Showing posts with label Postmodernism. Show all posts
Showing posts with label Postmodernism. Show all posts
Monday, January 6, 2020
Saturday, March 30, 2019
সমীর রায়চৌধুরীর গালগল্পের দ্রব্যগুণ : জপমালা ঘোষরায়
সমীর রায়চৌধুরীর গালগল্পের দ্রব্যগুণ
------------------------------------------------------
জপমালা ঘোষরায়
# কলকাতার আদিপুরুষ সাবর্ণ চৌধুরীর বংশধর সমীর রায়চৌধুরী নামক বিস্ময়পুরুষের সাহিত্যকর্মের প্রতি আগ্রহ লালন করেছিলাম একেবারেই কলজছাত্রীবেলা থেকে। আমার বাবা, ৫০ এর দশকের রবীন্দ্র অনুসারী কবি। তাঁর কাছে শুনেছিলাম সমীর রায়চৌধুরী হাংরী সাহিত্য আন্দোলনের পুরোধা এবং অনেক পরে, ৯০ এর দশকে এসে জানলাম তিনি বাংলা পোস্টমডার্ন সাহিত্য আন্দোলনেরও পথিকৃৎ। তখন পড়ার সুযোগ বলতে কালে ভদ্রে কলেজস্ট্রিট গিয়ে কিছু বই সংগ্রহ করা। তাও মেইন স্ট্রিমের লেখকদের বই পাওয়া গেলেও ওঁর মতো প্রতিষ্ঠান বিরোধী কোনো লেখকের বই তেমন পাওয়া যেত না। কাজেই বুভুক্ষা থেকেই গেছিল। পরে যে আর পাঁচজন সাহিত্যসেবকের মতো আমিও তাঁর সরাসরি স্নেহ সান্নিধ্য লাভ করবো এই চমৎকারের কথা কখনো চিন্তাও করিনি। বন্ধু কবি ও প্রাবন্ধিক মৌলিনাথ বিশ্বাসের সাহায্যে এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ /ছ বছরে এসে। বলা যায় আমিই বোধ হয় শেষতম সেবক যাঁরা তাঁর নিবিড় সান্নিধ্যে এসেছেন। তাঁর অজস্র গল্প প্রবন্ধ এবং কবিতা পড়ার সুযোগ যত পেয়েছি, যত তাঁর বহুমুখী প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের ঝর্ণাধারায় অবগাহন করেছি, ততই খুলে গেছে সিমসিম। পরে সম্পাদক মৌলিনাথ আমার মত দীন কলমজীবীকে দিয়ে সমীরের জীবিতাবস্থায় তাঁর গল্পের আলোচনা লিখিয়ে নিয়েছিলেন "কালকথা" পত্রিকায়। কোনো জীবিত কিংবদন্তীকে নিয়ে লিখতে গেলে ভয়টা থাকেই সুতরাং পড়াশুনোয় কোনো ফাঁকি চলে না। সমীরের অনেক লেখালিখির মধ্যে "খুল যা সিমসিম" গল্পগ্রন্থ এবং "অপূর্বময়ী স্মৃতি বিদ্যালয়" কাব্যগ্রন্থ দুটি মাত্র মনোযোগ দিয়ে পড়লেই আন্দাজ করা যাবে সমীর রায়চৌধুরী নামক সমুদ্রের ব্যাপ্তি ও গভীরতা। সবচেয়ে বড় ছিল তাঁর কথা বলার অসামান্য ভঙ্গী, কখনো ব্যাপ্তি থেকে শিকড়ের দিকে আসছেন পরক্ষণেই শিকড়কে রেখে দিয়ে ঘাসবিন্যসে চলে যাচ্ছেন ব্যাপ্তির দিকে। এই বিপ্রতীপ ধরতাই থেকেই সমীর রায়চৌধুরীর লেখনবিশ্বকে জানতে হবে। সমীরের জন্ম ১লা নভেম্বর ১৯৩৩ পানিহাটিতে, পরবর্তী সময় কাটিয়েছেন বিহারের পাটনা শহরে, অর্থাৎ দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান তাঁর মননকে বায়নারি থটপ্রসেসের মধ্যে লালন করেছে, যুক্তির ফাটল বা লজিকাল ক্র্যাক থেকে চিন্তার বিস্তারে সাহায্য করেছে। ফলত তাঁর গল্প একটা মাল্টি অ্যাঙ্গুলার ভঙ্গিমা পেয়ে গেছে এবং ভঙ্গিমা বাঙালীর আড্ডাখানার শুরু শেষ হীন চিরকেলে গালগল্পের মতো। এ প্রসঙ্গে বলি সমীরের গল্প সম্পর্কে "গালগল্প" শব্দটি ব্যবহার করেছেন তাঁর ভাই, বিখ্যাত সাহিত্যিক "হাংরিপুরুষ" মলয় রায়চৌধুরী।
# একসময় মনে করা হত ছোটগল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল তাৎপর্যে পৌঁছানো এবং তারজন্য চাই শক্তপোক্ত ঘটনা, স্থান কাল অনুযায়ী চরিত্র। কিন্তু এখন যেহেতু জীবন রিমোট কন্ট্রোলে বদলে বদলে যাওয়া চ্যানেল, হাজারো অ্যাপ এ ডাউনলোড করে ফেলা চমৎকার, তাই এখনকার গল্প অন্যরকম। এখন গল্পে নানারকম টুকরোটুকরো উদঘাটন বীজের মতো ছড়িয়ে যায়। জীবনের পাজলগুলো কুড়াতে কুড়াতে "আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে"। সমীরের গল্পে সমীর এভাবেই খোঁজেন সেল্ফ আইডেন্টিটি। খোলাখুলি বলতে কি, সমীরের লেখালিখিতে, তাঁর বোধের পুঁজিতে, গঠনকাঠামোয় কোথাও প্রাতিষ্ঠানিকতার ছোঁয়া মাত্র নেই। আছে কালখন্ডের ক্ষয়, নিরন্তর শূন্যতা, গ্লানি ও হতাশার বিরুদ্ধে দ্রোহ। কিন্তু এই দ্রোহের উচ্চারণ উচ্চকিত, মানে ফাটিয়ে দেওয়া বলতে যা বোঝায় তা নয়, এই দ্রোহ প্রত্যয়ী উচ্চারণে মজা শ্লেষ কৌতুকের রীতিতে ভাষাশব্দ ও লেখনবিশ্ব নির্মাণের। সরাসরি বলাই ভালো, সৎসাহিত্যের গুহামুখ খুলে দিয়েছে সমীর রায়চৌধুরীর গল্পবিশ্ব।
# সমীরের গল্পে অন্ধকার ততটা অন্ধকার নয়, শূন্যতা ততটা শূন্যতা নয়। শূন্যদশকে লেখা তাঁর একটি সাড়া জাগানো গল্প "মেথিশাকের গন্ধ" শুরুর আগে তিনি কোনো প্লট ভাবেন নি। তিনি ভাবেনও না। একটা বিষয়হীনতা দিয়েই শুরু করেছেন। কলকাতার নর্দার্ন পার্ক, ব্রহ্মপুরের বাড়িতে হঠাৎ লোডশেডিং এবং নিশ্চিদ্র অন্ধকার বাড়ি। তিথিগত আঁধারে আকাশের আলোটুকুও নেই। বসার ঘর থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত আপাত অদৃশ্য অথচ ঘ্রাণ আছে এমন এক "সামথিং"কে ইডিকেট করে তাঁর থটপ্রসেস বহুস্তরীয় অন্ধকারকে বহু কৌণিকতায় বিশ্লেষণ করতে করতে জীবনধর্মের মুক্তমুখে এগিয়ে যাচ্ছে।"একজায়গায় গিয়ে নিশ্চয়ই মেথিশাকের গন্ধের সঙ্গে শেফালির উপস্থিতির জৈব গন্ধ মিশবেই" এটাই জীবনমুুুুখীতা। একথা চিন্তা করতে করতে অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই গল্পকার এগোচ্ছেন, যেখানে মেথিশাক রান্না করতে করতে হঠাৎ ঘটে যাওয়া অন্ধকারে শেফালির হাত থেকে একটি কাঁচের শিশি পড়ে ভেঙে চুড়মার হয়ে যাচ্ছে এবং শেফালি অন্ধকার ভেদ করে চেঁচিয়ে সাবধান করে দিচ্ছে "এদিকে এসো না"। অর্থাৎ অন্ধকারে একজনের অভ্যস্ত যাপনেও ভাঙচুর আসছে। আবার নিমেষেই ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল দৃশ্যমান যা কিছু। সমস্ত "সামথিং" তখন "নাথিং" হয়ে গেল। এখান থেকেই উঠে আসছে একটা জাদু বাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়্যালিজম, অন্ধকারের বহুস্তর। একস্তরে শৈশবে মায়ের শেখানো সাবধানবাণীতে জুজুবুড়ি আর খোক্কস ভয়, আবার রাঙাদিদুর গপ্পে সেই খোক্কসজয়ের নির্দেশনা, এটা একটা স্তর। তার পরই রাঙা দিদুর মৃত্যুর পর মা যখন বললেন দিদু অন্ধকারের দেশে চলে গেছে, এবং সমীরের মনে হল কত প্রিয়জন সেই অন্ধকারের দেশে চলে গেল "সেই প্রথম অন্ধকারের মধ্যে প্রিয়জনের বাসা তৈরি হল" এটাও একটা স্তর। এভাবেই অন্ধকার হাতড়াতে হাতড়াতে মনে হল মা এবং ছোড়দির কথা যাঁরা মেথিশাক ভালোবাসতেন। "অন্ধকারের কত অলিগলি, অন্ধকারের মধ্যে একধরণের ফাটল"। এই প্রসঙ্গে এই অদৃশ্যের মধ্যেও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে শিল্পী অমিতাভ ধরের ছবি। ম্যাজিকাল রিয়্যালিটি। দুদিন আগে অন্ধকারে চলে যাওয়া শিল্পী বাঁধন দাসের থিওরি মনে আসছে "বাঁধনের কথা আজ খুব বেশী করে মনে পড়ছে। মাত্র দুদিন হল সে মারা গেছে।.......বাঁধন বলত অন্ধকারের স্থানিকতা। স্পেস যেভাবে সম্পর্ক গড়ে"। মেথিশাকটা আসলে এই গল্পে কোন বিষয়ই নয়। মেথিশাকের গন্ধকে কেন্দ্রকরে ভেদের শনাক্তকরণ থেকে অভেদের দিকে যাত্রা। এভাবেই বহুস্তর ভেদ করতে করতে শেষে এসে বললেন ডাইনিং টেবিলের কাছে একফালি শীতরোদ্দুর যেমন খুব চেনা এবং এবাড়ির নিজস্ব সম্পদ, তেমনি অন্ধকারটুকুও চেনা জানা, এবাড়ির নিজস্ব, যার সঙ্গ নিতে কোনো অসুবিধে নেই। সে হল "কালো রঙের কাজ"। প্রি-মডার্নের মতো আলোর বিপরীত অন্ধকার তো নয়ই, পাস্ট-মর্ডান বা আধুনিকোত্তরের মতো আলোর পরিপূরকও না। এখানে দুটোই সহজ এবং সমান (আলো= অন্ধকার)। এভাবেই যেখানে ছেড়ে দিলেন সেখানে অন্ধকার আনবাউন্ড, এন্ডলেস এবং আলোর চেয়েও আলোকিত হয়ে উঠল। এটাই সমীরের গল্পহীন গল্পের অভিনবত্ব এটাই পোস্টমডার্ন।
# সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের নামকরণগুলিও অন্যরকম, যেমন, বহুজাতিক ভূতের গল্পের খসড়া, শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বচন, স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা ওমলেট অবধি, ছাতা হারানোর বর্ষাকালীন দুকখু, কবিরাজ চাঁদচুড়ামণি শ্রীব্রজেশচন্দ্র কথিত দ্রব্যগুণ, একমিনিট বিয়াল্লিশ সেকেন্ড ওসামা বিন লাদেনের ক্যাম্পে ইত্যাদি। বোঝা যাচ্ছে নামকরণের ক্ষেত্রেও তিনি অপ্রাতিষ্ঠানিক। সমীরের গল্পকে গালগল্প বলার কারণ হল তিনি কোনো প্লট ভেবে নিয়ে গল্প লিখতে বসেন না। কোনো কাল্পনিক চরিত্রও থাকে না। তিনি নিজে একজন ব্যক্তি এবং ব্যক্তি সমীরের জীবনের অভিজ্ঞতার সূতোগুলোকে টেনে টেনে এনে জুড়ে দেন গল্পের মধ্যে। প্রসঙ্গক্রমে অনেক বাস্তব চরিত্র এসে যায়। কিন্তু তারা এমন ভাবে আসে যে তাদের কোনো কৈফিয়ত ও থাকে না। বা কৈফিয়তি দায়টাও সমীরের থাকে না। যেমন শুভাপ্রসন্ন, বাঁধন দাস, অমিতাভ ধর, কালীকৃষ্ণ, শ্যামল মজুমদার প্রমুখ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি যথাযথ ভাবেই তাঁর গল্পে আছে। আবার খুল যা সিমসিম গল্পের চাবিওয়ালা আসগর আসলে চাবিওয়ালা আসগরই। অন্য কেউ না। কিন্তু তার উপস্থিতি, ক্রিয়াকর্ম ইত্যাদি নিয়ে চরিত্রটিকে এমন অদ্ভুত ম্যাজিক্যালি রিয়্যাল করে তুললেন যে সে একটা গল্প হয়ে উঠল। প্লট বিহীন গল্প।
# "বহুজাতিক ভূতের গল্পের খসড়া" একটি খসড়া মাত্র নয়, বিশ্বায়নের হাজারো বাস্তব মজার মধ্যে একটি ম্যাজিক রিয়ালিস্টিক মজা। সমীরের লেখায় এই ঐতিহাসিক ধরতাইটাই অ্যাবসলিউট সত্য। জীবনের কত দ্বন্দ্ব সংঘাত দুর্যোগ, কত জ্যোৎস্না মেঘ কুয়াশা, অন্ধকারের ফাটল দিয়ে তিনি সব ম্যাজিকের মত দেখতে পান এবং সেভাবেই দেখান পাঠক বা শ্রোতাকে। কোনো পাব্লিশার প্লিজ আহত হবেন না! আঘাত দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। বইপাড়ার ব্যবসা নিয়ে সমীরের যা মনে হয়েছে আমি তার বিশ্লেষক মাত্র। এখানে কার্তিক নামের লোকটি বইপাড়ার পেশাদার ভৌতিক গল্প লিখিয়ে। বোধোদয় নামক দোকান অথবা সংস্থা থেকে তার জন্য রেডিমিক্স প্যাকেটে ভূতের গল্প লেখার অর্ডার এসেছে। ছবিছাবা সহ থিম দেওয়া আছে সেই অনুযায়ী গল্পের প্লট ভাবতে হবে। বাজারে কী ধরণের ভূতের গল্পের কাটতি আছে সেই অনুযায়ী অর্ডার। ছোটোদের ভূতের গল্প কার্তিক অনেক লিখেছে কিন্তু এবার তাকে লিখতে হবে বড়দের ভূতের গল্প, তাও আবার কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডকে সামনে রেখে বিষয় নির্বাচন করা হয়েছে মাল্টিন্যাশনাল বা বহুজাতিক ভূতের গল্প। সমীর কোনো চরিত্রকে কখনো আঘাত করেন না বরং একটা সহজ আনন্দময়তায় ছড়িয়ে দেন। কিন্তু মুশকিলটা হল কার্তিকের ভূতের গল্পের খসড়া আর জমে না কিছুতেই। হাজার চেষ্টা করেও সে বহুজাতিক ভূতকে নামাতে পারেনা। " বোধোদয় বলে এমন তো হওয়ার কথা নয়। নামকরা ব্র্যান্ডনেম। সবচেয়ে বেশী কাটছে। প্রশ্ন করে আবছায়া ছিল? -- হ্যাঁ, আর পোড়োবাড়ি? -- সেও ছিল। নিশাচর চলাফেরা? -- ছিল বৈকি, ছাতা হারানোর বর্ষাকালীন দুঃখু? --- তাও তো ছিল..... তাহলে অসুবিধা টা কোথায়?.... কার্তিক বুঝতে পারে না শেষ পর্যন্ত সেল্ফমেডের প্যাকেট নিয়ে বাড়ি ফেরে.... কেবলই অনুমেয়র দিকে তাকিয়ে আরও আরও... ভূতভাবনের বহুব্রীহি।.... একদিন পেয়ে যাবে। ধরা ছোঁয়ায় আসবে মনের মতো ভূত..." এভাবেই একটা ফ্যান্টাসি, এক আনন্দময় জগতের চলা ফেরার কথা। একটা সমস্যার কথা বলা হল কিন্তু কোনোরকম ক্যাওস ছাড়া, তছনছ ছাড়াই একটা ম্যাজিক রিয়ালিজমের মোড়কে।
# কালখণ্ডের চমৎকার কৌতুক হল বুদ্ধিজীবীদের বাজারায়ন তথা বিশ্বপুঁজিবাদ। একথা বোধহয় আধিপত্যবাদীরা বুঝে ওঠার আগেই বুঝে ফেলেছিলেন কতিপয় গোত্রচিহ্নহারা দ্রোহপুরুষ, তার মধ্যে সমীর রায়চৌধুরী অন্যতম। "শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বচন" গল্পে এই বাজারায়ন আর ভোগবাদের সম্পন্নতা ও বিপন্নতা দুই ই চিহ্নিত করেছেন ডবল ডুয়ালিটিতে। তাবড় তাবড় দেশীয় বণিকদের মদতে চমকদার সাবান, তেল, কেশকালা, মাজন এসব তৈরী করছে।এই সব সামগ্রীর দ্রব্যগুণ বিচারের জন্য কোথাও কোনো বাণিজ্যসংস্থা দশ বিলিয়ন খরচা করছে বিজ্ঞাপন বাবদ। এদের সমবেত আক্রমনের ফলে আমজনতা বিভ্রান্ত হচ্ছে। বিগবাজারে তারা বলিপ্রদত্ত হয়েও বুঝতে পারছে না যে ভোগবাদ আসলে একটি রোগ। ধর্মের টোপ গেলানো হিন্দু মাঙ্গলিক বচন "ওঁ হ্রীং শ্রী ওঁ লক্ষ্মীবাসুদেবায় নমঃ"। পিনাকী বলে ক্রেতাকে বিব্রত না করে বাজার দখল করতে হবে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে অনেক কবি লেখক ডকু ফিল্মমেকার সবাইকে টপকে অ্যাসাইনমেন্টটা পায় নায়ক সুব্রত। অফিস থেকে ৩০ হাজার টাকা ধার নিয়ে নিয়ে পুরীতে হোটেলে এসে ওঠে।সে খায় দায় আর লক্ষ্য করে কে কেমনভাবে টুথপেস্ট ব্যবহার করে। মুখশ্রীতে কেমন মহিমা খেলা করে। ব্রাশের ডিজাইন দেখে, টিউবের প্যাকিং। ফেনা গল্প স্বাদ মেজাজ ব্রাশের আকার ছন্দ।গাদা টুথপেস্ট নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে সে পেয়ে যায় বাজারায়ণের সূত্র। "স্রেফ টুথপেস্টের টিউবের মুখটা এক মিলিমিটার বাড়িয়ে দিতে হবে। গোপন থাকবে এই কৌশল। দাম মাত্র দুটাকা কমিয়ে একটা ঝুটো মিতব্যয়িতার গিমিক ধরে রাখতে হবে বাজারে। অথবা শুরুতে কোনো ফ্রি গিফট বা এক্সট্রা কুড়ি পার্সেন্টের ভড়ং। মনোযোগের কেন্দ্র সরিয়ে দিতে হবে। তাহলেই ফোর্টি পারসেন্ট অতিরিক্ত টুথপেস্ট ড্রেনআউট হয়ে যাবে। কেননা টিউবের মুখের ডায়ামিটার আগের চেয়ে এক মিলিমিটার বেড়ে গেছে।" অদ্ভুত রসময়তায় পণ্যের পৃথিবীর অসাড়তাকে তুলে ধরা হল এই গল্পে।
# " স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা ওমলেট অবধি" নামক গল্পেও যথারীতি কোনো আদ্যপ্রান্ত গল্প নেই। বর্তমান পণ্যতাড়িত সুপার ফাস্ট জীবনে প্রতুল তার মৃত মায়ের জন্য কষ্ট পেয়েও তাঁকে স্মরণ করার সময় নেই। ছবিটাও সে দেয়ালে টাঙায় নি তার পিছনের যুক্তিটা হল। ঘুরতে বেরোতে মায়ের ছবিটা তাকে আক্রান্ত করবে। মনখারাপ করলে তার কাজের গতি রুদ্ধ হবে। অথচ সে চায় মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী খুব জাঁকজমকপূর্ণ করে পালন করতে। তার ধারণা এভাবেই মাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি তার মধ্যে আর সময় পাবে না বলে আজ সে তন্নতন্ন করে মায়ের ছবি খুঁজছে। সারাবাড়ি আলমারি আনাচ কানাচ কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। খুঁজতে খুঁজতে সে অনেক দৈনন্দিন কাজ ভুলে যাচ্ছে কিন্তু মিমি, তার কয়েকমাসের সন্তান, তার শিশুখাদ্য আনতে ভুলছে না। এটাকে সমীর বলছেন "স্মৃতির হুলিয়া" হুলিয়া শব্দটি একটি মিশ্র সংস্কৃতির অপশব্দ, যা মেকিতাকে ইন্ডিকেট করে। প্রতুল অশোকের বাড়ি যেতে ভুলে যাচ্ছে, অশোক তার বাড়ি এলে সে মায়ের ছবি খুঁজতে খুঁজতেই অশোকের সঙ্গে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির অ্যাডভান্টেজ ডিস অ্যাডভান্টেজ নিয়ে আলাপ আলোচনা করছে সেখানে স্মৃতির মূল্য কতটুকু? এর মধ্যেই অনিমা জানাচ্ছে তার একসপ্তাহ আগে পেঁয়াজের বাক্সে ডিম রেখে ভুলে যাওয়া। প্রতুল বলে ওটাকে ওমলেট করে দিতে। অনিমা বলে মায়ের ছবি দুপুরে খুঁজবে আপাতত ওমলেট দিয়ে চা খাওয়া হোক। এভাবেই গল্পটির শেষহীন শেষ। এখানে ডিম শুধুমাত্র খাদ্যবস্তু থাকলো না, দ্বিতীয় ডায়মেন্সনে ডিম সৃষ্টি ও পরম্পরার দ্যোতক হয়ে উঠলো, কেননা ডিম থেকে দ্বিতীয় প্রজন্ম, যেমন প্রতুলের মায়ের থেকে প্রতুল, তার এবং অনিমার মিলন থেকে তাদের কন্যা সন্তান মিমির জন্ম। লেখক ককর্কশতাহীন সাংকেতিকতার মধ্যে দিয়ে দেখালেন আমাদের পণ্যায়িত জীবনের অসাড়তা।
# "কবিরাজ চাঁদ চুড়ামণি শ্রীব্রজেশচন্দ্র কথিত দ্রব্যগুণ " "আলজাজিরা" "একমিনিট বিয়াল্লিশ সেকেন্ড ওসামাবিন লাদেনের ক্যাম্পে" প্রভৃতি গল্পে দেখতে পাই কীভাবে বাংলা গল্পের ভাষাপ্রয়োগ শব্দের স্থানিকতা ও অর্থবোধকতা পাল্টে পাল্টে যেতে পারে। আলোচক কৌশিক চক্রবর্তীর ভাষায় তা হয়ে উঠতে পারে "রুবিক পৃথিবীর মাল্টিক্রোম হাতছানি"। "এই গল্পগুলিতে তিনি আতঙ্ক ও ভয়কে রিলেট করতে পারেন চমস্কি কথিত সাবভার্ট টেরারিজমের সঙ্গে। যেভাবে আমেরিকার জনগণের মধ্যে ওসামা নামক জুজুর ভয় দেখিয়ে আফগান যুদ্ধকে নৈতিক করে তোলাহয়, তার পিছনে রয়েছে আসলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। মানুষের আই ওয়াশ করা হয়, মানুষ আসলটা ধরতে পারে না। এই সূত্রটিকে তুলে ধরতে গিয়ে সমীর লিখলেন বিদেশী লাইব্রেরী তে প্রবেশ করতে গিয়ে সিকিউরিটি চেক উপলক্ষে একর ধরণের কাল্পনিক ভয়ের বাতাবরণ। এ প্রসঙ্গে এসেছে এয়ারপোর্ট এ অত্যধিক কড়াকড়ি আর হেনস্থার শিকার হয়েছে ভারত আফগানিস্থানের সাধারণ মানুষ, এমন কি ভারতে জেট ক্যাটাগরির সিকিউরিটি পাওয়া নেতা রাহুল গান্ধীর কথাও। যে ভয় কারণ বিহীন অথচ যে ভয় মিথ্যাকে সত্য করে দিতে পারে। এই ঘটনার নিরিখে বলিউডে শাহরুখ খান অভিনীত একটি চলচ্চিত্র মনে পড়ে " মাই নেম ইজ খান" এতেও দেখেছি সহজ সরল একটি মানুষ এই হেনস্থার শিকার হয়ে অত্যাচারিত হয়েও কিছুতেই প্রমাণ করতে পারে না যে " মাই নেম ইজ খান, বাট আই অ্যাম নট এ টেররিস্ট" শুধু মাত্র তার পদবী খান বলে তাকে এই হেনস্থা। সমীরের গল্পে এই ঘটনা তীব্র দংশনের রূপ না নিয়ে শুধু মাত্র অবলোকনের ধরতাইটুকু রেখে গেছে। ১১সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের সময় আগুন হানার থেকে বাঁচার জন্য এক দম্পতি জানলা দিয়ে নীচে ঝাঁপ দিচ্ছে। এটা একটা বিভ্রম ঠিক কথাই। কিন্তু পাজল্ড মানুষ মুহূর্তের বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় এই ভুল করে এবং আমরা জানি মানুষ এরকম করেওছিল। ইতিহাস তার সাক্ষী। সমীরের অবলোকন থেকে আমরা যা পাই, মনস্তত্ত্ববিদ হিসেব করে দেখেছিলেন সেই দম্পতি পতনকালীন অতিরিক্ত আয়ু পেয়েছিল ১মিনিট ৪২ সেকেন্ড যখন পতন আর উড়ান খুব কাছাকাছি। তাছাড়া অপরের আয়োজিত মৃত্যুর চেয়ে স্বেচ্ছা মৃত্যু অনেক বেশী সম্মানের। এখানে কোনো পরাজয় নেই। এটাও যেমন লেখক দেখাতে চেয়েছেন তেমনি উড়ান শব্দটাকে যোগ করে মৃত্যুর সঙ্গে মুক্তিকে যুক্ত করেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও যেখানে কোনো আত্মগ্লানি নেই। হত্যা আআর আত্মহত্যায় যে যার ঈশ্বর খুঁজে নেয়। এভাবেই মুক্তমুখে ছেড়ে দিয়েছেন গল্পটা।
# সমীর রায়চোধুরীর গল্প ও কবিতার লক্ষণ নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেছেন। আমি নিজেও আগে অন্যত্র তাঁর আরও অন্যান্য গল্প নিয়ে আলোচনা করেছি। তার থেকে মূল যে বিষয়টি উঠে আসে সেটি হল, সমীর রায়চৌধুরী আদ্যপ্রান্ত একজন পোস্টমডার্ন লেখক, যেখানে লেখকের স্বাধীনতা অবাধ। তথাকথিত অদ্যাপক অনুশাসিত গদ্য নয়। ফলত তাঁর রচনা ডিক্যাননাইসড, পাঠ্যবস্তু বাঁধনমুক্ত, রাইজোমেটিক এবং ডিন্যারোটিভাইজড। অধুনান্তিকের স্বরূপ নিয়ে এখনো অনেকের জিজ্ঞাসা এটা কি কোনো দর্শন? না কি চিন্তাচেতনার স্তর বিশেষ? না কি কোনো আইন? সমীর রায়চৌধুরী বলতে চান পোস্টমডার্ন আসলে কিছু কাললক্ষণ, সময়ের প্রবহমানতার সূত্রেই এর চলন গমন। তাই একে অস্বীকার করা মানে জীবনের স্রোতকে অস্বীকার করা।
Monday, November 26, 2018
উদয়ন ঘোষ : মলয় পোস্টকলোনিয়াল, মলয় পোস্টমডার্ন
যত দিন যাচ্ছে, মলয়ের লেখা যত পড়ছি, ততই মনে হচ্ছে, তাঁকে নিয়ে মহাভারত লেখা যায় । মহাভারত অবশ্য কথার কথা, আসলে মলয় সম্পর্কে বহুবিধ কথা লেখা যায় । সেজন্য নিজের সুবিধার্থে এবং টাইম অ্যাণ্ড স্পেস ভেবে, আমি স্হির করেছি, মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে মাত্র ওই কথা লিখি, অর্থাৎ মলয়ের পোস্টকলোনিয়ালিজম এবং তাঁর পোস্টমডার্নিজম ।
আর যে যাই ভাবুক, আমি ভাবি, এদেশে পোস্টকলোনিয়াল না হলে পোস্টমডার্ন হওয়া যায় না ।
আদিতেই বলে রাখা ভালো, ওই পোস্টকলোনিয়ালিজম ও পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কে আমার ধারণাকে, আমি, কিছুকাল হল, নিজের কাছে অন্তত, স্বচ্ছ করে রাখতে পেরেছি । কেননা দুটোই ঐতিহাসিক ভাববস্তুগত নির্দিষ্ট এক অবজেকটিভ কোরিলেশানে আছে । এবং দুটোই এককভাবে কোনও দর্শন, অথবা আচরণ কিংবা ঢঙ অথবা প্রবণতা নয়, তদুপরি এককভাবে এই দুই কোনও সাংস্কৃতিক অথবা পরিকাঠামোগত স্ফূরণও নয় । এবং এই দুই ওই সবকিছুর যোগফলও নয় । অথভ ওই পোস্টকলোনিয়ালিজম ও পোস্টমডার্নিজমে ওই সব তথাকথিত কোনও নির্দিষ্ট দর্শন, আচরণ, ঢঙ, প্রবণতা, সাংস্কৃতিক/পারকাঠামোগত স্ফূরণ ইত্যাদি ইতস্তত থাকলেও থাকতে পারে । কিছু গবেষক, ক্রিটিক, উৎসাহী পাঠক, অথবা ওই দুই ইজমের ধ্বজাধারী সেবক, লেখক, কিংবা সদাসর্বদা যাঁরা যে-কোনও ইজমের হঠাৎ দার্শনিক বনে যান, অথবা তদনুরূপ সমাজবিজ্ঞানী ওই দুই ইজমে, ওপরে, যা যা লক্ষণের কথা আছে -- তার সবগুলি, অথবা একাধিক, কিংবা যে-কোনও একটি লক্ষণকে ওই দুই ইজমের ধ্রুবতারা মনে করতে পারেন ।
আমি বরাবরই ওই সব ইজম, এবং তৎসংক্রান্ত নানাবিধ টাইটেল-সাবটাইটেল, লেবেলসর্বস্বতা ইত্যাদি থেকে তফাতে থাকার চেষ্টা করি । জীবিকায় শিক্ষক হবার জন্যে, এবং ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে আমাকে কিন্তু ওই সব পড়তে হয়েছে, এবং ক্লাসে ওই সব বলতেও হয়েছে, বিশেষত তথাকথিত নন্দনতত্বের ক্লাসে । আমাকে ক্ষমা করুন, পাঠক, ক্লাসে, প্রকাশ্যে ওই সব আমি মানিও বলতে হয়েছে, বা এই ঠিক যে রস নয় প্রকার, ছত্রিশ তার অনুষঙ্গ, যেভাবে ওই সব লেখা পোয়েটিইকস সম্পর্কিত গ্রন্হাদিতে, সেভাবেই বলতে হয়েছে । নিজের কথা বলার তো স্কোপ নেই, তাই ছাত্রদের কোনও দিনই বলা হয়নি যে, ওই সব জেনেও, সাহিত্যের চুলও ছোঁয়া যায় না ।
এমতাবস্হায় আমাকে লিখতে হচ্ছে, ওই কথা অর্থাৎ মলয় রায়চৌধুরীর পোস্টকলোনিয়ালিজম এবং তাঁর পোস্টমডার্নিজম । পাঠক অবশ্যই ভাবতে পারেন, কী দরকার ছিল এইসব ঘটা করার । স্রেফ মলয় রায়চৌধুরী কী ও কে সহজ সরল ভাষায় সরলার্থ করলেই হত !
হত না ।
কেননা পাঠক হিসেবে পাঠকমনকে যতটা জানি, সাহিত্যের আলোচনায় যদি ওই সব ইজম, টাইটেল, লেবেল না-থাকে, তাহলে অ্যাকাডেমিক সাহিত্য বুঝতে বড় অসুবিধে হয় । যেই লেখা হল, মলয় হাংরি জেনারেশন অন্যতম ইশ্যু, অমনি পাঠকের যা বোঝার সহজে বোঝা হয়ে গেল । কেননা পাঠকের, যে-কোনো ভাবেই হোক, ওই সব টাইটেল চোখে পড়বেই এবং মূর্ত থেকে বিমূর্ত ধারণা থেকেই যাবে, বলা উচিত জন্মও নেয় ওই সব ইজম, টাইটেল একবার মগজে ঢোকাতে পারলে । এখন, কী করি, আপনিই বলুন পাঠক, যখন পাঠক হিসেবে আমাদের মাথায় ইতিমধ্যেই ঢুকে বসে আছে ওই সব, তখন ওই সব দিয়েই কাজ করে যেতে হবে । না-হয় বযোজোর আমি ইজম টাইটেলের ফ্রেম ভেঙে গড়ে দিলাম । এবং এভাবে পাঠকমন ও আমার ভেঙে দেয়ার মধ্যে সত্যবস্তুকে রক্ষা, দুই-ই সামলালাম । হ্যাঁ, পাঠক, দু-নৌকোয় পা দিয়েই কাজটা করতে হবে । মানুষের সে-অভ্যাস ভালোই আছে -- কেননা পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র তথাকথিত অনাবিল জানোয়ার হয়ে পরক্ষণেই আবার তথাকথিত আবিল মানবিক হতে পারে । এ-কাজকেই আবার মানুষই বলর দু-নৌকোয় পা দেয়া ।
দুই
যাই হোক, প্রথমে পোস্টকলোনিয়ালিজমের কথা হয়ে যাক । অর্থাৎ মলয় কোথায় পোস্টকলোনিয়াল । এ-ব্যাখ্যায় আমি মলয়ের নিজস্ব ‘ভূমিকা’ তথা ‘আত্মপক্ষ’ থেকে ওঁরই কথাগুলো হুবহু লিখে যাচ্ছি : “২৯ অক্টোবর ১৯৩৭ থেকে ২ নভেম্বর ১৯৩৯ এর মধ্যে কোনো ১১ই কার্তিক, পাটনার প্রিন্স অব ওয়েল্স মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে, পৃথিবীর দিকে পা করে জন্মাবার’’’”ইত্যাদি । অথচ ক্ষণেক পরেই ওই মলয় জানাচ্ছেন, “হাসপাতালের রেকর্ড খুঁজে দেখেছিলুম ২৯ অক্টোবর -- ২ নভেম্বর ১৯৩৭, ১৯৩৮, ১৯৩৯ বৃহস্পতিবার শুক্রবার শনিবার কারুর, ছেলে হয়নি, হলেও মরা অবস্হায়।”--- ময় রায়চৌধুরীর ‘ভেন্নগল্প’-এর দ্বিতীয় ভূমিকার ‘প্রতিবন্ধী অস্তিত্ব’ থেকে হুবহু নেয়া ( পৃ ্ঞ-ট, মার্চ ১৯৮৪ ) ।
এখন ব্যাখ্যা সরল যে, মলয় পোস্টকলোনিয়াল, কেননা মলয় কলোনিয়াল নন, কেননা মলয় কলোনিতে জন্মাননি, কেননা পৃথিবীর দিকে পা করে জন্মাবার সুযোগ পেয়েছিলেন, কেননা পরবর্তীতে ওই হাসপাতালের রেকর্ডে, যেখানে তিনি জন্মেছেন বলে লোকশ্রুতি, সেখানে কোনও পুত্রসন্তান ( ছেলে ) জন্মাবার তথ্য নেই । অর্থাৎ মলয় পোস্টকলোনিয়াল ইন দা ট্রুয়েস্ট সেন্স অব দা টার্ম । পোস্টকলোনিয়াল না হলে নিজের প্রতিবন্ধী কলোনিয়াল অস্তিত্বকে, এবং তার পরিকাঠামোর ফ্রেম এভাবে ভাঙতে পারতেন না । মলয় এখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক, এবং উত্তরঔপনিবেশিক । ঠিক, তদুপরি বলি, মলয়ই একমাত্র, যিনি ঘোষণা করেন, “মলয় রায়চৌধুরীর কোনো গ্রন্হের কারুর কোনো কপিরাইট নেই’...কোনোরকম স্বত্ব কারুর জন্য সংরক্ষিত নয় । তা পাঠকের।” মলয় এখানে তৃণমূল গণতান্ত্রিক, অতএব উত্তরঔপনিবেশিক । বলা বেশি হোক, তবু বলি, পাঠক, এখানেই তাঁর পোস্টকলোনিয়ালিজম বুঝুন । এই পোস্টকলোনিয়াল হবার জন্যই মলয় বড় সহজে পোস্টমডার্ন হতে পেরেছেন । অবশ্য মলয় স্বয়ং মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদে পতনের সঙ্গে উপনিবেশেরও পতন হয় । তবুও মলয়ের জন্মকালে, বাল্যকালে, কৈশোরেও কিন্তি ওই সাম্রাজ্যবাদের ঐতিহাসিক পতন ঘটেনি ।
তিন
এবার পোস্টমডার্নিজম পপসঙ্গে যাই, কেবল এই কথা বলে নিয়ে, মলয় যে-উত্তরঔপনিবেশিক তথা অধুনান্তিক, এ তাঁর জন্মবৃত্তান্তেই আভাসিত, কেননা সেখানে সে যৌগিক সংস্কৃতির । জন্মলাভও করেন, আবার রেকর্ড রাখেন না ।
পশ্চিমী সভ্যতার এক শূন্যতায় পোস্টমডার্নিজম যে কেবল নঞর্থক প্রতিক্রিয়া, তা নয়, একটা প্রতিবাদের জায়গাও বটে । ১৯৭০ ও ৮০র দশকের সিনিসিজম ও হতাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য বলেই এর চিন্তাভাবনা ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করেছে । সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস ও পরাজিত মনোভাবের ভূমিটি, পোস্টমডার্ন তত্ব, কবিতা, শিল্প অধিকার করার, সক্ষমতাতেই মনোযোগ আকর্ষণ করে । পোস্টমডানড চিনতায়, তার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা জাক দেরিদার ভাবনায়, পাওয়ার বা ক্ষমতা সম্পর্কেই সন্দেহ ঘনীভূত, ক্ষমতার দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার দিকে অঙ্গুলিসংকেত । দেরিদা বলেন, ক্ষমতা সবকিছুকে জোর করে এক করতে চায়, পার্থক্য অস্বীকার করে, সময় ও সময় ছাড়িয়ে জীবনশিল্পের নানামাত্রিক ব্যাখ্যাকে চেপে ধরে এক করতে চায়, প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্হাতেও এর ব্যত্যয় হয় না । পাওয়ারকে তাই অবিশ্বাস করো । মানুষের তুচ্ছতা ও ক্ষমতাহীনতাকে পোস্টমডার্ন সামনে নিয়ে আসে । অত্যাচারিত যে অত্যাচারিত, তার কারণ সমগ্র ব্যবস্হাই অনিবার্যভাবে অত্যাচার পুনরুৎপাদিত করে । পোস্টমডার্নে এ সত্যই ধ্বনিত হয়, ক্ষমতাবান অত্যাচারিতের ভালো তো মোটেও নয়, বরং খারাপ । শুধু তাই নয়, দেরিদা ও পোস্টমডার্নেরা মনে করেন, সক্রিয়তার কোনও নির্বাচন নেই, যে কোনও সক্রিয়তাই ক্ষমতার সামগ্রিকতায় আক্রান্ত হয়, কার্যকর সক্রিয়তা তাই অনৈতিক । স্বাধীনতা যদি পেতেই হয়, তাহলে প্রয়োজন ‘ডিকন্সট্রাকশান’-এর বা বিনির্মাণের । এখানেই মানুষ পোস্টমডার্নকে সঙ্গী হিসাবে পায় : কারণ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় সে দেখে স্বাধীনতার অনুপস্হিতি, দেখে যে-কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্হাই হোক, ফলাফল একই : হতাশা ও স্বাধীনতাহীনতা । আমাদের “বাস্তবেও অন্য প্রক্রিয়ায় প্রায় এরকমই অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় । পোস্টমডার্নের এই সাধারণ মানুষের অসহায়তা বোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া, এখানেও তাই প্রাসঙ্গিক মানুষের তুচ্ছ হয়ে যাওয়া, মানুষের হতাশা এ-বাস্তবেও অন্যভাবে ক্রমশ মানব অস্তিত্বকে খাচ্ছে ।”
উদ্ধৃতিটি পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের । তাঁর পোস্টমডার্নিজম তত্বের ব্যাখ্যায় ওইভাবে অগ্রসর হয়ে তিনিও জানাচ্ছেন, পোস্টকলোনিয়াল না হলে পোস্টমডার্নিজমে প্রবেশ করা যায় না অবশ্য তিনি এ কথাও বলতে ছাড়েন না, কলোনিয়াল তৃতীয় বিশ্বের যে-হতাশা প্রথম বিশ্বের দ্রুত গ্লোবালাইজেশান দেখে জন্মায়, সেখানে পরোক্ষে পোস্টমডার্ন হওয়া যায়, যদিও তা খানিক পুঁথিপড়া হবে, স্পন্টেনিয়াস হবে না । এবং এখানকার মানুষদের তুচ্ছ হয়ে যাওয়া প্রথম বিশ্বের মানুষদের দেখে, দ্রুত উল্লম্ফনের দ্বারা সব তুচ্ছতাকে কাটাবার মানসিকতায় বৈদেশিক ঋণ নিয়েও -- গ্রাম্য কলকাতায় মেট্রোরেল করা, যার শুরুতেও অদূরে গ্রাম্য আচরণ, তার শেষেও ওই আচরণ, শুরুর তুল্যই, নিকটবর্তী । অথবা হায়দ্রাবাদে প্রথম বিশ্বকেও চমকে দেবার জন্য প্রস্তুত ইন্টারনেটের মহিমা, যারও অদূরে তেলেঙ্গানার কাছাকাছি ব্রাহ্মণ্য দাপট সর্বকালের গ্রাম্যতাকে ছাড়িয়ে যায়, এখনও । অর্থাৎ আধুনিকতা এখানে আধিপত্যবাদী নয়, ভঙ্গুর । তাই পোস্টমডার্ন হওয়া যায় । কেননা গ্রাম্যতার আয়রনিকাল অস্তিত্বেই বস্তুত পোস্টমডার্নিজমের আবির্ভাব ।
আমিও এসব মানি । বলা উচিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ওই ভাবনাকে অভিব্যক্ত করার জন্য আমি আমারই বাক্যসমূহকে কাজে লাগাই । এবং আজ একথা স্বীকার করা আমারই দায় যে এসবই আমি, বড় সম্প্রতি, মলয় রায়চৌধুরী থেকে সম্প্রসারিত হয়েছি ।
চার
সমীর রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘পোস্টমডার্নিজম : অধুনান্তিকতা’ গ্রন্হের প্রবন্ধ ‘পোস্টমডার্নিজম তত্ব : মলয় রায়চৌধুরী’ আমি একাধিকবার পড়লাম । সম্প্রতি খুব মন দিয়ে এমন নিবিড় পাঠ আর করিনি । কার্যত আমি প্রকৃতই বিস্মিত হচ্ছিলাম, এমন অনাবিল প্রক্রিয়ায় এদেশে বসবাস করে কীভাবে ওই প্রবন্ধ লেখা যায় । মাইল মাইল অসহনীয় জ্ঞান তো পযেই আছে কতকাল ধরে । কবেই আমি জানিবার জানিবার গাঢ় বেদনার ভার ঘাড় থেকে নামিয়ে, বেশ বহাল তবিয়তে আছি, ওই জ্ঞান আহরণের অসহনীয় বিদীর্ণ বিস্ময় থেকে মুক্ত হয়ে । স্হির করে নিয়েছিলাম, আর ওপথে যাব না । বড় জোর প্রিয় লেখকদের গদ্য-পদ্য পড়ে যাব, তাতে হবতো বা প্রাবন্ধিকতা থেকে যেতে পারে, অথবা ওই, জ্ঞান, যা আমার সুখের চুল অব্দি ছুঁতে পারে না । তবু ওই পর্যন্তই। আমি এখন শেকসপীয়ারের সবকিছু, বিশেষত সনেট, রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস-গান-ছবি, জীবনানন্দের ও বিনয় মজুমদারের সবকিছু পড়ে যাই । ভেবেছিলাম, এভাবেই কাটিয়ে দেব আরও কিছুকাল । তারপর কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘মহাভারত’ । দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামীর এপিসোডে বেদব্যাসের ম্যাজিক রিয়ালিটি । তারপর মৃত্যু অথবা মস্তিষ্কের স্তব্ধতা আসা স্বাভাবিক ।
পাঁচ
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, আমি স্হির করে ফেলেছি, সঙ্গে মলয় রায়চৌধুরী পড়ে যাব । এবার হুবহু মলয়ের সেই কথাগুলো লিখে যাই :-
“আধুনিকতার কালখণ্ডটির ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ । সাম্রাজ্যবাদের উথ্থান ও পতনের সঙ্গে ঘটেছে আর্ট ফর্ম রূপে উপন্যাসের উথ্থান ও পতন । সাম্রাজ্যবাদের পতনের সঙ্গে ফুরিয়েছে আধুনিকতা ও আধুনিকতার অবসানের সঙ্গে সম্পূর্ণ ছিতরে গেছে উপন্যাসের ফর্ম । উপন্যাসের আদি কাঠামো ভেঙে পড়ার সঙ্গে কাহিনিকেন্দ্র থেকে অপসারণ ঘটেছে নায়কের । যারা যারা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল, সাম্রাজ্যবাদ, আধুনিকতা, উপন্যাস বা নায়ক, সবাই আক্রান্ত হয়েছে অধুনান্তিক কালখণ্ডে । কেন্দ্র থাকলে থাকবে পরিধি বা প্রান্ত বা প্রত্যন্ত । সাম্রাজ্যবাদের প্রান্তিক যেমন উপনিবেশ । আগেকার উপন্যাসে অন্ত্যজ ছিল প্রান্তিক । শহর যদি ক্ষমতার কেন্দ্র হয়, গ্রাম তাহলে প্রান্তিক । আমি কেন্দ্রে থাকলে তুমি হবে প্রান্তিক । পুরুষ যদি কেন্দ্র হয়, নারী হবে প্রান্তিক । অধুনান্তিকতা চাগিয়ে ওঠে কেন্দ্রের বিনির্মাণ থেকে । আধিপত্যকে তা খর্ব কর সাহিত্যে, সংগীতে, শিল্পে, নৈতিকতায়, রাজনীতিতে, সমাজে, ভাবদর্শে । বাংলা সাহিত্যে গোরার জায়গায় এসেছে চোট্টি মুণ্ডা ।”
“সাম্রাজ্যবাদ শেষ হবার পর উত্তরঔপনিবেশিকতা গড়ে তুলেছে নিজস্ব আগ্রহের এলাকাটি, যেটি অধুনান্তিকতার উদ্বেগজনক আগ্রহের এলাকাও বটে : প্রান্তিকতা, প্রত্যন্তবাসী, অন্ত্যজ, মফসসল, অনিশ্চয়তা, বহুচারিতা, লোকসংস্কৃতি, দোআঁশলাপনা, লালিকা, রঙের ছটা, এলোমেলো চিন্তা, যৌগিক সংস্কৃতি, অনির্ণেয়তা, আকস্মিকতা, বিশৃঙ্খলা, গৃহহীনতা, ভুতুড়ে পুঁজি, প্যাসটিশ, পণ্য, বহুত্ববাদ, ঠিকেদারি শ্রমিক চুক্তি, একযোগে অনেক কাজ, অপ্রাতিষ্ঠানিকতা, রূপের বৈচিত্র্য ও অজস্রতা, তৃণমূল গণতন্ত্র, পাড়ার নান্দনিকতা ইত্যাদি। উত্তরঔপনিবেশিকতা ও অধুনান্তিকতা মনে করে ইতিহাস একরৈখিক নয়, ইতিহাস অজস্র ও স্হানিক । সাম্রাজ্যবাদ, আধুনিকতার নামে যে ইশারা ও দ্যোতকগুলো নেটিভদের ওপর চাপিয়েছিল, সেগুলোকে অধুনান্তিকতার মাধ্যমে উপড়ে ফেলে দিতে চায় উত্তরঔপনিবেশিকতা । নেলো রিচার্ডস বলেছেন যে, ইউরোপ আমেরিকায় পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা শুরু হবার আগেই অধুনান্তিকতার আসল প্রবণতাগুলো প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় চোখে পড়ে । কোনো উপনিবেশের ভাষাকে অপ্রভাবিত রাখেনি ইউরোপ । আধুনিকতার নামে চাপানো সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্ম বিষয়ে ধারণা সবই ইউরোপের । সাম্রাজ্যবাদের শিকারটির সমস্যা, অতএব, অধুনান্তিক । তার ভাষার ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে । বিচার, বিবেচনার মাধ্যম নষ্ট হয়ে গেছে । অভিব্যক্তির কাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে । অথচ সাহিত্য ও রাজনীতিতে, উত্তরঔপনিবেশিকতা আবর্তিত হয় ভাষাকে কেন্দ্র করে, কেননা, আত্মপরিচয় অন্য কোথাও পাওয়া যায় না । দেখা যাবে যে, শিল্পে ও সাহিত্যে একই ধরণের কাজ হচ্ছে উপনিবেশগুলোয় এবং পোস্ট-ইনডাসট্রিয়াল আমেরিকায় । এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকায় অধুনান্তিকতার প্রাসঙ্গিকতা এ থেকেই টের পাওয়া যায় । সাম্রাজ্যবাদের দরুণ উপনিবেশের নেটিভদের স্মৃতিবিপর্যয় ঘটে গেছে । পোস্টমডার্ন লেখালিখি ও ছবি আঁকায় যে প্রবণতাগুলো প্রখর তা তুলনীয় স্মৃতিবিপর্যয়ের সঙ্গে ।”
“আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি পোস্টমডার্নিস্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে । কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক তা নিয়ে চলছে বিরামহীন খেয়োখেয়ি । সত্য, জ্ঞান, বৈধতার নানান রকমফের । যেমন উলফা, জেকেএলএফ, খালিস্তান, শিবসেনা, আমরা বাঙালি, ঝাড়খণ্ড, গোর্খাল্যাণ্ড, বোড়ো্যাণ্ড, উত্তরাখণ্ড, ইত্যাদির মতন ছোট ছোট ছাতার স্হানিক কেন্দ্রিকতা-বিরোধী চেতনা । যেমন ভূমিসেনা, লাচিত সেনা, কুঁয়র সেনা । যেমন অজস্র নাটকের দল । যেমন আঞ্চলিক ভাষার কবিতা । যেমন টুকরো টুকরো মহাআখ্যানবাদী মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট দল । যেমন রাজনীতিতে ক্রিমিনালদের দৌরাত্ম্য । যেমন সুমন-নচিকেতা-মৌসুমীর সংগীতের ক্ষমতাকেন্দ্র-বিরোধী গান । যেমন হাজার হাজার লিটল ম্যাগাজিন । এবং ঘরে ঘরে ‘আদর্শের শেষ’ । যেমন টিনশেড কোচিং ক্লাস শিক্ষা কাঠামো । যেমন প্রতিটি বাঙালির আঙুলে এনলাইটেনমেন্ট-বিরোধী গ্রহরত্ন । যেমন লোকনাথ বাবা, সত্য সাইবাবা, অনুকুল ঠাকুর, বালক ব্রহ্মচারী, আনন্দময়ী, দাদাজী, রজনীশ, মহেশ যোগী ইত্যাদি ধর্মের ছোট ছোট ছাতা যযা হিন্দু শুদ্রকেও প্রতিষ্ঠা দেয় । কম্যুনিটির ভাঙন এবং অ্যসোসিয়েশান সমূহের জন্ম, যে উত্তরাধুনিক বৈশিষ্ট্যের কথা কিথ টেস্টার বলেছেন, এখানে তা ঘটেছে দেশভাগের দরুণ এবং মহাআখ্যানবাদী পার্টি রাজনীতির কারণে । কৌমসমাজ ভেঙে যাবার কারণেই পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র আজ ছুতোর গয়লা নাপিত ধোপা ধুনুরি মুচি, এরা অবাঙালি।”
“গ্রামকেন্দ্রিক নৈরাজ্য গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই । আধুনিকতার অসুখ সারানো যাবে কিনা বলা মুশকিল । এই যে দাদা একটু সরুন, দাদু ভাড়াটা দিন, মাসি বেগুন কত করে, বলার সময়ে আমরা যে শুধু দাদা-দাদু-মাসির সম্পর্কচ্যুতি জানতে পারি তা নয়, আমরা টের পাই কৌমসমাজ ভেঙে যাবার খবর, আমরা টের পাই কীভাবে এই শব্দগুলোর ভেতর থেকে তাদের মানে বের করে ফেলে দিয়েছে সমাজ । পোস্টমডার্নিজমকে বাঙালির দোরগোড়ায় এনেছে বঙ্গসংস্কৃতির অধুনান্তিক পার্টি রাজনীতি এবং উত্তরঔপনিবেশিক আর্থিক দুর্গতি।”
ছয়
এবার মলয়ের কথাগুলি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবা যায় । প্রথমেই বলা ভালো, আমি যে লিখেছিলাম, পোস্টকলোনিয়াল না হলে কেউ পোস্টমডার্ন হতে পারে না, সেখানে মলয়ের বক্তব্য ওই পোস্টকলোনিয়ালিজম এবং পোস্টমডার্নিজম আসলে একই বস্তুকেন্দ্রের দুটি অভিব্যক্তি, পরস্পর নির্ভর অথবা পারস্পরিক কিংবা যমঝ । অবশ্য মলয় আরও লজিকালি কথাটার বিস্তার ঘটিয়েছেন । তাঁর ধারণা, সাম্রাজ্যবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মডার্ন যুগের অবসান ঘটেছে, আধুনিকতার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে উপনিবেশেরও অবসানের লক্ষণাদি মূর্ত হয়েছে।
মলয়, বোধহয়, ধ্রুপদী সাম্রাজ্যবাদের অবসানের মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদের চারিত্রিক অবসান দেখেছেন । আমি অবশ্য বরাবরই নিয়ো-ইমপিরিয়ালিজম টের পাই, এখনও পাই । নিয়ো-ইমপিরিয়ালিজমের অস্তিত্ব মেনে নিলেও, মলয়ের একটি কথা তবু সত্য হয়ে ওঠে । ধ্রপদী সাম্রাজ্যবাদের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ধ্রুপদী উপনিবেশেরও অবসান ঘটেছে । এটা ঠিক । এবং মলয়কে সেলাম জানাই, আমার মধ্যকার এক নিগূঢ় জিজ্ঞাসা, যার উত্তর নানা সময়ে পেয়েও আবার জিজ্ঞাসায় আক্রান্ত হয়েছে আমার মন, অর্থাৎ আমার মস্তিষ্ক, সেখানে মলয়, সম্প্রতি, তাঁর রচনাদি পাঠকালে আমার শিক্ষক হয়েছেন । অর্থাৎ যথার্থ উত্তর দিয়েছেন, যার পর আর নাই ।
একদা আমি তিন কমিউনিস্ট পার্টির কখনও সদস্য, ককনও দরদি মেম্বার হয়ে বার বার নানা মিটিং, কংগ্রেস, পার্টি ক্লাস করে যে-প্রশ্নে মন তথা মস্তিষ্ককে জেরবার করেছি, তা হল, আমাদের দেশের রাষ্ট্রচরিত্র বিশ্লেষণে ও বৈপ্লবিক স্তর নির্ণয়ে ওই নিয়ো-ইমপিরিয়ালিজম ও নিয়ো-কলোনিয়ালিজমের ভূমিকা খুঁজতে । বার বার ভুল হয়ে গেছে । সি পি আই ও সি পি এম বাহিত হয়ে যখন নয়া-সংশোধনবাদ-বিরোধী শিবিরে গিয়েছি, তখন যেন সঠিক বৈপ্লবিক পথের দিশা পেয়ে উৎসাহিত তথা আহ্লাদে আটখানা হয়ে প্রকৃতই গৃহে বাস করেও রণাঙ্গনের মাঠে যাবার উদ্যোগ নিচ্ছিলাম । সে-সময় সংশোধনবাদী সি পি আই ও নয়া-সংশোধনবাদী সি পি এম-এর মধ্যপন্হাকে ঘৃনায় বর্জন করে যখন প্রায় গৃহত্যাগে মনস্হির করচি, এমন সময়ে আমার লেখকসত্তা, যার ভিতরে কল্পনা ও যে-কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা চরাচরের নানা সম্পর্কে আসছিল, যে-সত্তা ইহলোক স্বপ্নলোকের বর্ডার মানেনি, সে সহসা দেখল, প্রকৃত রণাঙ্গন নেই । অর্পিত তথা অ-লৌকিক রণাঙ্গন আছে কেবল । তখন ওই ধারাবাহিক সত্তা, যা একান্ত আমার, আমার চিন্তা জ্ঞানলব্ধ, পুনর্বার নয়া-উপনিবেশ ও নয়া-ফিউডাল তত্বে মনোনিবেশ করল ।
এই সময়ে তথাকথিত তৃতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অফিশিয়াল অথবা কংগ্রেসসিদ্ধ অস্তিত্ব আসেনি । তখন নানা গ্রুপ, নানা কর্মচিন্তা মাথা তুলছিল, তার মধ্যে মতাদর্শগত বিতর্কে এক ধরণের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাও মাথাচাড়া দিচ্ছিল । সেই উত্তপ্ত দাবানলী সময়ে আমার সঙ্গে একটি গ্রুপের যোগাযোগ ঘটে, ইতিহাসে তাদের নাম নয়া-সংশোধনবাদবিরোধী সোশ্যালিস্ট রিভলিউশানারি, সংক্ষেপে এস আর গ্রুপ । তাদের সঙ্গে দিনের পর দিন তর্কে যে জায়গায় পৌঁছেছিলাম, তার সঙ্গে মলয়ের বিশ্লেষণের গুণগত সাদৃশ্য আছে । সেই জায়গাটি হল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ক্ল্যাসিকাল ইমপিরিয়ালিজম তথা মনোপলি ক্যাপিটালিজমেরও অন্তিম সময় উপস্হিত । অতএব উপনিবেশেরও অবসান । স্তালিন তো এই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইমপিরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক দেশগুলির উৎসাহিত মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখেছিলেন । এশিয়ায় সেই মিক্তিযুদ্ধ দুই বিশাল দেশ ভারতবর্ষ ও চিনে ততদিনের মধ্যে সূচিত হয়ে গেছে । এই বাংলার তথাকথিত এস আর গ্রুপ বলতে শুরু করেছে তখন, পঞ্চাশের দশকের শেষে, তথাকথিত স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় বুর্জোয়ার উথ্থানে, এদেশে এক উল্লম্ফনে জাতীয় বুর্জোয়ারা নয়া-সাম্রাজ্যবাদী হয়ে গেছে, অন্তত তাদের সম্প্রসারণ তথা আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে ওই তথাকথিত স্বাধীনতা সংগ্রামে । সংগ্রামান্তে, জাতীয় বুর্জোয়ার অন্যতম নেতা, তথাকথিত গণতান্ত্রক জওহরলাল নেহেরু তাঁর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়ার’ পাতায় পাতায় অনুশীলন করছেন এক বৃহৎ ভারতবর্ষ, এক উপমহাদেশের ।
ক্ল্যসিকাল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের দ্বারা অধিকৃত কাশ্মীর, অসম ইত্যাদি ভারতীয় মেইনস্ট্রিমের অন্তর্গত না হয়েও তথাকথিত স্বাধীন ভারতবর্ষের ম্যাপে একান্ত ভারতীয় হিসেবে চিহ্ণিত করেছেন ওই ডিসকভারার । জাতীয় বুর্জোয়ার ভ্রূণেই সম্্রসারণবাদী নয়া-সাম্রাজ্যবাদীর ম্যাচিওর হওয়া । অতএব ওই এস আর গ্রুপের মতে, ভারতবর্ষের রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষমতা এখন সম্পপসারণবাদী বুর্জোয়াদের হাতে । অর্থাৎ এই দেশের ঔপনিবেশিক মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার ভ্রূণে শৈল্পিক বুর্জোয়া তথা নয়া-পুঁজিবাদের ম্যাচুরিটি ঘটে গেছে । সুতরাং এখন এদেশের মূল দ্বন্দ্ব পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্হার সঙ্গে সর্বহারা শ্রমিকমনস্ক জনগণের দ্বন্দ্ব । অর্থাৎ বৈপ্লবিক স্তর হল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব । ওই সব তথাকথিত পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিভোলিউশান ফালতু কথা -- রণাঙ্গনে এখন পুঁজিবাদ বনাম সর্বহারা ।
মলয়কে সেলাম, প্রকৃতই সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটে গেছে । আধুনিক যুগ তার অন্তিম কালে শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছে মডার্ন থাকার । কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পোস্ট-ইনডাসট্রিয়াল যুগের সূচনা মূর্ত হতে চলেছে । এবং পোস্টইনডাসট্রিয়ালিজম আসলে ইনডাসট্রিয়াল তথা মডার্ন এজের অন্তিমে উপস্হিত হয় । এবং এটি একটি গ্লোবাল উদ্যোগ ।
সুতরাং পোস্টমডার্নিজম তার নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে নানা ঢঙে সব দেশেরই দোরগোড়ায় কমবেশি উপস্হিত । সেলাম মলয় । আপনি ঠিকই দেখেছেন ।
সাত
সবকিছু ছেড়ে আমি কেবল মলয়ের ‘ভেন্নগল্প’ গ্রন্হটি দেখি, কেননা পোস্টকলোনিয়াল তথা পোস্টমডার্ন চরিত্র ওই ‘ভেন্নগল্পে’ বড় স্পষ্ট, ক্লিয়ার, সমুজ্জ্বল । ভূমিকায় মলয়ও বলেছেন : ‘দেখা যাবে, এই গ্রন্হটির পাঠবস্তুগুলো কেন্দ্রহীন ; বাস্তবতাকে বিনির্মাণ করে পাওয়া স্হিতিগুলো সমন্বয়হীন ; বিষয় অথবা আঙ্গিকে ঐক্য এবং সমাপ্তি নেই এবং কাঁচামালগুলো থেকে নির্মিত হচ্ছে না কোনোকিছু ; আমি কোনো অভিপ্রায় ছাপিয়ে দিচ্ছি না । বা গড়ে দিচ্ছি না শব্দব্যূহ ।...শরীর ও মন দুটো আলাদা আলাদা ব্যাপার, এরকম সরলীকরণের মধ্যে আমি কোনো রচনাকে টানিনি । লেখাগুলো বরং ভঙ্গুরতার স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনাকারীর, উত্তরঔপনিবেশিক মতদ্বন্দ্বের, জটিলতার, একরকম আলাপচারিতা ।’
এখানে আমি ওই ভূমিকায় যুক্ত করতে চাই ওই ‘উত্তরঔপনিবেশিক’-এর সঙ্গে ‘উত্তরআধুনিক’ শব্দ, যে দুই শব্দ, পূর্বেই লিখেছি, যমজ ।
‘ভেন্নগল্প’-গ্রন্হের প্রথম প্রকাশ কলকাতা বইমেলা ১৯৯৬ । রচনাকাল ১৯৮৩ - ১৯৯৫ । আমি ওই রচনাকালের মাঝামাঝি রচিত, ১৯৯২ সালের ‘অলৌকিক দাম্পত্য’ গল্পটিকেই কেবল ধরে মলয়ের পোস্টকলোনিয়াল, মলয়ের পোস্টমডার্ন চরিত্র বোঝার চেষ্টা করব ।
কেননা গল্পটি প্রতিনিধিস্হানীয় । আমার কাছে অসাধারণ । গল্পটির শুরু ও শেষ অনাদি ও অন্তহীন ।এবং আসলে গল্পটির মধ্যে কোনো স্টোরি এলিমেন্ট নেই । বলা উচিত এটি গল্প নয়, গদ্য ছাড়া আর কোনও অভিধা আমার জানা নেই । মলয়ের মতে Post-colonial episodes/Texts ; সবকিছুই বিনির্মাণের পর অভিব্যক্ত । শব্দগঠন বিনির্মিত । বাক্যবিন্যাস অব্দি বিনির্মিত । এই গদ্যের কোনো কেন্দ্র নেই, অতএব কোনো গ্রহ বা উপগ্রহ নেই ।
আট
তবে অন্যান্য গদ্য রচনাও আলোচনার মধ্যে আনলে ভালো হতো । সময় ও সুযোগের অভাব । পরন্তু আমার স্বভাবও এই যে, আমি নানা কিছুর মধ্যে আলোচনাকে বিন্যস্ত রাখতে পারি না । আমার পক্ষে সহজ একটি দুটির মধ্যেকার কথানুসন্ধান । যেমন ধরুন, কবিতা নাটক পুরো তফাতে রাখছি আপাতত । এমনকি বলা যায় উপন্যাসও, যদিও ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসটি মাথায় থেকেই যাচ্ছে, জানি না কেন ! শুধু এটুকু জানি, মলয়ের পোস্টকলোনিয়াল তথা পোস্টমডার্ন সিনট্যাক্স নিয়ে যে ভাবনা গড়ে উঠল এই কদিনে, তাতে ওই ‘নামগন্ধ’ উপন্যসের কিছু ভূমিকা আছে । মলয়ের মালমশলা ছড়িয়ে রেখেছি চতুর্দিকে, এবার কেবল বেছে নেবার পালা । তাতে ওই ঘটল, ওই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’ ।এই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’-এর অন্তর্গত নয়, অথচ সঠিক বাইরেও নয়, এমনকিছু আপাত অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু যথার্থই পপাসঙ্গিক কথা হয়ে থাক ।
মডার্ন যুগের মার্কসীয় রাজনীতির এক চমৎকার পোস্টমডার্ন অভীপ্সা আছে । গদ্যটির নাম ‘ভেন্ন’, সেখানে সীতেশের তারিখবর্জিত ডায়েরির লেখাটা :-
“আজকাল আমাদের দেশে শ্রেণিচেতনা বলতে সাধারণত পুঁজিপতি জোতদার ধনী ব্যক্তি প্রভৃতির বিরুদ্ধে জঙ্গী মনোভাবকে বোঝানো হয়ে থাকে । এটা শ্রেণী চাতনার একটা স্হুল দিক মাত্র । আসলে শ্রেণীচেতনা হল সমাজের বস্তুবাদী বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সমাজ বিকাশের পথ অনুধাবন করে ওই মুহূর্তের প্রগতিশীল কর্তব্য নিরুপণ করার ক্ষমতা । এক্ষেত্রে মার্কসবাদের চিরায়ত তত্ব ও সংক্ষিপ্ত মূল সূত্রগুলি খুব বেশি সহায়ক হবে না । বরং মার্কসবাদী পদ্ধতির সৃষ্টিশীল প্রয়োগের মাধ্যমেই যে কোনও দেশের পরিস্হিতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সম্ভব । এবং মার্কসবাদী সমাজ বিশ্লেষণের মূল কথা হল, ঐতিহাসিক বিকাশের পটভূমিতেই যেকোনো সমাজের বিশ্লেষণ করতে হবে ।”
‘ভেন্ন’ গল্পটি কিন্তু ১৯৮৩ সালে লেখা । অর্থাৎ ওই আশির দশকের গোড়ার থেকেই মলয়ের পোস্টমডার্নজম কাজ করছে ।
এখানে ‘The Name Of The Rose’, যা একটি পোস্টমডার্ন উদ্যোগ, তার লেখক উমবের্তো একোর কিছু কথায় আসি…”it ( postmodernism ) demands, in order to be understood, not the negation of the already said, but its ironic rethinking.” মলয় লিখিত ওই ডায়েরি, পাঠক বুঝুন, not the negation of the already said, but its ironic rethinking.
নয়
এবার সত্য সত্যই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’র চাবিকাঠি পেয়ে গেলাম । কেননা এই গদ্য, বস্তুত, দুর্ঘটনা, যা আকছার ঘটছে, তারই ironic rethinking । দুর্ঘটনা, এখানে বাস দুর্ঘটনা, মলয়ের সৃষ্টিশীল প্রয়োগে যে-দুর্ঘটনা অলৌকিক, তাই বলে অ-লৌকিক নয় । দাম্পত্যের যে কথা এখানে আছে, তাও ironic rethinking ।এখানে বলে রাখা ভালো, মডার্ন যুগেই দাম্পত্যের শেষ দেখা গেছে । লিভ টুগেদার মডার্ন সমাজ মেনে নিয়েছে । পোস্টমডার্ন সমাজ তারই ironic rethinking দেয় বলে ধারণা করি । এক্ষণে সরাসরি মলয়ের বাক্যে আসি :-
“কুড়ি বছর আগে শহরের উদাসীন রেল স্টেশনের সামনে চকচকে দুপুরের রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলুম ফরসা যুবতীর কাটা তর্জনী, রক্তহীন, কাচের রঙের নীলচে নখপালিশ, সোনার অলস আঙটিতে গরম পদ্মরাগমণি ঠায় জেগে…”
এবার, এই মলয়, কে বা কী, যিনি ওই অলৌকিক তর্জনী কুড়িয়ে পেলেন ? মলয় স্বয়ং বলেছেন, ওই পদ্মরাগমণি তো আসলে চুনি, এবং---
“যে চুনিতে আজও গ্রীষ্মকালীন কেনিয়ার বহুচারী যুবক সিংহের থাবার থমথমে গন্ধ আমাকে দু’তিনশো বছর আগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যখন আরা বালিয়া বা ছাপরা থেকে আমার কেঁদো পূর্বপুরুষরা পাকানো চামড়ার চাবুক খেতে আর অর্ধাহারে থাকার জন্যে কালোদের দ্বীপে জাহাজবন্দী কেনা গোলাম হয়ে চলে গিয়েছিলেন।”
এখানে মলয় প্রকৃতই বিশ্ববাসী তথা আবহমানকালীন । এখানে সময় ও কালের বিনির্মাণ হচ্ছে । এটি একটি পোস্টমডার্ন উদ্যোগ । আবার দেখুন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত মলয় ও তাঁর সহযাত্রীদের, ইতস্তত মৃত, অথবা জ্ঞানরহিত স্টেজের বিনির্মাণ । যেমন :-
“যে-দুটো রূপসী শীতল হাত আমাকে পেছন থেকে নির্লজ্জ জড়িয়ে রয়েছে, নারীর আতর মাখা বাহু, সোনার কয়েকগাছা অমৃতসরী চুড়িসহ, আজকে, কুড়ি বছর পর, এই শীতের আধো অন্ধকার সকালে, সে-হাতের দক্ষিণ তর্জনীতে সেই হুবহু আঙটি পদ্মরাগমণি । চল্লিশোর্ধ অকৃতদারকে এভাবে আকুল আঁকড়ে থাকা রহস্যময়ী বাহু, এতো শক্ত করে ধরে থাকা, আমি পেছন ফিরে দেখার চেষ্টায় ঠাহর করতে পারলুম না ।”
এবার পাঠক দেখুন, কুড়ি বছর আগে পাওয়া তর্জনী, এখন এই দুর্ঘটনার বিনির্মাণে রূপসীর অঙ্গীভূত । এবং তর্জনীতে । রহস্যময়ী বাহু ধীরে ধীরে অলৌকিক দাম্পত্যে নিয়ে যাচ্ছে । সে এক অসাধারণ বর্ণনা । এবং সে-বর্ণনাও মডার্ন ন্যারেটিভকে বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে পোস্টন্যারেটিভ ডিসকোর্সে নিয়ে যাচ্ছে । যেমন:-
“---ভাগ্যিস আপনি মারা গেলেন, তাই আপনার সঙ্গে এই নিবিড় পরিচয়ের সুযোগ পেলুম।” আমি বললুম ওঁকে, শীতের নিরাপদ ফিকে সকালকে শুনিয়ে, যখন আশেপাশে সবাই মরে গেছে মনে হয়, শুধু আমি বেঁচে, আমদের অমোঘ খবর কেউ জানতে পারেনি।”
“আপনার হৃদয় স্তব্ধ হয়ে গেছে । আপনি আমার কথা ভাবছেন না । কিন্তু তবু কেন ভালোবাসছেন আমায় ?”
“........”, আমি ওঁর আলতো করে বলা কথাগুলো শুনতে পাই । নিঃশব্দ কল্লোল হয়তো এই, অভিব্যক্তিহীন কাকলি, স্খলিত কেকা ।
“........”, উনি অজস্র কথা বলে যেতে থাকেন ।
“.........”, চোখ বন্ধ করে শুনি ওঁর কথাগুলি । মাথা পেছনে করে ওঁর ঠাণ্ডা ঠোঁটে আমার গাল ঠেকাই ! আমার উত্তাপ ওঁকে মুগ্ধ করে ।
আমিও বলে যেতে থাকি ।
-----বেঁচে থাকতে আমাকে চেয়েও দেখতেন না হয়তো আপনি ।
-----কতোদিন ভেবেছি আপনার কাটা আঙুল আর আঙটি আপনাকে খুঁজে ফেরত দিয়ে আসব ।
-----এখন তো আপনি আমার ভাষাও বুঝতে পারছেন না । না ?
-----বাসে, প্রতিটি মেয়েমেনুষকে বারবার দেখেছিলুম, কিন্তু কই, দেখিনিতো আপনাকে ।
-----আমার সৌভাগ্য, এতো লোক থাকতে আমাকেই আপনি বেছে নিলেন, এক বিচারাধীন মধ্যবয়সীকে ।”
পাঠক, দেখুন, এখানে, মডার্ন ডায়ালগের বিনির্মাণ, যা কিনা পোস্টমডার্নিজমের অন্যতম কোয়ালিটি । এ গদ্যে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমিও আছে ।
পোস্টমডার্নিজম তো অতীতকে, অতীতের রূপকথাকেও আহরণ করে, কিন্তু আয়রনিকালো ওই কার্য সম্পন্ন হয় । দেখুন :-
“ব্যঙ্গমি : ওকে ফিরে যেতে হবে ।
ব্যঙ্গমা : কোথায় ?
ব্যঙ্গমি : লাৎখোরদের পৃথিবীতে । বিপ্লবে । সংঘর্ষে । পরাজয়ে । সেখানে হাতিশালে হাতির গু থাকে, ঘোড়াশালে পড়ে থাকে লোহার নাল । ছাদের ওপর নৌকো, সিংহাসনে গাধা, নহবতখানায় কাক, মন্ত্রণাঘরে মাকড়সা, কোষাগারে গোবর, কামারশালে নেহাইয়ের ওপর ছাইভস্ম, পালঙ্কে আরশোলা, বাঁশের সাঁকো দিয়ে তৈরি রামধনু, গেরস্ত বাড়িতে ঘরে ঘরে ধেনো-টানা মাতালচি, খোরপোষের টাকায় প্রতিপালিত রাজনীতিক, মৃতদেহের বদলে মুখাগ্নি করার তোষক ।”
পাঠক, লক্ষ করুন, আধুনিকতাকে লাথি মেরে অধুনান্তিকতার অন্যতম লাৎখোর মলয়কে কোথায় ফিরে যেতে বলা হচ্ছে । ওই সব বিনির্মিত শব্দসমূহে আপনি অর্থ খুঁজতে পারেন, কিন্তু তাতে যেন বিনির্মিত অর্থ হয় । কেননা পোস্টমডার্নরা, স্বাভাবিক কারণেই, মডার্ন ভাষাতত্বকে অতিক্রম করে যান ।
দশ
পাঠক, এই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’ গদ্যে যে-যৌনতা আছে, তাও মডার্ন যৌনতারই বিনির্মিত যৌনতা, যা পোস্টমডার্ন । এ-বিষয়ে পোস্টমডার্ন William Simon যা বলেছেন, তা শুনুন, “For many people, the sexual part of their lives will take on new and somewhat disruptive salience -- disruptive in the sense that the metaphoric richness of the sexual may have to risk real life testa, tests that involve the effort to bring one’s fantasies into one’s reality. Such efforts have commonly led either to crises or to an impoverishment of both fantasy and reality.”
‘অলৌকিক দাম্পত্য’ এখানেই সত্য । এ-গদ্যে ফ্যান্টাসি-রিয়্যালিটি একবার বিন্যস্ত, তন্মুহূর্তেই ডিকনসট্রাকটেড । একবার ব্যথিত, তন্মুহূর্তেই নির্বেদ ।
আর এখানেই পোস্টকলোনিয়াল-মলয় এবং পোস্টমডার্ন-মলয়, এই বাংলায়, অদ্যাপি, সার্থক ও তুলনারহিত । সেলাম মলয় ।
[ এপ্রিল, ২০০১ ]
Subscribe to:
Posts (Atom)
হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে
হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় : নিখিল পাণ্ডে প্রখ্যাত কবি, হাংরির কবি দেবী রায় ৩ অক্টোবর ২০২৩ চলে গেছেন --- "কাব্য অমৃতলোক " ফ্ল্...
-
ছোটোলোকের শেষবেলা : মলয় রায়চৌধুরী এক ছোটোবেলা আর যুববেলার সবকিছু পালটে গেছে ; ইমলিতলা পাড়ার গোলটালির চালাবাড়িগুলো হয়ে গেছে ইঁটের দ...
-
হাংরি আন্দোলন -- সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগ মলয় রায়চৌধুরী ============= ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও স...

