিক স্তরে একজন তাত্বিকের আনুগত্ব মেনে নেওয়াই সঙ্গত । তাত্বিক মলয় প্রথম বুলেটিনে লিখেছেন :-

         “কবিতা এখন জীবনের বৈপরীত্যে আত্মস্হ । সে আর জীবনের সামঞ্জস্যকারক নয়, অতিপ্রজ অন্ধ বল্মীক নয়, নিরলস যুক্তিগ্রন্হন নয় । এখন, এই সময়ে, অনিবার্য গভীরতার সন্তৃস্তদৃক ক্ষুধায় মানবিক প্রয়োজন এমনভাবে আবির্ভূত যে, জীবনের কোনো অর্থ বের করার প্রয়োজন শেষ । এখন প্রয়োজন অনর্থ বের করা, প্রয়োজন মেরু বিপর্যয়, প্রয়োজন নৈরাত্মসিদ্ধি । প্রাগুক্ত ক্ষুধা কেবল পৃথিবীবিরোধিতার নয়, তা মানবিক, দৈহিক এবং শারীরিক । এ ক্ষুধার একমাত্র লালনকর্তা কবিতা, কারণ কবিতা ব্যতীত আর কী আছে জীবনে ! মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে । কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয় ।
         কবিতা থাকা সত্বেও, অসহ্য মানবজীবনের সমস্ত প্রকার অসম্বদ্ধতা । অন্তরজগতের নিষ্কুন্ঠ বিদ্রোহে, অন্তরাত্মার নিদারুণ বিরক্তিতে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রচিত হয় কবিতা --- উঃ, তবু মানবজীবন কেন এমন নিষ্প্রভ ! হয়তো, কবিতা এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে যারা অভ্যস্ত, তাদের অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব এই সংকটের নিয়ন্ত্রক ।
         কবিতা বলে যাকে আমরা মনে করি, জীবনের থেকে মোহমুক্তির প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণের ফলাফল তা কেবল নয় । ফর্মের খাঁচায় বিশ্বপ্রকৃতির ফাঁদ পেতে রাখাকে আর কবিতা বলা হয় না । এমন কি, প্রত্যাখ্যাত পৃথিবী থেকে পরিত্রাণের পথরূপেও কবিতার ব্যবহার এখন হাস্যকর । ইচ্ছে করে, সচেতনতায়, সম্পূর্ণরূপে আরণ্যকতার বর্বরতার মধ্যে মুক্ত কাব্যিক প্রজ্ঞার নিষ্ঠুরতার দাবির কাছে আত্মসমর্পণই কবিতা । সমস্ত প্রকার নিষিদ্ধতার মধ্যে তাই পাওয়া যাবে অন্তর্জগতের গুপ্তধন । কেবল, কেবল কবিতা থাকবে আত্মায় ।
         ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন । টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে । এখন কবিতা রচিত হয় অর্গাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে । যেহেতু ত্রশ্নু বলাৎকারের পরমুহূর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে ‘সচতনভাবে বিহ্বল’ হলেই এখন কবিতা লেখা সম্ভব । শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত । শখ করে, ভেবে ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু কবিতা রচনা তেমন করে কোনো দিনই সম্ভব নয়। অর্থবঞ্জনাঘন হোক অথবা ধ্বনিপারম্পর্যে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি না থাকলে, কবিতা সতীত মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতো অনুন্মেষিনী হয়ে যেতে পারে ।”

         হাংরি জেনারেশনের বিরুদ্ধে প্রচলিত যে অভিযোগ যৌনতা এবং জান্তব ক্ষুধা ও জৈবতার, তার ইঙ্গিতমাত্র নেই মলয়ের ইশতাহারে । যদিও জীবনের সামগ্রিক ক্ষুধাকে তিনি বলেছেন -- ‘মানসিক, দৈহিক এবং শারীরিক।’ তবু তাঁর বিশ্লেষণ যেখানে এসে থেমেছে সেখানে এ ক্ষুধা আত্মিক । অন্তরাত্মা ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির সামর্থ্যে কবিতা আসলে বস্তুগত জীবন ও আত্মিক জীবনের মেলবন্ধন । কবিতা যেখানে জীবনের একমাত্র আশ্রয় সেখানে কবিতা ও জীবন একার্থক অথচ জীবনের সংকট কবিতা ও জীবনকে ভিন্নভাবে দেখা। কবিতা-বানিয়েদের মলয় দেখেছেন ক্ষমাহীন, কবিতা তাঁর কাছে অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, সুতরাং ‘সচেতনভাবে বিহ্বল’ হলেই কবিতা সৃষ্টি সম্ভব । অরগ্যাজম বলতে যে জৈববৃত্তি বোঝায় তা কখনই উদ্দীপনাহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত নয় । বৈজ্ঞানিক সত্যে উপমাটি ব্যর্থ । এখানে আমাদের মেনে নিতে হবে কবিতার স্বতঃস্ফূর্তি মলয়ের ধারণামতো । অনেকটা রোমান্টিক কবিদের স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অফ পাওয়ারফুল ফিলিংস, অবশ্যই রোমান্টিকদের মতো আবেগে আত্মসমর্পণ নয়, কল্পজগৎ তৈরি নয়, সচেতন বিহ্বল অবস্হাই মলয়ের ধারণায় কবিতা সৃষ্টির শর্ত, ‘অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি’ না থাকলে তাকে মলয় কবিতা বলতে রাজি হননি । নিঃসন্দেহে অভিনব । বশেষত বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তি । কিন্তু এই অভিনব মতবাদ থেকেই হাংরি আন্দোলন শুরু ।
         এতদিনে হাংরি-সংগঠন শক্তি সঞ্চয় করেছে, একে-একে জড়ো হয়েছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, সুবো আচার্য, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবিমল বসাক,বাসুদেব দাশগুপ্ত, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ফালগুনী রায়, অরণি বসু, শম্ভু রক্ষিত, ত্রিদিব মিত্র, তপন দাস, মিহির পাল প্রমুখ । তালিকায় প্রথম তিনজন পঞ্চাশের, বাকিরা সময়ের দিক থেকে ষাট দশকের অর্থাৎ শক্তিকে নিয়ে হাংরি গোষ্ঠীভূক্ত হয়েছেন পঞ্চাশের চারজন কবি । কিন্তু প্রশ্ন, পঞ্চাশের এই চার কবির ষাটের অনুজ কবিদের সঙ্গে নতুন আন্দোলনে শরিক হবার প্রয়োজন হল কেন ? এই সময়ে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘কৃত্তিবাস’ বেরিয়েছে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়র্কশপ প্রোগ্রামে আমেরিকায় । ‘কৃত্তিবাস’-এর পপকাশনা নিয়ে চিন্তিত অথচ শরৎ-এর ওপরে আস্হা রেকেই তাঁকে চলতে হচ্ছে । ‘স্বপ্ন সংকলন’-এর পরিকল্পনা তাঁর মাথায় । অথচ গুছিয়ে উঠছে না কিছুই । লেখক নির্বাচনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে বন্ধুদের সঙ্গে । শরৎ-এর সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পেয়ে সুনীল আমেরিকা থেকে যে চিঠি সমীরকে লিখেছিলেন তাতে ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীতে যে ভাঙন ধরেছে তারই ইঙ্গিত । এই সময়ে আরো একটি ঘটনা -- তন্ময় দত্তের কবিতার খাতা চুরি । সুনীল বলেছেন, জীবনানন্দের পর সবচেয়ে সক্তিমান কবি তন্ময় । অভিমানে তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দেন ।
         বন্ধুদের মধ্যে এমনি নানা অসন্তোষ এবং ‘কৃত্তিবাস’-এর সম্ভাবনায় সন্দিহান হয়ে নতুন কিছু করার প্রবণতায় মলয়ের দাদা সমীরকে কেন্দ্র করে সন্দীপন উৎপল যোগ দিলেন হাংরি আন্দোলনে । শক্তি আগেই যুক্ত । তুলনায় প্রতিষ্ঠিত এই চার লেখকের সমর্থন পেয়ে হাংরি আন্দোলনে জোর এলো । আগেই বলেছি ইতিমধ্যে অনেক তরুণ সংঘবদ্ধ এই আন্দোলন ঘিরে । নানা চিন্তার ছাপ আসছে । আন্দোলন সম্পর্কে নানাজন নিজের মতো ফতোয়া দিচ্ছেন । মলয়ের চিন্তায় যে নির্দিষ্টতা ছিল,নানা চিন্তার চাপে ছড়িয়ে পড়ায় আন্দোলনকে স্পষ্ট রূপরেখায় বেঁধে দিতে হাংরি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নির্ণায়ক নিয়মবিধির একটি ইশতাহার রচিত হলো । লিখলেন মলয় :-
  1. The merciless exposure of the self in its entirety .
  2. To present in all nakedness all aspects of the self and thing before it.
  3. To  catch a glimpse of the exploded self at a particular moment.
  4. To challenge every value with a view to accepting or rejecting the same.
  5. To consider everything at the start to be nothing but a ‘thing’ with a view to testing whether it is living or lifeless.
  6. Not to take reality as it is but to examine it in all its aspects.
  7. To seek to find out a mode of communication, by abolishing the accepted modes of Prose and Poetry which would instantly establish a communication between the poet and his reader.
  8. To use the same words in poetry as are used in ordinary conversation.
  9. To reveal the sound of the word, used in ordinary conversation, more sharply in the poem.
  10. To break loose the traditional association of words and to coin unconventional and here-to-fore unaccepted combination of words.
  11. To reject traditional forms of poetry and allow poetry to take its original forms.
  12. To admit without qualification that poetry is the ultimate religion of man.
  13. To transmit dynamically the message of the restless existence and the sense of disgust in a razor sharp language.
  14. Personal ultimatum.

         এই চৌদ্দটি সূত্রের মূল লুকিয়ে আছে কি লিখব আর কি ভাবে লিখব এই তত্বের ওপর । সম্পূর্ণ অহং-এর ক্ষমাহীন প্রকাশ, বিশেষ মুহূর্তে বিস্ফারিত আত্মার আভাস সম্পূর্ণ নিজস্ব শব্দবন্ধে ও প্রকাশ রীতিতে । ঐতিহ্য অস্বীকার, পপচলিত রীতি প্রত্যাহার, এবং তার প্রকাশ প্রাত্যহিক ভাষায়, কিন্তু কামড় বসাবে তীক্ষ্ণ । অস্হির অস্তিত্বের যন্ত্রণা ও চরম বিতৃষ্ণা লোক-প্রচলিত মূল্যবোধকে ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠিত করবে কবিতাকে । ধর্মে কিছু পাওয়ার নেই । সমাজে প্রত্যাখ্যাত, রাজনীতি বন্ধ্যা --- একমাত্র আশ্রয় কবিতা । সমস্ত ভাঙচুরের মধ্যে দাঁড়িয়ে জীবনের অর্থকে ফলবানের চিন্তা নিঃসন্দেহে শিল্পীর ।
         ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অস্বীকার, প্রচলিত ধারার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কবিতার নতুন চেহারা আবিষ্কার প্রকৃতই সাহসী ও মৌলিক । নতুন কবিতার জন্য নতুন সূত্র অনুস্ধানও স্বাভাবিক । কিন্তু তত্ব নির্ভর করে কিংবা ইশতাহার মেনে কবিতা লেখা, দলবদ্ধভাবে সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন জাগতে পারে । ইশতেহারের সূত্রগুলো দলবদ্ধ সকলের ভেতর থেকে উঠে আসা কিনা সে প্রশ্নও উঠতে পারে । যদি ধরে নেওয়া যায় ইশতাহারের সূত্র ধরেই হাংরি আন্দোলনের সংঘবদ্ধতা তা হলে মেনে নিতে হয় এ আন্দোলনের জোর ছিল । জোর যে ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেল দ্রুত । তবে সে সংবাদ সমর্থনের নয়, বিরুদ্ধতার । লেখালিখির জন্য যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি এঁদের জীবনযাত্রা এবং শিল্প-অসম্পর্কিত ক্রিয়াকলাপ একটা টেনশনের আবহাওয়া তৈরি করল ।
         এ সবই হয়তো জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা থেকে উপজাত । চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান উভয়তই, ফলে এই বিকার । নাকি শুধু স্টান্ট ! শুধু স্টান্ট হলে মূল আন্দোলনই অর্থহীন । মনে হয় না শুধু স্টান্টের পেছনে এতগুলি তাজা ছেলে জুটেছিল । নিজেদের ধ্বংসের পথই কি নির্মাণ করেছিল হাংরি ছেলেরা ? এবং একই সঙ্গে এঁদের ধ্বংসের চক্রান্ত গড়ে উঠেছিল এদেশে, বিভিন্ন সংবাদপত্রের বিরুদ্ধবাদী সংবাদে এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়ায় । এই সময়ে মলয়কে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চিঠি খুবই জরুরি। চিঠিতে কোনো তারিখ নেই । পোস্টের স্হান আমেরিকার আইওয়া সিটি, তারিখ ১০ জুন ১৯৬৪ । উত্তরপাড়ায় ১৯৬৪ সালের জুনের ১৬ তারিখে । মলয়, সুনীলের বন্ধু সমীরের ভাই, তাঁর স্নেহভাজন ও প্রিয়জন । কিন্তু হাংরির অসামাজিক ও শিল্পসম্পর্কহীন ক্রিয়াকলাপে ক্ষুব্ধ সুনীল তাঁর মনোভাব স্পষ্ট বলেছেন । নিশ্চিতই সুনীলের কলকাতার বন্ধুরা তাঁর ক্ষোভের ইন্ধন যুগিয়েছিলেন । কিন্তু সুনীল এ-চিঠিতে মলয়ের কবিতাকেই সরাসরি অগ্রাহ্য করেছেন । যদিও কিছুদিন আগে সমীরকে লেখা চিঠিতে ‘কৃত্তিবাস’ থেকেই মলয়ের বই প্রকাশের অভীপ্সার কথা আমরা জানি । সুনীল লিখেছিলেন : ‘মলয়ের বই তো ওকে কৃত্তিবাস থেকেই বার করতে বলেছি, সাহিত্য প্রকাশক কোনো দরকার নেই ।
         ‘কৃত্তিবাস’ থেকে মলয়ের বই প্রকাশের ইচ্ছা কি শুধু বন্ধুকৃত্যের জন্য, বন্ধুর ভাইয়ের প্রতি স্নেহের টানই তার কারণ ? নাকি কবি হাসাবেই মলয়ের যোগ্যতা তখনও অবধি স্বীকৃত ছিল তাঁর । কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে এই ধরণের বদল তবে কি বন্ধুদের উসকানির ফল ? সুনীলের কাছে কবিতার আন্দোলনের চেয়ে ভালো কবিতা লেখা জরুরি । এতে আপত্তির কারণ নেই । এ তাঁর নিজস্ব ধারণা । কিন্তু হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার কথা বললেন কেন ? ঈর্ষা নয় । কারণ এঁদের লেখার জৌলস তিনি স্বীকার করেননি, লেখার জগতে এঁদের তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীও মনে করেননি । তবে কি হাংরির লেখকরা তাঁকে নানাভাবে উত্যক্ত করেছিল বলেই এই উত্তেজনা ? কিন্তু এতখানি উত্তেজনা কি সম্ভব, একেবারে হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার মতো । নাকি শক্তি, সন্দীপন ও উৎপলের কৃত্তিবাসগোষ্ঠী ত্যাগ ও হাংরি আন্দোলনে যোগ কৃত্তিবাসী বন্ধুদের প্রতিশোধস্পৃহ করে তুলেছিল ? এঁদেরই কেউ কি সুনীলের উত্তেজনার কারণ সরবরাহকারী ?
         হাংরি আন্দোলন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে । সুনীলের চিঠিতে যা ছিল আভাস, এদেশে তা তখন নাড়া দেওয়া সংবাদ ।  ১৯৬৪-এর ১৭ জুলাই ‘যুগান্তর’ দৈনিকে সংবাদ বেরুচ্ছে ‘সাহিত্যে বিটলেমী’ এই শিরোনামে । এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের দিক থেকে নঙর্থক । কিন্তু অনেক সত্য এখানে লুকিয়ে আছে । প্রচলিত ধারণা, পুলিশী গ্রেফতার এবং মামলা হাংরি আন্দোলনকে রাতারাতি খ্যাতি দিয়েছে । কিন্তু এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশী ব্যবস্হা গ্রহণের দুমাস আগের । অথচ দেখছি সংবাদেই প্রকাশিত হয়েছে হাংরি আন্দোলন ও এর লেখকরা ইতিমধ্যে বিদেশে আলোচিত । সাংবাদিক জানাননি, এদেশে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে এঁদের শেকড় ততদিনে অনেকদূর নেমে গেছে । হিন্দী তরুণ লেখকদের একটা অংশ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এই আন্দোলনে । পুলিশ এঁদের ওপর ন্জর রাখছে, রাখছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল দুমাসের মধ্যেই । পুলিশ নজর রেখেছিল কেন ? কিছু তরুণ লেখকের প্রথাবিরোধী লেখার জন্য ? শাসকগোষ্ঠী এবং সবরকম কতৃত্বকে অস্বীকার ও আক্রমণ করার জন্য ? বন্ধ্যা রাজনীতি , প্রচলিত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণায় তীব্র ছটফটানি পুলিশি আইনে অপরাধমূলক ছিল কি ? নাকি কেউ পুলিশকে এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন ? এসব কূট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের । ধীরে ধীরে তথ্য যাচাই করে ।
         এখন পর্যন্ত ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর সংবাদ জানাচ্ছে এঁদের জীনযাত্রা ও লেখা বদ্ধ-বাঙালি জীবনে নাড়া দিতে শুরু করেছে । সংবাদের যোগ্য করে তুলেছেন এঁরা নিজেদের ।কী অন্তর্দৃষ্টিতে এঁরা দেখতে পেয়েছিলেন রাজনৈতিক পাণ্ডাদের । যাঁদের স্হান হবে ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের মাঝামাঝি কোথাও’ । শুধু রাজনীতি নয়, সমস্ত ভারতবর্ষের অন্ধকার অনেক আগে থেকে আঁচ করার অপরাধ করে ফেলেছিলেন এঁরা। এবং সে শুধু সর্বস্ব পণ করে শিল্প করতে গিয়ে । দৈনিক যুগান্তরের সংবাদে  হাংরি আন্দোলনের ক্রিয়াকাণ্ডের উপরিতলের চেহারাটাই ফুটে উঠেছে, ভেতরের চেহারা কিছু পরিমাণে ধরার চেষ্টা দেখা যায় দুদিন পরের ‘আর মিছিলের শহর নয়’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে । প্রয়োজনীয় অংশ এরকম : ‘’বাংলাদেশে দলাদলিতে দীর্ণ বিশ্বাসহীন রাজনীতি আজ নিজের মস্তক চর্বণ করিতে ব্যস্ত । এই আবহাওয়ার জন্যই কি সমাজে এক ধরণের নিরাশাবাদ জন্ম লাভ করিতেছে, যার চেহারা ড্রেন-পাইপ মস্তানি, যার আওয়াজ রাস্তার রোমিওদের শিস, এবং সাহিত্যের ‘ক্ষুৎকাতরতার’ মধ্যে ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাইতেছে ? কাজেই ইহা আশ্চর্য নয়, এই সব বিকৃতির উপাসকরা, যারা ‘হাংরি জেনারেশন’ নাম ধারণ করিয়াছে, তারা পরম শ্রদ্ধাহীন অবজ্ঞায় ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের কোথাও’ রাজনীতিকদের স্‌আন নির্দেশ করিতে চাহিতেছে । কলিকাতার ক্ষুধার্ত ছেলেরা এই ধিক্কার দিতেছে এবং আত্মধিক্কারের মধ্যে বন্দী হইতেছে ; ইহা কি বন্ধ্যা রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত অথবা অসুস্হ সমাজের অভিশাপ?”
         সম্পাদকীয় স্তম্ভের লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, উত্তর দেননি । দিলে বলতে হতো ‘বন্ধ্যা-রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত ও অসুস্হ সমাজের অভিশাপ’ এই ক্ষুধার্ত ছেলেদের টেনে নিয়ে এসেছে শেষ আশ্রয়স্হল কবিতায় । তবে ভিন্নরূপের কবিতা নিশ্চয়ই, আমাদের সংস্কারের বাইরের কবিতা, ইরিটেটিভ কিন্তু নিজেকে চেনার জন্য অব্যর্থ । অন্তত হাংরি লেখকদের দৃষ্টিকোণ থেকে । হাংরি আন্দোলন সংবাদে ও সম্পাদকীয়তে এনেছে যে নঙর্থক প্রতিক্রিয়া, সে প্রতিক্রিয়ার টেনশন থেকে কলকাতার পুলিশ ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরের গোড়ায় হাংরি লেখকদের বিরুদ্ধে অ্যাকশানে নামলো । এ এস আই কালীকিঙ্কর দাসের অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতার জোড়াবাগান থানার এস আই এস এন পাল এই দিনেই এফ আই আর করলেন ।
         একই দিনের অভিযোগ ও এফ আই আর ( সেকশান ১২০ বি এবং ২৯২ আইপিসি ) --- কলকাতা পুলিশের সুনাম খুব অর্থবহ । হাংরি জেনারেশনের অভিযুক্ত বুলেটিনে যাঁদের লেখা ছিল সবাইকে অভিযুক্ত করা হলো । অর্থাৎ ঢাকি ঢুলি সব । কালীকিঙ্কর দাস জানিয়েছিলেন ‘ক্রেডিবল ইনফরমেশান’ থেকে হাংরি জেনারেশনের প্রচারের কথা জানতে পারেন । পুলিশ শাখার ইনফরমাররা যেভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকে তাতে কলকাতা পুলিশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের পক্ষে হাংরি ক্রিয়াকাণ্ডের খোঁজ পাওয়া খুবই সবাভাবিক ঘটনা । কিন্তু পুলিশ হঠাৎ হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে এত তৎপর হলো কেন ? কিন্তু কত ছিল হাংরি বুলেটিনের প্রচার সংখ্যা ? কজন পাঠক পয়সা খরচ করে ও পত্রিকা কিনত ? অর্থাৎ যে সময়ে কলকাতার বই-স্টল আলো করে পর্ণগ্রাফি বিক্রি হতো, সেসময়ে কতজন পাঠক রেস্ত খরচ করে  অশ্লীল লেখা জেনে হাংরি জেনারেশন বুলেটিন সংগ্রহ করত ? সুকুমারমতি বালক-বালিকাদের বিপথগামী হবার কতখানি সম্ভাবনা ছিল ও পত্রিকা পড়ে ? মূলত কবিতার মগজ এবং যে পপকাশভঙ্গীতে লেখা সে যুগে কবিতা পাঠকদের ক্ষেত্রেও তা ছিল প্রায় অসহনীয় । তা হলে “টু করাপ্ট দি মাইন্ড অফ দি কমন রিডার’ একথা আসছে কি করে ? সাধারণ পাঠকের সংজ্ঞা কি ?
         তবু তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক পুলিশ তার দৃষ্টিকোন থেকে হাংরির লেখাকে নৈতিকভাবে অশ্লীল মনে করেছে । আমার সংশয়ী মন এখানে অন্য ইন্ধন খুঁজে ফিরছে হয়তো । অভোযোগ দায়ের ও মামলা চালানোর সময়ে পুলিশের মনোভাব পরিবর্তন হয়নি ধরা যেতে পারে । কারণ যে অভিযোগ পুলিশ তুলবে তাকে তথ্য প্রমাণে আদালতে পপতিষ্ঠা করবে, এটাই স্বাভাবিক । আমি এখানে একটা চিঠির উল্লেখ রাখতে চাই।  কিছু পরবর্তীকালের । কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক । ১৯৬৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ‘ইনডিয়ান কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম’-এর এগজিকিউটিভ সেক্রেটারি মিস্টার এ. বি. শাহ মলয়কে এই চিঠিতে লিখেছেন :
“I met the Deputy Commissioner of Police the other day after we met at the Office of the Radical Humanist in Calcutta. I was told that they would not have liked to bother themselves with the ‘hungry Generation’ but for the fact that a number of citizens to whom the writings of your group were made available, insisted on some action being taken.”
        তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের দক্ষতা বা সক্রিয়তা নয়, কিছু নাগরিকের চাপাচাপিতেই পুলিশ হাংরিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে অগ্রসর হয় । প্রশ্ন, এই নীতিবাদী নাগরিকরা কারা ? কেন তারা হাংরিদের বিরুদ্ধে পুলিশকে সক্রিয় করলেন ? পুলিশ হাংরি জেনারেশনের এগারোজনকে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল ছয়জনকে । অথচ মামলা দায়ের করল একজনের বিরুদ্ধে । স্টেট বনাম মলয় রায়চৌধুরী । কিন্তু মলয় যে অভোযোগে অভিযুক্ত, অন্যদের তা থাকে নিষ্কৃতি পাবার কথা নয় । আসলে পেছনে আরও কিছু ঘটনা ঘটে গিয়েছে, এর মধ্যে হাংরি লেখকরা অনেকেই জবানবন্দি দিয়ে বসে আছেন পুলিশের কাছে । মধ্যবিত্ত বাঙালির নিরাপত্তাবোধ উসকে দিয়েছিল তাঁদের অস্তিত্ব । শিল্পের জন্য কারাবরণের চেয়ে হাংরি আন্দোলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা অনেক জরুরি ছিল সেসময়ে । আসলে সে সময়ে হাংরির নেতৃত্ব ও সংগঠন মলয়ের হাতে । সম্পাদক প্রকাশক হিসাবে যাঁর নামই থাক, মলয়ই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক । অবশ্যই বন্ধুরা জানতেন, কিন্তু থানা-পুলিশের ভয়ে ওঞ্চাশের লেখকদের মতই সুভাষ বা শৈলেশ্বর কেউ হাংরি জেনারেশনের কোনো দায়িত্ব নিতে চাননি । সবাই সম্পর্ক ত্যাগের কথাই বলেছেন । ব্যতিক্রম প্রদীপ চৌধুরী ।
         অ্যালেন গিন্সবার্গ আবু সয়ীদ আইয়ুবকে হাংরি লেখকদের সাহায্য করার আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন, সেই আবু সয়ীদ মলয় এবং তাঁর সঙ্গীদের লেখক বলে মেনে নিতে পারেননি । এবং লেখার জন্য কেউ এদেশে পুলিশীপীড়ন ভোগ করেছে বলেও তাঁর জানা নেই বলেছেন । অ্যালেন গিন্সবার্গকে ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪ যখন আবু সয়ীদ চিঠিতে এসব লিখেছেন, তখন কিন্তু কলকাতা পুলিশ হাংরি লেককদের বিরুদ্ধে মামলা সাজাচ্ছে । আবু সয়ীদের চিঠিটি এইরকম :-

পার্ল রোড, কলকাতা,
৩১ অক্টোবর ১৯৬৪
প্রিয় শ্রীগিন্সবার্গ
         আপনার ১৩ তারিখের উদ্দেশ্যহীন অবমাননাকর চিঠি পেয়ে আমি বিস্মিত । আপনি যে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমকে কমিউনিস্টদের দ্বারা চিহ্ণিত একটি জোচ্চোর বুলশিট উদারনৈতিক আঁতেলদে কমিউনিস্টবিরোধী সিনডিকেট বলে মনে করেন, তাতে আমি অবাক হইনি ; কেননা আমি কখনও কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামকে আপনার লেবেল 'বুর্জোয়া' কিংবা 'শ্রদ্ধেয়' থেকে মুক্ত করার কথা ভাবিনি ।
         যদি কোনো পরিচিত ভারতীয় সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবি তাদের সাহিত্যিক বা বৌদ্ধিক কাজের জন্য পুলিশের অবদমনের শিকার হতো , আমি নিশ্চিত যে ভারতীয় কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম আপনার অপমানজনক ওসকানি ছাড়াই হস্তক্ষেপ করতো ।  আমি আপনাকে জানিয়ে আনন্দিত যে তেমন কোনো কিছুই সাম্প্রতিককালে এদেশে ঘটেনি । মলয় রায়চৌধুরী ও তাঁর হাংরি জেনারেশনের তরুণ বন্ধুরা, আমার জ্ঞানমতে তেমন কোনো রচনা লিখে উঠতে পারেনি, যদিও তারা আত্মপ্রচার করে লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করেছে  এবং গণ্যমান্য লোকেদের চিঠি নোংরা ও অশ্লীল ভাষায় প্রকাশ করেছে ( আমি আশা করি আপনি স্বীকার করবেন যে 'ফাক' শব্দটি অশ্লীল এবং 'বাস্টার্ড' শব্দটি নোংরা, অন্তত এই বাক্যটিতে, "গাঙশালিক স্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো", তারা এর চেয়েও খারাপ   ভাষায় কবিদের নাম উল্লেখ করে লিখতে ইতস্তত করেনি )। সম্প্রতি তারা একজন মহিলাকে ভাড়া করে তার উন্মুক্ত বুক দেখাবার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল এবং সেই আশ্চর্যজনক আভাঁগার্দ প্রদর্শনী দেখার জন্য অনেকের সঙ্গে আমাকেও আহ্বান করেছিল । আপনি পৃথিবীর ওই পারে বসে কলকাতায় এই ধরণের বয়ঃসন্ধিকালীন ইয়ার্কিকে প্রচার করায় আপনার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বলে চালাতে পারেন । আশা করি আমার যা দায়িত্ব তা পালন করার জন্য আপনি আমাকে আপনার মতের সঙ্গে পার্থক্য সমর্থন করবেন ।
         পুলিশের পক্ষে নিশ্চয়ই বোকামি হয়েছে এই যুবকদের গড়া ফাঁদে পড়ে তাদের কয়েকজনকে কয়েক দিনের জন্য হেফাজতে নেয়া ( তাদের সবাইকে এখন ছেড়ে দেয়া হয়েছে ) আর তার দ্বারা তাদের প্রচারে সুবিধা করে দেয়া এবং জনসাধারণের সহানুভূতি সংগ্রহ করা -- তারা তাদের ইয়ার্কির মাধ্যমে নিজেদের প্রচারই চাইছিল ।
         আপনার মতের সঙ্গে আমার এ-ব্যাপারে মিল নেই যে ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের প্রধান কাজ হলো মার্কিন বিটনিক কবিদের কাঁচা অনুকরণকারীদের সাহায্য করা । ইউরোপীয় সাহিত্য সম্পর্কে আপনার জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি কিন্তু আমার ভাষার সাহিত্যকদের মূল্যায়ন করার ক্ষমতাকে আপনার নির্দেশে খর্ব করতে পারি না -- যে ভাষা সম্পর্কে আপনি নিজের অজ্ঞতা বেছে নিয়েছেন ।
         আপনার সঙ্গে গূঢ় পার্থক্য সত্ত্বেও এবং আপনার কয়েকটি অসাধারণ কবিতাকে ভালোলাগা সত্ত্বেও আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই ।
                                                                   ভবদীয়
                                                              আবু সয়ীদ আইয়ুব

         শৈলেশ্বর ও সুভাষের জবানবন্দিতে সাহসের অভাব ছিল । যে আত্মিক অসহায়বোধ তাঁদের হাংরি আন্দোলনে প্রাণিত করেছে, গ্রেফতার ও মামলার মুখোমুখি তাই তাঁদের বৈষয়িক অসহায়বোধে দাঁড় করিয়েছে । সুযোগ খুঁজেছেন নিস্তারের । এমনকি হাংরির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের মুচলেকার বিনিময়েও কাঙ্খিত ছিল মুক্তি । এসব কার্যকলাপ ও মনোভাব দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে মলয়ের । সামাজিক সব মূল্যবোধকে যাঁরা অবিশ্বাস করে এগিয়েছিলেন, যা কিছু প্রচলিত তাকেই সন্দেহ করা, শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও  এ অবিশ্বাস মাথা চাড়া দিয়েছিল । শৈলেশ্বরের জবানবন্দি পরবর্তী সময়ে মলয়ের ক্ষোভ ও ঘৃণার কারণ ।
         ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় অশ্লীলতার দোষারোপে আলিপুর ব্যাঙ্কশাল কোর্টের নয় নম্বর কোর্টে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট শ্রী এ কে মিত্র মলয়ের দোশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিলেন সঙ্গে অভিযুক্ত রচনাগুলোর বিনষ্টির আদেশ । কলকাতা হাইকোর্টে অবশ্য এ-মামলা টেকেনি । বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন মলয় । কিন্তু অনেক টেনশন ও অর্থ খরচের পর । শুধু কি তাই ? বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটে গেল হাংরি লেখকদের সঙ্গে ।
-----------------------
ঋণস্বীকার : মহাদিগন্ত

হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে

  হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...